বীর মুক্তিযোদ্ধা নরেশ দাস এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। জীবীকার তাগিদে এখনও কঠিন কঠোর কৃষি কাজ করতে হয় তাঁকে। বলাবাহুল্য বাংলাদেশের অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই প্রান্তিক পরিবারের সদস্য। শান্তিগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা তিনি। একাত্তরে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে ঘর ছেড়েছিলেন দামাল নরেশ দাস। যুদ্ধ করেছেন ৫ নম্বর সেক্টরের আওতায়। বিশেষভাবে নরেশ দাসের কথা বলার কারণ হলÑ তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা স্থগিত রাখা হয়েছে। কেন এই ভাতা স্থগিত রাখা হয়েছে, নরেশ দাস জানেন না এর কারণ। এজন্য তিনি মর্মপীড়ায় ভোগেন। মুক্তিযোদ্ধারা প্রকৃত অর্থে কোন কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধে যাননি। এক সুতীব্র দেশপ্রেমবোধের তাড়নায়ই প্রতিটি বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। স্বাধীনতার পর সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি, ভাতা প্রদান; এমনসব কাজ শুরু করেছেন তাঁদের ত্যাগের প্রতি স্বীকৃতি দানের মহান উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু যখন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি দিয়ে হঠাৎ তা কেড়ে নেয়া হয় তখন সেটি ওই মুক্তিযোদ্ধার জন্য হয়ে উঠে যুদ্ধে পরাজয় বরণের মতোই গ্লানিকর। সুরেশ দাসের অবস্থাও এখন এমনই। তাই তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা। ভাতা পেয়েছি। এখন পাচ্ছি না। আমার এ বিষয়টি যেন ভালো করে খতিয়ে দেখে আমার জীবদ্দশায় একটা উপায় করে দেন। মরার পরে দেখে কী লাভ। জীবন থাকতেই যেন আমার সম্মানটা আমি ফেরত পাই। জয় বাংলা।’ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের ১৬ ডিসেম্বর তারিখের পত্রিকায় তার এমন আক্ষেপোক্তিই প্রকাশিত হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার এমন আক্ষেপে আমরা লজ্জাকাতর হই। কেবল কিছু বিধিগত জটিলতার কারণে (?) এক বীরকে এমন অপমান করা অন্য অর্থে ধৃষ্টতার শামিল।
সরকার বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধন, যাচাই-বাছাই, সংযোজন-বিয়োজন করে থাকেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করতে না পারা জাতি হিসাবে আমাদের জন্য চরম লজ্জাজনক। বারবার তালিকার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এই কাজটিকে চরম তামাশায় পরিণত করেছে। অথচ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সহজেই এই কাজটি করা যেত। তখন কোন কারণে সম্পূর্ণতা না করা গেলেও পরবর্তী কয়েক বছরে এই তালিকাটি চূড়ান্ত হওয়াই ছিল প্রত্যাশিত। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠলেই মাসে মাসে আকর্ষণীয় পরিমাণের ভাতা পাওয়া যায়, অন্যান্য সুবিধাদিও বেশ। তাই এই তালিকাটি হয়ে উঠেছে লাভজনক। লাভের পিঁপড়ার জ¦ালায় একটি সর্বাঙ্গসত্য মুক্তিযোদ্ধা তালিকা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। এর ফাঁকে নরেশ দাসের মত মুক্তিযোদ্ধারা তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন অবলীলায়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কখনও তালিকায় নাম উঠানোর যে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সেখানে খুব বেশি পারদর্শিতা দেখাতে পারেন না। পারেন না বলেই নরেশ দাস জানতেই পারলেন না কেন তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জের খবরে তাঁর উপর যে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে তাতে তিনি খুব সুন্দর করে তাঁর যুদ্ধবর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন, কোথায় যুদ্ধ করেছেন, কার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন; এমন সব বর্ণনা দিয়েছেন বিশ^াসযোগ্যভাবে। তাঁর মুক্তিযোদ্ধার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ আছে বলে এই প্রতিবেদন পড়ে কেউ মনে করবেন না। অথচ তাই হয়েছে। শান্তিগঞ্জের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে হবে।
মুক্তিযোদ্ধা নরেশ দাস এখনও জমিতে কৃষি কাজ করেন। অন্যান্য কাজের সাথে হেমইত দিয়ে জমিতে পানি সেচ দিতে হয় তাঁকে। মুক্তিযোদ্ধারা এরকমই জীবনসংগ্রামী হয়ে থাকেন। জীবনের সরল দর্শনেই তাঁদের আস্থা। তাঁরা সুযোগ বা সুবিধা লাভের জন্য চতুরতার আশ্রয় নিতে পারেন না। নরেশ দাস জীবিতকালে কেড়ে নেয়া মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের সম্মান ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন। এক বীর মুক্তিযোদ্ধার এই আকুতি রাখতে সক্ষম হবে কি স্বাধীন বাংলাদেশ?

