বিদ্রোহী প্রার্থীর আধিক্যই নৌকা ডুবিয়েছে

টিপু সুলতান, দিরাই
দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পঞ্চম ধাপে দিরাই উপজেলার ৯ ইউনিয়নে ভোটের লড়াইয়ে ৬ টিতেই আওয়ামীলীগের ভরাডুবি হয়েছে। তবে দু’টিতে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও বিএনপির দখলে থাকা চরনারচর, সরমঙ্গল এবং তাড়ল ইউনিয়নে এবারও হারাতে হয়েছে আওয়ামীলীগকে। সরমঙ্গল ইউনিয়নে জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মতিউর রহমানের ঘনিষ্টজনেরা প্রকাশ্যে নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন এমন অভিযোগ ওঠছে। অপর দু’টিতে বিদ্রোহীদের আধিক্য এবং দলীয় কোন্দলকে ভরাডুবির কারণ বলে মনে করছেন দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা। তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি সাবেক সাংসদ মতিউর রহমান ভাটিপাড়া ও জগদল ইউনিয়নে প্রার্থী বদল করার সুপারিশ করেছিলেন। এই দু’টোতেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে এমন তথ্য ওঠে এসেছে। গত ২৮ মে এই উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কুলঞ্জ ও তাড়ল ইউনিয়নে তিনের অধিক বিদ্রোহী প্রার্থী নৌকার মাঝি’কে ডুবিয়েছে। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান ৩ হাজার ৫৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির একমাত্র বিদ্রোহী প্রার্থী মিছবাউজ্জামান চৌধুরী পেয়েছেন ১ হাজার ২৪৭ ভোট। অপর দিকে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী মিলন মিয়া ২ হাজার ১২৯ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। এখানে স্বতন্ত্র  প্রার্থী পবিত্র মোহন দাস টেলিফোন প্রতীক নিয়ে ২ হাজার ২৬৬ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ একরাম হোসেন মোটর সাইকেল প্রতীক নিয়ে ২ হাজার ২৪১ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে, আহাদ মিয়া ঘোড়া প্রতীক নিয়ে ১ হাজার ৭২৩ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে এবং কাওছার গাজী চৌধুরী চশমা প্রতীক নিয়ে ১ হাজার ২১৯ ভোট পেয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন। ওই ইউনিয়নে আওয়ামী ঘরনার  চারপ্রার্থী মিলে ৭ হাজার ৩১২ ভোট পেয়েও পরাজিত হয়েছেন।
ফলাফলের ক্ষেত্রে একই অবস্থা হয়েছে তাড়ল ইউনিয়নেও। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুছ ২ হাজার ৩৪৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ওই ইউনিয়নে বিএনপি’র    প্রার্থী আলী আহমদ পেয়েছেন ১ হাজার ৩৯৮ ভোট। গত ইউপি নির্বাচনে বিজয়ী উপজেলা বিএনপির সদস্য নুরুল হক তালুকদার ৭৯১ ভোট পেয়ে জামানত হারালেও প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা আকিকুর রেজা এবার ২ হাজার ১৯০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। আর নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আহম্মদ চৌধুরী পেয়েছেন ২ হাজার ১৬ ভোট। আওয়ামী ঘরনার আরেক প্রার্থী দ্রোপদ চৌধুরী নুপুর পেয়েছেন ১ হাজার ৪২৩ ভোট। এখানে আওয়ামীলীগের অনৈক্যই পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন দলের নেতা-কর্মীরা।                              
জগদল ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম ও ভাটিপাড়া ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান কাজীকে দলীয় মনোনয়ন দিতে তৃণমূল থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। ওই দুই ইউনিয়নেই প্রার্থী পরিবর্তন করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানের সুপারিশে। পরে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নির্দেশনা অনুযায়ী জগদল ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শিবলী আহমেদ বেগ ও ভাটিপাড়া ইউনিয়নে শাজাহান কাজীকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে সমর্থন জানিয়ে প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামেন উপজেলা আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল নেতারা। নির্বাচনে  এ দুই ইউনিয়নে মতিউর বলয়ের উভয় প্রার্থীই পরাজিত হন।
পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে উপজেলা আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, এ দুই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর কারণেই কুলঞ্জ ও তাড়ল ইউনিয়নে একাধিক দলীয় নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হবার সাহস দেখিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, ‘এখানে আওয়ামী লীগকে ধ্বংসের মূল পরিকল্পনাকারী সুরঞ্জিত সেন। দিরাইয়ে তার অনুসারিরা শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ করে না বলে প্রকাশ্যে দাম্ভিকতা দেখাচ্ছে তাকে খুশি করার জন্যই। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজেই এটা প্রমাণ করে গেলেন সুরঞ্জিত বাবু’। তিনি বলেন- ‘আমার ভাই-ভাতিজাকে নৌকায় ভোট না দেওয়ার জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে, ভোট কেন্দ্রের গোপন কক্ষে ভোট দেওয়া নিয়ে কথা উঠলেও যারা প্রকাশ্যে নৌকায় ভোট দেবার বিরোধিতা করেছে তাদের নাম প্রচার হচ্ছে না’।
দিরাই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক, পৌর মেয়র মোশারফ হোসেন বলেন,‘দিরাই উপজেলার ৯ ইউনিয়নেই দলের তৃণমূলের কর্মীরা যাদের মনোনীত করেছিল, অর্থাৎ ওয়ার্ড-ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি যাদের আওয়ামী লীগের প্রার্থী করেছিল, আমরা তাদের পক্ষেই প্রচারণা চালিয়েছি এবং দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার জন্যই কাজ করেছি’। তিনি জানান, দলের জেলা সভাপতি মতিউর রহমানের আত্মীয়-স্বজন তাড়ল ও সরমঙ্গল ইউনিয়নে দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন।