ভাটির লোকায়ত সংস্কৃতিকে টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
ভাটির বাঙালি সংস্কৃতিকে টুঁটি চেপে ধরতে চাচ্ছে একটি পক্ষ। এরা একসময়ের অসাম্প্রদায়িক ভাটি অঞ্চলকে ক্রমেই জাতপাতে বিভক্ত করে দিতে চাইছে।
প্রখ্যাত বাউল শাহ্ আব্দুল করিম ভাটির চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘হিন্দু মুসলমান মিলে গ্রামে করি বাস, গান বাজনার প্রচলন ছিল বারোমাস, যাত্রাগান কবিগান সদানন্দ মনে, হিন্দু বাড়িতে গাইত পূজাপার্বনে, মুসলমান বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ দিত, গেলে পরে মনে প্রাণে সেবা যতœ নিত।’ এসব ঐতিহ্যকে অতীত করে দেবার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী। এরা বাউল আসর, মেলা এসব ঐতিহ্যকে হতে দিচ্ছে না ভাটি অঞ্চলে।
শাল্লা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুশ শহীদ বললেন, আটগাঁওয়ে ৮ গ্রামের মেলা হতো, লাখো মানুষের সমাগম হতো। এই মেলা এবং পাশের শর্মা মেলা মাইকে ঘোষণা দিয়ে গেল চৈত্র মাসে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে একটি পক্ষ। কয়েক’শ বছরের ঐতিহ্য এই মেলাকে বলা হয়েছে, হিন্দুদের সংস্কৃতি, এখানে মুসলমানরা যাওয়া ঠিক হবে না। মেলা এখন থেকে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হলো। আব্দুশ শহীদ জানান, আটগাঁওয়ের রাহুতলার মেলা বন্ধের সময় বলা হয়েছে মেলায় জুয়া খেলা হয়। এজন্য মেলা বন্ধ থাকবে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেছিলেন জুয়া বন্ধ করার উদ্যোগ নেই আমরা, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেলা বন্ধ করা ঠিক হবে না। তাদের কথা শুনেনি উগ্রবাদীরা। তারা মেলা বন্ধ করে দিয়েছে। মেলা বন্ধ করতে যারা উস্কানী দিয়েছে। এরাই গেল ১৭ মার্চ নোয়াগাঁওয়ের ঘটনার আগে মাইকে উস্কানী দিয়েছে।
বাউল শাহ আব্দুল করিমের ভাবশিষ্য বাউল আব্দুর রহমান বললেন, প্রকৃতির উদারতায় ভাটির মানুষ সংস্কৃতিমনা, অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু একটি পক্ষ এরমধ্যে বিভক্তি টেনে দিতে চায়। তারা আমার বাড়িতে (আজমিরিগঞ্জের জলসুখায়) বাউল আসর করতে বাধা দিয়েছে। ২০১৯ সালে তিনবার বাউল আসরের তারিখ করেছি। তিনবারই পাশেই মাহ্ফিলের ডাক দিয়েছে তারা। তৃতীয়বারে এলাকাবাসী মধ্যস্ততা করে রাত ১১ টা পর্যন্ত মাহ্ফিল করার পর, আমাদের বাউল আসর রাত ১২ টায় শুরু হয়েছে। ২০২০ সালে বাউল আসরের আগের দিন মাইকে বাউল আসর ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এলাকাবাসীকে উস্কানী দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লোকজন তাদের উস্কানী আমলে নেয় নি।
গেল বছরের ১৭ মে বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের ভাবশিষ্য রণেশ ঠাকুরের গানের আসরঘরটি পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এই ঘরটিতে রণেশ ঠাকুর না থাকলেও তাঁর কিছু বাদ্যযন্ত্র ও গানের খাতা ছিল। স্থানীয় সাংস্কৃতিকর্মীরা দাবি করেছেন, এ ঘটনা পরিকল্পিত ছিল। যারা নানা সময়ে শাহ আব্দুল করিমকে গানের চর্চায় বাধা দিয়েছে, তারাই রণেশ ঠাকুরের গানের আসরঘরে আগুন দিয়েছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাহমুদ সেলিম বললেন, যশোর, নেত্রকোনা, পহেলা বৈশাখের বোমা হামলা, ময়মনসিংহের প্রেক্ষাগৃহে, ফরিদপুরে বাউলদের নিগৃহিত করা নোয়াগাঁওয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা সবই একই গোষ্ঠীর কাজ। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। সংস্কৃতি রক্ষার জন্যই স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছে। আমাদের আকাক্সক্ষা বিনা বাধায় সংস্কৃতি বিকশিত হবে। ১৯৭৫’এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাঙালি সংস্কৃতির প্রহরিকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর থেকে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ এবং বিস্তার ঘটানো হয়। সকলে মিলেই একে রুখে দাঁড়াতে হবে।