বোরো ধানে পোকার আক্রমণ, দিশেহারা শাল্লার হাজারো কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি
‘কষ্ট কইরা ধান করছি, জমির দিকে চাইয়া আছি, ধান পাকতো কাইট্টা আনতাম, কালকে জমিনে (জমিতে) গিয়া দেখছি ধান ঝলঝল করের, আজকে সকালে গিয়া দেখি মাঝে মাঝে সাদা সাদা অইয়া মরি যার (মরে যাচ্ছে), ৪ একর জমিন করছিলাম, দুই একরঔ নষ্ট অইগেছে।’
‘কৃষি অফিসারে আইয়া দেইক্কা কইছইন বিকালে জমিতে ওষুধ স্প্রে করতো অইবো, আমার ১৮ একর জমিন আছে ওষুধ স্প্রে করতে অইলে ২৫-৩০ হাজার টেকা লাগবো, আমি না অয় ওষুধ দিলাম, আমার লাগা (লাগোয়া) জমিনে স্প্রে না দিলে কি কাম (কাজ) অইবো, হিখানের (পাশের জমির) পোকা আইয়া আমার জমিনে ধরবো, সরকারিভাবে হাওর জুইড়া ওষুধ স্প্রে করা দরকার’।
উপরের মন্তব্যগুলো শাল্লার প্রতাপপুরের কৃষক প্রমোদ দাশ এবং আঙ্গাউরা নোয়াগাঁওয়ের সামর্থবান কৃষক মাখল লাল দাশের।
কেবল এই দুই কৃষক নয়। শাল্লার প্রতিটি গ্রামে, বাজারে, ক্ষেতে- খামারে গেল তিনদিন হয় এক আলোচনা। পোকার আক্রমণে কপাল ভাঙছে কৃষকের। সারা বছরের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। এক কৃষক আরেক কৃষকের মুখের দিকে কেবল তাকাচ্ছেন।
নোয়াগাঁওয়ের টিটু দাশ, নাইন্দার প্রমোদ দাশ, আনন্দপুরের প্রজেশ দাশ, সুলতানপুরের হাবিব মিয়া, মুক্তারপুরের রাজকুমার বিশ^াস, নারাইনপুরের অবিনাশ দাশ সোমবার সকালে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় বললেন, ব্রি ২৮ জাতের ধান, লালডিঙা, হাইব্রিড সুগন্ধা সবই খেয়ে শেষ করে দিচ্ছে পোকায়। জমিতে ১০-১৫ হাত পরে পরে ১০-১৫ হাত জুড়ে সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে ধানের শীষ। শীষের গোড়ার নরম স্থান কেটে দিচ্ছে পোকায়। আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। এখানে ওখানে যাচ্ছি, ফল হচ্ছে না কিছুই।
উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রদীপ দাশ বললেন, একেকটি ধানের শীষে সাদা-কালোয় মিলে ২০-৩০ টা পোকায় ধরছে। দুপুরে কম থাকে, রাতে বেড়ে যায়। যে জমিতে ধরে, একেবারে শেষ করে দেয়, অনেকে কেরোসিনও ছিটাচ্ছে, কাজ হচ্ছে না, সরকারি উদ্যোগ ছাড়া মানুষকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করা যাবে না।
শাল্লা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত দাশ বললেন, শীষকাটা লেদা পোকা এবং গোড়া পচা রোগ দেখা দিয়েছে এই উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ধানি জমিতে। গত দুই দিন সরেজমিনে উপজেলার কলাপাড়া, পুটকা, নারাইনপুর ও আগুয়াই গ্রামে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছি, তারা যেন শীষকাটা লেদা পোকার জন্য কীটনাশক সেতারা এবং নাইট্রো এবং গোড়া পচার জন্য টিল্ট অথবা স্কোর ব্যবহার করেন। তিনি জানালেন, এগুলো ছাড়া আরও ভাল ওষুধ আছে, অন্যগুলো শাল্লায় পাওয়া যাচ্ছে না। পোকা দমনের জন্য আলোকপাত বা নাইটসেড করার জন্যও বলা হচ্ছে। রাতে নাইটসেডের নীচে সাবান পানি রেখে পোকা নিধন করা সম্ভব। কৃষকদের এভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অবনী মোহন দাশ বললেন, শাল্লার বৃহৎ ছায়ার হাওরে এই পোকার আক্রমণ দেখে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। বিষয়টি উপজেলা ও জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক ফরিদুল হাসান বললেন, শাল্লায় ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। সকল এলাকায় পোকার আক্রমণ নেই। যেখানে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। সেখানকার কৃষকদের বিকালে সোনালী মিস নামের কীটনাশক ১০ লিটার পানির সঙ্গে ১০ মিলি মিশিয়ে অথবা মার্শাল নাইট্রো ১০ লিটার পানির সঙ্গে ২০ মিলি মিশিয়ে ছিটানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।