বিশেষ প্রতিনিধি
যেন ‘ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো’। ধর্মপাশার জয়শ্রী ইউনিয়নের বিল্লালপুরের বর্গাচাষী মো. শফিকুল ইসলাম ও খোদেজা বেগমের ঘরে এই আলো ঝলমল করছে। তাঁর তিন ছেলের এক ছেলে জাহিদ এবার মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। ইতিমধ্যে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে সে। আরেক ছেলে মো. মুনসুর আলম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ (মেধাক্রম ২২০) পেয়েছে। বড় ছেলে মো. আশরাফুজ্জামান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির (মেধাক্রম ৬৯৫) সুযোগ পেয়েছে। শফিকুল-খোদেজা দম্পতির মোট ছয় সন্তান। অন্য তিনজন এদের ছোট। ছোটরাও মেধায় কম যায় না। ছোট তিন জনের দুই জন জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিচ্ছে, অন্য সন্তানটি প্রাথমিক সমাপণী পরীক্ষা দিবে।
বর্গাচাষী মো. শফিকুল ইসলামের নিজের কোন জমি নেই। স্ত্রী খোদেজা বেগম এবং নিজের স্কুল- কলেজ পড়–য়া সন্তানদের নিয়েই অন্যের জমি চাষ করে ৬ সন্তানের (৫ ছেলে ও ১ মেয়ে) খাবার যোগান তিনি।
গত বোরো মৌসুমে ৪ একর জমি বর্গা করেছিলেন সবটুকুই পানিতে ডুবেছে। বেকায়দায় পড়ে ভাতিজা কামাল মিয়ার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম।
শফিকুল ইসলাম জানালেন,‘ঋণ দেবার সময় ভাতিজা কামাল মিয়া বলেছেন, এই টাকা তোমার শোধ করতে হবে না। তোমার সন্তানরা যদি কোনদিন ভাল কিছু করে, তারা শোধ করতে চাইলে করবে, না হয় না করবে। সন্তানদের সেটি জানিয়েছি আমি।’
শফিকুল ইসলামের ৬ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছেলে আশরাফুজ্জামান, দ্বিতীয় মো. জাহিদ হাসান, তৃতীয় মো. মুনসুর আলম, চতুর্থ মেয়ে শাফলা আক্তার, পঞ্চম মো. আলমগীর হোসেন এবং সবার ছোট মো. জাহাঙ্গীর আলম। ৬ সন্তানই মেধাবী। জয়শ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আশরাফুজ্জামান, জাহিদ হাসান এবং মুনসুর আলম উত্তীর্ণ হবার পর মোহনগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জাহিদ বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং আশরাফুজ্জামান বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫ এবং মো. মুনসুর আলম জয়শ্রী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ ৪.৪২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এইচএসসিতে আশরাফ সিলেটের মদন মোহন কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৪.৪৩, জাহিদ সিলেট এমসি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ এবং মুনসুর সিলেট সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৪.৯২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।
জাহিদের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনার সকল ব্যয়ভার দেখাশুনা করেছেন, তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকীর বড় ভাই মাজাহারুল আলম সিদ্দিকী। সিলেটে পড়াশুনার সময় তিনভাই একসঙ্গে ম্যাচে ওঠে এবং তিনজনেই টিউশনি করে পড়াশুনা করে।
জাহিদ হাসান জানায়, মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ হবার পর স্থানীয় পত্রিকায় তাকে নিয়ে লেখালেখি হওয়ায়- ভর্তি এবং পড়াশুনার খরচ চালাতে অনেকেই সহায়তা তুলে দিয়েছেন। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম, মৌলভী বাজারের শ্রীমঙ্গল সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান, পুলিশ হেড কোয়ার্টারের সহকারী পুলিশ সুপার (হাইওয়ে) মাহবুবুজ্জামান সরকার ফিরোজ, সুনামগঞ্জের সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, জামালগঞ্জের ফেনারবাঁকের শশাংক তালুকদার, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ডাক্তার অঙ্কুর তালুকদার সহায়তা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৫১ হাজার টাকা সহযোগিতা পান জাহিদ। এই টাকা থেকে জাহিদ অন্য দুই ভাইকে বিভিন্ন স্থানে ভর্তি পরীক্ষা দেবার খরচের টাকাও যুগিয়েছে।
জাহিদ হাসান বললো,‘আমি হবিগঞ্জ মেডিকেলে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু আমার সিলেটের দুটি ছাত্রকে কথা দেওয়া ছিল, আরও দুই মাস পড়াব, এজন্য তাঁদের পড়াতে হয়। পরে হবিগঞ্জে গিয়ে টিউশনি করবো, পড়াশুনাও করবো।’ জাহিদ জানালো, আমার অন্য ভাইয়েরাও তাই করবে।
বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন,‘আমার সন্তানদের জন্য দোয়া করবেন, আমি ওদের কোন সহায়তা করতে পারিনি, বরঞ্চ ওরা মাঝে-মধ্যে আমাকে টাকা পাঠিয়ে সংসারের খরচ চালাতে সহায়তা করে।’


