‘তাঁর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়’

স্টাফ রিপোর্টার
বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট আইনজীবী, লেখক-গবেষক বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু স্মরণে রবিবার সন্ধ্যায় নাগরিক শোকসভা হয়েছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাসন রাজা মিলনায়তনে এই শোকসভা হয়।
শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক শোকসভা আয়োজন কমিটির আহবায়ক ও সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত। বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ৬৯ বছর বযসে মারা যান।
শোকসভার শুরুতে প্রয়াত বজলুল মজিদ চৌধুরীর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের পর শুরু হয় আলোচনা পর্ব।
শোকসভায় পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, সুনামগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য ড. জয়াসেনগুপ্ত, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক, লে. কর্ণেল এ.এস হেলাল, কর্ণেল রউফ, বীর মুক্তিযোদ্ধা রানা চৌধুরী, কর্ণেল জহির সাজ্জাদ, সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরী সংহতি প্রকাশ করেছেন।


শোকসভায় বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ -৫ আসনের সাংসদ মুহিবুর রহমান মানিক, সুনামগঞ্জ -৪ আসনের সাংসদ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নুরুল হুদা মুকুট, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক, প্রবীণ নারীনেত্রী শীলা রায়, সুনামগঞ্জের প্রবীণ আইনজীবী ও লেখক আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন, হুসেন তওফিক চৌধুরী ও হুমায়ূন মঞ্জুর চৌধুরী, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে, বর্তমান অধ্যক্ষ নীলিমা চন্দ, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম, ব্যাংক কর্মকর্তা নৃপেশ তালুকদার, জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি মো. মাসুক আলম, আইনজীবী স্বপন কুমার দাস রায়, জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরি ভট্টাচার্য, প্রয়াত বজলুল মজিদ চৌধুরীর মেয়ে সারাফ ফারহিন চৌধুরী। শোকসভা সঞ্চালনা করেন জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
শোকসভায় বক্তারা বলেন, বজলুল মজিদ চৌধুরী একজন আলোকিত মানুষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা অন্তপ্রাণ এই মানুষটি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কল্যাণে জীবনভর কাজ করে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সুনামগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তাদের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, খসরুর বিদায় সুনামগঞ্জ শহরের জন্য একটি নক্ষত্রের পতন। তিনি ছিলেন সাহসী, মানবিক ও প্রতিবাদী মানুষ। সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তাঁর লেখা ‘ রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ ‘ গ্রন্থ একটি সাহসী প্রয়াস। তিনি হাওরের কৃষকদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরা ছযজন মুক্তিযোদ্ধা মিলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পাওয়া ভাতার টাকা না নিয়ে ‘গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে সেই টাকা জনকল্যাণে ব্যয় করছেন। অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ ধূর্জটি কুমার বসু, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল মোমেন, জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটর সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মতিউর রহমান পীর, জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সাধারণ অ্যাড. সম্পাদক সালেহ আহমদ, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শামছুল আবেদীন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. চাঁন মিয়া অ্যাড. মল্লিক মইনুদ্দিন সোহেল, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আক্তারুজ্জামান সেলিম, হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, জেলা সিপিবি’র সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার, সুনামগঞ্জ পৌর ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ, জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি অ্যাড. খায়রুল কবির রুমেন, কবি সুখেন্দু সেন, বিটিবি’র জেলা প্রতিনিধি অ্যাড. আইনুল ইসলাম বাবলু, অ্যাড. আব্দুল ওদুদ, জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আবু নাসের, জেলা সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এনাম আহমদ, নারীনেত্রী সংঘ মিত্রা ভট্টাচার্য্য প্রমুখ।
শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন, আমার অনুজ ছিল খসরু। সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আমি ১৯৬৫ সালে এবং খসরু ’৬৭ সালে এসএসসি পাশ করি। পরবর্তিতে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ট পরিচয় হয়। আমার ছোট ভাই ও সাথীকে হারিয়েছি আমি। বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরু আমাদের অহংকার। তিনি বলেন, আসুন আমরা তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে বই প্রকাশ করি। পৌর মেয়র নাদের বখতকে এ উদ্যোগ নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।


সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী বলেন, কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি খসরুর শোক সভায় আমাকে আসতে হবে। সে আমার ৫ বছরের ছোট ছিল। ছোটবেলা থেকেই সকলের ভালোবাসার পাত্র ছিল সে। আমরা যখন জুবিলীতে ৯ম-১০ শ্রেণির ছাত্র, তখন সে কচিকাচার আসরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। স্কুলে থাকা অবস্থায় নাটকে পার্ট করতো। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথেও জড়িত ছিল। একজন পারফেক্ট মানুষ ছিল সে।
তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে মুক্তিযদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সেই যুদ্ধের মাধ্যমে একটা জাতি স্বাধীনতা পেল। এর থেকে বড় পাওয়া জীবনে আর কি হতে পারে। তাঁর মুক্তিযুদ্ধের উপর লিখিত বই গবেষণার কাজে লাগবে। ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’ বইটি যখন পড়েছি, মনে হয়েছে আমি জার্মানির রাজপথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সেখানেই তাঁর কৃতিত্ব। বলতে গেলে সে নিজেই ছিল একটা প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, আইনজীবী সমিতির একই টেবিলের চারপাশে বসে আমরা বহু বছর একসাথে কাটিয়েছি। আমাদের অক্সিজেন ছিল সে। হাসি ঠাট্টায় জমিয়ে রাখতো চারপাশ। তাঁর চলে যাওয়া মানতে পারছি না।
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, সিনিয়র আইনজীবী আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, খসরু অনেক সুকর্মের মধ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিল। তাঁর মৃত্যু মহিরুহের পতনের মতো। খসরু’র জায়গা পূরণ করার মতো লোক আমার চোখে পড়ে না। সে যে কাউকে উদ্ভুদ্ধ করে কাজে সম্পৃক্ত করতে পারতো। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত জীবন, কর্ম জীবন, সাংবাদিক, সাংসারিক জীবনে খসরু সফল ছিলো।
জেলা উদীচীর সভাপতি শীলা রায় বলেন, একজন বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন খসরু ভাই। উপস্থিত ক্ষেত্রে যে কোন বিষয় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন তিনি। আমাদের ‘গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থের নামকরণ খসরু ভাই করেছিলেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ আমরা তাঁর নেতৃত্বে করেছি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু আমাকে শক্তিহীন করেছে। তবে তাঁর কর্মই তাঁকে আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখবে।
সোনালী সকাল সংগঠনের পক্ষে অ্যাড. স্বপন কুমার দাস রায় বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ছিলেন একাধিক প্রতিভার অধিকারী। সোনালী সকাল সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। আমি ১৯৯২ সাল থেকে খসরু ভাইয়ের সাথেই চলাফেরা ছিল। প্রতিদিন সকালে হাঁটাচেরা করতেন তিনি। আজ সোনালী সকাল সংগঠন রয়েছে কিন্তু খসরু ভাই নেই। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আমি খসরু ভাইয়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাড. মাসুক আলম চৌধুরী বলেন, খসরু ভাই ছিলেন বহুবিদ প্রতিভার অধিকারী। তাঁর সকল প্রতিভা প্রস্ফুটিত হয়েছে। তিনি একজন সফল আইনজীবীও ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকও ছিলেন। আমরা আইনজীবীরা খসরু ভাইয়ের সকল কাজ কর্ম অনুস্মরণ করি এবং অনুকরণ করি। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানের মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ-খবর নিতেন। আজ খসরু ভাইয়ের মৃত্যুতে আমাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়। পীড়া দেয় মনে। আমরা তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করি।
জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি নারী নেত্রী গৌরী ভট্টাচার্য বলেন, অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ছিলেন সকলের অন্তরের মানুষ। তিনি আমাদের সাংগঠনিক কাজে প্রেরণা যোগাতেন। আজ খসরু ভাইয়ের মৃত্যুতে শূণ্যতা বোধ করছি আমরা। তাঁর বেদনা কখনও ভুলতে পারবো না।
বাল্যবন্ধু নৃপেশ তালুকদার বলেন, বজলুল মজিদ চৌধুরী বলেন খসরু আমার বাল্যবন্ধু ছিলো। এতো ঘনিষ্ট ছিলো যে, তাঁর অনুষ্ঠানে না আসলে রাগ করতো। তাঁর রাগও ভাল লাগতো। আজ বন্ধুকে হারিয়ে একা হয়ে গেলাম। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নীলিমা চন্দ বলেন, অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী ছিলেন সাদা মনের মানুষ। যেকোনো মানুষের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতেন। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. নজরুল ইসলাম বলেন, অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরীর কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। অনেক কিছু জেনেছি। আদালতে বিচারকের সামনে বলা কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনতাম। তাঁর মৃত্যুর একদিন আগেও আদালত চত্ত্বরে আমাদেরকে নানা বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করি।
সিনিয়র আইনজীবী হোসেন তওফিক চৌধুরী বলেন, অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু সারাজীবন মানুষের উপকার করেছে। খসরু তাঁর ভাল কাজ কর্মে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।