বিশ্ব রেকর্ড গড়া হলো না ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য’র

স্টাফ রিপোর্টার
৩১ ঘণ্টায় ৮২ কিলোমিটার সাঁতরে শারীরিক অসুস্থতার কাছে হার মানলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য (৭১)। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনাপাটি এলাকায় এসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যার জন্য বিশ্ব রেকর্ড করা হলো না বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য’র। অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা এই সাঁতারুকে সাতারুকে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে, পরে বিকাল সাড়ে পাঁচ টায় তাঁকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ রিপোর্ট লেখার সময় (সন্ধ্যা ৭ টায়) তিনি সিলেটের পথে ছিলেন।
বুধবার বেলা দুইটায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য হরিনাপাটি এলাকায় পৌঁছালে তাঁর শরীর সাদা হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি করে তাঁকে অনুসরণকারী চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবী ও পুলিশ সদস্যদের ট্রলারে তুলা হয় বয়োজ্যেষ্ঠ এই সাতারুকে।
জানা যায়, সোমবার সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে কিনব্রিজ পয়েন্ট সংলগ্ন চাঁদনিঘাট থেকে সাঁতার শুরু করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। ২৮৫ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার মিশনে নেমেছেন তিনি। কিন্তু বৃষ্টিপাত ও ঠান্ডা পানিতে ৮২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনাপাটি এলাকায় হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এর আগে ২৮৫ কিলোমিটার সাঁতরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ফেরিঘাটে পৌঁছাতে প্রায় ৭০ ঘন্টা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। সাঁতরে তিনি সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ এই ৪ জেলা আংশিক বা সম্পূর্ণ অতিক্রম করার কথা ছিল। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন, নৌ-পুলিশসহ সিভিল সার্জনের একাধিক টিম সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। সাঁতারে সার্বিক সহযোগীতায় ছিল সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
মঙ্গলবার দুপুরে হরিনাপাটি এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য এর সঙ্গে থাকা সিলেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল বললেন, ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র শ^াসকষ্ট বেড়েছে, শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমেছে, ঠান্ডায় নিমুনিয়ার উপক্রম হয়েছে। সঙ্গে থাকা ডাক্তাররা তাঁকে সাঁতারে অনুমোদন দিচ্ছিলেন না। ডাক্তারের পরামর্শ অমান্য করেই সাতার চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। একসময় তিনি ওঠে আসতে বাধ্য হন।
সিলেট মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের আহবায়ক মনোজ কাপালি মিন্টু বলেন, সোমবার রাতে বৃষ্টি হয়েছে মঙ্গলবার সকালেও বৃািষ্ট হয়েছে ,একারণে পানি অত্যন্ত ঠান্ডা ছিল। অতিরিক্ত ঠান্ডা পানির কারণে উনার শরীর অসুস্থ হয়েছে। উনি সাঁতার সম্পন্ন করতে না পারায় আমরা ব্যাথিত হয়েছি।
যুব কমান্ড নেতা শেখ মোহাম্মদ আলম বললেন, জয় পরাজয় বড় কথা নয়, উনি যে এই বয়সে ২৮১ কিলোমিটার সাঁতারে সাহস করেছিলেন, তাতে আমাদের সাহস বেড়েছে। সোমবার রাত থেকে বৃষ্টির কারণে পানি ঠান্ডা ছিল। এই বৃষ্টিতে ভিজার কারণে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
সঙ্গে থাকা চিকিৎসক দলের প্রধান তপোজিৎ ভট্টাচার্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য পরিশ্রান্ত, তার শরীরে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে। ঝুঁকি না নিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হয়। প্রথমে তাঁকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে আনা হয়। পরে সন্ধ্যায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ওখানে পৌছাবেন তিনি।
প্রসঙ্গত, একাধিক জাতীয় রেকর্ডের পর অবিরাম সাঁতারু হিসাবে বিশ্বরেকর্ডও করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। তবে তার সেই রেকর্ড কেড়ে নিয়েছেন একজন মার্কিন সাঁতারু। নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়তে সাঁতারে নেমেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য।
শনিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে সিলেট নগরের মেন্দিবাগস্থ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেন, আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। ২০১২ সালের মে মাসে অবসর গ্রহণ করলেও এখনো কনসালট্যান্ট হিসাবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অধিনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কাজ করছি। ছাত্রজীবন থেকে সাঁতার আমার নেশা। আমি একজন অবিরাম শৌখিন সাঁতারু। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটানা ৯৩ ঘন্টা ১১ মিনিট এবং ১৯৭৬ সালে ১০৮ ঘন্টা ৫ মিনিট অবিরাম সাঁতার কেটে জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করি। ২০১৮ সালে ১৮৫ কি.মি দূরপাল্লার সাঁতার কাটি যা ছিল আরেকটি স্থানীয় রেকর্ড। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটানা ৯৩ ঘন্টা ১১ মিনিট সাঁতার কেটে রেকর্ড করায় জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে রূপার নৌকা দিয়ে সম্মানিত করেন।
তিনি বলেন, ১৯৭০ সাল থেকেই আমি দূরপাল্লার বা অবিরাম সাঁতারের সঙ্গে জড়িত। সেবার নিজের থানা নেত্রকোনার মদনে টানা ১৫ ঘন্টা সাঁতার কেটেছিলাম। তারপর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশকে স্বাধীন করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ১৯৭৩ সালে সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে টানা ৮২ ঘন্টা সাঁতার কেটেছিলাম। এছাড়াও সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন পুকুর, ধোপাদিঘীতে, সুনামগঞ্জ এবং ছাতকেও তিনি দীর্ঘসময় অবিরাম সাঁতার কেটেছেন বলে জানান।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য ১৯৫২ সালের ২৩ মে নেত্রকোণার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের এমসি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।