বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশ

হিরন্ময় রায়
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৩০ এর দশকে ভয়াবহ বিশ্বমন্দা নেমে এসেছিল পৃথিবীতে। কয়েক দশক লেগেছিল সেই মন্দা কাটিয়ে উঠতে। দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত খবরে ও ০৫ মে ২০২০ তারিখের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইএমএফ এর প্রধান ক্রিস্টিলিনা জর্জিয়েবার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, “১৯৩০ এর মহামন্দার পর সবচেয়ে বড় সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি।”
কেন এই আশংকা, প্রশ্ন জাগে অনেকের। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে যত লোক মারা গিয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি লোক যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জায় মারা যায়। ইবোলা, সার্স, এনথ্রাক্স সংক্রমণে মারা গিয়েছে বহু মানুষ। তাহলে কী প্যানিক সৃষ্টি করা হচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের কোন স্ট্র্যাটেজির শিকার সারাবিশ্ব! এ কথা ঠিক, আমাদের দেশেই আমরা বিভিন্ন প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ হারিয়েছি। সারা বিশ্বে বিভিন্ন রোগে, যুদ্ধে, অনাহারে, দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বছরে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যান। কিন্তু করোনা নিয়ে এতো আতংক কেন?
কারণের খুঁজে বুঝার চেষ্টা করছি সবকিছু। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক কেন এগুলো বলছে?
২০০৮ থেকে শুরু হওয়া বিশ্বমন্দায় ধুঁকছে বিশ্ব অর্থনীতির বড় বড় কেন্দ্রগুলো। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ভারতের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ। এই মন্দা কাটানোর কৌশল হিসেবে ইতিমধ্যেই এই কেন্দ্রগুলো বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক ঋণের সুদ ৫% এ নিয়ে এসেছে।বেসরকারি বিনিয়োগে মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়েছে। ইউরোপের কিছু দেশ শূন্য সুদের দিকে গিয়েছে। কিছুটা মেরামত হচ্ছিল বিশ্ব অর্থনীতি। কিন্তু করোনা সংক্রমণ সারাবিশ্বের ১৯২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে কাছাকাছি সময়ে। এর প্রকোপ ঠেকাতে দেশগুলো একে একে লকডাউন, সাটডাউনের দিকে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে উৎপাদন। আবার উৎপাদন কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। যে কারণে বেকার হয়ে পড়েছেন লোকজন। ফলে ভোক্তা হিসেবে তাদের আয় সংকোচিত হয়ে যাওয়ায়, অসমর্থ অবস্থার দরুণ তাদের পণ্য চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। ফলে উৎপাদন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। এটি একটি অর্থনৈতিক চক্র। এর আগে একই সাথে এতোগুলো দেশ কখনো সাটডাউনে বা লকডাউনে যায়নি, উৎপাদন ও বাণিজ্য কেন্দ্র বন্ধ করেনি। ঠিক এই কারণেই এতো সতর্কবার্তা শুনানো হচ্ছে। পূর্বের দুর্যোগগুলো একটি বা কয়েকটি দেশে আক্রমণ করেছিলো, ১৯২ টি রাষ্ট্রে নয়। ফলে বিশ্বে অন্যত্র উৎপাদন ও বাণিজ্য হয়েছে, এবারের মতো বিশ্বব্যাপী বন্ধ হয়নি।
এই অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়গ্রস্ত।কারণ বিশ্বমন্দা থেকে উত্তরণে ইতমধ্যে যে ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে, তার অধিক কী ব্যবস্থা নেয়া যাবে এখন?
