বিশেষ প্রতিনিধি
বিগত বোরো মৌসুমে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান কেনার কৃষক রেজিস্টার বেশিরভাগ উপজেলায়ই ছিল অগোছালো। কৃষক ধান দিয়েছেন কি-না, তা এসব রেজিস্টার দেখে বের করা কঠিন হবে। কৃষকরা বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবেই এভাবে রাখা হয়েছে, যেখানে দুর্নীতি বেশি হয়েছে, সেখানে রেজিস্টার বেশি অগোছালো হয়েছে। এদিকে, আগামী বুধবার থেকে আবার জেলার ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সরকারিভাবে আমন ধান কেনা শুরু হচ্ছে। সেখানেও এভাবেই অনিয়মের আশঙ্কা করছেন কৃষক নেতারা। জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য কর্মকর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, রোববার সকল উপজেলায় চিঠি পাঠিয়ে জানানো হয়েছে, আমন ধানের মৌসুম থেকে পরবর্তীতে ধান কেনার সময় কৃষক তালিকা এভাবে অর্পূণাঙ্গ রাখা যাবে না। ধান যাদের কাছ থেকে কেনা হবে, তাদের নামের তালিকা পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে এবার বোরো ধান কেনা হয়েছে ১৭ হাজার ৮২৩ টন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ কৃষকের মধ্য থেকে ১৮ হাজার ২১৮ জন কৃষককের কাছ থেকে এই ধান কেনা হয়েছে। খাদ্য বিভাগ দাবি করেছে, সকল ধানই সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হয়েছে। কৃষক নেতাদের দাবী ধান দিয়েছে, প্রভাবশালী লুটেরারা।
যেসব কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে, তাদের নামের তালিকা প্রায় এক মাস চেষ্টার পর রোববার খাদ্য বিভাগ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। এই তালিকা দেখলেই বুঝা যাবে, কোনো কোনো উপজেলায় ধান কেনার সময় সঠিকভাবে রেজিস্টার তৈরি হয় নি। কৃষক নেতারা বলেছেন, ফড়িয়া-দালালদের সুবিধা দেবার জন্য এভাবে রেজিস্টার তৈরি করা হয়েছে।
কোনো কোনো উপজেলা খাদ্য অফিসের তালিকায় কৃষকের নাম, পিতার নাম, গ্রাম, ইউনিয়ন, ব্যাংক হিসাব নম্বর, কতটুকু ধান দিয়েছেন ঐ কৃষক সেইসব তথ্যের উল্লেখ নেই। কোন কৃষকেরই মুঠোফোন নম্বর তালিকায় নেই।
শাল্লা উপজেলায় কোন কৃষক কতটুকু ধান দিয়েছেন এবং ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ নেই। জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ খাদ্য গোদামে কৃষকের নাম ছাড়া আর কিছুই তালিকায় নেই। কৃষি কার্ডের নম্বরও তারা (খাদ্য গোদাম কর্মকর্তা) ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না।
দোয়ারাবাজারে কৃষকের পিতার নাম, গ্রামের নাম উল্লেখ করা হয় নি। ব্যাংক হিসাব নম্বরও রেজিস্টারে উল্লেখ নেই। দিরাইয়ে অবশ্য নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা রয়েছে।
তাহিরপুরে কৃষকের গ্রামের নাম, পিতার নাম, ব্যাংক হিসাব উল্লেখ নাই। সুনামগঞ্জ সদরে কৃষকের নাম, গ্রামের নাম উল্লেখ থাকলেও, কৃষকের পিতার নাম এবং ব্যাংক হিসাব উল্লেখ নাই। মধ্যনগরের কৃষকদের ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ নাই। বিশ^ম্ভরপুরের তালিকা ছিল পূর্ণাঙ্গ। ধর্মপাশায় কৃষকের গ্রামের নাম উল্লেখ নেই। দক্ষিণ সুনামগঞ্জে পিতার নাম ও ব্যাংক হিসাব উল্লেখ নেই। জামালগঞ্জে কৃষকের পিতার নাম উল্লেখ নেই। ব্যাংক হিসাবও অস্পষ্ট। জগন্নাথপুরে কৃষকের গ্রামের নাম ও ব্যাংক হিসাব উল্লেখ নেই। ছাতকে কৃষকের পিতার নাম ও ব্যাংক হিসাব উল্লেখ নেই। কোনো খাদ্য গোদামেই কৃষকের তালিকায় কৃষকদের মুঠোফোন নম্বর লিখা নেই।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, কৃষকরা সরকারি খাদ্য গোদামে খুব কমই ধান দিয়েছে। হয়রানির চিন্তা করে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে যায় না তারা। ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় কার্ড বিক্রি করে দিয়েছেন কৃষকরা। এই কার্ড কিনে নিয়েছে প্রভাবশালী-ফড়িয়ারা, এদের ঠিক সরকারি দলও বলা যায় না, যখন যে সরকার আসে, তারা ওই দলেরই হয়। এরা কৃষকদের কাছ থেকে স্বাক্ষর দেওয়া চেক নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় টাকা তুলেছে। এজন্য খাদ্য গোদামের কৃষক তালিকা এভাবে অগোছালো করে রাখা হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাবেক সদস্য করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, খাদ্য গোদামের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যাদের যোগাযোগ রয়েছে, এ ধরনের দালালরাই কৃষকদের কার্ড নিয়ে গেছে, তারাই ব্যাংক হিসাবসহ অফিসিয়েল সকল কার্যক্রম তাদের মতো করেছে। কৃষকদের এই বিষয়ে আরও সচেতন করতে হবে।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, খাদ্য বিভাগের উপর কৃষকদের আস্থার অভাব রয়েছে। কৃষকরা ধান নিয়ে গেলে নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়। এই সুযোগ নেয় ফড়িয়া, দালালরা। ধান কেনার রেজিস্টারে মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল। মুঠোফান নেই, এমন মানুষের সংখ্যা এখন খুব কমই আছে। সরকারি ক্রয় কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতার অভাব থাকায়, এভাবে তালিকা লিখে রাখা হয়েছে। তিনি এই মাসে আমন ধান কেনার সময় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জানতে চাইলে জেলা খাদ্য অফিসের তথ্য প্রদানকারী গোলাম আউলিয়া বলেন, বোরো মৌসুমের ধান কেনার সময় ক্রয়কেন্দ্রগুলোর কৃষক তালিকায় কিছু বিষয়ে ঘাটতি ছিল, তবে কৃষকদের আইডি কার্ডের ফটোকপি রেখে ধান কেনা হয়েছে। রোববার সকল খাদ্য গোদামে চিঠি পাঠানো হয়েছে ধান কেনার সময় ১৫ টি কলাম পূর্ণ করার জন্য।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া মোস্তফা বললেন, আমন ধানের উৎপাদন হয়েছে তিন লাখ টন। ধান কেনা হবে ৮ হাজার ১১৮ টন। এবার যাতে ধান কেনার সময় রেজিস্টারে আরো বেশি তথ্য রাখা হয়, সেই বিষয়টি খেয়াল রাখা হবে।


