স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশকে বলা হয় জলাভূমির দেশ। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম নিদর্শন হলো আমাদের জলাভূমিসমূহ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলার জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ মিঠা পানির টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের ২য় রামসার এলাকা। ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া, জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে সারি সারি হিজল-করচ শোভিত, পাখিদের কলকাকলি মুখরিত টাঙ্গুয়ার হাওর মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম। টাঙ্গুয়ার হাওরে রয়েছে ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১৫০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ১৫০ প্রজাতির মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি এবং ২১ প্রজাতির সাপ।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা ও ২০০০ সালে রামসার সম্মেলনে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০০৩ সাল থেকে ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ ও আনসার সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে।
তবে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক শ্রেণির অসাধু লোক চুরি করে মাছ ও পাখি শিকার এবং বন ঝঙ্গল কেটে উজার করছে। প্রশাসনের হাতে মাঝে মাঝে ধরাও পড়ে জীব বৈচিত্র বিপন্নকারী এসব মানুষ।
রাতের বেলায় টর্চ জ্বালিয়ে পাখি শিকার করারও অভিযোগ আছে। জ্বালানি হিসেবে অবাধে কেটে নেওয়া হচ্ছে নলখাগড়া, চাইল্যাবন, হিজল-করচ গাছের ডালপালা। এতে উজাড় হচ্ছে ঘন সবুজ বন। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের কারণে হাওরের নিচের জলজ প্রাণি এবং উদ্ভিদ নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলে ওপার থেকে নেমে আসা বালির কারণে ভরাট হচ্ছে হাওর ও তৎসংলগ্ন নদী। এছাড়াও হাওরে পর্যটকদের ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের থালা, পলিথিন, চিপস-চানাচুরের প্যাকেট ও সংরক্ষিত এলাকায় উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোয় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। হাওর পাশর্^বর্তী হোটেলে খাবারের বিশেষ আইটেম হিসেবে দেখানো হয় অতিথি পাখির মাংস। এতে বিপন্ন হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীব বৈচিত্র্য।
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রুপ জলমহালগুলোর অন্যতম। বর্তমানে মোট জলমহাল সংখ্যা ৫১টি এবং মোট আয়তন ৬,৯১২.২০ একর। তবে নলখাগড়া বন, হিজল করচ বনসহ বর্ষাকালে সমগ্র হাওরটির আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ২০.০০০ একর। টাংগুয়ার হাওর প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ। এই হাওর শুধু একটি জলমহাল বা মাছ প্রতিপালন, সংরক্ষণ ও আহরণেরই স্থান নয়। এটি একটি মাদার ফিশারী। হিজল করচের দৃষ্টিনন্দন সারি এই হাওরকে করেছে মোহনীয়। এছাড়াও নলখাগড়া, দুধিলতা, নীল শাপলা, পানিফল, শোলা, হেলঞ্চা, শতমূলি, শীতলপাটি, স্বর্ণলতা, বনতুলসী ইত্যাদি সহ দু’শ প্রজাতিরও বেশী গাছগাছালী রয়েছে এই প্রতিবেশ অঞ্চলে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরে এসে মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখেন।
শীত মৌসুমে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ব্যাপক পাখির আগমন ও অবস্থানে মুখরিত হয় টাঙ্গুয়ার হাওর। বিলুপ্ত প্রায় প্যালাসেস ঈগল, বৃহদাকার গ্রে-কিংষ্টর্ক, শকুন এবং বিপুল সংখ্যক অতিথি পাখি ছিল টাঙ্গুয়ার হাওরের অবিস্মরণীয় দৃশ্য। স্থানীয় জাতের পাখি পানকৌড়ি, কালেম, বৈদর, ডাহুক নানা প্রকার বালিহাঁস, গাংচিল, বক, সারস প্রভৃতির সমাহারও বিস্ময়কর। টাঙ্গুয়ার হাওর মাছ-পাখী এবং উদ্ভিদের পরস্পর নির্ভরশীল এক অনন্য ইকোসিস্টেম। মাছের অভয়াশ্রম হিসাবে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী।
গত ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গুয়ার হাওরে মোট ৩৯ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে, যার মধ্যে ২৭টি পরিযায়ী প্রজাতির। সবচেয়ে বেশি ১২ হাজার ৭৬০টি পিয়ং হাঁস দেখা গেছে। এরপর লালমাথা ভূতিহাঁস দেখা গেছে ৯ হাজার ৯০৩টি। এ ছাড়া কুট পাখি দেখা গেছে ৯ হাজার ৩৯৮টি। এবারের শুমারিতে পৃথিবীজুড়ে মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি বেয়ারের ভূতিহাঁস দেখা গেছে। বিরল প্রজাতির বৈকাল তিলিহাঁস, ফুলুরি হাঁস, কুঁড়া ইগল, খয়রা কাস্তেচরা, উত্তুরে টিটি ও কালোলেজ জোড়ালি পাখিও দেখা গেছে।
জাতীয় পাখিশুমারির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে শুধু টাঙ্গুয়ার হাওরে ১ লাখ ৪৬ হাজার পরিযায়ী পাখি দেখা গিয়েছিল। সে বছর দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোতে প্রায় আড়াই লাখ পরিযায়ী পাখি এসেছিল। কিন্তু এর পরের বছর থেকেই বাংলাদেশে পরিযায়ী পাখি আসা কমতে শুরু করে। তবে ২০২০ সালের তুলনায় এবার টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখির পরিমাণ বেড়েছে। গত বছর টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি দেখা গিয়েছিল ৫১ হাজার ৩৬৮টি, আর এবার এই হাওরে পাখি এসেছে ৬১ হাজার ১২৫টি। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, বন বিভাগ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের যৌথ জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের গবেষণায় বলা হয়, দেশের হাওর এলাকায় সার প্রয়োগ কম হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে সেখানে আসা পরিযায়ী পাখিদের বিষ্ঠা প্রাকৃতিক সার হিসেবে ভূমিকা রাখে। ফলে হাওরে ধান ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও এসব পাখি ভূমিকা রাখছে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরকে আন্তর্জাতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওখানে যে সব আনসার সদস্যরা পাহাড়া দেবার কাজ করছেন, তাদের বেতন বকেয়া ছিল দীর্ঘদিনের। ঈদের আগে আমার চেষ্টায় তাদের সকলের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলে দেওয়া হয়েছে, ওখানে পাখি, মাছ বা গাছগাছালি কেটে নেবার সংবাদ পাওয়া গেলে আনসারদের বেতন বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। এছাড়া পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে ওখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের চিন্তা করছি আমরা। যাতে পর্যটকেরা নিরাপদে ঘুরতে পারেন এবং পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় পুলিশ ভূমিকা রাখতে পারে।







