বিদ্যুৎ যন্ত্রণায় অতিষ্ট সুনামগঞ্জবাসী-বিকল্প বিদ্যুৎ লাইনের কাজ চলছে ঢিমেতালে

বিশেষ প্রতিনিধি
সামান্য বাতাস বা বৃষ্টি হলেই সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ থাকে না। এমন দুরাবস্থা গত প্রায় ২০ বছর ধরে। বিদ্যুৎ গেলে এমনও হয়, ১৮ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে শহর। গত বৃহস্পতিবার রাত ১১ টায় বিদ্যুৎহীন হন সুনামগঞ্জবাসী, বিদ্যুৎ দেখেছেন পরদিন শুক্রবার বিকাল ৪ টায়, অর্থাৎ ১৬ ঘণ্টা পর কিছু সময়ের জন্য সুনামগঞ্জ শহরে বিদ্যুৎ মিলেছে। তাও পল্লী বিদ্যুতের সহায়তায় শহরে বিদুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। মূলত. ছাতক থেকে হাওরাঞ্চল দিয়ে আসা পুরাতন জড়াজীর্ণ ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের কারণে এমন সমস্যা হচ্ছে বলে বহুদিন থেকে জানিয়ে আসছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এদিকে, বিদ্যুতের এমন দূরাবস্থা দূর করার জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে জাউয়াবাজারে একটি সাবস্টেশন এবং ঐ সাবস্টেশন থেকে একটি ৩৩ কেভি’র বিকল্প বিদ্যুৎ লাইন করার কাজ শুরু হলেও এর কাজ চলছে ঢিমেতালে। অবশ্য প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ হবে বলে দাবি করেছেন।
ঝড়ে বা বৃষ্টিতে পুরাতন লাইনে সমস্যা দেখা দিলে সহজে হাওরাঞ্চলে যেয়ে ত্রুটি সারাতে পারে না বিদ্যুৎ বিভাগ। এজন্য দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকেন প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহক। সুনামগঞ্জের গ্রাহকরা এখন আকাশে মেঘ দেখলেই বুঝেন বিদ্যুৎ চলে    
যাবে, কখন আসবে কেউ জানে না। এমনকি বিদুৎ গেলে  কখন আসবে সেই তথ্যও গ্রাহকদের জানাতে পারে না বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ চলে গেলে সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ বিভাগের টেলিফোন বা মুঠোফোন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উঠায় না কেউ। এই নাগরিক দুর্ভোগের জন্য প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা মিছিল-সমাবেশ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের এমন ক্ষোভ আমলে নেয় না বললেই চলে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেরেনুর আলী বলেন,‘মানুষের দুর্ভোগ আমলে নেয় না সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ গেলে আসবে কখন, এটি জিজ্ঞেস করার জন্য মানুষও পাওয়া যায় না, ফোন দিলেও ধরে না। এখন শুনেছি জাউয়াবাজার থেকে একটি বিকল্প বিদ্যুৎ লাইনের কাজ শুরু হয়েছে। এটিও দেখা যাবে প্রকল্প মেয়াদের মধ্যে কাজের বিল হবে, কিন্তু শেষ হবে না’।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগেরই একজন কর্মচারী বললেন, ‘জাউয়াবাজার সাবস্টেশন থেকে হওয়া বিকল্প বিদ্যুৎ লাইনের কাজ কোনভাবেই জুনের মধ্যে শেষ হবে না’।
জাউয়াবাজার নতুন বিদ্যুৎ সাব স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী ইয়াছিন ইকরাম বলেন,‘প্রায় পৌঁনে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে জাউয়াবাজারে বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এখন কেবল ডেকোরেশনের কাজ বাকী’।
জাউয়াবাজার থেকে দিরাই সড়কের মোড় পর্যন্ত ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইন হচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশ দিয়ে এই লাইন আসছে। ২০১৫ সালের জুনে এই কাজ শুরু হয়েছিল। সামনের (২০১৬’র জুন মাসে) জুন মাসে এই কাজ শেষ হবার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, ‘কোনভাবেই জুনের মধ্যে এই কাজ শেষ হবে না। সুনামগঞ্জবাসীর ভোগান্তিও শেষ হবে না’।
এই প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী অনিক সরকার বলেন,‘প্রথম দিকে পানির কারণে এবং বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় এবং ঠিকাদারের কাজের লোকজন না থাকায় বিলম্ব হয়েছে, তবে জুনের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে বলেই আশা করছি আমরা’।
ঢিমেতালে কাজ করা প্রসঙ্গে এই প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পাবনার মেসার্স শওকত আলী এ- সন্স’র প্রকৌশলী ইমতিয়াজ বলেন,‘আমাদের কাজের মেয়াদ জুন মাস পর্যন্ত। জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু আমরা কাজের কিছু মালামাল যেমন ক্রসআর্ম, পিন ইন্সুলেটর, ডিস্ক ইন্সুলেটর পাচ্ছি না’। এভাবে দায়িত্বশীলরা পরস্পরকে দোষারোপ করে এক পর্যায়ে জুনেই কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে বিল উত্তোলন করতে পারেন বলে মন্তব্য করছেন বিদ্যুতের সিলেট প্রকল্প অফিস সংশ্লিষ্ট একজন কর্মচারী। ঐ কর্মচারী জানান, ‘জুনের মধ্যে কাজ শেষ না দেখালে ঐ প্রকল্পের টাকা ফেরৎ চলে যাবে’।
বিদ্যুতের সিলেট প্রকল্প অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী ছানা উল্লা অবশ্য বলেছেন,‘কাজ না করিয়ে বিল উঠানোর কোন রেকর্ড বিদ্যুতের সিলেটের প্রকল্প অফিসে এর আগে ঘটেনি। এক্ষেত্রেও ঘটবে না। মালামালের ঘাটতি থাকলেও কাজ জুনের মধ্যেই শেষ হবে। সব মিলিয়ে আর ১৫-২০ দিনের কাজ রয়েছে। পানি কমলেই কাজ শুরু হবে’। তিনি জানান, এই বিকল্প বিদ্যুৎ লাইন দিরাই সড়কের মোড পর্যন্ত যাবে। ওখান (দিরাই সড়ক মোড় থেকে থেকে সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ অফিস পর্যন্ত আগে থেকেই ৩৩ কেভি লাইন রয়েছে। সুনামগঞ্জে গ্রীড স্টেশন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হাওরাঞ্চল দিয়ে ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়া ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে বিকল্প হিসাবে এটি ব্যবহার করা যাবে।