বণিক বার্তার ২২ মার্চের সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মোতাবেক বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রগুলোর শেয়ার মার্কেটের অবস্থা পর্যালোচনা করলে বুঝা যাবে সবকিছু।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই শেয়ার সূচক স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’স এবং ডাও জোন্স সম্প্রতি শীর্ষ অবস্থান খুইয়েছে যথাক্রমে ৭.৭% ও ৮.৩%।
ইউরোপের ১৭টি দেশের ৬০০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত “ইউরোপ -৬০০” শেয়ার সূচকে ধ্বস নেমেছে ১১%, জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রধান শেয়ার সূচক নেমেছে প্রায় ১২%।
এশিয়ার প্রধান শেয়ার সূচক (হংকং, টোকিও এবং সিউল) শুরু থেকেই নিম্নগামী।
এগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সংকেত। দীর্ঘমেয়াদে কাজ হারিয়ে বেকার হতে যাচ্ছেন উন্নতবিশ্বসহ পৃথিবীর সকল দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকজন। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার ফলে ভাোক্তার অভাবে উৎপাদন হ্রাস পাবে। একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হবে। ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে ও যাবেও। আমাদের দেশও সম্ভাব্য ঝুকিতে রয়েছে। কারণ আমাদের দেশও কৃষিতে নির্ভরতা কাটিয়ে শিল্প উদ্যোগের দিকে হেঁটেছে। দেশের জিডিপিতে স্বাধীনতা প্রথম দশকে কৃষি খাতের অবদান ছিলো ৭৫%। এখন সেই খাতের অবদান ১৩.৩% ধার্য হয়েছে। শিল্প খাতে ৩৫.৫% ও সেবা খাতে ৫১.৬% লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে (তথ্য সূত্র, ২২মে এর যুগান্তর পত্রিকা)।
শিল্পখাতে প্রধান খাত হলো তৈরী পোশাক শিল্প। এখানে বিজিএমইএ দাবি মতে ৪০ লক্ষ লোক এবং সরকারের কলকারখানা পরিদর্শন সংক্রান্ত দপ্তরের মতে ২১ লক্ষ ৩০ হাজার ১৫৪ জন নিয়োজিত আছেন। উল্লেখযোগ্য লোকজন নিয়োজিত আছেন বিভিন্ন সেবা খাতে। কৃষিতে নিয়োজিত আছেন, জনশক্তির ৪০.৬%( বিবিএস: ২০১৮ কৃষি পরিসংখ্যান)।
এখন বাংলাদেশের উৎপাদিত শিল্প পণ্যের প্রধান ক্রেতা কারা, একটু দেখেন-যুক্তরাষ্ট্র ৩৮.৮%, জার্মানি ১২.০৯%, ফ্রান্স ৫.২%, নেদারল্যান্ড ৫.২%, ইতালি ৪.৪২% এবং অন্যান্য দেশ ১৭.৫% (তথ্যসূত্র: বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, সংরক্ষণাগার অনুলিপি, ১০/০২/২০১৮)।
আমাদের ক্রেতা রাষ্ট্রগুলো এখন মন্দা আক্রান্ত। প্রবৃদ্ধি কমছে তাদের। কাজ হারাচ্ছে বা হারাবে মিলিয়ন মিলিয়ন লোক। ফলে ভোক্তা সংকোচনের ফলে চাহিদারও সংকোচন হবে। যে কারণে তাদের কাছ থেকে আমরা ক্রয়াদেশ হারাবো বা হারনোর ঝুকিতে পড়তে পারি। ফলে আমাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ইতিমধ্যে অনেক গার্মেন্টস ও ছোট বা মাঝারি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন দেশে। ফলে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পঢ়েছে ও পড়বে লোকজন। ফলে ভোক্তা সংকোচনের প্রভাব পড়বে সেবাখাতেও। সেখানেও কাজ হারিয়ে বেকার হবে লোকজন। তাছাড়া কাজ হারিয়ে প্রবাসী শ্রমিক ভাইরা ফিরতে বাধ্য হবেন।
সম্ভাব্য বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করোনা উত্তরকালে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান। প্রবৃদ্ধি বড় কথা নয়, ঠিকে থাকাই হবে বড় সাফল্য। কারণ পৃথিবীর বহুদেশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবমান হবে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে হবে। বিদ্যমান কর্মসংস্থানের জায়গাকে সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্পচাহিদা হ্রাস পাওয়ায় সেটা কিভাবে সম্ভব হবে?
দেশের ২, ৮৬, ৯৫, ৭৬৩ টি খানার মধ্যে ১, ৫১, ৮৩, ১৮৩টি কৃষি খানা ও ১, ৩৫, ১২, ৫৮০টি হলো অকৃষি খানা।
আমাদের দেশে কাজ হারিয়ে প্রভাব পড়বে অকৃষিখানার উপর। এই অকৃষিখাতে নিয়োজিত লোকজনকে বিশ্বমন্দার সময়ে শিল্পে কর্মসংস্থান করানো দীর্ঘ সময়ের বিষয়। আমরা যা করতে পারি, তা হলো বিশ্বমন্দার প্রভাবমুক্ত খাত কৃষিখাতে কাজে লাগানো।
আমাদের দেশে মোট আবাদযোগ্য ফসলি জমি আছে ৮৫.৭৭ লক্ষ হেক্টর। এর মধ্যে ২.২৩ লক্ষ হেক্টর জমি পতিত থেকে যায়। এগুলোকে আবাদের আওতায় আনা যায়। এখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। তাছাড়া আমাদের এক ফসলি জমি আছে ২২.৫৩ লক্ষ হেক্টর, দুই ফসলি জমি আছে ৩৯.১৪ লক্ষ হেক্টর, তিন ফসলি জমি আছে ১৭.৬৩ লক্ষ হেক্টর ও চার ফসলি জমি আছে ০.১৭ লক্ষ হেক্টর (সূত্রঃ বিবিএস: ২০১৮ কৃষি পরিসংখ্যান)
এই ফসলি জমিগুলোকে দুই ফসলি বা তিন ফসলি জমিতে উন্নীত করতে হবে।
এজন্য নদী ও হাওরগুলোকে খনন করে ড্রেজিং এর মাটি দিয়ে কৃষিজমিগুলোর উচ্চতা বাড়িয়ে এগুলোকে বন্যামুক্ত জমিতে পরিণত করতে হবে। ফলে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হবে। এখানে প্রয়োজন পড়বে আরো লোকবল, যা কর্মসংস্থান হবে। কৃষি উপখাত মৎস্যখাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। কৃষি পণ্য রপ্তানীর জন্য বিশেষ বাণিজ্য কূটনীতি প্রয়োগ করতে হবে। আগামী বিশ্বে খাদ্য শস্যের চাহিদা বাড়বে বিশ্বব্যাপী।
এজন্য সরকারি- বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৫ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনতে হবে।
যখন এ লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়বে বা সরকারি, বেসরকারি ব্যয় বাড়বে, এখানেও কর্মসংস্থান বাড়বে। ফলে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে দেশের সেবাখাতে এর সুফল পড়বে। সেখানে চাহিদা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান হবে। মোট কথা আভ্যন্তরীণ উৎসকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান ও ভোক্তা সৃষ্টি করে উৎপাদন ও সেবা খাত সচল রাখার মাধ্যমে ঠিকে থেকে ধীরে ধীরে শিল্পখাতকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে। ভয় কি, ১৬ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের আভ্যন্তরীণ বাজার আছে আমাদের। এটা নিজেই একটি অন্যতম শক্তি।
এগুলো অসম্ভব ভাবছেন? তাহলে বাংলাদেশের কিছু বিস্ময়কর অগ্রগতির তথ্য দিচ্ছি। জেনে অবশ্যই পুলকিত হবেন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ করে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন টার্মে নেয়া কৃষিবান্ধব নীতির সুফল ভোগ করছে বাংলাদেশ।
খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে ১০ ম স্থানে আছে। সবজি উৎপাদনে ৩য়, মাছ উৎপাদনে ৪র্থ ও ধান উৎপাদনে ৪র্থ। সরকারের ১৯৯৯, ২০১৩ ও ২০১৮ সালের কৃষিনীতির সুফল ভোগ করছে বাংলাদেশ (সূত্র: কৃষি সালতামামি, ২০২০)।