বিপ্লবী ফুচিক

বেলাল আলী
বিপ্লবী জুলিয়াস ফুচিক নামের সাথে ক‘দিন আগে আমার পরিচয় ঘটে। তার ‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’ পাঠ করার পর ঘটে এই সুযোগ। তাই বিপ্লবী এই মহৎ মানুষের কর্মকান্ড সম্পর্কে কিছু না লিখে পারছিলাম না। ফুচিক ছিলেন একজন সাংবাদিক; সাহিত্য সমালোচক এবং কমিউনিস্ট। ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯০৩ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা ইস্পাতের কারখানায় কাজ করতেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৫বছর বয়স থেকেই তিনি শ্রমিক সংগঠন আর স্বদেশের সাংস্কৃতিক জগতে কাজ শুরু করেন। চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সাহিত্য, মিউজিক আর্ট নিয়ে পড়াশুনা করেন। সেই সময়ই ফুচিক কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন; সমাজতান্ত্রিক ক্রোড়পত্রে বেরোতে থাকে তাঁর লেখা।
ফুচিক ১৯২৯ সালে ‘নির্মাণ’ পত্রিকায় প্রধান সম্পাদকের কাজে যুক্ত হন। তখন তাঁর নেতৃত্বে এই পত্রিকা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এক হাতিয়ার বিশেষ হয়ে ওঠে। এরপর ফুচিক পার্টির মূল রক্ত সঞ্চালনের যন্ত্র ‘রুদে প্রাভো’ এই পত্রিকাটির সম্পাদক হন। একজন সাংবাদিক  ও সম্পাদক এবং একজন অধ্যাপক হিসেবে স্বদেশের মানুষের কাছে তাঁর রিপোর্টগুলো পৌঁছানোর পর চেক প্রতিক্রিয়াশীল মহল থেকে ফুচিক-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। বেশ কয়েকবার তাঁর ভাগ্যে জুটে হাজতবাস। মিউনিখের নাৎসি আক্রমণের পর কমিউনিস্ট প্রেস নিষিদ্ধ হয়। এই নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে পার্টির সমস্ত কাজ আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যেতে হয়। মার্ক্সীয় দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য পড়াশুনায় এই সময়টা কাজে লাগান তিনি। এই একই সময়ে ফুচিক আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে তিনি ‘রুদে প্রাভো’ আর বিদ্রƒপবাদী পত্রিকা ‘ক্রানাভেসেক’ ছোট ভেঁপু প্রকাশ করতে থাকেন।
ফ্যাসিজমের পক্ষে যে মানবদমনকারী শক্তি এর বিরুদ্ধে সরাসরিই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সে লড়াই দেশের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আর কতটুকুইবা দেরি! নাৎসি দখলদারীর বিরুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধে যা দেখা গেছে, নেপোলিয়নের আগ্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে রুশ প্রতিরোধের সময় যেমনটা ঘটেছে-পুরো জনসাধারণের প্রতিরোধ মানবিক উত্থানের মতো ফুচিক হয়ে ওঠেন তাঁর প্রতীক। তাঁর ৪০ বছরের জীবনে তিনি তিক্ততম অভিজ্ঞতাসহ মানুষকে শুনিয়েছিলেন সূর্যোদয়ের গান। সারা বিশ্ব ফুচিককে বিপ্লবী একজন কমিউনিস্ট হিসেবে জানে। স্বদেশ ভূমি সা¤্রাজ্যবাদী হিটলারের নাৎসি বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ার পর তিনি ছিলেন চেক কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতা; অন্যভাবে দেখলে মানুষের উপর শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক দূর্জয় সৈনিক। তাঁর কাজ ও লেখা সারা বিশ্বে মানবিক আবেদন ঘোষণা করে। সাথে সাথে এই আবেদনের অধিকার পৌঁছে দেওয়ার সংগ্রাম মৃত্যুহীন মৃত্যুবরণ করার এক শিক্ষাদান করে। ফুচিক কিন্তু ক্ষমতার জন্য নয়, জনগণের জন্য, জনগণের বিশাল মুক্তির জন্যই জনগণের ক্ষমতা গ্রহণ করা উচিত- এই বিশ্বাস থেকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আস্থা রাখতেন; এবং এই কারণেই ১৯২১ সালে চেক কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে   তিনি এই সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়া রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হয়। জার্মানির নাৎসিবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদী মনোভাবের ফলে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বয়ে যায় রক্তের বন্যা। ফুচিক নিজেই যেমন দেখেছেন, তেমনই ১৯১৫ সালে নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন অসংখ্য হাঙ্গেরীয় শিশু হত্যার মতো ঘটনা। শোষণ ও রক্তচক্ষু শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা অল্প বয়সেই দেখেছেন তিনি। এই সময়টা ফুচিক কাটিয়েছিলেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়; পড়েছেন দর্শন, সাহিত্য আর শিল্প সংগীতের ইতিহাস।
ফুচিক মানুষের সমাজে বৈষম্য আর শোষণ পুরো রাষ্ট্র এবং সমাজকে বিষিয়ে তোলে- এটা লক্ষ্য করতে পেরেছিলেন। তিনি রাজনীতি সাহিত্যের মধ্যে কোন বিরোধ দেখতে পাননি। তাঁর কাছে জীবন ও শিল্প এক হয়ে দেখা দিয়েছিল। শিল্প কখনও জীবনের জন্য সংগ্রামের হাতিয়ার, কখনও জীবনের প্রগাঢ় ও নিবিড় উপভোগের অবলম্বন। স্বভাবত এই চিন্তা থেকেই তাঁকে সাহসিক বিপ্লবী কাজ-কর্ম ও কয়লা-খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটে যোগ দেওয়ার প্রণোদনায় বেআইনি কাগজ-ইস্তাহারও বের করতে হয়েছে। কিন্তু সন্দেহ নেই যে পাশাপাশি চলছিল তাঁর সাহিত্যকর্ম।
এদিকে ১৯৩৯ মার্চ আর কোনো ঢাকাঢাকির মধ্যে না গিয়ে নির্র্লজ্জের মতো হিটলারের নাৎসিবাহিনী দখল করে নেয় ফুচিকের স্বপ্নের পুরো দেশ চেকোস্লোভাকিয়াকে। এখানে বিপ্লবী ফুচিক আর কী করতে পারতেন? সন্দেহ নেই কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের পরিপূর্ণ মুক্তি অর্জনের পাশাপাশি বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা; তাকে সে কাজ বন্ধ রেখে শুরু করতে হলো বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশটির অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে যে সাহিত্যিককে এই যুদ্ধে যুক্ত হয়ে পড়তে হয়েছিল, নাৎসি বর্বরতার ভয়ঙ্কর থাবার আঘাতে লন্ডভন্ড এক পার্টির নেতৃত্ব নিতে হয়েছিল, যাকে থাকতে হতো আত্মগোপন করে, বেআইনি কমিউনিস্ট কেন্দ্রের প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে, নিয়মিত প্রকাশ করতে হতো ‘রুদে প্রাভো’ ও অন্যান্য নানা কাগজ, সেই ফুচিককে একবার মনে হবে অসাধারণ বিপ্লবী, আবার মনে হবে অপরাজেয় জীবনের কথক; তারপর এই দু-ই দুইয়ে মিলিয়ে আমরা পাই এক জুলিয়াস ফুচিককে।

কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস- ১৯৪২ সালে গেষ্টাপোদের হাতে ধরা পড়লেন ফুচিক! কিভাবে গ্রেফতার হলেন এবং তাঁকে অকথ্য নির্যাতন সইতে হয়েছে এই সময় সেটাই তিনি রচনা করেছেন তাঁর ‘নোটস ফ্রম দ্য গ্যালোজ’ বইতে। এর ইংরেজি অনুবাদ একসময় পৃথিবীর কোটি কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। এককথায়- এই ‘নোটস ফ্রম দ্য গ্যালোজ’ হলো আসলেই অগ্নিময় মনুষ্যত্বের এক দলিল। তীব্র জ্বালাময় আগুনের অক্ষরে লেখা হয়েছে বীভৎস নাৎসি নির্যাতনের করুণ কাহিনী; আর সেই কাহিনীর ভিতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে মানব মুক্তির অদম্য লক্ষ্য এবং মানুষের গরিমা আর দৃঢ় সংকল্পের বয়ান । এই বই পড়লে নির্যাতনের আতঙ্ক নয় বরং বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাই আমরা লাভ করে থাকি।
বাস্তবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি ধ্বংস হলেও সমাজতন্ত্রের আদর্শের কিন্তু মৃত্যু নেই। আজকে পুঁজিবাদী ও সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির সংকট ও ধ্বংস আসন্ন নয় তাই বা কে বলবে? আঁধারের মধ্যে বসবাস করলে তাকে চিরস্থায়ী মনে হতেই পারে; তবুও এক সময় ঠিকই সূর্য ওঠে। ফুচিকের লেখায় আমরা সংগ্রামে যোগ দেবার  অনুপ্রেরণা পাই। বলা যায়, এই আশ্চর্য বিশ্বাস ভবিষ্যতের দিকে চোখ মেলে রাখাই হলো এই লেখার মূল সুর।
বিপ্লবীর আসলে মৃত্যু হয় না; তবুও আমরা দেখি শারিরীক মৃত্যু পথযাত্রী হয়েও ফুচিক ঠিকই তার বন্ধুদের অসমসাহস আর দৃঢ়তায় বুক বেঁধে সামনে চলার প্রেরণা দিয়েছিলেন। আর এই লেখায় আমরা সেই স্বাক্ষ্যই পাই। তিনি সবার দৃষ্টি ফেরাতে স্বক্ষম হন তাঁর প্রিয় স্বদেশ- চেকোস্লোভাকিয়ার জীবন্ত এক বাস্তবতার দিকে। এখানে গেষ্টাপোদের হাতে ধরা পরার পর ফুচিকের ভাগ্যে কি ঘটে? আমরা দেখি তাঁর ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন! তদন্তের নামে এবার চলে জিজ্ঞাসাবাদ; নাম কি, কোথায় বাড়ি; কেন্দ্রীয় কমিটিতে কি কি দায়িত্ব পালন কর? কিন্তু ফুচিকের কোনো উত্তর নেই। মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, মাথা থেকে ঝড়ছে রক্ত; হাত-পায়ের আঙ্গুলগুলো ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেল! তবুও এই নির্যাতনে তিনি মুখ খুললেন না। ফুচিক নিজে ১৬৭ নম্বর সেলে থেকে দেখছেন একের পর এক মৃত্যু। এদিকে তাঁর মৃত্যু যেন হবার নয়; একদিকে নির্যাতন আর দম আটকে থাকা অবস্থায় ডাক্তার এসে দেখেন তিনি তখনও জীবিত! ডাক্তার অবশ্য ডেথ রিপোটটি আগেই তৈরী করে রেখেছিলেন; এবার সেটি ছিড়ে ফেলে প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, ‘ওর জানটা ঘোড়ার মতো শক্ত।’ ফের চলে আবার ধোলাই; নির্যাতনের উৎসব। ফুচিক ঠিকই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো জীবিত ফুচিকের এই লাশটা যাতে হাত ছাড়া নাহতে পারে সে ব্যাপারে ওদের কি প্রচন্ড সতর্কতা!
ফুচিক ভাবতেন বর্তমান খুব শ্রীঘ্রই ইতিহাস তৈরী করবে এবং বহু অপরিচিত সাহসী মানুষের নাম তখন অতীতে ঢাকা পড়বে। বীরদের চোখের স্বপ্ন আকাক্সক্ষাগুলো বিস্মিত; ওদের অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দাও। উজ্জ্বল লেবাস খুলে বিপন্ন মানুষটিকে লক্ষ করো। এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় আমাদের জেনে রাখা দরকার। যে কাজ করে তার মেয়াদ ক্ষীণ, কিন্তু তার কাজ দীর্ঘায়ু। মুল সংকল্পের জোরটা আসে মানুষের ভেতর থেকে। সাংবাদিক হিসাবে তিনি কিভাবে পাঠকের সাথে তার ভেতর থেকে সংলাপ সৃষ্টি করতে হয় ফুচিক সেটা জানতেন।
‘নোটস ফ্রম দ্যা গ্যালোজ’ এর একটি বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছিল পাঁচের দশকে ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। পরে অনুদিত লেখাগুলোতে একসঙ্গে করে  বের হয় ‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’ এই নামে। প্যান্ক্রাট্ জেলে  ফুচিক যে নোট লিখে গিয়েছিলেন, যেখানে চেকগার্ড এ কোলিন্স্কি তাঁর কাগজ কলম এনে দিতেন এবং একে একে সব নোট যতেœ রাখতেন; এটা ছিল এরই সংগৃহীত রূপ। স্ত্রী অগাষ্টিন ফুচিক ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় বন্দী ছিলেন; পরে মুক্তি পেয়ে জানতে পারেন যে, গেষ্টাপোদের হাতে নির্যাতনের ফলে ফুচিক মৃত্যুবরণ করেছেন এবং একটি নোট লিখে রেখে গেছেন। এ লিখিত কাগজগুলোই ‘নোট্স ফ্রম গ্যালোজ’ নামে পরিচিত যা অগাষ্টিন ফুচিক পাঠকের কাছে তুলে ধরেন।
মৃত্যুর আগে ফুচিকের বার্তা ছিল, ‘তোমাদেরকে ভালবাসি তোমরা যারা মানুষ। মা বাবা ভাই বোনের কাছে শোকের সঙ্গে আমার নাম যেন যুক্ত হয় না।’  আসলে ফুচিক ছিলেন একজন অসাধারণ মানব দরদি; তার দেশ জার্মান নাৎসি বাহিনীর দখলে না যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই। মৃত্যুর পথিক হয়েও তিনি সেদিন আমাদের শুনিয়েছেন সূর্যোদয়ের গান; দেখিয়েছেন আশার নতুন বীজ। আসলে ফুচিক ছিলেন ফুচিকের মতোই; জাত এক বিপ্লবী।