আকরাম উদ্দিন
‘এক এক করে বছর গুণি, এক বছর পর ভাতা পেয়ে মানুষের ঋণ শোধ করি। এবার ভাতাও পাইনি। ঋণও শোধ করতে পারিনি। সারা জীবন দেশ ও জাতির কল্যাণে গান গেয়েছি। এখন বুড়ো হয়েছি। আমার পাশে কেউ নেই। শুধুই একাকী অন্ধকার ঘরে বসে সময় পার করছি।’ এমন আর্তনাতের কথা শোনালেন প্রবীণ সংগীত শিল্পী ও সুরকার ফটিক চন্দ।
তাঁর সাথে আলাপ করে জানা যায়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবছর ১৬ হাজার ৬ শ’ টাকা করে ভাতা পেতেন। ২০১৫ সন পর্যন্ত তিনি ভাতা পেয়েছেন। ২০১৬ সন থেকে আর ভাতা পাচ্ছেন না। কেন হঠাৎ করে এই ভাতা বন্ধ হলো সেটি জানা নেই এই বয়স্ক দুস্থ শিল্পীর। এ প্রসঙ্গে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল শনিবার সন্ধ্যায় দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বললেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এভাবে ফটিক চন্দ সহ আরও কয়েক জনের ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। আমরা বাদ পড়া শিল্পীদের তালিকা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। আশা করা যায় বিষয়টির সমাধান হবে।’ তিনি আরও বললেন, ‘এবার তাঁকে জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে গুণীজন সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মাননা দেয়া হবে।’
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শামছুল আবেদিন বলেন, ‘প্রতিবছরই আমরা তাঁর নাম পাঠাই, এবারও পাঠানো হয়েছিল। কেন ভাতা বন্ধ করা হলো তার ব্যাখ্যাও মন্ত্রণালয় ভালভাবে দিতে পারেনি। তবে তিনি যাতে আবারও ভাতা পান সে চেষ্টা করছি আমি।’
শনিবার দুপুরে এই প্রবীণ শিল্পীর অসুস্থতার খবর শোনে সৌরভ দা ফোন করে শ্রমিক নেতা বাদল দা ও এই প্রতিবেদককে শহরের বিলপাড় এলাকার বাসায় পাঠান। তখন গিয়ে দেখি দুপুরের প্রচন্ড গরমেও গায়ে লেপ জড়িয়ে শুয়ে আছেন তিনি।
ফটিক চন্দ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বয়স ৮২। এক সময়ের মোটা দেহের অধিকারী ফটিক চন্দ এখন হালকা হয়ে গেছেন। শরীর ভেঙ্গে গেছে। দেহের বিভিন্ন স্থানে বয়সের ভাঁজ পড়েছে। তবুও আমাদের দেখে বিছানা থেকে উঠে বসলেন কোনো মতে। তিনি জানালেন, স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন না। ২ বার স্ট্রোক হয়েছে। শ্রবণশক্তি কমে গেছে, শরীর দুর্বল হয়েছে, প্রেসার বেড়েছে, বুকে প্রচন্ড চাপ অনুভব করছেন, মুখে রুচি নেই, কোমরে, হাটুতে এবং পায়ে শক্তি নেই। ২৫ বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন তিনি। শহরের প্রায় সকল অভিজ্ঞ ডাক্তারদের চিকিৎসা নিয়েছেন। দৈনন্দিন ওষুধ খাচ্ছেন। ওষুধ খেয়ে শুধু টিকে আছেন কিন্তু চলতে পারেন না। নিজস্ব কোনো সম্পদও নেই তাঁর। ঘরে স্ত্রী ছায়া রাণী চন্দও অসুস্থ।’
শিল্পী ফটিক চন্দ পাকিস্তান আমলে অন্য গীতিকারের গান গাইতেন এবং সুর করতেন। তিনি তাজুদ আলী পীরের লেখা ৬টি গানের সুর করেছেন। যেমন-‘আমি গোনাগার আল্লা আমি গোনাগার, দিবানিশি ভাবি বসি কেহই নাই আমার।’ তিনি নিজেও গান লিখতেন ও গাইতেন। তাঁর রচিত একাধিক গান ছিল। সংখ্যা বলতে পারেন না। দেশ স্বাধীনের পর বন্যার পানিতে সকল গান হারিয়ে গেছে। এখনও মনে আছে দুই একটি গানের কলিÑ‘কও কও কও গো কন্যা, কও তুমি বুঝাইয়া, কেন তুমি কাঁনতে আছো, নদীর কূলে বইয়া, শ্বাশুড়ি কি দিছে গালি, না ননদীর জ্বালা।’ নিজের লিখা এই একটি গানের কলি বলতে পারলেন তিনি বহু কষ্ট করে।
তিনি শিল্পী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সংগীত শিল্পী ছিলেন। এখন তাঁর নাতিও শিল্পী। তিন জেনারেশন চলছে সংগীত চর্চা করে।
ফটিক চন্দ পরিবারে গানের তালিম নিলেও পরে তালিম নেন দিরাই শ্যামারচরের রথীন্দ্র নাথ চৌধুরী এবং রামকানাই দাসের কাছে। এরপর নেত্রকোনার গোপাল দত্তের কাছে গানের তালিম নেন। পাকিস্তান আমলে ১৭ জেলার গানের শিল্পীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ফটিক চন্দ সিলেট বিভাগে ৩য় স্থান লাভ করেন।
এরপর তিনি সিলেট বেতারে একাধারে প্রায় ২০ বছর গান পরিবেশন করেন। গানের সম্মানীও পেয়েছেন তিনি। বেতার কেন্দ্র ছাড়াও তিনি ঢাকায় এবং আজমিরিগঞ্জে গান পরিবেশন করেন। শহরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর জন্য অনেকটা বাধ্যতামূলক। তিনি শুধু গানই গাইতেন না, তিনি গানের ওস্তাদও ছিলেন। তাঁর কাছে গানের তালিম নিয়ে অনেকেই নাম করেছেন। তাঁর শিষ্য সংগীত পরিচালক মো.আপ্তাব মিয়া, শামীম আহমদ, আভা চক্রবর্তী, রুমা দাস, যতীন্দ্র দাস এরকম অনেকে।
ফটিক চন্দ অশ্রু ভেজা চোখে শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমার শিষ্যরা অনেকেই বাসাতে এসে দেখেছেন। আমি বেশি সহযোগিতা পেয়েছি আপ্তাবের কাছ থেকে। আমি এখন জীবন সায়াহ্নে। আমি একটু সুখ চাই। এই সুখ কে দেবে আমায়।
ওস্তাদ ফটিক চন্দ হয়তো আর বেশি দিন বাঁচবেন না। তাঁর চাওয়া পাওয়ার পরিমাণও বিশাল কিছু নয়। আমরা যদি তার বন্ধ হয়ে যাওয়া ভাতা আবারও চালু করতে পারি তাহলে অসুস্থ ও দুস্থ এই শিল্পীর মুখে একটুখানি হাসি ফুটে উঠবে। এই সামান্য কাজটুকু কি আমরা করতে পারি না?


