ভবনের তালা খুলেনি একযুগ পরেও

বিশেষ প্রতিনিধি ও আবু হানিফ
প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনসহ সকল অবকাঠামো নির্মাণের একযুগ পরেও সরকারের তদারকিতেই যায় নি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের জগদল ২০ শয্যা হাসপাতাল কমপ্লেক্স। ওখানে দেখভাল করার পাহাড়াদারও নেই। ভবনের ছাদ-দেয়ালসবই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সীমানা দেওয়াল নদীগর্ভে চলে গেছে। কমপ্লেক্সে আশপাশের লোকজন গরু নিয়ে রাখেন এখন। দিরাইসহ আশপাশের ৩ উপজেলার ৪০ গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য ২০০৮ সালে বিশ^ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে জগদল ২০ শয্যা হাসপাতাল কমপ্লেক্সের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। অবকাঠামোর উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালে। আর কিছুই হয় নি এই হাসপাতালের।
জগদল গ্রামের বাসিন্দা সাবেক যুগ্ম সচিব মিজানুর রহমান জানান, তিনি যখন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ছিলেন তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মুশারফ হুসেন ছিলেন কুমিল্লা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। মন্ত্রী তাকে পছন্দ করতেন। এক পর্যায়ে তিনি জেনেছিলেন দেশে ২০ শয্যার ২০ টি হাসপাতাল হবে। পরে মন্ত্রীকে অনুরোধ করে তিনি তার গ্রামে একটি হাসপাতাল নির্মাণের ব্যবস্থা করেন এবং তখনকালীন হুইপ (বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা) ফজলুল হক আছপিয়াকে দিয়ে নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করান। ওই অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি আসেন নি। পরে নানা সমস্যা মোকাবেলা করে এই হাসপাতাল কমপ্লেক্স’এর অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। এর কিছুদিনই পরই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত (প্রয়াত জাতীয় নেতা) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে হাসপাতাল কমপ্লেক্সের সকল ভবন উদ্বোধন করলেন। জনবল ও সরঞ্জাম কাঠামোর তখনও অনুমোদন হয় নি। এরপর থেকে প্রায় একযুগ হলেও এটি তালাবদ্ধই আছে। সপ্তাহ্ খানেকের মধ্যেই জনবল ও সরঞ্জাম কাঠামো অনুমোদনের প্রক্রিয়া তিনি শুরু করবেন জানিয়ে বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান
তাকে সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছেন। জনবল ও সরঞ্জাম কাঠামো অনুমোদন হলে হাসপাতালটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে যাবে। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনবল নিয়োগ দিলে এবং সরঞ্জাম সরবরাহ করলে হাসপাতালটি চালু হবে, মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্খার বাস্তবায়ন হবে।
স্থানীয় একাধিক বয়োজ্যেষ্টরা জানান, ২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন মন্ত্রী জাতীয় নেতা (বর্তমানে প্রয়াত) সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা প্রফেসর ডাঃ সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতালের ভবনগুলোর উদ্বোধন করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এতে উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন উপলক্ষে দিরাই উপজেলা হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কয়েকদিন হাসপাতালে সেবা দেয়া হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। উদ্বোধন হলেও চালু করা হয় নি হাসপাতালের আন্ত:বিভাগ ও বহি:বিভাগ।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জিল্লুর রহমান চৌধুরী হাসপাতালটির পদ সৃজনের লক্ষ্যে কাগজপত্র-তথ্যসহ প্রস্তাব প্রেরণের জন্যে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জনকে পত্র দেন। একই বছরের ২৪ এপ্রিল তৎকালীন সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হাসপাতালে নতুন পদ সৃজনসহ ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য পদে জনবল নিয়োগ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিকট ডি.ও লেটার দেন। একই বিষয়ে ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে প্রস্তাব প্রেরণের জন্যে ১১ সেপ্টেম্বর উপসচিব জিল্লুর রহমান চৌধুরী পুনরায় সিভিল সার্জনকে আরেকটি পত্র দেন।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন পরে ৪ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট ও ১ জন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, ১ জন সহকারী সার্জন, ১ জন মেডিকেল টেকনেশিয়ান (ল্যাব), ১ জন ফার্মাসিস্ট ও ৭ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ১ জন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, ১ জন ল্যাব এটেন্ডেন্ট, ২ জন ওয়ার্ড বয়, ১ জন এমএলএসএস, ২ জন আয়া, ১ জন কুক-মশালচী, ১ জন সিকিউরিটি গার্ড ও ১ জন সুইপারের পদ সৃজনের প্রস্তাব দিয়ে উল্লেখ করেন, এতে বছরে আর্থিক ব্যয় হবে ১ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ৪শ ৩৫ টাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী স্বাস্থ্য সচিবের নিকট প্রেরিত পত্রে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও অনুরোধ করেন। কিন্তু রোববার পর্যন্ত এই প্রস্তাব আমলেই নেয়নি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। পদ সৃজন না হওয়ায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনগুলো তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।
জগদল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক হোসেন বললেন, দিরাই উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে পূর্ব দিরাইয়ে জগদলে নির্মিত হাসপাতালটিতে দিরাই, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুর উপজেলার ৪০ টি গ্রামের লোকজন স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারতেন। চারদিকে হাওর বেষ্টিত এলাকাটি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অনুন্নত। হাসপাতাল ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ছে। গ্রীল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সীমানা দেয়াল নদীগর্ভে চলে গেছে। পাহাড়াদার না থাকায় মালামাল চুরি হচ্ছে। হাসপাতালের কমপ্লেক্স গরু-বাছুর ছড়ানোর স্থান গ্রামবাসীর পছন্দের স্থান। প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত জীবিত থাকা অবস্থায় অনেক চেষ্টা করেছেন। আমরাও চেষ্টা করছি, মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রীর কাছেও আমরা গিয়েছি। এখনো কিছুই হয় নি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শিবলি বেগ বললেন, হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণকালীন সময়ে ভুল স্থান নির্ধারণ করা হয়। রতনগঞ্জে হাসপাতালের স্থান হলে সকলের জন্য ভালো হত। জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত জীবিত থাকতে চেষ্টা হয়েছে। এখনো স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, ওই সময়ে নির্মিত সিলেটের শাহ্পরানে একটি ২০ শয্যার হাসপাতালও এভাবেই ছিল, এখন সেটি করোনা রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। জগদল হাসপাতালের ক্ষেত্রে সেটিও হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামসুদ্দিন আহমদ জানালেন, করোনার আগে এই ২০ শয্যার হাসপাতাল সরেজমিনে দেখে কিছু পরিস্কার করে একজন ডাক্তার দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। করোনার জন্য পরে সেটিও হয়নি। জনবল পর্যাপ্ত না থাকায় এখন ওখানে একজন প্রহরীও দেওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা বলেন, হাসপাতাল ভবনটি এখনো সরকারের তদারকিতেই যায়নি। আমি এই বিষয়ে কিছু কাজ শুরু করেছিলাম। করোনার জন্য এই কাজ পিছিয়েছে। মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সরকারের তদারকিতে হাসপাতালটি নেবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো।