বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সংযোগ সড়কে। সড়কের কোন কোন অংশ দেখলে বুঝার উপায় নেই এখানে এক সময় সড়ক ছিল। জেলা শহরের সাথে উপজেলা সদরের যোগাযোগ সড়কের উজ্জ্বলপুর অংশ ও জামালগঞ্জ সেলিমগঞ্জ-মান্নানঘাট অংশের প্রায় ২০০ মিটারেরও বেশি অংশ পানির তুরে ভেসে গেছে। এতে করে সুনামগঞ্জ- জামালগঞ্জ- সেলিমগঞ্জ পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ দুই অংশে আনুমানিক ৩ কোটি টাকার সড়ক ভেসে গেছে। ভেঙে যাওয়া অংশে ফেরি বসিয়ে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হলেও বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। এছাড়া সেলিমগঞ্জ-গজারিয়া সড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৮০০ মিটার এবং সাচনা-মমিনপুর ও সাচনা-রামনগর সড়কের অনেক অংশ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা এলজিইডি অফিস।
এদিকে, সাচনা-সুনামগঞ্জ সংযোগ সড়কের অধিকাংশ অংশ বন্যার সময় এক সপ্তাহেরও বেশি পানিতে ডুবে থাকায় স্থানে স্থানে গর্ত ও খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রী চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে।
অপরদিকে, সাচনা-সুনামগঞ্জ ও জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ মূল সড়ক ছাড়াও উপজেলার অভ্যন্তরে থাকা গ্রামীণ অনেক সড়কও কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলে উপজেলার ছোট-বড় বিভিন্ন সড়কে ৫-৬ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা না করলে চলাচলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে, এমন আশঙ্কা করছেন সড়কে যাতায়াতকারী যাত্রীসাধারণ থেকে শুরু করে সচেতন মানুষ।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের উজ্জ্বলপুর অংশে প্রায় ১৫০ মিটার ও জামালগঞ্জ-গজারিয়া সড়কের সেলিমগঞ্জ-মান্নানঘাট অংশের মাঝখানে ৫০ মিটারেরও বেশি সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই ২০০ মিটার সড়ক ভেঙে যাওয়া অংশে ক্ষতির পরিমাণ হবে আনুমানিক ৩ কোটি টাকারও ওপরে। এছাড়া সেলিমগঞ্জ থেকে গজারিয়া সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে আরও প্রায় ৮০০ মিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সংযোগ সড়কের পুরাতন আরসিসি রোড অনেক আগেই ভেঙে গেছে। এখন যা আছে সব নতুন। এ নতুন সড়কও বন্যার পানিতে ভাঙছে বলে জানিয়েছে উপজেলা এলজিইডি।
উজ্জ্বলপুরের ভাঙা সড়ক সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা অংশ দিয়ে দ্রুত গতিতে পানি লোকালয়ে ঢুকছে। বন্যায় ভেসে যাওয়া অংশটুকু দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এখানে পূর্বে কোন সড়ক ছিল। সড়কের বিশাল অংশ ভেঙে যাওয়ায় নৌকা দিয়ে এপার-ওপারে যাতায়াত করছে মানুষ। সুনামগঞ্জমুখী যাত্রীরা টমটম কিংবা লেগুনা দিয়ে উজ্জ্বলপুরের ভাঙা অংশে গিয়ে নামছে। পরে সেখানে ফেরির অপেক্ষায় বেশ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদেরকে। এতে করে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মানুষ।
বন্যায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ভীমখালী ইউনিয়নের উজ্জ্বলপুর অংশের সড়ক ভোগান্তি নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আব্দুল ওয়াকিব বলেন, ‘সড়ক ভেঙে যাওয়ায় মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। ফেরির জন্য দাঁড়িয়ে থেকে অনেক সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। সঠিক সময়ে কেউই তাদের গন্তব্যে যেতে পারছে না। সড়ক ভাঙার পর মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে প্রথম দুইদিন আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ফেরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তারপরও যেন দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না মানুষ। তাই দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।’
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের মো. তুতা মিয়া বলেন, ‘বন্যার পানিতে সড়ক ভাঙায় আমরা খুব অসুবিধার মধ্যে আছি। টমটম-সিএনজি এখন চলে না। ফেরি দিয়া পার হইতে কমপক্ষে আধা ঘন্টা সময় লাগে। যাইতে-আইতে বেশ সময় নষ্ট হয়। মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে। পানি কমার সাথে সাথে যেন সড়ক তাড়াতাড়ি ঠিক কইরা দেওয়া হয়।’
সম্প্রতি, সাচনাবাজার-সুনামগঞ্জ সড়কে চলতে গিয়ে সাচনা গ্রামের নিহার দাস বলেন, ‘সড়কের যে অবস্থা দেখলাম তাতে দিন দিন আরও করুণ অবস্থা হবে। সড়কের স্থানে স্থানে গর্ত হয়ে পাথর বের হওয়ার পাশাপাশি কিনারে বালু-পাথর সরে গাছের শিকড় বের হয়ে গেছে। নি¤œমানের কাজ হওয়ায় এই অবস্থা হতে পারে। তাই পানি উঠামাত্রই সহজে ভেঙে যাচ্ছে সড়ক। জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। নইলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে বৈ কমবে না।’
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম জিলানী আফিন্দী রাজু বলেন, ‘বন্যায় উজ্জ্বলপুরের যে অংশ ভেঙেছে সেটা জামালগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জে যাওয়ার প্রধান সড়ক। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা পরিষদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ১৫ দিনের জন্য টেন্ডার দিয়েছে। তাতে নির্দিষ্ট হারে একটা ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু করোনা ও বন্যায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করাটা আসলে ঠিক নয়। আমরা ভাড়া ফ্রি করে দেওয়ার চিন্তা করছি।’
উপজেলা এলজিইডি’র প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার জানিয়েছেন, ‘জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে দ্রুত সংযোগ স্থাপন প্রয়োজন। এজন্য এলজিইডি হেড কোয়ার্টারের ডিজাইন সেকশনকে যথাযথ ডিজাইনের মাধ্যমে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যা আমাদের উপজেলা এলজিইডি অফিসের পক্ষে সম্ভব নয়। পানি সরে গেলে হয়তো উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা এলজিইডির পক্ষ থেকে প্রাথমিক চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’


