ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) তোলে দিচ্ছি, “পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যা- এক্সচেঞ্জ কমিশিন (এসইসি) গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সংশোধিত সংঘবিধি (আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন) অনুমোদন করেছে।(৪) এখানে এসইসি (সিকিউরিটিজ অ্যা- এক্সচেঞ্জ কমিশিন), ডিএসই (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ), আইসিবি (ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ), আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন (সংশোধিত সংঘবিধি) ইত্যাদি নাম বা বিশেষ অর্থবাচক শব্দ বা শব্দবন্ধ বাংলাতেই হতে পারতো, ‘আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন’ যেমন অনায়াসে হয়ে গেছে ‘সংশোধিত সংঘবিধি’। কিন্তু ইংরেজ মেকলে (টমাস ব্যাবিংটন মেকলে) সাহেবের সুযোগ্য শিষ্য কতিপয় আমলাতান্ত্রী বাঙালির ইংরেজির প্রতি অন্ধ আনুগত্য সেটা হতে দেয় নি। তা ছাড়া সামগ্রিক বিবেচনায় প্রতিটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এখনও ইংরেজির অবাঞ্ছিত প্রবসন পুরোমাত্রায় অব্যাহত আছে। তরুণেরা এখানে নাট্য সংস্থার নাম রাখেন সাইরেন, প্রসেনিয়াম। বলা বাহুল্য এই ‘অবাঞ্ছিত প্রবসন’ অর্থাৎ ইংরেজিকে অবাঞ্ছিত আত্তীকরণ (এমনকি যাকে সার্বিক বিবেচনায় ‘অবাঞ্ছিত প্রবসন প্রবণতা’ বলাও বোধ করি অসঙ্গত হবে) এখনও প্রথমস্থানেই আছে, দ্বিতীয়স্থানে নামানো যায় নি। এই আত্তীকরণ ঔপনিবেশিক কালপর্বে ঘাড়ে চড়ে ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার ব্যভিচার প্রতিষ্ঠা করতে আর এখন বহালতবিয়তে আছে নয়া ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী আর্থসাংস্কৃতিক সর্জন ভুবনায়নের যুগের আগ্রাসী মস্তান ভাষা ইংরেজির অসীম অপ্রতিরোধ্য দাপটে। আজ এতকাল পরেও ইংরেজিকে প্রশাসনের অন্তর থেকে তো নয়ই, রাস্তার পাশে দোকানের কপালকপোলে লটকানো নামপাটা থেকেও উৎপাটন সম্ভব হয় নি। সেখানে যেমন ঝাঁকিয়ে বসেছে তারচেয়ে বেশি ঝাঁকিয়ে বসেছে প্রধান পণ্ডিতের পাড়ায়। সে-পণ্ডিতের পাড়ার একজন অভিযোগ করেছেন, “বাংলা একাডেমির নামটি ট্রেডমার্ক হওয়াতে সেটা এখনও অর্ধবাংলা হাফ ইংলিশ হয়ে আছে এ নিয়ে মাঝে মাঝে একাডেমী প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ভাষা আন্দোলন সূচিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন এখনও ইংরেজী ভাষাতেই আছে। শহীদ মুনীর চৌধুরী বলতেন বিশ্ববিদ্যালয় হলো গিয়ে রক্ষণশীলতার শেষ দুর্গ। সেই দুর্গেও বাংলা ভাষা প্রবেশ করেছে। তবে অধিকাংশই দৈনন্দিন অফিসীয় কাজে, প্রাতিষ্ঠানিক কাজে নয়। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দলিল, অর্থাৎ আইন কানুন বিধি-উপবিধির অধিকাংশই ইংরেজি ভাষায়।”(৫) অবশ্য এই মন্তব্যের পর তারকাচিহ্ন ব্যবহার করে পৃষ্ঠার নিচে পাদটীকায় জানিয়েছেন, ‘এই প্রবন্ধ যখন লিখছি, তখন খবর পাওয়া গেল বিশ্ববিদ্যালয় বিধিবিধান বাংলায় করার জন্য বাংলা একাডেমীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ তারপর তাঁর লেখায় তাঁর বিচরণক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন বিভাগ-বিষয়-অনুষদ ইত্যাদির নাম-নামপাটা বা নামফলকের বিশদ বর্ণনা (বিতং বা বিস্তারিত বর্ণনা বলতে না চাইলেও, নিশ্চিত করে বলা যায় একটি নির্দিষ্ট চোতা) উপস্থিত করেছেন। যাতে এইসব প্রশাসনিক বিভিন্ন বিভাগ-বিষয় ইত্যাদির নাম-নামফলক বা নামপাটার পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টার প্রসঙ্গ (‘শহীদ মুনীর চৌধুরী বলতেন বিশ্ববিদ্যালয় হলো গিয়ে রক্ষণশীলতার শেষ দুর্গ। সেই দুর্গেও বাংলা ভাষা প্রবেশ করেছে।’) সম্যক বিবৃত হয়েছে। সেখানে বাংলায়ন বা বাঙালিয়ানা, সাবেকি ইংরেজিপনা ও বাংরেজিপনার বিচিত্র সমাহার লক্ষ্য করা যায়। বাংরেজিপনাকে তিনি কৌতুকী চমৎকারিত্ব সহকারে অর্থাৎ যাকে বলে চমৎকার করে ‘অর্ধ বাংলা হাফ ইংলিশ’ অভিধায় অভিহিত করেছেন। এক জায়গায় লিখেছেন, “ভাইস চ্যান্সেলর পদবীটির বাংলা ‘উপাচার্য’ করা হয়েছে; সেটা বেশ প্রচলিত হয়ে গেছে; কিন্তু সংকট দেখা দিয়েছে পরবর্তী পদবীর ক্ষেত্রে; ইংরেজী pro-vice chancellor বাংলা হতে গিয়ে ‘প্রো-উপাচার্য’ হয়ে বসে আছে। এটা কি ইংরেজী না সংস্কৃত বোঝার উপায় নেই। শব্দটির মূল কি আর উপসর্গ কি, কোন্ রূপতাত্ত্বিক সূত্রানুযায়ী তৈরী শব্দ তা বলা বিড়ম্বনা মাত্র।”(৬) এই ‘প্রো’কে নিয়ে মুশকিলে পড়া গেলো। এর নাকি অনুবাদ-থেকে-আমদানি নেই। নিরুপায় বিশ্ববিদ্যালয় pro-vice chancellor – কে ‘প্রো-উপাচার্য’ করে রাখতেই বাধ্য হলো। অবাক কা-। তা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান-যাঁরা-পণ্ডিতরা সাংবাদিকদের (পাছে লোকে বলে, তাঁরা নাকি সাংঘাতিকও বটে) ডাকলেই পারতেন। তাৎক্ষণিক তরজমায় তারা সর্বসময়েই প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিতে সবিশেষ পারদরঙ্গম এবং তাৎক্ষণিক তরজমায় তাঁরা (সাংবাদিকরা) যে আসলেই ‘সাংঘাতিক’ (দক্ষ) তা প্রমাণ করেই ছাড়েন। আমন্ত্রিত হলে এসপার ওসপার একটা কীছু হতোই। তাঁরা ইংরেজি ‘হুয়াইট ওয়াস’কে বাংলা ‘ধবল ধুলাই’ করে দিয়েছেন নিমেষেই। উড়ালসেতু, সবুজসংঙ্কেত, চিরুনিতল্লাসি, নলজাতক ইত্যাদি শব্দ (কিংবা শব্দজুট, এমনকি শব্দজট বলতে আমার অনাপতিত্ত প্রযুক্ত) ইংরেজি থেকে এবংবিধ বাংলা করে ফেলা সাংবাদিকদের মগজাভিধানের তাৎক্ষণিক পরিবেশনার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। এমনকি তাঁরা সৃষ্টি করেছেন ‘জলজট’-এর মতো বিস্ময়কর সুন্দর শব্দ। বলি কি, সাংবাদিকদের দ্বারস্থ হলে ‘প্রো’র একটা জুতসই বাংলা নিশ্চত বেরিয়ে যেতো। কিন্তু না-বেরোনোটাকে বাঙালির মূর্খতা বলে অভিহিত করে নিজেকে মূর্খ করে তোলার মূর্খতা দেখানো অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কেবল এইটুকু বলে রাখি যে, বুঝে না-বুঝে এইরূপ মুৎসুদ্দিগিরির সমর্থন আর ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজাকারের পাকিস্তানপ্রীতি (ফাঁকিস্তানপ্রীতি) সমান কথা।
পারক্যপ্রেম কিংবা পরপ্রীতি (রাজাকারজীবিতা পারক্যপ্রেমের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, পারক্য অর্থে যখন পরদেশ উপলভ্য) যুক্তির ধার ধারে না, বরং বুদ্ধিকে ভ্রষ্ট করে, পণ্ডিতের পাণ্ডিত্যকে প- করে। পারক্যপ্রেমীর কা-জ্ঞানের একমাত্র নিয়তি অজ্ঞাতবাস। স্মার্তব্য যে, অজ্ঞাতবাস মানে জ্ঞাতবাস থেকে বিচ্ছিন্নতা, প্রবসনে স্থানান্তর। এই ‘প্রো-উপাচার্য’-কে নিয়ে বাঙালির বিশ্ববিদ্যালয়ের মুৎসুদ্দি (শিক্ষাগুরু নৈবচ, তত্রাচ দীক্ষাগুরু) যে কর্মের কর্তা কিংবা যে-কেরদারিশমা প্রকাশে পারদরঙ্গম তা ইতিহাসে অতুলনীয় পারক্যপ্রীতি। ইংরেজির প্রতি এই প্রীতি সত্যি সত্যি প্রথিত হয়ে থাকবে। বিবরণ পাঠপরক্ষণে আমার একেবারে আক্কেল গুড়ম। ঢাকা বিদ্যালয়ের মুৎসুদ্দিগিরি সম্বন্ধে মসীগিরি করতে গিয়ে ‘বাঙালীর ইংরেজী ব্যবহারের সাধারণ বোধ’ সম্পর্কে তীর্যক বাক্যবাণ প্রক্ষিপ্ত হয়েছে, “ইংরেজীতে ‘কমন সেন্স’ বলে একটি পদ আছে, এর বাংলা হচ্ছে ‘সাধারণ বোধ’ বা কা-জ্ঞান। ‘বাঙালীর ইংরেজী ব্যবহারে এই বোধ’ যথাযথভাবে কাজ করে কিনা তা ভাববার বিষয়। উদাহরণ থেকে জানা যায় ‘প্রো-উপাচার্য’ যে ব্যবহৃত হচ্ছে এই পদটি ‘প্রো’ ইংরেজী প্রিপজিশন, বাংলায় কোনো ‘প্রো’ উপসর্গ নেই, ‘প্র’ আছে। সুতরাং ‘উপাচার্যে’[র] সঙ্গে ‘প্রো’ যুক্ত করা উপরোক্ত জ্ঞানের পরিচয় দেন [শব্দটা ‘দেন’ না হয়ে ‘দেয়’ হবে কি ? এবংবিধ প্রশ্ন উত্থাপন সংশ্লিষ্ট বাক্যার্থবোধের ক্ষেত্রে বিপত্তি উদ্ভবের দিকটি বিবেচনায় নিলে মনে হবে একেবারে অনর্থক নয়। ই.কা.] কিনা ভাবা যেতে পারে। উপাচার্য গঠিত হচ্ছে সন্ধিসূত্রে উপ+আচার্য= উপাচার্য ঠিক। কিন্তু ‘প্রো+উপাচার্য’ কোন প্রমিত বাংলা ব্যাকরণের কোন সন্ধিসূত্রে গঠিত হয়েছে কেউ জানে না। এটাই দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ভাবনায় ব্যবহার করে আসছে । একাধিকবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তা সংশোধিত হয় না। এতে বুঝা যায় বাংলায় ইংরেজীর কু-প্রভাব কি!”(৭) ‘কুপ্রভাব’ কিংবা ‘কু-ভাব’ কিনা জানি না, তবে প্রভাব যে নয়, তা মর্মে মর্মে প্রতীতি হচ্ছে । কারণ যে-প্রভাব আত্মজাগৃতি ঘটায় না সে-প্রভাবকে প্রভাব বলে না। রবীন্দ্র রবির তাপে তপ্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ হতে চাই না। রবীন্দ্রপ্রভা আমাকে আরও আমি করে তোলবে, আমার আমিত্ব কিংবা অস্মিতাকে সমৃদ্ধ করবে, বিকশিত করবে, তবেই তা হবে প্রভাব, অন্যথায় নয়। মানুষ বিকশিত হবে তার নিজের মতো করে, তবেই সে মানুষ। ভুলে গেলে চলবে না, স্টিফেন হকিং স্টিফেন হকিংয়ের মতো, সে-জন্যেই তিনি শ্রেষ্ঠ । নজরুল কিংবা জীবনানন্দ নজরুল কিংবা জীবনানন্দের মতেই। তাঁদের কোনও তুলনা নেই, হবে না।
তাহলে মোদ্দাকথা, ‘বাংলা হয়েছে’, ‘এখনও বাংলা হয়নি’, ‘অর্ধ-বাংলা হাফ-ইংলিশ থেকে রেহাই পেয়েছে’ অথবা পায় নি ইত্যকার জটিলতার ঝঞ্ঝাটে আটকে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কিংবা নামপাটার বঙ্গীকরণের যুগান্তকর মহৎ প্রচেষ্টা। এই প্রচেষ্টা যে পুরোপুরি গতির প্রগতি পায় নি, কী এক ব্রিটিশীয় মেকলেতান্ত্রিক মোহমুগ্ধতার ঘোরে নিমগ্ন হয়ে, বিচ্ছিন্নতার ( alienation) বন্ধঘরেই আটকে আছে বরাবরের মতো, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ : ‘প্রো-উপাচার্য’কে ‘উপউপাচার্য’ কিংবা ‘সহউপাচার্য’ করা যায় নি। করে ফেললে বোধ করি একেবারে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো না। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘বাঙালীর ইংরেজী ব্যবহারে এই বোধ’, যেটা অভিযোগ নয় প্রশ্নের অভিঘাতে আক্রান্ত, ‘যথাযথভাবে কাজ করে কিনা’ অর্থাৎ কেমন জানি একটা রহস্যময় গোলকধাঁধার গোলে পড়ে গোলমেলে অবস্থায় দিনগত পাপক্ষয়ে মেকলেতান্ত্রিক দিনাতিপাত করা মাত্র, এর বেশি আর কীছই নয়। এই মেকলেতান্ত্রিকতা থেকে বাঙালি মুৎসুদ্দির যেনতেন প্রকারেণ মুক্তি চাই। এই মুক্তির সুবাতাস তো বইছে। গণমাধ্যমে তো ‘উপমন্ত্রী, উপসচিব, উপজেলা, উপনেতা, উপদল, উপকুন্দল, উপপ্রধান ইত্যাদি সর্জিত হয়েছে, এমনকি বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা প্রসূনকান্তি রায় ওরফে বরুণ রায়ের স্বৈরাচার এরসাদবিরোধী ভাষণে, সেই ১৯৮৮ সালেই, ‘উপজেলা’র অনুগবয়ন ‘উপজ্বালা’ শব্দটিকে প্রয়োগ করতে স্বকর্ণে শ্রবণ করেছি। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রশাসনিক পদ ‘উপউপাচার্য’ নয় কেন ? শেষপর্যন্ত না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, যে-করেই হোক, বাংলাকে উপেক্ষা করার কিংবা প্রকৃতপ্রস্তাবে সর্বার্থে মাতৃভাষাবিযুক্তির চিহ্নটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ে লেপ্টেই রইল। আর সেই সঙ্গে অমর্যাদা করা হলো ইংরেজি থেকে বঙ্গীকরণের যথার্থ সামর্থ্যকে। মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে হীনম্মন্য হওয়ার দীক্ষা নিতে হলে বোধ করি যে-কারও পক্ষে নিজেকে এখানেই নিবেদন করা উত্তম হবে। স্বাধীনতার চারদশকাধিক কাল পেরনোর পরেও মেকলের ভয়ঙ্কর সর্বগ্রাসী প্রেতাত্মাকে নির্বাসনে পাঠানো গেলো না, মুনীর চৌধুরী কথিত রক্ষণশীলতার ধ্বজা ধরে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কোণে, না কি কেন্দ্রে, এখনও নিজের ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের (প্রভুত্ব পাঠে অনাপত্তি প্রযুক্ত) ধ্বজা উড্ডীন রেখেছে এবং এতো কীছুর পর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় : আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ও বিচ্ছিন্নতার ( alienation) প্রপঞ্চে আক্রান্ত, স্বাধীন দেশেও তার মুক্তি মেলে না। মুক্তি থেকে এই বিচ্ছিন্নতা আর কত দীর্ঘ হবে? বিচ্ছিন্নতার বিবরবন্দিত্ব আর কত দিন? অস্মিতার শত্রু এই অসুরকে এসো বধ করি। এসো, নিজেকে জানি। আত্মবিচ্ছিন্নতাকেই মৃত্যু বলে। এসো, আত্মচৈতন্যে জাগ্রত হই। চলো ফিরে যাই বাঙালির কবি রামপ্রসাদের কাছে, ‘মন রে কৃষি কাজ জানো না/ এমন মানব জমিন রইল পতিত/ আবাদ করলে ফলতো সোনা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের নামপাটার কোথাও ইংরেজি বহালতবিয়তে আছে আবার কোথাও নেই, পুরোপুরি বাংলা হয়ে গেছে। এমনি একটা দ্বিচারী জুতের বিভিন্ন বিষয়-বিভাগের তালিকা দিতে গিয়ে তিনি (মনসুর মুসা) লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরী বা দিনপঞ্জীটি খুললে দেখা যায় এতে বিভাগগুলোর নামে বিচিত্র রকম প্রবণতা আছে। মূলদলিল যেহেতু ইংরেজীতে তাই সিনেট, সিন্ডিকেট, অর্টিক্যাল, বাজেট, ভাইস-চ্যান্সেলর, চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, উপরেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার, সেকশন অফিসার, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রারের অফিস ইংরেজী। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পুরোপুরি বাংলা হয়ে গেছে। অর্ধ-বাংলা হাফ-ইংলিশ থেকে রেহাই পেয়েছে। সেকশন অফিসার এখনও বাংলা হয় নি। ‘হিসাব পরিচালক’ বাংলা হয়েছে, ‘প্রধান প্রকৌশলী’ও তাই, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী’ও তাই, কিন্তু টেকনিক্যাল অফিসার, সেকশন অফিসার বাংলা হয় নি। জনসংযোগ বাংলা হয়েছে কিন্তু মেডিক্যাল সেন্টার এখনও ইংরেজী আছে। ডাক্তার বা চিকিৎসক এখন মেডিক্যাল অফিসার, মেডিক্যাল অফিসার ইংরেজী থাকলেও যিনি খ-কালীন তাঁকে পার্টটাইম লেখা হয় না, খ-কালীন লেখা হয়ে থাকে। এখানেও অর্ধবাংলা হাফ ইংলিশের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।”(৮) তা লেখক আরও কীছু লক্ষ করুন, কোনও আপত্তি নেই। ব্যাপারটা যে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’র রসাবত্যাধিকারী কাবুলি আবদুর রহমানের ‘রান্নাঘরে আরো আছে’র মতো, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সে ফিরিস্তি আপাতত নাই বা দিলাম।
আসলে নামকরণ কিংবা নামবদলের এই ভাষাসাংস্কৃতিক জটিলতাটি বহুধাবিভক্ত বিচ্ছিন্নতাপ্রপঞ্চের একটি। ঔপনিবেশিকতা উপনিবেশের সমাজবাস্তবতাকে পাল্টে দেয়। পুঁজির প্রভুত্বের এটাই নিয়ম। তৈরি করে নির্মম শোষণ-শাসনের প্রশস্ত পরিসরপ্রপঞ্চ কিংবা, যাকে বলে, সমাজবাস্তবতা। উত্তর-ঔপনিবেশিকতার এমন গুরুভার পৃথিবীর প্রায় দেশকেই এখনও, বাংলাদেশের মতোই, নির্মম নিয়তির আকারে বহন করতে হচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছে, সুনামগঞ্জ যেমন তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তার আওতা কিংবা প্রভাবমুক্ত নয়। সুনামগঞ্জে যেমন ‘ট্রাফিক পয়েন্ট’ কিংবা ‘রিভার ভিউ’ আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমনি আছে : টেকনিক্যাল অফিসার, সেকশন অফিসার, মেডিক্যাল সেন্টার, মেডিক্যাল অফিসার, এ্যালিফেন্ট রোড় ইত্যাদি। এসবই জাতিগত দাসত্বের ঐতিহাসিক ভাষাসাংস্কৃতিক চিহ্ন, ঔপনিবেশিকতার মনদখুপাই (মন+দখল+অকুপাই)। মুক্তচিন্তার দর্শনের পরিপ্রক্ষিত বিবেচনায় একেই বলে অবক্ষয়, অপকৃষ্টতা। কিংবা বিচ্ছিন্নতাও বলতে পারেন কেউ, ইচ্ছে হলে। ঔপনিবেশিকতার অপকৃষ্টতাক্রান্ত আফ্রিকা সম্পর্কে এক লেখক লিখেছেন, “ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা, নির্মমভাবে, আফ্রিকার মানুষকে তার পরিবেশ থেকে উপড়ে এনেছে, তার মনুষ্যত্ব হরণ করে তাকে পণ্য বানিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে তার ভাষা ও সংস্কৃতি, তাকে করে তুলেছে তার নিজের বাসভূমেই কোনও সামাজিক রাজনৈতিক অধিকারহীন মানুষ- ‘অপমানুষ’, নিজের সম্পর্কে বিকৃত হীনতার বোধ জাগিয়ে তুলেছে তার মধ্যে।”(৯) সামগ্রিক বিবেচনায় ভাষাসাংস্কৃতিক বিকাশে উৎকর্ষতা অর্জনের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনও এক ‘বিকৃত হীনতার বোধ’-য়ের বৃত্তে বন্দি হয়ে আছে এবং অবস্থাদৃষ্টে কারও কারও মনে হতে পারে যে, এই বৃত্তটি অনতিক্রমণীয়, যদিও ভাঙার লক্ষণও একবারে দুর্লক্ষ্য নয়।
পূর্বপ্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তন করা যাক। বলছিলাম, ‘একটি বিশেষ নামপাটা’ সম্পর্কে। ইংরেজিনির্ভর সে-নামফলকটি দৃষ্টিগোচর হলেই লর্ড ক্লাইবের কথা, মেকলের (পুরোনাম টমাস ব্যাবিংটন এডওয়ার্ড মেকলে, লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক-এর আইন সচিব, কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন-এর সভাপতি, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচ্যশিক্ষার পরিবর্তে পাশ্চাত্যশিক্ষার প্রস্তাবক (০২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫), ইতিহাসে তাঁর এই শিক্ষাপ্রস্তাব ‘মেকলে মিনিটস’ বা ‘মেকলে মিনিট’ নামে বিখ্যাত।) কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মোহাম্মদ আলি জিন্না, আইয়ুব-ইয়াহিয়া, সৈয়দ আলী আহসান, মুনায়েম খানের কথা। মনে পড়ে বাংলাদেশের মানুষের উৎকট মধ্যপ্রাচ্যপ্রীতি, ভারতভীতি ও পাকিস্তানপ্রীতির কথা। অনন্তর মনে পড়ে বাঙালি চিন্তকদের মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশের সমাজ-রাজনীতিক বাস্তবতা নিয়ে অন্তরঙ্গ উপলব্ধির কথা এবং সামাজিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত ও জায়মান চলিতকর্মের পরিসরনির্ভর তাঁদের একান্ত প্রত্যক্ষণ-নিরীক্ষা ও বিশ্লষণ-ভাবনা-উপাত্তের নির্গলিতার্থের নির্সাসের বিভিন্ন রঙ-বেরঙ কিংবা ধরণ-প্রকরণে স্ফূরিত-প্রতিভাত বিচ্ছিন্নতার ফল্গুধারা পরিলক্ষিত হয়, সে-গুলো প্রতিদিনকার সামাজিক-রাজনীতিক কর্মকা-ের অভিঘাতে আরও প্রকটিত হয়, চেতনার গভীরে রক্তক্ষণ তীব্র করে। চিন্তকদের একজন লিখেছেন, “মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে ধর্মের যে পুনরুজ্জীবন দেখা যাচ্ছে, তার অভ্যন্তরে প্রকৃত ধর্মচর্চার অস্তিত্ব কি খুঁজে পাওয়া যায় ? আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি দলের অভ্যন্তরে ধর্মের যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে,তার মধ্যে আসলেই কি ধর্ম আছে ? যাঁরা তবলিগে যাচ্ছেন, কিংবা সুফি সম্মেলন করছেন, অথবা পীর-ফকিরদের মুরিদ হচ্ছেন, ওরস করছেন, মাজার জিয়ারতে যাচ্ছেন, মানত করছেন, তারাঁ কি অধিক ধর্মপরায়ণ ? ধর্মপরায়ণতা, ধর্মান্ধতা আর ধর্ম নিয়ে ব্যবসাÑ এসবের পার্থক্য কি-করে বোঝা যাবে ?।
“প্রশ্নগুলো উত্থাপন করলাম সকলের বিবেচনার জন্য। এখানে এসব প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে যাব না। সংস্কৃতি প্রসঙ্গেই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করলাম। সকলের কাছে আমার প্রশ্ন, দুই দশকের মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের সয়স্কৃতি কি উন্নত হয়েছে ? (১০) ইংরেজি বর্ণে ও ভাষায় লেখা একটি বিশেষ নামপাটার ভাবনানির্ভর ঔপনিবেশিকতা, মেকলে মিনিট, মুৎসুদ্দি, ফাঁকিস্থান, মৌলবাদ, ধর্ম ও সংস্কৃতিস্পর্শী মানসভ্রমণ শেষে এই নাতিদীর্ঘ উদ্ধৃতির প্রসঙ্গ মরমে মর্মরিত হওয়ার ঘটনাটি যখন সংঘটিত হয় তখন নিজেকে সত্যিই মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বিবৃত ‘অপমানুষ’ মনে হয়, যার দেশ আছে কিন্তু দেশপ্রেম নেই, স্বাধীনতার নামে যে জীবনভর পরাধীনতাকে নিজের অজান্তে মান্যতা দিতে অভ্যস্ত, প্রভুভক্ত কুকুরের জীবন তার বড়বেশি প্রিয়। কল্পনার চেয়ে বিশাল এই বিচ্ছিন্নতার কোনও তুলনা হয় না।
মননে এত ভাবনার সূত্রপাতকারী এই নামফলকটিতে ভীষণ তাৎপর্যময় দু’টি শব্দে সর্জিত ‘ডেপুটি কমিশনার’ শব্দবন্ধটি আছে। শব্দ দু’টিকে কেউ কেউ বাংলায় ইংরেজি থেকে কৃতঋণশব্দের মর্যাদা দিতে ভীষণ উৎসাহ বোধ করেন। তাছাড়া শব্দদু’টির মু-মাল ডিসি (দুষ্ট লোকের স্ল্যাঙ্গুয়েজে এই ডিসির স্ল্যাঙ্গার্থ ‘ডায়রেক্ট ক্রিমিনাল’ হয়ে গেছে সেই কবে, তার ইয়াত্তা নেই, যেমন তারা এমপি-কে করে ফেলেছে ‘মহাপাপী’) তোÑ প্রতিষ্ঠাগুণে জেলা প্রশাসকের চেয়ে বেশি বোধগম্য কি না জানি না- ব্যাপক পরিচিতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে ইতোমধ্যে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এইভাবে দেশি শব্দের চেয়ে বিদেশী শব্দের প্রিয়তা কিংবা পরিচিতি মাঝে মাঝে বেশি পরিলক্ষিত হয় বটে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আমজনতার কারও কারও মগজে একটি দু’টি ইংরেজি শব্দ কাঁটার মতো আটকে আছে, এটাই সত্যি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য : সৈয়দ মুজতবা আলীর চুটকীর ঢাকাইয়া টাঙ্গাওয়ালার মগজাভিধানে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ নেই ‘ভার্সিটি’ আছে। ভার্সিটি তার কাছে বাংলা বলে সহজে বোধগম্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় অচেনা ইংরেজি বলে একেবারেই অবোধগম্য। গন্তব্যস্থানের নাম ইংরেজিতে বলার জন্য (টাঙ্গাওয়ালার ধারণা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ একটি ইংরেজি শব্দ এবং শব্দটি তার বোধগম্য নয়) সে তার যাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে। প্রায় দুই শত বছরের ঔপনিবেশিকতার জুয়ালটা তো চট করে ঘাড় থেকে নামনো যায় না। তার জন্য প্রচ- শক্তিধর অস্মিতা চাই, জয়নুলের আঁকা দ্রোহী ষাড়ের মতো।
নামপাটার নিচে ডেপুটি কমিশনারের বঙ্গায়ন লেখা হয়েছে ‘জেলা প্রশাসক’। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘ডেপুটি’ শব্দের ভুক্তিতে অর্থ প্রদত্ত হয়েছে, “১ প্রধান কর্মচারীর বা পরিচালকের সহকারী। ২ সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট বিশেষ।” অন্যদিকে ‘কমিশনার’ শব্দের ভুক্তিতে অর্থ প্রদত্ত হয়েছে, “১ বিভাগের প্রধান শাসনকর্তা। ২ পৌরসভার সদস্য। ৩ তদন্ত কমিটির সদস্য।” শব্দ দু’টির জোটবদ্ধ প্রকাশে যে-শব্দবন্ধ (ডেপুটি কমিশনার) তৈরি হয় অভিধানে প্রদত্ত অর্থানুসরণে সে-শব্দবন্ধের অর্থ ‘জেলা প্রশাসক’ হতে পারে বলে কোনও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ বা তৎসংক্রান্ত কোনও যৌক্তিক ইঙ্গিত বা ভাষাতাত্ত্বিক সমর্থন কোথাও নেই। বাংলা একাডেমীর ‘প্রশাসনিক পরিভাষা’ গ্রন্থে ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর অর্থ প্রদত্ত হয়েছে, “উপ-কমিশনার, উপ-মহাধ্যক্ষ”।(১১) বাংলা জেলা (জিলা) শব্দটা এসেছে আরবি ‘দিলা’ শব্দ থেকে। বাংলা একাডেমী বাংলা ব্যবহারিক অভিধানে ‘জিলা, জেলা’ ভুক্তিতে শব্দটির অর্থ দেওয়া আছে, “প্রশাসনিক বিভাগ; একাধিক উপজেলার সমষ্টি; বিভাগের ( division) অংশ বিশেষ; district।” বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান অনুসারে জেলা শব্দটির প্রথম প্রয়োগ ১৭৮৮ সালের ক্যালকাটা গেজেটে পরিলক্ষিত হয়। তৎকালের বাংলা পত্রিকা ‘সমাচার দর্পণ’-য়ে শব্দটির প্রথম ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় ১৮২৬ সালে। বির্তনমূলক অভিধানে অর্থ দেওয়া হয়েছে, “দেশ অথবা প্রদেশের প্রশাসনিক বিভাগ।” এ প্রসঙ্গে আর বেশি কেরদারিশমা প্রদর্শনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কেবল বলি : ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর বাংলা ‘জেলা প্রশাসক’ নয় এবং জেলা প্রশাসকের ইংরেজি ডেপুটি কমিশনার নয়। তাছাড়া একটিকে আর একটির প্রতিশব্দরূপে প্রতিপন্ন করাও কোনও যুক্তিতেই সঙ্গত নয়। তবে সেটা (ডেপুটি কমিশনারের বাংলা জেলা প্রশাসক) যদি আমলাতান্ত্রিকতার আমলামি হয় তা হলে অবশ্য কোনও কথা নেই। কী আর করা ! গুরু বাতেলাবীর গোলাম গুলমগির বলেন, ‘আমলা আক্কেলের অতলান্তিক। তার সঙ্গে আঁতলেমি করো না।’
ফারসি ‘কারচোব’ শব্দের অর্থ বস্ত্রের উপর সুক্ষ্ম কারুকাজ বা নকশা, বাংলাভাষায় শব্দটির প্রবসিত রূপ কারচুবি, কারচোপ এবং কারচুপি, কারচোপি। বির্তনমূলক অভিধানে প্রথম দু’টিরই অর্থ দেওয়া আছে : কাপড় বা অন্য কিছুর উপর নকশার কাজ। অন্য দু’টির মধ্যে একটি ‘কারচুপি’-র অর্থ দেওয়া আছে : ১ চালাকি, ২ অসদাচরণ ও অন্যটি ‘কারচোবি’-র অর্থ দেওয়া অছে : কৌশল, চালাকি। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই শব্দ দু’টি একই অর্থদ্যোতনা সম্পন্ন শব্দপ্রতীকের বানানভেদ মাত্র। এইভাবে শব্দের অর্থান্তর ঘটতেই পারে এবং যে কোনও জীবন্ত ভাষার ক্ষেত্রে এই রকম হওয়াটাই স্বভাবিক। অর্থাৎ স্থানকালপাত্রভেদে শব্দের অর্থের সংকোচ, প্রসার, উৎকর্ষ, অপকর্ষ ইত্যাদি ঘটে থাকে। সুভাষ ভট্টাচার্য বলেন, “অর্থ সংকোচে অর্থ ছোট হয়ে যায়, আর অর্থের বিস্তারে অর্থ প্রসারিত হয়। অর্থাৎ কোনও শব্দের অর্থ হয়ত ছোট ছিল, পরে বড় হল, প্রসারিত হল। কদর্য কথাটাকেই ধরা যাক। গোড়ায় এটা ছিল একটা বিশেষ্য শব্দ, আর এর মানে ছিল কুৎসিত স্বামী। খুব অবাক হচ্ছ কি? কদ্ মানে কুৎসিত। অর্য মানে স্বামী। দুয়ে মিলে (কদ্+অর্য) কদর্য, কুৎসিত স্বামী। পরে এর মানে বদলে গেল, পদও বদলে গেল। পদ ছিল বিশেষ্য, হল বিশেষণ। মানে ছিল কুৎসিত স্বামী, কিন্তু পরে হল কুৎসিত। স্বামী অস্বামী যা কিছু কুৎসিত তাকেই কদর্য বলা যায় এখন। (চলবে)


