বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু-স্মরণে

নৃপেশ তালুকদার নানু
বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার বর্ণাঢ্য জীবনের জানাশোনা কিছু তথ্য সাদামাটাভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি। তিনি ১৯৬৭ ইং সনে সরকারী জুবিলী স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন। বজলুল মজিদ চৌধুরী বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে সহপাঠীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক মহলে তার সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ট ও আন্তরিক যা ছিল অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়। ১৯৬৯ ইং সনে গনঅভ্যুত্থান কালীন সময়ে ছাত্র সমাজের মিটিং মিছিলে তার সরব উপস্থিতি ছিল। ১৯৭০ইং সনের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ সদর আসনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিপুল ভোটে নির্বাচিত দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরীর পক্ষে উনার জ্যেষ্ঠ ছেলে তার ঘনিষ্ট বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান মোসাদ্দেক রেজা সহ অন্যান্যদেরকে সাথে নিয়ে সংসদীয় এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরলস প্রচারণা চালিয়ে ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরী। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সহযোদ্ধাদের মধ্যে ৫ জন অন্তরঙ্গ বন্ধু একসাথে চলাফেরা করতেন। আমৃত্যু তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল । ঐ ৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন দেওয়ান মোসাদ্দেক রেজা চৌধুরী (প্রয়াত), সাব্বির আহমদ মিনু (প্রয়াত), আ.ত.ম সালেহ, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (প্রয়াত) এবং সুশান্ত রঞ্জন ভদ্র সাধন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা সবাই সামাজিক দায়িত্ব পালনে ও সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি একই কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন। বেশ কিছুদিন তিনি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। এ কাজে জড়িত হওয়ার পিছনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম হোসেন বখত সাহেবের মাধ্যমে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় নেতা মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেব এর সহায়তা পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে বজলুল মজিদ চৌধুরী তার স্বীকারোক্তিতে গর্ববোধ করতেন। পরবর্তীতে আইন শাস্ত্রে পড়ার জন্য ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় অবস্থানকালীন পড়াশোনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অবস্থিত প্রখ্যাত চার্টাট একাউন্টেন্ট ফার্ম এন্ড্রো গোমেজ এন্ড কোম্পানীতে তিনি হিসাব বিভাগে একজন কর্মী হিসাবে অস্থায়ী ভাবে কাজে যোগদান করেছিলেন। ওই ফার্মটির প্রধান কার্যালয় ছিল চট্টগ্রামে আর ঢাকা শাখার দাায়িত্বে ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরীর ঘনিষ্ট বন্ধু সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান অঞ্জন কুমার দেব চার্টার্ড একাউন্টেন্ট (বর্তমানে ঢাকাস্থ এ.কে দেব এন্ড কোং এর কর্নধার)। বজলুল মজিদ চৌধুরী উক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকুরী না করলেও পারতেন। তিনি সচ্ছল পিতার সন্তান ছিলেন। তাছাড়া তার ভগ্নিপতি পরিবার নিয়ে তখন ঢাকায় অবস্থান করতেন এবং তিনি বাংলা একাডেমীতে চাকুরীরত ছিলেন। ঐ ফার্মে সুনামগঞ্জের অনেক ছেলেরা আসা যাওয়া করতেন। দিনব্যাপী গল্প গুজব হতো ও হাসি-তামাশার মধ্য দিয়ে অফিসের কাজ চলতো। যথারীতি বজলুল মজিদ চৌধুরী তাঁর পড়াশোনা চালাতেন। ঢাকায় অবস্থানকালীন তার ছায়াসঙ্গী ছিলেন সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌরাঙ্গ দেশী (ডেপুটি পোষ্টমাষ্টার জেনারেল পদে অবসর গ্রহণ করেন)। বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর পিতা মরহুম মফিজুর রহমান চৌধুরীর গ্রামের বাড়ী লক্ষীপুরে কৃষি খামার ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে তার পিতা অবিভক্ত লক্ষীপুর ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তাছাড়া পাকিস্তান আমলে সিলেট সুনামগঞ্জ রোডে চলাচলকারী গুটিকয়েক বাস গাড়ীর মধ্যে একটি বাসের মালিক ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরীর পিতা। অতঃপর বজলুল মজিদ চৌধুরী এল.এল.বি পাশ করেন। ঐ সময়ে দেশের মধ্যে পশ্চিম জার্মান যাবার জন্য অসংখ্য বাংলাদেশী আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। লোভনীয় এই প্রসÍাবটিতে বজলুল মজিদ চৌধুরীকেও তার এক আত্মীয় আগ্রহী করেন। তিনি ভেবেছিলেন আইন পেশা চালানোর অনেক সময় পাওয়া যাবে বরং ইউরোপ দেশে যাওয়ার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজে স্বাবলম্বী হই এবং প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি।
বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে পরিবার থেকে আপত্তি আসবে ভেবে ঢাকায় অবস্থান করা তার এক বাল্যবন্ধু সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান এনামুল হক চৌধুরীর (অবসরপ্রাপ্ত চীফ ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশ টেলিভিশন) কাছে এ ব্যাপারে সাময়িক সহায়তা চাইলেন। সানন্দে ঐ বন্ধুটি তার প্রস্তাবে রাজী হলেন। এবং যদি সম্ভব হয় উনার বেকার ছোট ভাইকে পশ্চিম জার্মানে তার সঙ্গে নেয়া যায় কি না বিবেচনার জন্য তিনি অনুরোধ করেন। শেষ পর্যন্ত তারা দুজনই পশ্চিম জার্মান পারি জমান। জার্মান দেশে কিছুদিন অবস্থান করে তিনি দেখলেন পশ্চিম জার্মানে গমনকারী অধিকাংশ প্রবাসী অধিক আয়ের জন্য ছুটাছুটি করছে এবং নি¤œআয়ের চাকুরী পাচ্ছে। অনেক ভেবে চিন্তে বজলুল মজিদ চৌধুরী ঐ দেশে একটি খন্ডকালীন কাজ নিলেন যাতে নিজের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো যায়। এই সুযোগে তিনি ৬ মাস মেয়াদী জার্মান ভাষা শেখার একটি প্রশিক্ষণ নিলেন। যেই ভাবনা সেই কাজ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কাঙ্খিত চাকুরী পেলেন। যা জীবনের মান উন্নয়নে সফলতা বয়ে এনেছিল। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি ছিলেন পারদর্শী।
বজলুল মজিদ চৌধুরীর সামাজিক দায়িত্ব পালনের দু একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাননীয় চেয়ারম্যান এবং একজন পরিচালক সুনামগঞ্জে এসেছিলেন। তারা উভয়ই বীর মুক্তিযোদ্ধা। বজলুল মজিদ চৌধুরীর বন্ধুতুল্য বীর মুক্তিযোদ্ধা উজির মিয়া তখন অসুস্থ এবং সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন। তার অনুরোধে সাবেক জেলা কমা-ার বীর-মুক্তিযোদ্ধা হাজী নুরুল মোমেন দুজন সাথীকে নিয়ে এসে অসুস্থ উজির মিয়াকে আর্থিক সাহায্যের জন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন। মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয় সদয় হয়ে অসুস্থ উজির মিয়ার ছেলের কাছে বড় অংকের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। বছর কয়েক পূর্বে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে সদর উপজেলার বিপুল সংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে স্থানীয় লতিফ কমিউনিটি সেন্টারে শীতবস্ত্র বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। উক্ত অনুষ্ঠানে তৎকালীন জেলা সদরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রচারবিমুখ একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বিগত ২০০০ সন থেকে আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু ট্রাস্ট এর মাধ্যমে প্রতি বছর ৫ শতাধিক অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা সন্তন ও পোষ্যদেরকে শিক্ষা উপকরণ ক্রয় করার জন্য ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল এর সহায়তায় তার নিজ গ্রামে ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
উল্লেখ্য বছর তিনেক পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলায় অকাল বন্যার কারণে ব্যাপক ফসল হানি হয়। এ ধরনের অকাল বন্যার কবল থেকে স্থায়ী নিরসনের জন্য এবং এতদবিষয়ে বিভিন্ন দাবী দাওয়া আদায়ে অত্র জেলার বিভিন্ন শ্রেণীপেশার নাগরিকদের নিয়ে “হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন” নামে একটি সামাজিক সংগঠন গঠিত হয়। যার সভাপতি ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরী। উক্ত সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সহায়তায় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে তিনি জাওয়ার হাওয়ের নিকটবর্তী দুটি গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবারকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করে দেন।
দেশের স্বনামধন্য দুইজন গুণী ব্যক্তির সম্মান রক্ষায় তিনি দৈনিক প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি এডভোকেট খলিল রহমানকে সাথে নিয়ে বজলুল মজিদ চৌধুরী অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন । একাধিকবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার কবির বকুল এবং পঞ্চাশোর্ধ বাংলা সিনেমার পরিচালক পি.এ. কাজল তাদের একটি বাংলা সিনেমায় সুনামগঞ্জের একজন মরমী কবির রচিত একটি গানে গীতিকার হিসেবে সংশ্লিষ্ট মরমী কবির নাম উল্লেখ না করায় স্থানীয় আদালতে কবির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দুই জনের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালতের বাইরে আপোষের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসায় তিনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন।
বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু একজন ক্রীড়াপ্রেমী ও সংস্কৃতমনা ব্যক্তিত্ব ছিলেন । দেশে আর্ন্তজাতিক মানের নবনির্মিত মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম একদিবসীয় ভারত-বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ এবং নবনির্মিত সিলেট আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম একদিবসীয় ওয়েস্টইন্ডিজ-বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে উপভোগ করেছিলেন । এক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ছিলো দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনার একজন সাক্ষী থাকা । এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষের বহুল আলোচিত সিনেমা “মনের মানুষ” এর চিত্রায়ন হয় তাহিরপুর উপজেলায় । উক্ত সিনেমার শিল্পী ও কলাকুশলীদের সুনামগঞ্জে অবস্থান সম্পর্কে সার্বক্ষণিক খোজ খবর রেখেছিলেন । তাছাড়া বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত পরিচালিত দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “ইত্যাদি” সুনামগঞ্জে দৃশ্য ধারণের সকল খুঁটিনাটি খবরাখবর তিনি পূর্বজ্ঞাত ছিলেন । এসব বিষয় লক্ষ করলে বুঝা যায় সত্যিকার অর্থেই তিনি সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন ।
বজলুল মজিদ চৌধুরী ছিলেন একজন প্রগতিবাদী ব্যক্তিত্ব। তার গঠনমূলক চিন্তা চেতনা এবং বৈষয়িক ভাবনা ছিল যুব সমাজের নিকট অনুকরণীয়।
লেখক: সহপাঠী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার।