বিশেষ প্রতিনিধি ও আমিনুল ইসলাম
সারা দেশে বালু-পাথর ও কয়লা নিয়ে যেতে হয় এই নদীর বুক দিয়েই। একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় কার্গো ও বাল্কহেড চলতো। এখন কেবল বর্ষার দুই মাস চলে। ভাটির দুটি বড় হাওর অকাল বন্যায় তলায় এই নদী ভরাটের কারণেই। লাখো মানুষ এই নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। সরকার গণমানুষের দাবি পূরণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দও দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ নদী বৌলাই খননে বিলম্ব হচ্ছে। এলাকাবাসী বলছেন, দ্রুত নদী খনন না হলে আগামী বোরো মৌসুমে শনি ও মাটিয়ান হাওর অরক্ষিত থাকবে। হেমন্তে কয়লা-পাথর বহনকারী বাল্কহেডগুলোর ঝট লাগবে পথে পথে।
দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে সারা বছর নদীপথে যাতায়াত, ভারতের মেঘালয় থেকে তাহিরপুর সীমান্তের তিন শুল্কস্টেশন বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী হয়ে দেশে আসা কয়লা ও পাথর সারা দেশে সরবরাহ এবং তাহিরপুর উপজেলা সদরের সঙ্গে সারা দেশের নৌ-যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে বৌলাই নদী খননের দাবি গত প্রায় ২০ বছর ধরে।
মানুষের দাবি পূরণে এবং ভাটির অর্থনীতি সচল রাখতে তাহিরপুর থানার সামনের অংশ থেকে ভাটিতে আনন্দনগর পর্যন্ত ৬. ৭ কিলোমিটার নদী খনন শুরু হয়েছে ৯ মার্চ থেকে। এর উজানের ৪ কিলোমিটার ফাজিলপুর পর্যন্ত বিআইডব্লিউটি’এ ইতিপূর্বে খনন করেছে।
৭ কোটি ৩২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে তাহিরপুর থানার সামনা থেকে ভাটিতে ৬.৭ কিলোমিটার নদী খননের কাজ করছেন রাজধানী ঢাকার ঠিকাদার আলম খান।
গত পহেলা ফেব্রুয়ারি এই ঠিকাদারকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও তিনি কাজ শুরু করতে বিলম্ব করেন। ৯ ফেব্রুয়ারি জাহিদ ফারুক বৌলাই নদীর খনন কাজ পরিদর্শনের জন্য তাহিরপুর আসেন। নদীর খননের কাজ শুরু না হলে ক্ষুব্ধ হবেন মন্ত্রী, এই ভয়ে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ঠিকাদারকে দিয়ে তাহিরপুর উপজেলা সদরের পাশে অ্যাস্কেভেটর দিয়ে নদী খননের কাজ শুরু করান। ঠিকাদার নদীর তলদেশের ১০ মিটার (প্রস্তে) অংশ খনন করে নদীতেই মাটি রেখে দেয়। এই মাটি কয়েকদিনের মধ্যে পানি এসে আবার নদীতেই চলে যায়।
এরআগে বিআইডব্লিটিএ নদীর উজানের দিকে তলদেশ প্রস্তে ২০ মিটার করে খনন করে আসায় স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন ওঠে ভাটিতে প্রস্তে ১০ মিটার খনন করলে, উজানে ২০ মিটার খনন করার প্রয়োজন ছিল কী?
পরে আবার প্রাক্কলন পরিবর্তন করে তলদেশে ২০ মিটার (প্রস্ত) খননের সিদ্ধান্ত নেয় পাউবো। গত জুন মাসেই নদী খননের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু মন্ত্রীকে দেখানোর জন্য দৃশ্যমান সামান্য কাজ করে কোভিড’এর দোহাই দিয়ে সবকিছু গুটিয়ে চলে যায় ঠিকাদারের লোকজন। কাজের সময়সীমা জুন মাসে পার হয়ে গেলে সময় বর্ধিত করা হয় নভেম্বর মাস পর্যন্ত। পরে মাস খানেক হয় ছোট একটি মেশিন দিয়ে আবার কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
তাহিরপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন বলেন, মানুষের দাবি পূরণের জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়েছেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজই ধরেনি। এখন কাজ ধরলেও ছোট একটি মেশিন দিয়ে খুবই ধীরগতিতে কাজ চলছে। আমাদের মনে হচ্ছে, নভেম্বরে কাজ শেষ হবে না। ভাটির অংশে কাজের ধীরগতির কারণে, খনন হওয়া উজানের অংশ মাটিতে ভরাট হতে পারে। তাতে সরকারের টাকা কেবল গচ্ছা হবে, নদী খননের কিছুই হবে না।
স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী সেলিম আখঞ্জি বলেন, বৌলাই খনন হলে উজানের বা মেঘালয়ের পানি রক্তি বৌলাই-সুরমা হয়ে মেঘনায় মিলিত হতে বাধা থাকে না। অকাল বন্যা হবার আশংকা কম থাকে। এই নদী খননে ধীরগতিতে মানুষ হতাশ। গত এক মাসে ছোট একটি মেশিন নদীর ২০-৩০ হাত খনন করেছে। আগামী বোরো মৌসুমের আগে নদী খনন শেষ হবে না, হাওর ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। হেমন্তে কয়লা-পাথর বহনকারী বাল্কহেডগুলোর ঝট লাগবে।
ঠিকাদার আলম খান’এর সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলার জন্য বার বার চেষ্টা করলেও তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ থাকায় এ ব্যাপারে বক্তব্য জানা যায় নি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, বৌলাই নদী খননের কাজ ড্রেজার ও অ্যাস্কেভেটর দিয়ে করার কথা। মার্চে কাজ শুরু হলেও কোভিড-১৯’এর কারণে লোকজন কর্মস্থলে না থাকায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন নদীতে অতিরিক্ত পানি রয়েছে, ¯্রােতের বেগ আছে, পানি কমলেই কাজের গতি বাড়বে। শুরু’র দিকে নদীর তলদেশ ১০ মিটার খনন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উজানে যেহেতু তলদেশ ২০ মিটার খনন করা হয়েছে, ভাটিতেও সেভাবে করা জরুরি। এজন্য ডিজাইন পরিবর্তন করে খনন কাজ করা হচ্ছে। কাজ পরিকল্পনামাফিক এগুচ্ছে। বর্ধিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে।


