ভাইবে রাধারমণ

ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য
খ্রিস্টিয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে বাংলাদেশ সুফিবাদ প্রচারিত হতে থাকলেও সিলেট প্রচারিত হয় চতুর্দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হযরত শাহজালাল ও তাঁর সঙ্গীদের দ্বারা। সুফিবাদ এমন এক ধরনের মরমীবাদ, যার মধ্যে বৈরাগ্যবাদ ও সর্বেশ্বরবাদের অপূর্ব সমন্বয় দৃশ্যমান। আরবদের নিকট অগ্নি উপাসক পারসিকগণ পরাজিত হলেও তাদের মধ্যে যে নৈরাশ্যবাদের সূচনা হয়, তাই ক্রমশ এঁদেরে বৈরাগ্যবাদের দিকে ধাবিত করে। বৈরাগ্যবাদ এবং নৈরাশ্যবাদের সমন্বয়ে ক্রমে এখানে সৃষ্টি হয় সর্বেশ^রবাদী চেতনা আর এই চেতনাগুলোই সমন্বিত হয়ে এক সময় তৈরী করে নতুন মরমীবাদ।
সুফিগণের নিকট ঈশ্বর পরমাত্মা, সৃষ্টি জীবাত্মা। জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে একাকার হয়ে যেতে আগ্রহী বলে তাঁদের সংগীত জুড়ে রয়েছে প্রেম ও ভক্তি। বিনোদন নয়, সংগীতের মাধ্যমে তারা আসলে স্রষ্টার আরাধনা করতেন। বাদ্যযন্ত্র সহযোগেই তারা তাঁদের সাধনা সংগীত পরিবেশন করতেন স্রষ্টার উদ্দেশ্যে।
সুফিবাদের অনুরূপ না হলেও এক ধরনের ভক্তিবাদ বাংলায়ও প্রচলিত ছিল। বিষ্ণুুর উপসাকগণ ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমে তাঁর উপাসনা করতেন। তবে বাংলায় প্রকৃত ভক্তিবাদ সৃষ্টি হয় চৈতন্যের জম্মের পর, সুফিবাদের প্রভাবে। জয়দেব-চণ্ডীদাসের রাধা, কৃষ্ণ, চৈতন্যের হাতে পড়ে জীবাত্মা পরমাত্মায় রূপান্তরিত হন। সুফিমতের আশিক-মাশুক মূর্ত হয়ে উঠেন কৃষ্ণ রাধার শরীরে।
চৈতন্যের পৈতৃক নিবাস সিলেট । প্রধান প্রধান অনুসারী কিংবা শিষ্যগণও সিলেটেরই অধিবাসী ছিলেন বিধায় সিলেট চৈতন্য প্রবর্তিত নৈব্য-বৈষ্ণববাদ সহজেই প্রচলিত হয়। নব্য বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদে কৃষ্ণ পরমাত্মা, রাধা জীবাত্মা। পরমাত্মার সাথে জীবত্মার প্রেমের সর্ম্পক বিধায় এখানে কৃষ্ণ প্রেমিক, রাধা প্রেমিকা। কৃষ্ণের প্রতি রাধার যে আকর্ষণ, তা স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির আকর্ষণ। সৃষ্টি স্রষ্টার সাথে মিশে বিলীন হয়ে যেতে চায়।  বৈষ্ণব ও সুফি সাধকগণ এ কারণে   গৃহত্যাগ করেন। পার্থিব সব কিছু পরিত্যাগ করে তারা স্রষ্টার প্রেমে হন মগ্ন।
সুফি ও বৈষ্ণব ধারার মধ্যে যথেষ্ট মিল থাকলেও অমিলও ছিল প্রচুর। একারণে দুদল সাধক, দুটি ভিন্ন ধারাতেই ¯্রষ্টাকে অনুসন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু পরবর্তীতে এদের মধ্যেও সমন্বয় ঘটে। সুফি ও বৈষ্ণব মতবাদ মিলে তৈরী হয় ভিন্ন আরেকটি নতুন মরমীবাদ। বলাবাহুল্য, এরাই বাউল।
১৮৩৪ সনে জন্ম নেয়া রাধারমণ দত্ত বৈষ্ণব মতেই দীক্ষিত ছিলেন। শ্রীযুক্ত রঘুনাথ গোস্বামী ছিলেন তার দীক্ষা গুরু। তবে বিভিন্ন ভাব মিশ্রণের কারণে এই বৈষ্ণব মতবাদ ও পূর্ববর্তী সব বৈষ্ণব মতবাদ অপেক্ষা ভিন্নরূপ ধারণ করে। সমন্বিত এই মতের নাম সহজিয়া বৈষ্ণব। বাউল এবং সুফি মতের যথেষ্ট প্রভাব একারণেই তার গানে প্রত্যক্ষ হয়।
সহজিয়া মতবাদ প্রকৃত অর্থেই সহজ। শাস্ত্রের নিয়মনীতি এখানেই একদমই শিথিল। গুরু অত্যন্ত সহজ ভাবে তার শিষ্যকে আরাধনার পরার্মশ প্রদান করেন। সিদ্ধি লাভ হয় এতে সহজে, মানুষের উপকারেও তারা আসতে পারেন অল্প সময়ে।
সহজ সাধনারও প্রথম স্তরেই অবশ্য গৃহত্যাগ করতে হয়। রক্ত সম্পর্কীয়দের সাথে সর্ম্পক ত্যাগ করেই সাধন স্তরে ঘটে পদার্পণ।
রাধারমণও তাই করেছিলেন। তবে তিনি পথিক বা অরণ্যবাসী হন নি। নলুয়ার হাওর সংলগ্ন একটি স্থানে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে এখানেই ঈশ^র সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন।
মরমী সাধনায় গুরু একজন অপরিহার্য ব্যক্তি। বাউল, বৈষ্ণব,  সুফি সব ধরাতেই গুরুর শরণাপন্ন হতে হয়। তার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেই শুরু হয় নতুন পথ চলা। দীক্ষা গ্রহণের সময় অধিকাংশ শিষ্যের নামের পরিবর্তন ঘটে। নতুন নাম নিয়ে শুরু হয় নতুন পথ চলা। তবে রাধারমণের নামে কোনো পরিবর্তন আসার তথ্য পরিলক্ষিত হয় না। পুরাতন নামে এবং গতানুগতিক আরাধনা পদ্ধতির বাইরেই সম্পন্ন হয়েছিল তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন।
রাধারমণ দত্তের সংগীত বিচিত্র বিষয়ে পরিপূর্ণ। প্রার্থনা তো ছিলই, আত্মতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব এবং পরমাত্মা তত্ত্ব বিষয়ক  অসংখ্য সংগীত তিনি রচনা করেছেন। সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মের তাত্ত্বিক বিষয় অবলম্বনে রচিত তার দ্বি শতাধিক সংগীত সিলেট তো বটেই, সমগ্র বাংলার বৈষ্ণব সংগীত ভান্ডারের অমূল্য সম্পদ। তবে তাঁর রচিত মোট সংগীতের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তন্মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ব্যতিক্রম হচ্ছে ধামাইল গান। রাধা-কৃষ্ণের-প্রেম-বিরহ, পাওয়া-না পাওয়া, তথা আনন্দ ব্যথার চিত্র উপস্থাপন করেছেন।
সহজিয়া ধারার সাধকগণ অসাম্প্রদায়িক বিধায়, রাধারমণের গানগুলোও অসাম্প্রদায়িক রূপ লাভ করছে। একটি বিশেষ মতের উদ্দেশ্য রচিত হওয়া সত্ত্বেও সর্ব মতের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম তাঁর গানগুলো। শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো সাম্প্রদায়িক চিন্তা ছিল না মনে। আল্লাহ ঈশ^রে যেমন তিনি পার্থক্য দেখেন নি, গুরু এবং মুর্শিদ শব্দের পার্থক্যও তাঁর কাছে নিরর্থক।
রাধারমণ বলেছেন- মুর্শিদ বলি নৌকা ছাড়ো তুফান দেখি ভয় করিও না,
মুর্শিদ নামে ভাসালে তরী অকূলে ডুবিবে না।
সহজিয়া সাধনায় দেহ একটি গুরুত্ব বিষয়। দেহ ও মনকে ভাল ভাবে চিনে নেওয়ার পর তার চাহিদাকে সংযমের দেয়াল দিয়ে সংযত করতে হয়। দেহ মনের চাহিদা অসীম। একে একটি পর্যায়ে সংযত করতে না পারলে সমাজের জন্য ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। দেহ ও মনের সাধনার রূপকে এই সাধকগণ ভক্ত শিষ্যদের মূলত সংযত জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তুলতেন।
রাধারমণ বলেছেন-
মন তোর বোকা চাষী ত্রিজগতে আর দেখিনা,
দেহের জমি পতিত রইলো চাষাবাদ তো করলি না।
তিনি আরো বলেন-
ও মন থাকো রে সাবধানে
রং মহল লুটি নেয় রিপু ছয় জনে।
দেহের বিচিত্র ও সুদৃঢ় গঠন তাকে বিস্মিত করেছিল বলেই বলেছিলেন-
আমার দেহ তরী কে করলো গঠন
মেস্তুরি কে চিন নি রে মন।
প্রচুর রূপক শব্দের ব্যবহার ছিল রাধারমণের গানে। এ গুলোর প্রকৃত অর্থ অনেকের কাছেই এক সময় অজানা ছিল। শিয্য ছাড়া কেউ তা অনুবাধন করতে পারতো না। এখানো কিছু কিছু শব্দ আমাদের কাছে রহস্যময় হয়ে দাঁড়ায়।
দেহতত্ত্ব বিষয়ক একটি গানে তিনি বলেছেন-
খাসমহলে বসত করি
বে-মেয়াদি পাট্টাধারী
একুশ হাজার ছয়শত মাল গুজারি
তিলে পলে আদায় করে।
সহজিয়া সাধকগণ মানুষকে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশী। তাঁদের মতে, অদৃশ্য পরমাত্মার অংশ প্রাণি আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। মানুষই ¯্রষ্টার সব চেয়ে প্রিয় বলে তাঁকে সব চেয়ে সুন্দর হিসাবে তৈরী করেছেন বিধাতা। একারণে মানুষের মধ্যেই ¯্রষ্টার অস্তিত্ব প্রবল মনে করেন সব সহজিয়া সাধকরা। মানুষকে ভজলেই ¯্রষ্টার আরাধনা হবে, এই বিশ^াস থেকে মানুষের দেহ ও মন নিয়ে অনুসন্ধিৎসু হন এই সাধকগণ। তারপর নানা রূপক সংকেতের মাধ্যমে তার শিষ্যের কাছে পৌঁছে দেন গবেষণাজাত ফলাফল।
রাধারমণ মনে করেন, তাঁর মন, ঘরের মধ্যে ঘর বেঁধেছে। তাঁর মতে ঘরে আছে বাহান্ন গলি তিপ্পান্ন বাজার, কিন্তু মূল কোটায় যে মহাজন বসে আছে, সে অধরা। ‘জায়গা হয় না ঘরের মাঝে, অথচ সে থাকে না ঘর ছাড়া’।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈষ্ণব পদাবলীর অনুসরণ রাধারমণ দত্তের গানে পরিলক্ষিত হয়। কৃষ্ণ লীলার গোষ্ঠ, রাগ, অনুরাগ, আক্ষেপানুরাগ, মান, বিরহ, মিলন, অভিসার প্রভৃতি বিষয়ে প্রচুর সংগীত তিনি রচনা করেছেন। এসব সংগীতের ভাষা এবং সুর অবশ্য মৌলিক এবং নিঃসন্দেহে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল।
রাধারমণের বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত গানের সুরে স্থানীয় লোকসুর এবং পদাবলীর সুরের মিশ্রণ ঘটায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী শ্রুতিমধুর মৌলিক সুরের আর্বিভাব ঘটে। এই সুর শ্রবণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মনে একটি বিরহ ভাবের উদয় হয়। বলাবাহুল্য এই বিরহ ভাবই সাধারণ ভক্ত শ্রোতাকে আধ্যাত্ম অঙ্গনে নিবিষ্ট করে রাখে। প্রসঙ্গত উল্লেখ যে, রাধারমণের পরে জন্ম নেয়া দেওয়ান হাসন রাজাকে যেমন বিরহেও উচ্ছ্বসিত দেখা যায়, রাধারমণ সেখানে ঠিক উল্টো। তার প্রেমের গানও বিরহের ভারে ভারাক্রান্ত।
রাধারমণ অবশ্য দ্রুত লয়ের আনন্দ উল্লাস মুখর সংগীতও সৃষ্টি করেছেন। এসব সংগীতে রাধা-কৃষ্ণের উল্লেখ থাকলেও মোটেই তা আধ্যাত্মরস সমৃদ্ধ সংগীত নয়। মূলতঃ লোক সমাজের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রচিত এই গানগুলোর সরস বাক্য ও চটুল সুরের মাধ্যমে নির্মিত। বাংলা গানের ক্ষেত্রে এর সুরই কেবল ব্যতিক্রম নয়, পরিবেশনরীতিও স্বতন্ত্র। রাধারমণকে ধামাইল নামক বিশিষ্ট এই নৃত্য সংগীতের জনক বলেন অনেকে। যারা এতে সন্দেহ পোষণ করেন, তাঁরা তাঁকে এই সংগীতের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা বলে দাবি করেন।
ধামাইল এমন এক ধরনের সংগীত, যা একদল মহিলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত দ্বারা তালি প্রদান পূর্বক নানা ভঙ্গিতে বৃত্তাকার অথবা উপ বৃত্তাকার ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করেন। সচরাচর বিয়ের অনুষ্ঠানে সংগীতটি পরিবেশন হলেও শিশু-সন্তানের ব্রত, অন্নপ্রাশন, ব্রাহ্মণ সন্তানের উপনয়ন প্রভৃতি আনন্দময় উৎসবেও তা পরিবেশিত হয়। পরিবেশনের প্রথম দিকে গানটির লয় ধীর থাকে। পরিবেশনকারীগণ হাত দ্বারা তালি প্রদান পূর্বক বৃত্তাকার দাঁড়িয়ে প্রথমে ডানে পাশে দু কদম এগিয়ে গানের একটি পংক্তি পরিবেশন করেন। পরে বাঁ পাশে এক কদম পিছিয়ে আরেকটি পঙক্তি করেন উপস্থাপন। এতে ধীর গতিতে বৃত্তটি ডান পাশে অগ্রসর হতে থাকে। গানের একদম শেষ পর্যায়ে তালে পরির্বতন ঘটে এবং খুব দ্রুত লয়ে ঘটে তার পরিসমাপ্তি।
গীত নামে পরিচিত আরো একধরণের সংগীত রাধারমণ সৃষ্টি করেছেন, যা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানেই পরিবেশিত হতে দেখা যায়। অন্যান্য সংগীতের সাথে এর পার্থক্য হলো এই যে, এধরনের সংগীতের সুর অপেক্ষাকৃত ধীর লয়ের এবং কথাগুলো টেনে টেনে গাইতে হয়। ধামাইল সংগীতের মতোই প্রথমে দলনেত্রী প্রথম-পংক্তি উচ্চারণ করেন,পরে অন্যান্যরা সমবেত ভাবে তাতে কন্ঠ মেলান। এই গানে কোনো বাদ্যযন্ত্র তো ব্যবহৃত হয়ই না, হাত দ্বারা ও কেউ তালি প্রদান করেন না।
রাধারমণের গানের ভাষাও আকর্ষণীয়। তৎসম এবং খাঁটি বাংলা শব্দের সঙ্গে স্থানীয় আঞ্চলিক শব্দের অসাধারণ সমন্বয়ে অপূর্ব ভাষাশৈলী তৈরী করেছেন তিনি। ভারি সুর এবং নান্দনিক গঠনশৈলীর কারণে অসামান্য শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে তার গানগুলো। কোনো কন্ঠশিল্পী যখন গেয়ে ওঠেন-
ভ্রমর কইও গিয়া-
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে
অঙ্গ যায় জ¦লিয়া।
তখন গানের সুর এবং শিল্পীর কন্ঠশৈলীর সঙ্গে সংগীতের ভাষাও আমাদের চমৎকৃত করে তোলে।
রাধারমণ একটি শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা রাধামাধব দত্ত একজন কবি ছিলেন বলেন জানা যায়। একটি শিক্ষিত পরিবারে জন্ম নেয়া কবিকে লোক কবি বলা কতটুকু যৌক্তিক এ প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই আসে। কিন্তু রাধারমণ দত্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কোন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন কি না এ বিষয়ে পরিষ্কার নয়। তার আচরিত ধর্ম এবং রচিত সাহিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চিহ্ন বহন করে না। গানের ভাষা, সুর, গঠনরীতি এবং দর্শন সর্ম্পূণ লোকআঙ্গিকে গড়ে উঠায় অধিকাংশ গবেষক তাঁকে লোককবি বলতেই আগ্রহী। আমরাও এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারি না।
মধ্যযুগে বাংলার কবিগণ নিজের নাম সংগীতের শেষাংশে উল্লেখ করতেন। লোককবিগণ এ ক্ষেত্রে পাগল, বাউল, অধম, দীন, প্রভৃতি শব্দ সঙ্গে করতেন ব্যবহার। কিন্তু রাধারমণ দত্ত এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম।
ভাইবে বা ভেবে শব্দ তার অভিনব আবিষ্কার। প্রত্যেকটি গানের শেষে এই শব্দ ব্যবহার করে তিনি সব লোককবি থেকে নিজেকে করেছেন স্বতন্ত্র। তাঁর এই স¦াতন্ত্রিক গুণাবলি নি:সন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য নি:সন্দেহে গৌরবের।
সিলেট অঞ্চল বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে খানিকাটা ভিন্ন, সুনামগঞ্জ এর মধ্যে আবার অধিকতর ভিন্ন। সমুদ্র সদৃশ হাওর এতদঞ্চলের মানুষের মনকে অপেক্ষাকৃত অধিক আবেগপ্রবণ করে তোলায় এখানকার মানুষ অধিকতর সামাজিক এবং উৎসব প্রিয়। নানা উৎসব অনুষ্ঠান উপলক্ষে সংগীত সৃষ্টি হওয়ার সুযোগও একারণেই এখানে বেশী তৈরী হয়।
সিলেট বিভাগে সম্মিলিত হয়েছে সুফি ও বৈষ্ণব মতবাদ। এখানে নাথ এবং বৌদ্ধ মতবাদের ও প্রভাব একসময় ছিল। যেখানে সুফি ও বৈষ্ণব মতের উৎকৃষ্ট মিলন ঘটেছে, সেখানে বাউল, বাওলা, সহজিয়া প্রভৃতি মতবাদের হয়েছে উৎপত্তি। কুষ্টিয়া এবং সিলেট এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। লালন, হাসন, দুদ্দু এর মতো প্রতিভাবান কবিদের কথাও অবশ্য সঙ্গত কারণেই স্মরণ করতে হয়। উপযুক্ত পরিবেশে এবং যোগ্য ব্যক্তির সমন্বয় যেখানে ঘটে, সেখানেই উন্নতমানের সাহিত্য কিংবা সংগীত লাভ করে উৎপত্তি। রাধারমণ ছিলেন একজন অসামান্য প্রতিভাবান পুরুষ, কাছে পেয়েছিলেন উপযুক্ত মনোরম পরিবেশ। প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিভা এবং উপযুক্ত পরিবেশের সমন্বয়ের কারণে সুনামগঞ্জ তথা বাংলা লাভ করতে পেরেছে রাধারমণ দত্তের মত একজন অসাধারণ, কালজয়ী সংগীত স্রষ্ট্রাকে।
লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।