রবি ঠাকুরের দুই বিঘা জমি কবিতার ঋণগ্রস্ত উপেনের তবু দুই বিঘা জমি অবশিষ্ট ছিল। ওই জমিটুকু কিনতে চেয়েছিলেন জমিদার বাবু। ভূস্বামী জমিদার বাগানের দৈর্ঘ-প্রস্ত সমান করতে উপেনের ওই দুই বিঘা জমি নানা কূটকৌশলে দখলে নেন। জমি হারানো উপেনের শেষ আক্ষেপ ছিল এরকমÑ ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে’। রবি ঠাকুরের উপেনের মত দশা হয়েছে কাইয়ারগাঁও গ্রামবাসীর কারও কারও। তবে সেকালের ভূস্বামী জমিদার কারও হীন চক্রান্তে নয়। বরং আধুনিককালের লুটেরা চরিত্রের কিছু দুর্বৃত্ত ধরণের লোক এইসব গরিব গ্রামবাসীর ভিটে উচ্ছেদের বন্দোবস্ত পাকা করেছে। এই দুর্বৃত্তরা বালু-পাথরখেকো নামে কুখ্যাত। এরা সরকার ও রাষ্ট্রের আইনের প্রতি রীতিমত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলতি নদীতে নির্বিচারে বোমা মেশিন চালিয়ে নদীর তলদেশের পাথর উঠিয়ে নিজেদের লাভের পাহাড় বড় করছে। কাইয়ারগাঁওয়ের ভাগ্যবিড়ম্বিত ভিটে-হারা মানুষের দুঃখ দেখার কেউ নেই। সেই উপেনের মতই কেবল মনে মনে খেদ ঝাড়তে পারে তারা- ‘এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’। সেইকালে যেমন উপেনের আহাজারিতে ভূস্বামীর মন টলেনি একালেও তেমনি মুনাফালোভী অবৈধ বোমামেশিন কারবারিদের বুকে তুলতে পারে না সামান্যতম আলোড়ন। তাই তো বার বার এক রকমই ঘটনা ঘটে চলেছে। কত সংবাদ প্রচার হয়েছে সংবাদপত্রে, কত অভিযান হয় নদীতে, নিরব অসহায়ত্বের কত অশ্রুবিন্দু চলতি নদীর সঞ্চয় বাড়ায়; তবু অবস্থা থাকে এক এবং অভিন্ন। এ থেকে পরিত্রাণের কি কোনই পথ নেই?
বালু ও পাথর উত্তোলনে বোমা মেশিন ব্যবহার আইনে নিষিদ্ধ। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ মাঝে-মধ্যেই অবৈধ বোমামেশিন জব্দ করে নিয়ে আসেন, কিছু বোমামেশিন অকুস্থলে নষ্ট করে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু অভিযানের পর আবারও বোমামেশিনের গর্জন আর কম্পনে নদীর তলদেশ প্রচ- আলোড়িত হতে হতে গ্রাম ভাঙে, ভাঙে বসত-জমি, ভাঙে মানুষের হৃদয়। কেন? এর উত্তর অজানা। বোমামেশিনওয়ালারা বোধ করি ধরেই নিয়েছে মাঝেমধ্যে তাদের কিছু মেশিন বাজেয়াপ্ত হবে। এটা ধরেই মনে হয় এরা ব্যবসা করে। এই ক্ষতিকে তারা ব্যবসার খরচ বলেই গণ্য করে। যাবতীয় খরচ তুলে লাভ না হলে কেউ ব্যবসা করে না। মেশিন বাজেয়াপ্ত করা থেকে তারা যে খুব বেশি লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে তা বুঝা যায় না। লোকসান হলে কেউ এ ব্যবসায় আসত না। দরকার ছিল এমন সাজার যে সাজা হলে এই অবৈধ কারবারিরা পুনরায় অপকর্মে নিয়োজিত হওয়ার সাহস হারাত। প্রয়োজন ছিল এই অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ। যতক্ষণ পর্যন্ত এরা বোমামেশিন চালানোকে লোকসানি ও নিজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা বলে গণ্য না করবে ততদিন পর্যন্ত বন্ধ হবে না এই অপরাধপ্রবণতা।
ক্ষতিগ্রস্তদেরও দায় আছে। এরা প্রবল-প্রতাপশালীদের ভয়ে মুখে রা টি কাড়েন না। কথায় বলে না কাঁদলে মাও শিশুকে দুধ দেয় না। সুতরাং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিবাদী হতে হবে আইনসঙ্গত উপায়ে। সরকার ও প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতি রাত বসে বসে বিশাল চলতি নদী পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। এই পাহারাদারির দায়িত্ব পালন করতে হবে এলাকার সাধারণ মানুষকে। কোথায় কখন এইসব অবৈধ বোমামেশিন চলে সেই তথ্য জানাতে হবে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে। বোমামেশিনের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হলে গুটিকয়েক ব্যক্তি এই অবৈধ কাজ করার সাহস পাবে না। সুতরাং দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে নিজেদের ভিটে-জমি রক্ষার জন্য, সর্বোপরি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার জন্যও।
বোমামেশিনের আগ্রাসনে চলতি নদীর ভাঙন কবলিত কাইয়ারগাঁওসহ অপরাপর জনপদকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
- বোমা মেশিনের তান্ডব বিলীন হওয়ার পথে কাইয়ারগাঁও
- ছাতক পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব নিলেন তাপস চৌধুরী

