‘ব্যাকরণ নয় অকারণ’

ভূমিকা-৩
অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
ফেসবুকে অনেকে বাংলা ভাষা, বানান ইত্যাদি নিয়ে অনেক কিছু জানতে চায়। হতেই পারে জানতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক তাই তো সুকুমার রায় তাঁর ‘বিষম চিন্তা’ কবিতায় লিখেছেন–‘মাথায় কত প্রশ্ন আসো,/ দিচ্ছে না কেউ জবাব তার,/ সবাই বলে মিথ্য বাজে,/ বকিসন্ েআর খবরদার। যেহেতু মানুষের মাথা বিবেক সম্পন্ন মাথা, প্রশ্ন তো আসবেই। জবাবও কেউ না কেউ দেবেই। সবাই বললেই মিথ্যে বাজে হয়ে যাবে কেন ? মানুষের কোনো কিছুই মিথ্যেও নয়, বাজেও নয় কোনোটাই শ্লীল-অশ্লীলও নয়। মানুষ যা করে তার জীবনের জন্যই সমাজের জন্যই করে। বিচার হবে কী দিয়ে ? বিচার হবে সমাজের একটা ‘তন্ত্র’ আছে, তা দিয়ে। এই তন্ত্র কী ? নিয়ম, কানুন, আইন। কে তৈরি করেছে ? মানুষই সমাজের হয়ে সমাজের জন্য নিজের জন্য আইন বা ‘বিধি’ তৈরি করেছে। এটা মেনে সে চলে সমাজ চলে, সমাজকে চালায়। সাধারণ মানুষ এই বিধি বলতেই ঈশ্বরকে বুঝে। ঈশ্বরকে যেমন দেখা যায় না তেমনি বিধিও দেখা যায় না। তাই জীবনে হেরে গিয়েই আর্তচিৎকার দিয়ে বলে– হায় বিধি একি করলে! তার বানানো ‘তন্ত্র’ তাকে যখন বিদ্ধ করে সে তখন নিজেকে পুনর্বিবেচনা করে। এই ‘সমাজ’ আর ‘তন্ত্র’ শব্দ দু’টিকে একশব্দ বানিয়ে দেখুন তো শব্দটা কী হয় ? ‘সমাজতন্ত্র’। হ্যাঁ, এটার নামই সমাজতন্ত্র। আরও পুরনো অতি আদিম অতি প্রাাচীন, যা ছিলো ‘আদিম-সাম্যবাদ’। আদিম গুহা মানব থেকে শুরু হয়ে দিনে দিনে পরিপক্ক হয়েছে। আর তার অনুকরণেই পরবর্তী মানুষেরা নিজেদের জন্য যা দরকার তাই আবিষ্কার করেছে। এভাবে প্রকৃতিকে জয় করে করে নতুন নতুন নিয়ম বানিয়েছে।
ফেসবুকে সবাই যে আমাকেই প্রশ্ন করে তাও না, তবে উত্তর দিলে অবাঞ্ছিত হবে না বুঝেই লিখতে চেষ্টা করি। একজন লিখেছেÑ কেন এবং কেনো এ দুইয়ের পার্থক্য কী ? বুঝিয়ে দিলে উপকৃত হবো। জানি না কী উপকার করতে পারবো বা পারলাম। তবু লিখেছিÑ এ দু’য়ের কোনোই পার্থক্য নেই। শব্দটি হলো কেন, উচ্চারণটি হলো কেনো। নয়তো আপনি আপনার মত করে কেন্ ‘বদ্ধাক্ষর’ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারেন তাই শব্দটি লেখকের মতো করে উচ্চারণ করার জন্য ‘ও’ কার লাগিয়ে ‘মুক্তাক্ষর’ যুক্ত করে দিয়েছেন। তাই কবিতায় বিন্যস্ত শব্দকে ‘অক্ষর’ কেটে আপনি বের করতে পারেন কবি ‘বর্ষা’কে কেন ‘বরষা’ লিখেছেন। এখানে ‘বর্ষা’ দুই অক্ষর, ‘বরষা’ তিন অক্ষরের মাত্রার সাথে ছন্দ মেলাতেই কবি ‘বরষা’ লিখেছেন। মানুষ অতি প্রাচীণ থেকেই ছন্দে চলতে মিত্রক্ষরে বলতে অভ্যস্থ। দেখুন না অতি প্রাচীন গ্রামীণ প্রবচনগুলো কেমন ‘মিত্রাক্ষর’ মেলানো। যেমনÑ‘কাতি মাইশ্যা বাওরে, যাইয়ো না গো হাওরে’।
শুধু তাই নয় ভাষা যেহেতু মানুষ সৃষ্টি করেছে তাই ভাষার একটি সুরও দিয়েছে। তার প্রমাণ পৃথিবীতে এখনো কিছু সুরেলা ভাষা আছে যেগুলি সুর করে উচ্চারণ করতে হয় বা পড়তে হয় যেমন সংস্কৃত, আরবি। অন্যান্য ভাষার যে সুর নেই তা নয়। ধ্বনি মানেই ‘স্বর’ আর স্বরের সাথে স্বর মিলে যেহেতু ‘শব্দ’ গঠন হয় সেহেতু সুরেরও সৃষ্টি হয়। অতি সূক্ষ্ম বিধায় তা অতি শ্রুতিধর না হলে কানে বাজে না। কেউ ‘পান’ বললে ‘কান’ বুঝে। উদাহরণ হলো কবি বা গীতিকার যখন গান লিখেন সুরকার সেটার সুর করেন। এই গানের সুর শব্দগুলির ধ্বনি বা স্বরের চরিত্র বুঝে সুরকারের শ্রুতি গুণে এত হৃদয়-গ্রাহী হয় যে গান শুনে শ্রোতা আপ্লুত হয়। আর সেই গানের কবি বা গীতিকার নিজেও ভাবে নাই যে তার বাছাই করা শব্দগুলির মধ্যে যে এত মধুর সুর লুকিয়ে আছে। তার নিজের ক্ষমতা নেই এমন সুর-সঙ্গতি সম্পন্ন শব্দ বিন্যস্ত করে এমন একটি গান লিখে, যা এমনি এমনিই গান হয়ে যায়। তাই সুরকার ও গীতিকার একই ব্যক্তি হলে সোনায়-সোহাগা মিলন ঘটে। যেমন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-গ্রাম্যবাউল শিল্পীদের গান এজন্যই এত সুমধুর হয়। সুতরাং ভাষা উচ্চারণে ধ্বনিগুলির মধ্যেও সুর লুকিয়ে আছে। শুধু তাই নয় একটা মাত্রাও আছে, আর তা ভাষার অক্ষর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বললে বিশ^াস হবে কিনা জানি না আপনি ‘ক’ ধ্বনিটি যে সুরে উচ্চারণ করেন ‘খ’ ধ্বনিটি একই ‘স্বরে’ উচ্চরণ করেন না। প্রমাণ দিয়ে যদি বলতে হয় দেখবেন–আপনি ‘ক’ ধ্বনিটি যদি সঙ্গীতের ‘সা’ স্বরে উচ্চারণ করে থাকেন ‘খ’ ধ্বনিটা অবশ্যই ‘গা’ বা গান্ধারে উচ্চারণ করেছেন। আঞ্চলিক ভাষায় তা খুবই স্পষ্ট ময়মনসিংহ এলাকার কেউ বলবে- আপনি যা-ই-বা-ই-ন ? সিলেট এলাকার এ কথাটাই বলবে-আপনি যা-ই-ত্তা-য়নি। এটা সুর যন্ত্রে পরিষ্কার দেখানো যাবে। সামনে থাকলে হারমোনিয়াম দিয়ে সাক্ষাত প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিতাম, আপনিও মেনে নিতে বাধ্য হতেন। আপনি বলবেন আপনি সুর বুঝেন না গান গাইতে পারেন না তা ঠিক নয়। ভাষা উচ্চারণ করতে পারে প্রতিটা মানুষই ‘সুরেলা,’ প্রতিটা মানুষই গাইতে জানে। ওস্তাদগণ বলেন বাক্শক্তি যার আছে তারই সুর আছে। সমস্যাটা হয়েছে এখানেইÑ একজন মানুষ কী জানে, কী জানে না, এটাই সে জানে না। ছাত্রদের বেলায়ও এটাই সমস্যা–সে জানে সে কিছুই জানে না। কিন্তু সে যদি নিজেকে অনুসন্ধান করে এটুকু বের করতে পারে যে, সে কী কী জানে না, তাহলে এইটুকু জেনে বা ঠিক করে নিলেই তো হয়। আপনি বলছিলেনÑ আপনি সুর চেনেন না–ধরুন আপনার দরজায় এসে আপনাকে কেউ ডাকছেন। না দেখেই কী করে বলে দিতে পারলেন সে কে। অথবা যে যে ডেকেছে তাদের প্রত্যেকের নাম আলাদা আলাদা বলে দিতে পারলেন কীভাবে ? তাহলে স্বীকার করুন যে আপনিও সুর বুঝেন। মনের অজান্তেই আপনি তা বুঝেন, বুঝতে বাধ্য। কেননা ‘নৃেত্য’র পর আদিম মানুষেরা যা রপ্ত করেছে তা ‘স্বর’ তথা সুর তথা গান বা সঙ্গীত। পৃথিবীতে চৌষট্টিটি কলা বা বিদ্যা আছে। এই চৌষট্টি বিদ্যা বা ‘কলা’র শ্রেষ্ঠ কলা হলো সঙ্গীত। তা এমনি এমনিই হয়ে যায় নাই। এই সঙ্গীতের সাতটি ‘শুদ্ধস্বর’ বা ‘বর্ণ’র সাথে আরও পাঁচটি ‘বিকৃতস্বর’ বা বর্ণসহ বারোটি বর্ণমালার বিদ্যা হলো সঙ্গীত। এই বারোটি ‘বর্ণমালা’ দিয়ে পৃথিবীর সব ভাষার গান গাওয়া যায়। আপনি আপনার বর্ণমালা’ দিয়ে অন্য কোনো ভাষা বলতে বা বুঝাতে পারবেন ? না পারবেন না। কিন্তু সঙ্গীত পারে। সুতরাং প্রকৃষ্ট ‘বর্ণমালা’ সৃষ্টিতে সঙ্গীতই শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি কাব্যের নাম দিয়েছেন ‘কড়ি ও কোমল’। এই নাম বিচারে সাহিত্য বিশারদদের মধ্যে সান্ত¡না হলো জীবনের ‘কঠিন’ আর ‘নরম’ দিকটি বুঝাতেই রবীন্দ্রনাথ এ নাম দিয়েছেন। তাতো ঠিকই আছে, সেটা হলো কবিতার স্থ’ুল-ভাবার্থ কন্তিু সুক্ষ্ম দিকটি কী ? এ পর্যন্ত অনেককে জিজ্ঞেস করেছি। সবাই এরকমই একটা না একটা কিছু বুঝাতে চাইছেন। আপনাকেও দায়িত্ব দিলাম, কাকে দরকার জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। এখন প্রশ্ন কর্তার কথা হলো তাই যদি হবে ‘কঠিন ও নরম’ নাম দিলেই পারতেন। ‘কড়ি’ আনলেন কেন ‘কোমল’ আনলেন কেন? নিশ্চয়ই এর কোনো বিশেষত্ব বা মাহাত্ম্য আছে। তাহলে শুনুন বলি- রবীন্দ্রনাথ যেমন ছিলেন ছন্দ-বিশারদ তেমনই সঙ্গীত বিশারদ। গুরুর কাছে তিনি উচ্চাঙ্গ-সঙ্গীতের মাত্র তিনটি রাগের তালিম নিয়েছিলেন পরে তিনি একটি রাগেরও সৃষ্টি করেছেন। সঙ্গীতের ‘বর্ণমালা’র কথা আগেই বলেছি। সঙ্গীত বিশারদের স্বাক্ষর হিসেবে সঙ্গীতের দু’টি ‘স্বর’র ‘পরিভাষা’ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি কাব্যের নামকরণ করেছেন ‘কড়ি’ ‘কোমল’। ‘কড়ি’, ‘কোমল’ সঙ্গীতের ‘বর্ণমালা’য় বিকৃত পাঁচটি ‘স্বর’র ‘দু’টি স্বর’। এদের বিশেষত্ব হলো একমাত্র ‘মা’ বা ‘মধ্যমা’র ডানদিকে বেড়ে ‘কড়া’ হয়। আর স্বরটি কড়া বা চড়া হয় বিধায়ই হয়তো এই স্বর’টির নাম হয়েছে ‘কড়ি’। বাকি চারটিই ‘কোমল-স্বর’ ‘সা’ এবং ‘মা’ ছাড়া বাকি পাঁচটিতেই নিচের দিকে যায় বা কমে যায়। এখন বঝুন রবীন্দ্রনাথ ‘কড়ি ও কোমল’ দিয়ে কী বুঝিয়েছেন ? বুঝিয়েছেন ‘জীরনের উল্টোপিঠে সবটাই বিকৃত তবে কোনোটা বেশি কোনোটা একটু কম’। যাক, যা বলছিলামÑইংরেজি তার বর্ণমালাকে ছাব্বিশটিতে আনতে পেরেছে। আমার ভাষায় এখনও পঞ্চাশটি। তারও কারণ আছে। বাংলা ভাষার যখন অতি প্রাাচীন যুগ, ইংরেজি ভাষার তখন অত্যাধুনিক যুগ। সুতরাং ভাষা’র বয়স বিচারে সঙ্গীতের তুলনায় ইংরেজি বাংলা বা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার বয়স অতি নগণ্য। ইংরেজি ভাষার বিশেষজ্ঞরাই বলে– ,ি ী, ু এ বর্ণগুলি না থাকলেও চলে তাতে ইংরেজি ‘বর্ণমালা’ এসে যায় তেইশটিতে, আমরা বিভাষীরা দেখি- ম, ল, ু একই ধ্বনি, এখান থেকেও দু’টি বাদ দেওয়া যায়। তখন ইংরেজি ‘বর্ণমালা’ হয়ে যায় একুশটি। তাও তো সঙ্গীতের বারোটির কাছাকাছি আসে না। সুতরাং সঙ্গীত এখনও সর্ব-বয়ষ্ক ভাষা আর এজন্যই শ্রেষ্ঠ ভাষা।
যাক্, আর দীর্ঘ করছি না ধ্বনি উচ্চারণে যার যার কেরামতি দেখানোর একটি গল্প বলেই শেষ করবো। গত লেখায় বলেছি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ লোকও বাংলা শুদ্ধভাষা’য় কথা বলে। পূর্ববঙ্গ থেকে বাবা’র আমলে যাওয়া ক’টি পরিবারের তিন বন্ধু বেড়াতে এসেছে তাদের পুরাতন ভিটায়। এখানেরও সম-সাময়িক ক’জন মিলে নানা কথা নানা বিষয় নিয়ে ক’দিন চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এক পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের একটি ছেলে বললো তোরা তো পূর্ব-বঙ্গের মানুষ ‘স’কে ‘হ’ উচ্চারণ করিস। পূর্ব-বঙ্গের একজন তো ক্ষেপে গিয়ে বললো– কোন্ হালায় কয় ? তাদের একজন বললো এই যে বললে ‘হালা’ ‘শ্যালা’ তো বললিনে। আর একজন বললো–এমন হকলে কয় না। অন্যজন বললো এই যে এখনও ‘হকলে’ বললে ‘সকলে’ তো বলিসনে। পূর্ব-বঙ্গের তৃতীয়জন তেড়ে গিয়ে বললো–এমন সটাৎ সটাৎ হয়ই, তোরা তো একেবারে ক্যালকেশিয়ান হয়ে গেছিস। এই হলো আমাদের ‘ভাষা-চর্চা’র নানা কথা। থাক্, আজ রাখলাম। ধন্যবাদ। তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ইং।