মো. মশিউর রহমান
সুনামগঞ্জের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ছিলেন একজন মানবতাবাদি, সমাজ সচেতন ব্যক্তি। সুনামগঞ্জে শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও গণমানুষের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। তাঁর মৃত্যুতে সুনামগঞ্জ শহরে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকেল ৩ ঘটিকায় সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তিনি ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়ন নিবাসী কৃষিজীবী বাবা মরহুম মফিজুর রহমান ছিলেন একজন প্রখ্যাত সালিশ ব্যক্তিত্ব। মা মরহুমা মজিদা খাতুন চৌধুরী। এ দম্পতির ৫ মেয়ে ও ৩ ছেলের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ১৯৭১ সালে সুনামগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী থাকা অবস্থায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসা¤্রদায়িক চেতনায় বিশ^াসী। সমাজ সংস্কৃতির প্রতি ছিলেন গভীর অনুরাগী। ১৯৬৭ সালে জেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় হতে তিনি এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন সুনামগঞ্জ কলেজে। ছিলেন রাজনীতি সচেতন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) এ। ১৯৬৮ সালে কলেজ কেবিনেটের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সুনামগঞ্জের এই আলোকিত সন্তান সক্রিয় ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে বিএসসি পাস ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন অনুষদে ভর্তি হন। ১৯৭৭ সালে এলএলবি পাস করে জীবিকার প্রয়োজনে চলে যান পশ্চিম জার্মানীতে। বেশ কয়েকবছর সেখানে অবস্থান করে ১৯৮৩ সালে দেশের টানে চলে আসেন। সে বছরেই সুনামগঞ্জ বারে আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন। পেশায় প্রতি ছিলেন বেশ দায়িত্বশীল। ১৯৯১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা বারের সাধারণ সম্পাদক ও ২০০০ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৭-২০০৯ সালে দায়রা জজ আদালত, সুনামগঞ্জর পাবলিক প্রসিকিউটর ও একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পূর্বে ‘দৈনিক সংবাদ’ ও দেশ স্বাধীনের পর ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকার সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। পরে তাঁর সম্পাদনায় সুনামগঞ্জ জেলায় ‘সাপ্তাহিক সুনাম’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি দীর্ঘ ৮ বছর ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। সাংবাদিকতা কালে তাঁর পেশাদারিত্ব মনোভাব ছিল। তাঁর হাত ধরে সুনামগঞ্জে অনেক সাংবাদিক গড়ে উঠেন। যারা বর্তমানে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বেশ সুনামের সাথে কাজ করছেন। সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার তিনি ছিলেন উপদেষ্টা সম্পাদক। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব সুনামের সহিত পালন করেন। লেখালেখিতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। গত তিন দশক ধরে তিনি মুক্তিযুদ্ধেও উপর গবেষণা চালিয়ে যান। ২০১২ সালে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘রক্তাক্ত ৭১’ বেশ গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় একটি বই। সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য এখনও সবাই তাঁর বইটির শরণাপন্ন হন। এই বইটির মাধ্যমে সন্তানহারা মা ৪৮ বছর পর তার সন্তানের খোঁজ পান সুনামগঞ্জ সদরের ডলুরাতে শহীদ সমাধিতে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘পশ্চিম জার্মানীর স্মৃতিকথা’। তিনি ছিলেন ‘মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র, সুনামগঞ্জ’র আহবায়ক। এখান থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বরুণ রায় স্মারকগ্রন্থ’, ‘আলফাত উদ্দিন আহমদ স্মারকগ্রন্থ’, ও ‘হোসেন বখত স্মারকগ্রন্থ’। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলার সকল হাওর ডুবে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। সে সময় কৃষকদের অধিকার আদায়ে সুনামগঞ্জ গড়ে উঠে সামাজিক সংগঠন ‘হাওর বাচাঁও’। তিনি এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। আমৃত্যু এ সংগঠনে সক্রিয় ভাবে কাজ করে গিয়েছেন। এভাবে একাধিক সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। পেশাগত কাজে বাহিরে পুরো সময়টুকু তিনি বিভিন্ন কল্যাণমুখী কাজে ব্যয় করেন। তার ব্যক্তিগত চেম্বারটি তার পেশার লোকদের চেয়ে সামাজিক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত লোকের দ্বারা ভীড় থাকতো। গত এক দশক ধরে তাঁর কাছে থেকে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরিতে কার্যকরী কমিটিতে থাকা অবস্থায় জগৎজ্যোতির নামে পদক প্রদানে ব্যক্তি বাছাই কমিটিতে তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সুনামগঞ্জ সাহিত্য সভায় তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। খসরু ভাই একজন মানবিক মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন কাজে তিনি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সুনামগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবী ও রক্তদান সংগঠন বিশ^জন’র উদ্যোগে গত বছর করোনার শুরুর দিকে মাসব্যাপী শহরের কর্মহীন শ্রমজীবী লোকদের প্রতিদিন দুপুরে একবেলা আহারের ব্যবস্থা করে। এতে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানবিক ব্যক্তিবর্গ সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। একদিন খসরু ভাই আমাকে ফোন করলেন আমেরিকা প্রবাসী উনার নাতির জন্মদিন উপলক্ষে তিনি আমাদের এই কার্যক্রমে শরিক থাকতে চান। উপদেষ্টা হিসেবে আমি সংগঠনের সভাপতি কর্ণ বাবু দাস কে ফোনে বিষয়টি আমি অবহিত করি। তাঁকে খসরু ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে বলি। খসরু ভাই একদিন দুপুরের আহারের পুরো টাকা কর্ণের হাতে তুলে দেন। একদিন আমার বন্ধু নুর হোসেনকে নিয়ে উনার বাসায় যাই। জামালগঞ্জ নয়াহালট নিবাসী নুর হোসেনের মামা একজন অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছিলেন না। খসরু ভাই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে অসচ্ছল এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ভালো চিকিৎসার ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। এর কয়েকমাস পরেই তিনি মারা যান। পাশাপাশি এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে আয় বৃদ্ধির জন্য তিনি একজন প্রবাসীর কল্যাণে একটি সেলাই মেশিনের ব্যবস্থা করে দেন। সংসার জীবনেও তিনি ছিলেন একজন সফল বাবা। একজন সফল স্বামী। তাঁর দুই মেধাবী সন্তান শিক্ষা জীবনে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। ছেলেটি দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েট থেকে ¯œাতক পাস করে আমেরিকাতে এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে সেখানেই বিশ^খ্যাত একটি কম্পিউটার তৈরীর প্রতিষ্ঠানের সফটওয়ার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছে। মেয়েটিকে উচ্চ মাধ্যমিকে আমি দু বছর ইংরেজি পড়িয়েছি। সে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় হতে এলএলবিতে অনার্স ও মার্স্টাস শেষ করে বর্তমানে দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আর্ন্তজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন’র ল’ফার্মে কাজ করছে। স্ত্রী মুনমুন চেীধুরী একজন কবি ও সংগঠক। মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর কর্ম আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাবে। দেশের এই সূর্য সন্তানের প্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
লেখক : প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি দিগেন্দ্র বর্মন কলেজ, বিশ^ম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ।


