ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) নৃত্যপর বিনোদিনী বিজ্ঞাপনবনিতার মতো সগৌরবে কেবল ঝলসায়।
অপরদিকে সুন্দরী সুরমা অনাব্যতার শিকার হয়ে অতীতের সেই নাফানীমত্ত প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়েছে বহুলাংশে, তার যৌবনের উদ্ভিন্ন উচ্ছলতা আর আগের মতোন ততোটা নেই, তার তীরে কংক্রিটের সমারোহ যতোটা নিষ্প্রাণ পাথুরে স্তূপ তৈরি করেছে তার অববাহিকায় সবুজস্নিগ্ধ ঝোপের ঝাঁকড়া ততোটাই কমেছে, বরং এখন নেই বললেই চলে। আর বুলবুলি এখন বিপন্ন প্রজাতির পাখি, কোনও এক ঝোপের আড়ালে বসে আপন খেয়ালে তোলা তার সুরের ঝংকার অনুভব করা কারও পক্ষে দিবাস্বপ্নেও সম্ভব নয়। স্বপাদদেশে বিস্তৃত শাড়ির আঁচলটা যে বিছিয়ে দেয়, সে-পাহাড়টা সেই কবে হাতছাড়া, সাতচল্লিশের দেশভাগের নির্মম রাজনীতিক কুঠার সুনামগঞ্জের মানচিত্র থেকে সে-পাহাড়কে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। মোহাম্মদ সাদিক কবিতায় কবিতায় কেবলি সেই সরোজিনী নাইডু বর্ণিত সুন্দরী সুনামগঞ্জের ঘরকালজিক (ঘরকাতুরে+নস্টালজিক, স্মৃতিজাগানিক অথবা নস্টালজিক) কবি। কালে কালে চারপাশের খালি জলা-জায়গা বা ফসলি খেত যাই হোক, লোকেরা দখল করে নিয়ে বাসাবাড়ি তোলেছে ক্রমে ক্রমে। নতুনপাড়ার দক্ষিণে জাওয়ার হাওরের জটরের দিকে আগ্রাসী শহর ক্রমাগত বর্ধিত হচ্ছে। কবি মুতাসিম আলী একবার তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন, গ্রাম্য বুর্জোয়ারা নাকি ক্রমে দখল করে নিচ্ছে শহরের জমি আর চারপাশে গজাচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি।
মনে পড়ে ষোলঘর পাউবো’র (ওয়াপদার) উত্তরের, বোরো ক্ষেতের মাঠে পুকুর কেটে ভিটা জাগিয়ে তাতে তোলা ছনের দু’চালায় যখন থাকতাম তখন বাসার পূর্বদিকে সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে উত্তর দিকে মুহম্মদপুরে প্রলম্বিত রাস্তার পূর্ব-পশ্চিম দু’পাশেই শীতবসন্তের মৌসুমে উদ্ভাসিত সবুজে সবুজ বোরো ক্ষেতের বিস্তৃত মাঠ, সে মাঠ বর্ষায় জলে থৈথৈ, দু’চোখের অবারিত দৃষ্টিতে স্বপ্নরং ছায়া ফেলতো দূরদিগন্তের নীলনোয়া আসমান। হাওয়া দিলে খোলা হাওরের জলে ঢেউ খেলতো, এখন সেখানে বহুতল বাসাবাড়ি-দালানের বিপল সমারোহ, কেবল কঠোর কংক্রিট, পাষাণের বাহারি প্রস্ফোটন। এই প্রস্ফোটনের মাজেজা একটাই, জনস্ফীতির কারণে বসতিস্ফীতির বহর কেবল বাড়ছে শহরবন্দরের চারপাশে। সুনামগঞ্জের সর্বত্র, পাড়ায় পাড়ায় অলিতে গলিতে, নতুন নতুন বাড়ি-দোকানঘর উঠছে আর বাংলাসহ বাংরেজি (বাংলা+ইংরেজি), আররেজি (আরবি+ইংরেজি) ইত্যাদি খিচুড়িভাষার অপূর্ব সব নামফলক কিংবা নামপাটা লাগছে কোঠাগুলোর চাঁদিতে কিংবা গায়েগতরে ও সেই সঙ্গে বাসাবাড়িগুলোর দেউড়িতে বা দেওয়ালের কোথাও নাম লিখা হচ্ছে, তাতে বাংলা নাম কালেভদ্রে দুয়েকটি দৃষ্টিগোচর হয়। দেখেশুনে যে-কারও মনে হতেই পারে, বাংলামুল্লুকের বাঙালি মুসলমান নাম রাখতে গিয়ে বাংলা শব্দভা-ারের ঝাঁপি বন্ধ রেখে বরাবরের মতো পরভাষার (আরবি-ইংরেজি) শব্দঝুলিতে হস্ত প্রবিষ্ট করে প্রাতিস্বিক হাত টানের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিকতার অবসানের পর পরোক্ষ ঔপনিবেশিকতার প্রকরণে পাশ্চাত্য এখনও প্রাচ্যের সম্পদভাণ্ডার থেকে হরণ অব্যাহত রেখেছে। আর পাশ্চাত্যের শব্দকোষ থেকে প্রাচ্য তুলে আনে কেবল কয়েকটি শব্দ, গুটিকয় শব্দ বাদে যে-গুলোর সাধারণ্যে কোনও অর্থবোধগম্যতা নেই, নামপাটার গায়ে লেপ্টে থাকা ছাড়া। পশ্চিমের সঙ্গে পূর্বের বিনিময়বাণিজ্য, শব্দের সঙ্গে বিজ্ঞানের অস্পৃশ্যতার আরাধনা, এই বাণিজ্য একদিকে বিজ্ঞানের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের বিচ্ছিন্নতাকে ( alienation) যেমন বাড়ায়, অন্যদিকে তেমনি মাতৃভাষার সঙ্গেও বিচ্ছিন্নতাকে তলে তলে লালন করে আত্মপরিচয়ের ঔজ্জ্বল্যকে ফিকে করে তোলে।
নামপাটার নামকরণের প্রকরণ দেখে যে-কারও মনে এই ধারণা বদ্ধপরিকর হতেই পারে যে, ব্যক্তিনামে কেবল নয় প্রতিষ্ঠানের নামের নমুনায়ও বাঙালি মুসলমান ধর্মপরিচয়ের বিজয় কেতন উড়িয়ে দেওয়ার আড়ালে প্রকৃতপ্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্য সংস্কৃতির পূজা করতে মুখিয়ে থাকেন এবং নামফলকের নামায়ণের নমুনায় মাতৃভাষা ব্যবহারকুণ্ঠ হয়ে উঠেন নির্দ্বিধায় এবং প্রকারান্তরে প্রমাণ করেন তাঁরা নিজেরা ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার নিরর্থকতার দ্বারা দারুণভাবে আক্রান্ত এবং এই ঐতিহাসিক তথ্যটিও ভুলে থাকতে ভালোবাসেন যে, ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাব্যাধির প্রকোপ এড়াতে “ইরানিরা ছিলেন অতিমাত্রায় ঐতিহ্যসচেতন এবং সংস্কৃতিগতপ্রাণ জাতি”।(২) এতে দ্বিমতের কোনও অবকাশ নেই যে, আরবি ‘আল্লা’ কিংবা ‘সালাত’ অর্থে ইরানদেশে ফারসি ‘খোদা’ ও ‘নামাজ’ ব্যবহৃত হয়। এদিকে বাংলাদেশেও খোদা ও নামাজ শব্দদ্বয়ের ব্যাপক প্রচলন। আল্লা-সালাত-খোদা-নামাজের এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার প্রসারিত পরিসরপ্রেক্ষিতের বৃহৎ দর্পণে বাঙালি মুসলমানের ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতায় প্রপন্নতার প্রপঞ্চের মুখও এক ঝলক অবলোকন করে নেওয়া যায়। ইদানিং এই শব্দদ্বয় পরিহারের সচেতন প্রচেষ্টা বিশেষ মহলের পক্ষ থেকে পরিলক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু সে-প্রচেষ্টা ফারসি থেকে আরবিতে প্রত্যাবর্তনের, দেশের সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত বিনির্মাণের বিবেচনায় ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে প্রত্যাহার না করে।
সুনামগঞ্জে একটি বাড়ির নাম ‘তরুশোভা’। সেটি একজন কবির (রোকেস লেইস) বাড়ি বলেই হয় তো নামটি সুনামগঞ্জের নাফানী নিসর্গের সঙ্গে খাপে খাপে খাপ খাওয়ানো। আবার কোনও বাড়ির নাম হয় তো বিদেশপ্রীতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শক ‘হল্যান্ড হাউস’। অন্য একটির নাম হয় তো শুরু হয়েছে আরবিপ্রীতির দন্তবিকশিত পরিপত্র বাংলা ‘বাড়ি’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ ‘বায়তুল’ সহযোগে। বিহারি পয়েন্ট থেকে দক্ষিণে ময়নার পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তার পশ্চিমপাশে এমন একটি নামফলক দৃষ্টিগোচর হলে, মনে পড়ে, আক্কেল গুড়–ম হয়ে গিয়েছিল। ‘তরুশোভা’ নামটি যে-ভাবে মনের গহনে একটি স্নিগ্ধছায়াচ্ছন্নতার চিত্রকল্প তৈরি করে, এ শহরের সিংহভাগ বাড়ি-দালান-কোঠা বা প্রতিষ্ঠানের নামের আড়ম্বর মনের মুকুরে সে-রকম কোনও চিত্রকল্প তৈরি করে না। ‘চন্দ্রসোনার থাল, সিঙ্গির দাইড়, কৈবাহার, হাতির গাতা, রোপাভূঁই, হিংরাঘাট, গোলাঘাট, বনুয়া, কানামুইয়া, ঘনিয়াকুড়ি, তিনবিলা, ‘মনকামারের কুড়িডুবি’ ইত্যাদি এতদঞ্চলের হাজার হাজার জলাশয় অর্থাৎ বিলবাদাড়ের কয়েকটির নাম। এই নামগুলো প্রাচীন বাংলার সবুজ প্রকৃতির মতো চৈত্রকল্পিক নন্দনতাত্ত্বিকতায় নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ, ভাষাশৈল্পিকতায় কতদূর পরিপূর্ণ তার পরিমাপ করার সাধ্য আর যারই থাক আমার অন্তত নেই, স্বীকার করে নিচ্ছি, বলতে কোনও দ্বিধা নেই, যা শহরের বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণে নিদারুণভাবে অনুপস্থিত। এইসব শব্দ তাদের গায়েগতরে নামকরণের আলাদা বৈশিষ্ট্য ভাষাব্যবহারের মুন্সিয়ানা ও বাঙালিয়ানার গৌরব ধারণ করে, অপরদিকে তারা মনের মধ্যে কোনও না কোনও চিত্রকল্প তৈরিতে বিশেষ প্রকরণে পারদরঙ্গম। এইসব শিল্পসম্মত চৈত্রকল্পিক নাম জলজঙ্গলজ প্রাকৃতসংস্কৃতি থেকে উঠে আসা মানুষের প্রমিত নন্দনতাত্ত্বিক মননশীলতার পরিচায়ক। এই নামগুলির মধ্যে লোকায়তিক মনের গভীরগোপন রহস্য তিরোহিত হয়ে আছে, হয়তো বা কোনও কোনওটির সঙ্গে আছে কোনও কিংবদন্তি কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের যোগ। যেমন ‘দেখার হাওর’।
এই ‘দেখার হাওর’-এর নামের সঙ্গে এই হাওরের বাসিন্দাদের একসময়কার ব্যসন কিংবা একটি বিশেষ বিলাসিতার সম্পর্ক আছে। দেখার হাওরের পাড়ের বিদগ্ধ মানুষ প্রভাষক এনামুল কবীর বলেন ‘দেখার হাওরের মানুষেরা গায়েগতরে ডেকা বা ষাড়ের মতেই ছিল শক্তিশালী ও প্রবল ইন্দ্রিয়পরায়ণ। ঘরে ঘরে ষাড় প্রতিপালন ছিল প্রকৃতিপ্রদত্ত সে-শক্তিমত্তার প্রতীকী প্রকাশ।’ কিংবদন্তি আছে : এই হাওরের কৃষকরা সখ করে ষাড় প্রতিপালন করতো। সেগুলো হাওরের উর্বর মাটিতে উৎপন্ন পর্যাপ্ত ঘাস খেয়ে ব্যাপক মোটাতাজা হতো আর বিলের পাড়ে দিনমান লড়াই করতো। অথবা এই নিয়ে হয় তো অন্য কোনও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কিংবদন্তি আছে : বিলের গভীর জলের তলা থেকে দু’টি বৃহৎ ষাড় উঠে এসে দিনমান লড়াই করে আবার বিলের জলে অদৃশ্য হয়ে যেতো। কা-টা ছিল অনেকটা ‘কেহ কারে নাহি হারে সমানে সমান’। হাওরের মাতৃভাষায় (আঞ্চলিক ভাষায়) ষাড়কে বলে ‘ডেকা’। ‘ডেকা’ দেখা যেতো বলে এই হাওরের নাম ‘দেখার হাওর’ (<ডেকার হাওর)। অর্থাৎ ‘ডেকা’ সহযোগে হাওরের নাম প্রথমে ‘ডেকার হাওর’ এবং কালক্রমে লোকমুখে /ড/-য়ের উচ্চারণ /দ/ হয়ে গিয়ে হয়ে গেছে ‘দেখার হাওর’।
কিন্তু এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, দেখার হাওরের নামের সঙ্গে যেমন ষ-সংক্রান্ত কিংবদন্তি ওতপ্রোত তেমন কোনও কিংবদন্তি শহরের অলিতে গলিতে গজিয়ে উঠা সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাড়ি কিংবা দোকানপাটের নামগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোত নয়। একদিকে হাওরবিল, নদীখাল, কান্দাজাঙ্গাল, বনজঙ্গল (বর্তমানে নিশ্চিহ্ন) ইত্যাদির নামের সঙ্গে যেমন কমবেশি কিংবদন্তি কিংবা ঐতিহ্যিকতা, জাতিগত নিজস্বতা কিংবা স্বকীয়তা-স্বাতন্ত্র্যের প্রগাঢ় পরিচয়ের প্রতিপত্তিকে স্বীকরণ বা আত্তীকরণ সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে বাঙালি মুসলমানের স্বনাম ও নামপাটার নামসংস্কৃতিতে সে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকরণ সর্বার্থে অনুপস্থিত। শহরের স্থাপনাগুলোর নামের ক্ষেত্রে ইংরেজি, আরবি কিংবা ফারসি ভাষার শব্দস্বীকরণ প্রমাণ করে যে, নিজের পরিচয় নিজের ভাষায় দিতে বাঙালি মুসলমান ভীষণ কুণ্ঠিত ও স্বাভিমান থেকে বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত। বাঙালি মুসলমানের এইরূপ পরসংস্কৃতিপরতাকে, বড়জোর বলা যায়, বিভাষাপ্রীতির বাগাড়ম্বর (ইচ্ছে হলে বাঘাড়ম্বর পড়তে পারেন, বাঙালি সংস্কৃতির উপর আক্রমণটা তো বাঘের থাবার মতোই ভয়ঙ্কর।) থেকে উপজিত ভাষিক নামপ্রপঞ্চ। অর্থাৎ কি না সুনির্দিষ্টভাবে কোনও বিভাষা, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার প্রতি অকারণ প্রীতিবশত মানুষের মগজে গজিয়ে উঠা স্বভাষাবিচ্ছিন্নতারূপ ব্যাধির উৎকট প্রকাশ, বিশেষ করে প্রকটাকারে অর্থাৎ বাড়াবাড়ি মাত্রায়। সে-ব্যাধির প্রকোপ নামকরণের (বাংরেজি নাম ইত্যাদি) সঙ্গে এতোটাই ওতপ্রোত যে, নামফলকে মূর্তনির্দিষ্ট হয়ে ওঠা এইসব ভাষাবিচ্ছিন্নতার (বাংলা শব্দ ব্যবহার না করা) প্রতিরূপ স্বসংস্কৃতিবিচ্ছিন্নতার পরিপত্র হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে এবং সার্বিক বিবেচনায় এই নামায়ন মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতার অশুভ চর্চার বিকারব্যাধির প্রস্ফোটন হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে। নামায়নের এই প্রতিক্রিয়াশীল (প্রতিক্রিয়াশীল এ জন্যে যে, এটি স্বসংস্কৃতি থেকে মানুষকে উদ্বাস্তু করে) প্রকরণ কিংবা বিকারগ্রস্ততা অনুসৃত হচ্ছে মানব ও মানবসৃষ্ট স্থাপনা ও বস্তুসূহের পরিচয় বিবৃতির ক্ষেত্রে। প্রকারান্তরে লোকেরা স্বমননশীলতার চর্চা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলছে এবং প্রকৃত সৃজনশীল চর্চায় নিয়োজিত থাকার পরিবর্তে একধরণের অসৃজনশীল অনুকরণগ্রস্ততার ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে মিথ্যা আত্মশ্লাঘায় ভোগছে। পরসংস্কৃতিপরতার কাছে এই আত্মসমর্পণ, কাপুরুষতাই কেবল নয়, প্রকৃতপ্রস্তাবে আত্মপরিচয়ের সঙ্কটকে আমন্ত্রণ করে জাতিগত আত্মহননের পথ পরিষ্কার করার নামান্তরও।
উত্তম জলযোগ, সুষমা সংগীত সংস্থা, সুবল সাজঘর, রূপায়ণ, সুরলোক সাংস্কৃতিক সংস্থা ও সংগীত বিদ্যালয়, সারদা কুঠির প্রভৃতির মতো বিশুদ্ধ বাংলায় নির্মিত ‘সংখ্যালঘুজনচিত্তজ’ নামফলকগুলো মাতৃভাষা ও স্বসংস্কৃতির মহিমাকে প্রতিনিয়ত প্রকটিত করছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এখানে প্রতিষ্ঠানসমূহের মাতৃভাষায় এমন স্বল্পসংখ্যক নামকরণের পরিসংখ্যান প্রতিপন্ন করে যে, মাতৃভাষা ও স্বসংস্কৃতির অহঙ্কারে সমোজ্জ্বল শহর এটি নয়, অথচ সুনামগঞ্জকে লোকসংস্কৃতির রাজধানী বলতে এখানকার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বড়বেশি ব্যাকুল। মাতৃভাষা ও স্বসংস্কৃতির অহঙ্কারে সমোজ্জ্বল নামফলকের এই স্বল্পতা প্রমাণ করে যে, সাতচল্লিশের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে (প্রকৃতপ্রস্তাবে দ্বিধর্মতত্ত্বের ভিত্তিতে) দেশভাগ পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভারতপ্রবসন (পূর্ববঙ্গের প্রেক্ষিতে প্রকৃতপ্রস্তাবে পশ্চিমবঙ্গযাত্রা। যে-যাত্রাটি প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতারই একটি রূপভেদ। আসলে বিচ্ছিন্নতা বিভিন্ন প্রকারের, সংখ্যায় অনেক।) অনিবার্য করে তোলে তাদের সংখ্যাকে অতিরিক্ত মাত্রায় কমিয়ে দিয়েছে। তৎপরেও নামফলকের নামকরণে ব্যতিক্রম প্রতিফলিত হয়, যেমন : উড়াল প্রকাশ, সপ্তডিঙ্গা, কুটুম বাড়ি, প্রিয়াঙ্গণ, আদর্শ শিশুশিক্ষা নিকেতন, সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (জনান্তিকে বলে রাখি, নাম যাই হোক, এ বিদ্যালয়ে বেঁটে, উচ্চতায় অনুচ্চ, বালিকারাও পড়তে যায়)।
আমার বাসা থেকে পুবের পয়েন্টে ‘পার্থিব ষ্টোর’ ও ‘দিপা ষ্টোর (তপু)’ দু’টি দোকানের নামফলক। দু’টিই বাংলা ইংরেজির গাঁটছড়া বাংরেজি। এর উত্তরে রাস্তার পুবপাশে, মাত্র এই ক’দিন আগে গজিয়ে উঠা দোকান কোঠার কপালকপোলে দু’টি নতুন নামফলক লেগেছে। ‘ভাই ভাই রেষ্টুরেন্ট’ ও ’নন্দিনী ট্রেডার্স’, তারাও বাংরেজি। যে গলিতে আমার বাস, সেটা উত্তর দিকে শতেক কদম গিয়ে মিলেছে যে সড়কে, সেটি সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়ক থেকে পূর্বদিকে হাজিপাড়ার ভেতরে বিস্তৃত হয়ে মিলেছে নতুনপাড়ার অন্দরে উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত রাস্তায়। এই গলির মাথায় যেখানে রাস্তার ত্রিবেণী সঙ্গমের (তেরাস্তা) সৃষ্টি, সেখানে গলির মুখের রাস্তার পশ্চিমে একটি মসজিদ। সুন্দর করে নাম লেখা আছে ‘বায়তুচ্ছালাম হাজিপাড়া নতুনপাড়া জামে মসজিদ’। এখানে ‘বায়তুচ্ছালাম’-এর বানানটায়, আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, ‘চ’-এর ব্যবহারটি কতটুকু আরবি মাখরেজের (উচ্চারণের) বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ হয়েছে সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই, নামটায় চোখ গেলেই, মনে হয় মূলের উচ্চারণানুগ বানান হয়নি অর্থাৎ উচ্চারণে বিচ্ছিন্নতা সংঘটিত হয়েছে। যদিও আমি কোনও ক্বারি নই, তবু ভাবিত হই মনে মনে। বাংলা ‘চ’ এবং ‘ছ’-এর উচ্চারণ একরকম নয়, প্রথমটি অল্পপ্রাণ ও দ্বিতীয়টি মহাপ্রাণ। এখানে কেন জানি মনে হয় ‘চ’ এর স্থলে ‘ছ’ হওয়া অধিকতর বাঞ্ছনীয়, আরবি উচ্চারণ-প্রকরণ কী নির্দেশ করে জানি না, আমার ভুলও হতে পারে, সেজন্যে আবার সবিনয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।
এরপর গলি পেরিয়ে গলির চেয়ে বড় গলিতে উঠে মাত্র কীছুটা পুবে এগিয়ে রাস্তার উত্তর পাশে হাতের বামে একটি দোকানের নাম ‘রাজু ভ্যারাইষ্টিজ ষ্টোর’। ‘ভ্যারাইষ্টিজ’ শব্দটা সত্যি অভিনব। তবে ইংরেজি ‘ভেরাইটি’-র বহুবচনের ভাষিক রূপ ‘ভেরাইটিজ’-কে ওই দোকানিপাণিনির স্বগোত্রীয় বৈশ্যপতঞ্জলি কিংবা মুদিযাস্ক কোন্ অসাধ্যসাধনরূপ ব্যাকরণসূত্রের করণকৌশলে কখন যে ‘ভ্যারাইষ্টিজ’ করে ফেলেছেন সে বুদ্ধিসাধিত্র আমি নিরুত্তমের এখনও অনায়ত্তই রয়ে গেছে। এবংবিধ বৈয়াকরণিক সাধনপ্রকরণই কি নিপাতনে সিদ্ধ বলে স্বীকৃত ? কে জানে ? ইংরেজি ভাষায় এমন একটি অষ্টমাশ্চর্যের মতো নতুন শব্দসৃষ্টির সুনিপুণ কৃতিত্বের জন্য ইংরেজদের পক্ষ থেকে এই বাঙালি পাণিনিকে নোবেল পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সমীচীন হবে বলে বোধ করি। যদি আরও একটু এগিয়ে যাই তবে হাতের ডানে রাস্তার দক্ষিণে পাই ‘ফাতেমা ফার্ণিচার মার্ট’। আরবি ইংলিশের মিশ্রণে তৈরি এই ‘আরলিশ’ (আরবি+ইংলিশ) নামটিতে অপাত্রে কন্যাদানের মতো কেবল সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ণ-ত্ববিধান কার্যকর করা হয়েছে অসংস্কৃত অর্থাৎ বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে।
রবীন্দ্রনাথের অনুমোদনবঞ্চিত এই প্রকার বানানবিধি তাঁর কঠোর সমালোচনার শিকার হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘অন্তত তদ্ভব শব্দে যিনি সাহস দেখিয়ে ষত্বণত্ব ও দীর্ঘ হ্রস্বের প-পা-িত্য ঘুচিয়ে শব্দের ধ্বনিস্বরূপকে শ্রদ্ধা করতে প্রবৃত্ত হবেন তাঁর আমি জয়জয়কার করব। যে প-িতমূর্খরা “গভর্ণমেন্ট” বানান প্রচার করতে লজ্জা পান নি তাঁদেরই প্রেতাত্মার দল আজও বাংলা বানানকে শাসন করছেনÑ এই প্রেতের বিভীষিকা ঘুচবে কবে ? কান হলো সজীব বানান, আর কাণ হলো প্রেতের বানান একথা মানবেন তো ?’(৩) রবীন্দ্রনাথের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো সংস্কৃতাগত অবিকৃত বাংলাশব্দ ভিন্ন অন্য সকল প্রকার শব্দ অর্থাৎ অসংস্কৃত শব্দ অর্থে অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি এই রকম সকল প্রকার শব্দের বানানে ষত্বণত্ব ও স্বরের দীর্ঘহ্রস্ব ভেদ প্রযোজ হবে না। এখানেই সংস্কৃত ও বাংলার তফাৎ। সংস্কৃতের ব্যাকরণবিধি বাংলায় অপ্রযোজ্য। এটাই বাংলার বৈয়াকরণিক বৈশিষ্ট্য। বাংলায় তৎসম শব্দে ষত্বণত্ব ভেদ মান্য করে লেখা হবে ব্রাহ্মণ কিন্তু অসংস্কৃত শব্দে /ন/ বিধেয় করে লেখা হবে বামন। অর্থাৎ সংস্কৃত ভিন্ন অন্য শ্রেণির শব্দের ক্ষেত্রে (১). /ণ/ স্থলে /ন/, (২). /ঈ/, / ী/-কার স্থলে যথাক্রমে /ই/, //ি-কার, এবং (৩). /ঊ/, / ূ /-কার স্থলে যথাক্রমে /উ/, / ু /-কার বিধেয়। একদম চোখ বুজে, নির্দ্বিধায় ব্যবহৃত হব। এ সম্পর্কে এটাই বাংলা বানানের সুনির্দিষ্ট নিয়ম।
দেশের অন্যান্য শহরের কথা জানি না, সুনামগঞ্জ শহরের নামপাটা কিংবা নামফলকগুলো বাংলালিপিতে লেখা। এ শহরে ইংরেজিলিপিতে লেখা নামফলক নেই বললেই চলে, সংখ্যায় এতোই কম, তারপরও দুয়েকটি তো পাওয়া যেতেই পারে। তেমনি আবার বাংলা লিপিতে লেখা অথচ বিশুদ্ধ বাংলা শব্দে বিন্যস্ত নামফলক খুব কমই চোখে পড়ে। সুনামগঞ্জ শহরের নামফলকগুলোতে ব্যবহৃত শব্দসমূহ কোন্ ভাষার শব্দভা-ার থেকে আগত, এ প্রশ্নের উত্তরে অনুসন্ধিৎসু হয়ে একটু নিবিষ্টচিত্তে চিন্তা করলে অনায়াসে এই সহজ সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব যে, সেগুলোর মধ্যে একই সঙ্গে একাধিক ভাষার প্রবসিত শব্দ বিদ্যমান। যদিও বাংলাভাষী দেশে নামফলকের শব্দ বা শব্দগুলো সাধারণত ও স্বাভাবিকভাবেই বাংলা হওয়াই সঙ্গত ছিল, কিন্তু এখানকার নামফলকগুলোতে চয়িত শব্দের মধ্যে প্রকৃতপ্রস্তাবে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি এই তিন ভাষার ভাণ্ডার থেকে আমদানি করা শব্দের প্রাচুর্যের সঙ্গে বাংলাশব্দের অপ্রতুলতা পরিলক্ষিত হয়, প্রকারান্তরে যেটাকে ভাষাবিচ্ছিন্নতা বলে নির্দ্বিধায় অভিহিত করা যেতেই পারে, সঙ্কোচবশত ‘খুব একটা অসঙ্গত হবে না’ বলার দরকার নেই । বাংলা শব্দ ব্যবহার না করে অবাংলা শব্দের ব্যবহারকে বাংলাভাষা থেকে বিচ্ছিন্নতা না বলে উপায় কী ? আরবি, ফারসি ও ইংরেজি এই তিন ভাষা ব্যতীত অন্য কোনও ভাষা থেকে আগত শব্দের সম্ভাব্যতাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, দুয়েকটা ‘চিনা’ (‘পরিচিত’ অর্থে নয়, ‘চিন দেশীয়’ অর্থে) শব্দও তো থেকে যেতে পারে। যেমন ‘চাওমিন’ (অর্থ কী কে জানে ?), উকিলপাড়ায় ইংরেজি লিপিতে একটি দোকানের নাম Chaomin Chinease Restaurent (চাওমিন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট)।
নামফলক কিংবা নামপাটা নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে, তখন এখানে একটি বিশেষ নামফলকের উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলে প্রত্যাশা রাখি। আলোচ্য নামফলকটি উপরে ইংরেজি লিপিতে ও নিচে বাংলা লিপিতে লেখা। এই ইংরেজিনির্ভরতা বা ইংরেজিপ্রীতি (বাঙালির পরসংস্কৃতিপরতার একটি, যা’ অবশ্যই একধরণের বিচ্ছিন্নতাও বটে।) এই দেশের একটি দীর্ঘজীবী অসাধারণ বিশেষত্ব। এই বিলক্ষণ বিশেষত্বটি প্রতিপন্ন করছে যে, এই দেশ একদা (১৯৪৭-পূর্বকালে) ১৯০ বছর যাবৎ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের উপনিবেশ ছিল এবং ঔপনিবেশিক ব্যভিচারের সবচেয়ে রক্তাক্ত চিহ্ন এই দেশ এখনও বহন করছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি, মাছি ভনভন করা দগদগে ঘায়ের মতো পচনপুঁজদুর্গন্ধ নিয়ে। ১৮৩৭ সালে ফারসির স্থলাভিসিক্ত ইংরেজি ফারসির মতো বাংলার ঘাড়ে চড়ে বসে ছিল, এখনও আছে, সিন্ধুবাদের ঘাড়েচড়া শয়তান বুড়োর মতো। এই বুড়োকে ঘাড় থেকে নামানোর কোনও কার্যকর প্রচেষ্টা আজ পর্যন্ত কোথাও পরিলক্ষিত হয় নি। প্রশাসনিক কোনও সিদ্ধান্ত আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ে এ দেশে জনহিতকর কাজে কখনওই সফলতা লাভ করে না, বাংলাভাষাকে প্রশাসনিক পর্যায়ে ‘প্রবসিতকরণ প্রচেষ্টা’ও এখনও প্রচেষ্টা পর্যায়েই রয়ে গেছে, পূর্ণ হয় নি কিংবা ফলপ্রসূ হয় নি। বেসরকারি বাদ দিলাম সরকারি যে-কোনও প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মসূচির নাম রাখা হয় ইংরেজিতে। দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি সংবাদের অংশ (চলবে)
- সরকারের অন্যতম অর্জন বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে আনা -পরিকল্পনামন্ত্রী
- শাবি উপাচার্যকে দুঃখ প্রকাশের কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী


