ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) মাতৃভাষা কিংবা স্বদেশি ভাষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হলে মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তার একটি প্রমাণ, যারা মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করেন, তাদের প্রতি মাতৃভাষা-অজ্ঞ, শুধু ইংরেজি শিক্ষিত একদল মানুষ ক্রুদ্ধ এবং খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন, তারা ভাবেন এই সব আন্দোলন বুঝি ইংরেজির বিরুদ্ধে ! এটা সম্পূর্ণ বোঝার ভুল। ইংরেজি খুব ভাল শিখলেও মাতৃভাষা শেখা যাবে না কেন ? সব মানুষই দুটি বা তিনটি ভাষা অনায়াসে শিখতে পারে। আমাদের দেশের গান, নাটক, সাহিত্য, ফিল্মও তো ইংরেজিতে হয়ে যাবে না, বিভিন্ন ভাষার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জাপানিরা কাজের ভাষা হিসেবে ইংরেজি শিখলেও জাপানি ভাষা ত্যাগ করে না, ত্যাগ করলে তারা সমাজ জীবনে অংশ গ্রহণও করতে পারবে না। দু’জন ইংরেজি জানা জাপানি বা চিনে পরস্পরের সঙ্গে কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলে না। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে ইংরেজিনবিশরা নকল সাহেব কেন হতে চান, কে জানে।”(২) এটাকে সিন্দুবাদের ঘাড়ে গ্যাঁট হয়ে বসা ভূতের মতোন বাংলার মাথায় চড়ে বসা ইংরেজির খবরদারিত্ব বা মাতব্বরি যা-ই বলি না কেন মূলত ব্যাপারটা দাঁড়ায়, বংলাভাষার ভেতরে ইংরেজি ভাষার শব্দ প্রক্ষেপণক্রিয়া অব্যাহত রেখে বাংলাভাষীদেরকে স্বভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত পরিচালনা করা। বাংলাভাষাদেশে ইংরেজিচর্চা বা ইংরেজিপ্রীতির একটি প্রায়োগিক ব্যবস্থা সেই ১৮৩৭ সন থেকে এখনও পর্যন্ত সমাজ পরিসরে বিদ্যমান আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তার প্রমাণ বিধৃত আছে তৎকালে নামকরণকৃত যে-কোনও প্রতিষ্ঠানের নামে। এমনকি ‘কলিকাতা’ ও ‘বাংলা’ যথাক্রমে হয়ে গিয়েছিল ‘ক্যালকাটা’ ও ‘বেঙ্গল’। এখানে এই শহর সুনামগঞ্জে সেই ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত দু’টি বিদ্যালয়ের একটির নামকরণ করা হয়েছিল হাজি মকবুল পুরকায়স্থ হাই স্কুল (প্রতিষ্ঠা : ০১. ০১. ১৯৩৭) ও অন্যটির বুলচান্দ হাই স্কুল (প্রতিষ্ঠা : ০১. ০১. ১৯৩২)। এ দু’টি বিদ্যায়তনই এ দেশের দু’জন জনহিতৈষীর দানে প্রতিষ্ঠিত, তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের এতে কোনও অবদান নেই। আমাদের কাছে এ বিদ্যালয় দু’টি এইচএমপি হাই স্কুল ও বিসি হাই স্কুল বলে সমধিক পরিচিত। বিদ্যালয়ের নামের ‘হাই স্কুল’ বাদে বাকি ব্যক্তি নামের অংশটুকুর ইংরেজি মু-মালকরণের (সংক্ষেপায়ণ বা abbreviation) বাংলা প্রতিবর্ণীকরণই বিদ্যালয় দু’টির বর্তমান নাম। সহজ কথায় ইংরেজির বাংলায়ন অথবা বলা যায় ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে এক ধরনের ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে ‘বাংলার মাথায় ইংরেজির চড়ে বসা’ আর কি। বর্তমানে বিদ্যালয় দু’টির নাম ইংরেজি বর্ণের বাংলালিপিতে লেখার প্রতিরূপ মাত্র। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘হাই স্কুল’ শব্দদ্বয়ের বঙ্গায়ন ‘উচ্চ বিদ্যালয়’। এই নাম দু’টির বিবর্তনের ইতিহাস সহজেই প্রমাণ করে আমরা সার্বিক বিবেচনায় ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার বলয় ভেঙে মুক্ত হবো কি, সেটা তো দিল্লি দূরস্থ, এখনও পুরোপুরি বন্দি হয়ে আছি। অর্থাৎ ইংরেজিনবিসিপনা করতে গিয়ে নকল সাহেব বনে বসে আছি এবং মুক্তির কোনও সচেতন উদ্যোগও আপাতত ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না। এক্ষেত্রে মুক্তির বাসনা ব্যক্ত করা হয়েছে শাবিপ্রবি (শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়), নোবিপ্রবি (নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়), বাউবি (বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়), ঢাপ্রবি (ঢাকা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়), ঢাবি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), আশিশিনি (আদর্শ শিশুশিক্ষা নিকেতন) ইত্যাদির মতো মু-মালনাম সর্জনের সক্ষমতা প্রদর্শন করে, যাকে সীমিত ক্ষেত্রে প্রচেষ্টার উদাহারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় মাত্র। বিশেষ করে শিক্ষিত মহলে দৃশ্যমান আছে ওই ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার বলয়ের সীমা অতিক্রম না করার প্রবণতা এবং এই প্রবণতা বর্তমান সমাজের বিশেষ একটি শ্রেণির মধ্যে প্রবলভাবে সক্রিয় আছে। মনে হচ্ছে এই প্রবণতার বিদ্যমানতার প্রমাণ স্বরূপ উদাহরণ প্রতিস্থাপন করা জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রসঙ্গক্রমে কয়েকজন বিখ্যাত কিংবা অবিখ্যাত লেখকের ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবাদিতার উদাহরণ উদ্ধৃত করা যাক।
ধ্রুব এষ সুনামগঞ্জের কৃতীসন্তান, তিনি দেশে-বিদেশে বিখ্যাত, দেশের যশস্বী প্রচ্ছদশিল্পী, সাহিত্যিক হিসেবে নামডাক কম নয়, গল্প উপন্যাস কবিতা দেদার লিখে সাহিত্যচর্চায় সব্যসাচীত্বের প্রমাণ রেখেছেন। তাঁর একটা সায়েন্স ফিকশন(৩) পড়েছি। সব লেখকের লেখা পড়া-হয়ে ওঠে না, এমনটি সম্ভবও নয়, তাঁর লেখা হাতের কাছে পেলেই পড়ি, যদিও সব সময় পাই না। গল্পটি পড়ে আমার বেশ লাগলো। কল্পবিজ্ঞানের গল্প হিসেবে গল্পটির যৎকিঞ্চিৎ বৈজ্ঞানিক ত্রুটি (অন্তত আমার মতানুসারে, এখানে বিস্তারিত বলার অবকাশ নেই) থাকা সত্ত্বেও আমার কাছে বেশ চমৎকার লেগেছে, মজাও পেয়েছি। সাহিত্যকৃতিকে হতে হয় পাঠকচিত্তরঞ্জক। কিন্তু যে-কোনও একজন ভাষাসচেতন পাঠকের কাছে গল্পের এই বৈজ্ঞানিক ত্রুটির চেয়েও বাক্যের মধ্যে যখন তখন যত্রতত্র দেদার ইংরেজি শব্দের প্রক্ষিপ্ততা বড় উৎকট-ভজকট বলে পরিলক্ষিত হতে পারে, বলে মনে হয়েছে। সাহিত্যসর্জনের ক্ষেত্রে এরকম অকারণ ইংরেজিপ্রীতিকে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার নামান্তর বলে চিহ্নিত করা, বোধ করি সাহিত্যবিধিবহির্ভূত আচরণ বলে বিবেচিত হবে না।
গল্প-উপন্যাস বা কবিতা-প্রবন্ধ ইত্যাদির ভাষার মধ্যে অজস্র ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বর্তমানে এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে তা ভাষিক-শৈল্পিক প্রয়োজনের মাত্রাকে অতিক্রম করে অপ্রয়োজনীয় বাহুল্যে পর্যবশিত হয়ে পড়ছে উভয় বঙ্গের কীছু কীছু নয়, প্রায় লেখকের লেখায়। শ্রীএষ তাঁর এই ছোট গল্পটিতে (মহাশূন্য) ১৬২টি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন (যে সব শব্দ একাধিক বার ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোকে গণনায় একবার করেই ধরা হয়েছে। এবং স্বীকার করে নিচ্ছি যে, উল্লেখিত শব্দসংখ্যাটি প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে দুয়েকটি কম বেশি হতে পারে)। আমি বলছি না যে তাঁর গল্পের মধ্যে অপরিহার্য ইংরেজি শব্দ নেই। ‘অপরিহার্য ইংরেজি শব্দ’ সেগুলোই, যে-ইংরেজি শব্দগুলো বাংলাভাষীদের ভাববিনিময়ের ক্ষেত্রে বলতে গেলে একরকম অবিকল্প শব্দের মর্যাদাসম্পন্ন অর্থাৎ ব্যবহার করতে একান্তভাবে বাধ্য না হয়ে কোনও উপায় নেই। যেমন মন্তাজ ( montage ) তেমনি একটি অবিকল্প ইংরেজি শব্দ। অর্থাৎ ইংরেজি শব্দটিকে ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে জনবোধ্য অথচ অবিকল্পশব্দ হতে হবে, যার বিকল্প-বাংলা-শব্দ নাই বা আমরা বাংলাভাষীরা তৈরি করতে পারিনি কিংবা বিদ্যমান থাকলেও আমরা তেমন ব্যবহার করি না অথবা আমাদের মধ্যে প্রচলিত নয়। বাংলায় প্রচলিত এমন অবিকল্প ইংরেজি শব্দের সংখ্যা অসীম নয়, অবশ্যম্ভাবীভাবে অঙ্গুলিমেয়। আর ইংরেজি অভিধান থেকে ইচ্ছেমতো যে-কোনও শব্দ এনে বাংলা বাক্যের যত্রতত্র বসিয়ে দিলেই শব্দটি কোনও এক জাদুমন্ত্রবলে বাংলাভাষায় ব্যবহৃত হওয়ার মতো অবিকল্প ইংরেজি শব্দের যোগ্যতা অর্জন করে ফেলে না বা বাংলাভাষায় কৃতঋণশব্দরূপে মর্যাদা পেয়ে যায় না। শ্রীএষের গল্পটিতে ব্যবহৃত ইরেজি অবিকল্প শব্দগুলো বাদ দেওয়ার পরও অনেক ইংরেজি শব্দ আছে যেগুলো একাধিক বার, এমন কি অনুসন্ধান করলে হয় তো জানা যাবে যে, ১০ বারেরও বেশি বার ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলোকে, আগেই বলেছি, গণনায় একবার করে ধরেই এই ১৬২টি শব্দ পাওয়া গেছে (যদি অনবধানতাবশত, আবারও বলছি, দুয়েকটি কম-বেশি হয়ে যায়, সে জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।)। এই ১৬২টি শব্দের প্রায় শব্দই একাধিক বার ব্যবহৃত হওয়া অনুসারে গল্পটিতে ইংরেজি শব্দসংখ্যা কতটা আমি গণনা করিনি। যেখানে একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করে সারা জীবন বাংলাভাষায় গল্প লেখার বিরল ক্ষমতা আছে শ্রীএষের, আমি তাঁকে ভালো করে চিনি/জানি এবং তাঁর কল্পনাতীত সর্জনক্ষমতা সম্পর্কে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই, এই অসম্ভবকে তিনি ইচ্ছে করলেই সম্ভব করতে পারেন, সেখানে কেন এমন ইংরেজি শব্দের এত অনাবশ্যক ছড়াছড়ি থাকবে তাঁর গল্পের ভেতরে ? প্রশ্নটা একান্ত সঙ্গত কারণেই উঠতে পারে। তিনি কি গল্প, উপন্যাস, কবিতা সৃষ্টির সময় বিভাষার শব্দ ব্যবহার না করার নীতি অনুসরণ করতে পারেন না ? নিশ্চয়ই পারেন। ইচ্ছে করলেই পারেন। কিন্তু করেন না কেন, সেটা অনেকটাই ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা শীতের সকালের মতো অস্পষ্ট । কিংবা আমি কোনও না কোনও যুক্তির ভিত্তিতে একটা কীছু কল্পনা করে নিতে পারি, যে-টা মোটেও সঙ্গত হবে না, আমাদের উভয়ের পক্ষেই।
বাংলাভাষায় ইংরেজি শব্দের এই অপ্রয়োজনীয় প্রক্ষেপ কিংবা প্রক্ষিপ্ততা কিংবা অনুপ্রবেশ বাংলাভাষাকে কতোটা প্রদূষিত করছে সেটা নির্ণয়ের আগে এটা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায় যে, ভাষা-ঔপনিবেশিকতার নিগড়ে আমাদের লেখক-সাহিত্যিকরাও কম-বেশি শৃঙ্খলিত ও ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত, লেখকদের ক্ষেত্রে যেটাকে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা বলা যায়। তাঁরা ভুলে যান যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁদের চেয়ে নিশ্চয়ই কম ইংরেজি জানতেন না, তিনি ইংরেজি ভাষায় একটি কাব্যও লিখেছিলেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার তো বলতে গেলে প্রায় শূন্যের কোঠায় পড়বে বলেই মনে হয়। তাই বলে তাঁর রচনা সাহিত্য পদবাচ্যতা হারিয়ে ফেলেছে এমন তো কীছু নয়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও একশত বছর পর পর্যন্ত যে ভাষায় সার্থক সাহিত্যচর্চা চলেছে নিরন্তর, ভাষা আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ মিলেছে, অধিকন্তু আজকাল যখন বাংলাসাহিত্য সকল দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে বিশ্বসভায় মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে, জটিল ও উচ্চভাব প্রকাশে তার কোনও জড়তা নেই, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বাংলা পরিভাষা তৈরি হয়ে গেছে। জীবনানন্দ তার কবিতায় ভীষণ জটিল কিন্তু অপরূপ চিত্রকল্প নির্মাণ কৌশলের সামর্থ্য প্রদর্শন করে এ ভাষার ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে গেছেন, কমলকুমার মজুমদার অনুবাদ অযোগ্য ভাষাশৈলী সৃষ্টি করে গেছেন, তখন কেন ইংরেজির কাছে এই ভিক্ষাবৃত্তি? বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় দিকপাল গল্পকার কিংবা উপন্যাসিকরা এই শৃঙ্খল ভাঙতে পারেন না, তা কিন্তু নয়, তাঁরা এতটাই শক্তিধর যে তাঁরা ইচ্ছা করলেই ইংরেজির প্রতি এই অকারণ মুগ্ধতা ভাঙতে পারেন, এমন কি নতুন ভাষাশৈলী তৈরি করতে পারেন। কমলকুমার মজুমদার, সতীনাথ ভাদুড়ী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, শওকত আলী, অখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির নতুন নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরি করতে পেরেছেন। কিন্তু কেন যে কীছু কীছু লেখকের ইংরেজির প্রতি অকারণ মুগ্ধতা কাটে না তা আমার বোধগম্য নয়, তবে অনুমান করত পারি, তাঁরা ইংরেজিমনস্ক বিশেষ একটি শ্রেণির মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থাকেন এবং লেখক নিজেও ওই বিশেষ শ্রেণিরই প্রতিনিধি। তাঁরা হয় তো ভাবেন, ইংরেজির দ্বারা তাঁরা তাঁদের পাঠকপ্রজার মনোরঞ্জন করতে সক্ষম হয়ে সত্যিসত্যি প্রজামনোরঞ্জক রাজা বনে যাবেন। একটু অন্যভাবে ভাবলে বলা যায়, লেখকের এই ইংরেজিপ্রীতির মূলে পাঠকমনোরঞ্জন নয়, হয় তো বাণিজ্যবাসনা কার্যকর আছে। বইয়ের দাম সম্প্রতি আকাশচুম্বী। বইক্রেতার অধিকাংশই কমবেশি ইংরেজিমনস্ক মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা দারিদ্র্যসীমার উপরে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠী। যারা স্বভাবতই ইংরেজি পছন্দ করেন। বাক্যের বাংলা শব্দের ফাঁকফোঁকড়ে দুই একটা ইংরেজি- তা হোক জনদুর্বোধ্য, কুচ পরোয়া নেই- থাকলে দু’এক বোতল মেরে দেওয়ার মতো আনন্দ মাগনা মেলে।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি লেখায়(৪) কমবেশি ১৮০টির মতো, আর একজন লেখক শঙ্করলাল ভট্টাচার্যর লেখায়(৫) কমবেশি ৩৮০টির মতো ইংরেজি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁদের লেখায় বৈয়াকরণের দেওয়া সংজ্ঞানুসারে কৃতঋণশব্দ বা বাংলায় ‘নিজস্ব শব্দ’ হিসেবে গৃহীত হয়ে গেছে এমন ইংরেজি শব্দের অভাব আছে তা কিন্তু নয়। দু’চার পঙক্তি লিখলেই একটা না একটা ইংরেজি শব্দ স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। এই এখনই আমার লেখায় বাংলা ‘পঙক্তি’ শব্দটির স্থলে ইংরেজি ‘লাইন’ শব্দটি এসে গিয়েছিল, তাকে বাক্যের বাইরে রেখে দিতে রীতিমত জোর প্রয়োগ করতে হলো, তাকে বাতিল করে দিয়ে খুঁজেপেতে আনতে হলো পঙক্তিকে, কিন্তু ‘লাইন’কে কিন্তু খুঁজে আনতে হয়নি সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মন থেকে এমনিতেই এসেছিল। আসলে আমরা বাঙালিরা যতোটা ‘লাইন’-য়ে ততোটা ‘পংক্তি’-তে অভ্যস্ত নই। এ রকম মনের ভেতর ঠাঁই করে নেওয়া সর্বত্র ব্যবহৃত ও সর্বজনবোধ্য ইংরেজি শব্দগুলোই বাংলা শব্দ হয়ে গেছে বলে ধরে নিতে হবে, আমাদের বাংলা অভিধানগুলোও বাংলাভাষায় আপন করে নেওয়া এমন জনবোধ্য ইংরেজি শব্দগুলোকে নিজের শব্দভুক্তিভুক্ত করতে কোনও কার্পণ্য করেনি, আরবি-ফারসি প্রভৃতি বিভাষার এন্তার শব্দের ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে, পৃথিবীর যে-কোনও ভাষার ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে থাকে আর হওয়াই স্বাভাবিক। ব্যাকরণে এমন সহজবোধ্য ইংরেজি বা পরভাষার শব্দের বাংলা হয়ে ওঠা শব্দগুলোই কৃতঋণশব্দ হিসেবে স্বীকৃত। লেখক তিন জনের লেখায় ব্যবহৃত শব্দগুলির নমুনা দাখিল করলে যে-কারও সন্দেহ হতে পারে আমি ইংরেজি অভিধান থেকে ইচ্ছে করে সাধারণ পাঠকরা যে-সব শব্দ সহজে বুঝতে পারবেন না, ইংরেজিতে শিক্ষিত ছাড়া অন্য কাউকে বুঝতে হলে অভিধান খোলতে হবে, এমন সব শব্দ এখানে সন্নিবেশিত করেছি। পাঠকরা ইচ্ছে করলে যে-কোনও বাংলা অভিধান খোলে দেখে নিতে পারেন শব্দগুলোর মধ্য থেকে কোন্ কোন্ শব্দ অভিধানে বিদেশি বা কৃতঋণশব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে, এদের একটিকেও আশা করি পাবেন না। লেখকদের প্রত্যেকের লেখা থেকে মাত্র কয়েকটি করে নির্বাচিত শব্দ উদাহরণ স্বরূপ পাঠকদের বিবেচনার জন্যে উদ্ধৃত করছি- পার্পল, সাইকো, হার্টথ্রব, এ্যাবস্টেক্ট (ধ্রুব), পিউরিটান, ম্যাসিভ, র্যাম্প, ফিউরিয়াস, ইমিউনিটি (শীর্ষেন্দু), লুকোপ্লাস্ট, অরগ্যাম, রাইম, রিজন, জেরক্স (শঙ্করলাল)। আগেই বলেছি এ শব্দগুলো বিশেষভাবে ইংরেজি শিক্ষিত ছাড়া সাধারণ পাঠকদের সবার বোধগম্য হবে বলে মনে হয় না, তাই এ থেকে এমন একটি প্রত্যয় জন্মে যে, যেনো বা ইংরেজি ভাষার সমস্ত শব্দই বাংলা শব্দের স্বীকৃতি পেয়ে কৃতঋণশব্দ হয়ে গেছে বা ইংরেজি অভিধান থেকে ইচ্ছে মাফিক যে-কোনও শব্দ তোলে এনে বাংলা বাক্যে সন্নিবেশন করামাত্র তা এমনিতেই বাংলা শব্দপ্রতীকের রূপ লাভ করবে বা বাংলাভাষীদের কাছে বোধগম্য আদি অকৃত্রিম বাংলা শব্দরূপে স্বীকৃত হয়ে যাবে। বাংলা বাক্যে গাদনক্রিয়ার মতো করে এমন নির্বিচার ইংরেজি শব্দের প্রক্ষেপণ বা প্রবিষ্টকরণকে সমর্থন করার জন্য আর একটি টুটকা যুক্তি এমন হতে পারে যে : মাঝে মাঝে বাংলা বাক্যের মধ্যে দুর্বোধ্য বাংলা শব্দের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, তখন তো অভিধান খোলে শব্দটির অর্থ সন্ধান করার কষ্ট স্বীকার করতে কোনও কার্পণ্য করা হয় না; শিবনারায়ণ রায়ের কোনও লেখা পড়তে গিয়ে যেমন প্রায়শ অভিধানের দ্বারস্থ হতে হয়, শুধু তাই নয় এমন কি মাঝেমধ্যে সংস্কৃত ব্যাকরণের মহারণ্যে প্রবিষ্ট হয়ে শব্দার্থকে গরুখোঁজা করে মরতে হয়; সেভাবে না হয় বাংলা বাক্যের মধ্যে ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দের অর্থটা মাঝেমধ্যে ইংরেজি অভিধান খোলে দেখে নিতে হবে, তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। এমন হলে তো সব লেঠা চুকে যায়, কোনও সমস্যাই আর সমস্যা থাকে না। অর্থাৎ বাংলাভাষীদের কাছে বাংলা আর ইংরেজি অভিধানের মধ্যে আর কোনও ইতর বিশেষ থাকবে না, উৎকৃষ্ট মুড়িঘন্ট বা খিচুড়ির মতো বাংলা ইংরেজির একটি মহাভাষাঘণ্ট একেবারে হস্তামলক হয়ে যাবে। আর প্রকারান্তরে বাঙালিরা ইংরেজি শিখে দ্বিভাষিক জাতি না হয়ে হয়ে উঠবে বাংলিশ/বাংরেজি জাতি, ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাঙলাদেশের অস্তিত্বের বাংলারঙটি অগস্ত্যযাত্রা করবে। ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রণোদনা চালিয়ে বাংলাদেশে দ্বিভাষিকতা সর্জনে বর্তমানে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। দ্বিভাষিকতার সংজ্ঞার্থ হলো : দুইটি আলাদা ভাষা আলাদাভাবে ব্যাকরণসম্মতভাবে শেখা ও ব্যবহারিক জীবনে সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সংঘটনের উপায়রূপে অলাদা আলাদাভাবে ভাবপ্রকাশে সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ দ্বিভাষিকতা বোঝাতে ভাষা দু’টিকে একটির সঙ্গে আর একটির মিশ্রণ ঘটানো বা দু’টি ভাষার একটি সম্পৃক্ত দ্রবণ বোঝায় না। আলোচ্য লেখকদের গল্পের ভাষায় লেখকরা বাংলাবাক্যে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সচেতনভাবে যে-বাংরেজি দ্রবণ তেরি করছেন, প্রকৃতপ্রস্তাবে তা কোনও বাংলা-ইংরেজির উত্তম দ্রবণ নয়, বরং একধরনের ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা, প্রকারান্তরে ভাষাধর্ষণ। মনে হয় যে, যে-কোনও লেখককে আবদুশ শাকুর হতে হবে। তিনি বলেছেন, “আমি একজন লেখক, জেনেশুনে একটি ইংরেজি শব্দকে অকারণে আমার লেখায় কেন ফিউশন করব? এই স্বাধীনতা ভাষা আমাকে দেয় না।”(৬) এই যখন একজন যশস্বী লেখকের অভিমত, তখন সাধারণ্যে দুর্বোধ্য এই সব ইংরেজি শব্দের ব্যবহার নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
পাকিস্তানি আমলে ‘বাংলা বিনাশের চক্রান্তরূপে’ পূর্বাঞ্চলে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র ভাষাবিচ্ছিতাকে প্রয়োগ করা হয়েছিল। তারা ‘মুসলমানি ভাষা’ সর্জনের অজুহাতে, বাংলাভাষাদেশে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ জোর করে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, গাদনক্রিয়ার মতো । এই লেখকরাও কি সচেতনভাবে তাই করছেন ? অবশ্য দু’টিতে বেশ কীছু তফাৎ আছে। কর্মটি তখন করা হয়েছিল আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের দ্বারা আর এখন করা হচ্ছে ইংরেজি শব্দের দ্বারা। উভয় ক্ষেত্রেই ক্রিয়াটি প্রকৃতপ্রস্তাবে গাদন, তা ভদ্রভাবে প্রক্ষেপণ বা প্রবিষ্টকরণ যে নামেই ডাকা হোক না কেন। তখন প্রক্ষেপণকরণকর্মের মুখ্যকর্তা ছিল ঔপনিবেশিকতার প্রত্যক্ষ প্রতিভূ বিভাষী পাকিস্তানি স্বৈরাচার ও কতিপয় বাঙালি কারিন্দা (যথার্থ অর্থে রাজকার), আর এখন কর্মের কর্তা ভাষাবিচ্ছিন্নতাব্যাধিতে আক্রান্ত বাংলাভাষী সাহিত্যিকরা, তাঁরা কেউ বহির্দেশি ও বিভাষী নন।
বিশেষ একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গদ্য লেখকদের পক্ষে একজন কবির মতোন উত্তর দেওয়া কীছুতেই সঙ্গত হবে না। কবি বলতেই পারেন আমার কবিতা কেউ বুঝলে বুঝুক বা নাই বুঝুক আমি কবিতা লিখবই। কিন্তু মনে রাখতে হবে কবির এই সগর্ব ঘোষণার মধ্যে বিভাষা প্রবসনের আপদ আদৌ নেই। মাতৃভাষার শব্দরতœ ব্যবহার করেই কবি তাঁর অনির্বচনীয় ভাবানুভাব ও অনুমিতি ব্যক্ত করেন বা তাঁর কাব্যিক জটিলতার প্রচ্ছন্নতা সর্জন করে অপরূপ চিত্রকল্প তৈরি করেন। তাই দুর্বোধ্য হওয়ার অধিকার যেমন কবির আছে সাধারণত গল্পকার কিংবা ঔপন্যাসিকের সে অবকাশ তেমন নেই (যদিও তাঁরা কেউ কেউ যে-যাদুবাস্তবতার জন্ম দেন, তাতে কারও কারও মতে দুর্বোধ্যতার প্রপন্নতা পরিলক্ষিত হয়)। আর তাঁরা যদি সে রকম কেউ হতে চান তাঁদরেকে অবশ্যই একমেবাদ্বিতীয়ম টমাস মান বা কমলকুমার মজুমদার হতে হবে। আর মান-কমলদের মতো হতে পারলেই কেবল তারা দুর্বোধ্য হবার অধিকার পাবেন, অন্যথায় নয়। তবে মনে রাখতে হবে যে ‘ইংরেজি পাণ্ডিত্যের স্বকীয় ভাণ্ডার থেকে’ সুন্দর সুন্দর অসীম ভাবার্থধর শব্দ তুলে এনে বাংলা বাক্যের কাঠামোর ভেতরে জোরপূর্বক প্রক্ষেপণ করে দিলে তা বাংলাভাষায় অর্থহীন বিদেশি শব্দের প্রবিষ্টকরণ বলে বিবেচিত হবে সহজেই, যে-প্রবিষ্টকরণ বাংলাভাষার সঙ্গে লেখকের অধ্যাপকীয় গাদনক্রিয়া ব্যতীত অন্য কীছু বলে বিবেচিত হবার যোগ্য নয়। এইরূপ ‘অধ্যাপকীয় গাদনক্রিয়া’ সত্যিকার অর্থেই যাকে বলে একটি ‘অশ্লীল সাহিত্যপনা’, এমনকি তথাকথিত এই সাহিত্যপনা ভাষার উর্বর পেটে পোতা জাগিয়ে তোলার অলৌকিক কোনও ক্ষমতা সংরক্ষণ করে না যে, আলাদা কোনও ভাষাশৈলী তৈরি করবে, সেটা (আলাদা ভাষাশৈলী) কেবল তৈরি হতে পারে ভাষার আন্তর্শক্তির উজ্জীবন ঘটিয়েই। কোনও ভাষায় বিভাষার (আরবি, ফারসি, উর্দু কিংবা ইংরেজি ইত্যাদি বাংলা ভিন্ন অন্য যে-কোনও ভাষার) শব্দ প্রক্ষেপণ (প্রক্ষেপণ ভাষাভ্যন্তরে বিশেষক্ষেত্র ব্যতীত সর্বাবস্থায় কৃতঋণপ্রপঞ্চ সম্পন্ন করে না, ফলে গাদনক্রিয়ার চেয়েও অধিক অশ্লীলতা সর্জিত হয়) করে সে-ভাষার আন্তর্শক্তির উজ্জীবন ঘটানো যায় না। আগে একাধিক বার বলেছি, পাকিস্তান আমলে বাংলার সঙ্গে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের একীভবন ঘটিয়ে একটি আলাদা ভাষা তৈরির সচেতন প্রচেষ্টা চলেছিল। অদ্ভুত ছিল সে ভাষা, সে ভাষারীতির দ্বারা কোনও আলাদা ভাষাশৈলী সৃজিত না হলেও ভাষাকে ‘গাদনক্রিয়া’র দ্বারা প্রদূষিত করার যথার্থ ও পরিপূর্ণ সম্ভব্যতা পরিলক্ষিত হয়েছিল। সে ভাষা সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ বলেন, “বাঙলা বিনাশের চক্রান্তরূপে ওই গোষ্ঠী একরকম ‘পাকিস্তানি বাঙলা’ বিকাশেরও চেষ্টা করেছিল। এই ‘পাকিস্তানি বাঙলা’র চেহারা এমন : গোজাশতা এশায়েতে আমরা অতীতে বাঙলা ভাষার নানা মোড় পরিবর্তনের কথা মোখ্তাসারভাবে উল্লেখ করেছিলাম। বাংলা ভাষা মুসলমান বাদশাহ্ এবং আমীর-ওমরাহদের নেক নজরেই পরওয়ারেশ পেয়েছিল এবং শাহী দরবারের শান-শওকত হাসিল করেছিল। (মাহে-নও, ১ : ৭, ১৯৪৯)।’’(৭)
আজ একবিংশ শতকের প্রথম দশকের সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে বলতে হচ্ছে, ভাষৌপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরে ফিরিয়ে নেবার ফাঁকতাল খোঁজছেন আমাদেরই কতিপয় যশস্বী সাহিত্যিক। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাছে সশ্রদ্ধচিত্তে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, আদপে তারা কি ‘জান্তে কিংবা অজান্তে’ (‘জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে’) ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার কারিন্দা ? এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর বা জুতসই একটি মীমাংসা দিয়ে গেছেন আমাদের এক যশস্বী প্রাবন্ধিক আব্দুশ শাকুর। স্বকৃত নোমান এক প্রবন্ধে আবদুশ শাকুর সম্পর্কে লিখেছেন, “যেমন ‘ফ্লাট’কে তিনি (আবদুশ শাকুর) লিখতেন ‘মহল’, কথাসাহিত্যিক না লিখে লিখতেন ‘কথাকার’। জিজ্ঞেস করলাম, ফ্লাট সর্ববাঙালির কাছে পরিচিত একটি শব্দ। বাংলা ভাষায় ফিউশন হওয়া এই ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করলে আসুবিধা কী? উত্তরে তিনি বললেন, বাংলা ভাষায় শব্দটি ফিউশন করেছে কারা ? নিশ্চয়ই লেখকরা ! সেই লেখক দলিল লেখক হোক, কেরানি, পুস্তক লেখক বা কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক হোক। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে শব্দটি হয় তো মুখে মুখে ব্যবহার করত ইংরেজি ভাষার আগ্রাসনের শিকার সাধারণ মানুষ। কিন্তু লেখক তার লেখনীর মাধ্যমে শব্দটিকে স্বীকৃতি দিলেন বলেই তো বাঙালিসাধারণ এটিকে অতিউৎসাহের সঙ্গে ব্যবহার করছে। লেখকরাই ভাষার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেন। আমি একজন লেখক, জেনেশুনে একটি ইংরেজি শব্দকে অকারণে আমার লেখায় কেন ফিউশন করব ? এই স্বাধীনতা ভাষা আমাকে দেয় না। দেখ, ফ্লাট শব্দটি লেখা কতটা কঠিন। প্রথমে ‘ফ’, ফ-এর সঙ্গে ‘ল’ সংযুক্ত, তারপর ‘্য’, তারপর ‘া’, তারপর ‘ট’। ঘোরানো-প্যাঁচানো এই জটিল শব্দটি কেন আমি ব্যবহার করব ? বাংলা ভাষায় মাত্র তিনটি অক্ষরে সহজ-সাবলীর ‘মহল’ শব্দটিকে আমি কেন উপেক্ষা করব? এই উপেক্ষা ঔপনিবেশিক প্রভাবিত হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ বলে আমি মনে করি।”(৮) তিনটি অক্ষরে সহজ-সাবলীর ‘মহল’ শব্দটিকে আবদুশ শাকুর উপেক্ষা করার কোনও কারণ খোঁজে না-পেতেই পারেন। সেটা তাঁর একান্ত প্রাতিস্বিক ব্যাপর। কিন্তু ভজকট একটা থেকেই গেল। বাংলায় ইংরেজি শব্দ বর্জনের ভাষ্য বা বিবৃতি রচনা করতে গিয়ে ইংরেজি ‘ফিউশন’ শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া গেলো না, বিষয়টা সচেতন কারও পক্ষে মেনে নেওয়া সমীচীন হবে কি ? তাও এমন একজন পাঠকের পক্ষে যিনি ‘জেনেশুনে একটি ইংরেজি শব্দকে অকারণে’ একজন লেখকের নিজের লেখায় ব্যবহারের আপত্তির বিষয়ে অবগত হয়েছেন এবং স্মার্তব্য যে, পাঠকের এই অবগতি (অকারণে বাংলাভাষার বাক্যে ইংরেজি বা ব্যাপক অর্থে অবাংলা শব্দ ব্যবহার অসঙ্গত ও অকারণ ব্যভিচার) আবদুশ শাকুরের মতো বাংলাভাষায় অকারণে ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের ঘোর বিরোধী একজন লেখকের বিবৃতিতে প্রবসিত হয়েছে। এখানে লেখক স্বকৃত নোমান স্বয়ং ‘ফিউশন’ শব্দটিকে কথোপকথনের মধ্যে প্রথম প্রয়োগ করেছেন বা গলিয়ে দিয়েছেন অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফিউশন’ করেছেন। অর্থাৎ এখানে বাংলাবাক্যে গলনবিরোধী (ফিউশনবিরোধী) কথাবার্তায় একটি গলন (ফিউশন) ঘটেছে। এতে সহজেই বোধোদয় হয় যে, যেখানে দু’জন ভাষাসচেতন সাহিত্যিকের কথোপকথনে বাংলা ভাষায় ইংরেজির গলন (ফিউশন) ঘটে, সেখানে সাধারণক্ষেত্রে বাংলাভাষায় ইংরেজির গলনকে (ফিউশনকে) ঠেকানো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রকৃতপ্রস্তাবে আমরা বাঙালিরা ইংরেজির বিশ্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না, ইংরেজি আমাদের মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন ভাষাবিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি, আরও যথার্থ অর্থে বলতে গেলে বলতে হয় একটি ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে রেখেছে। প্রমাণ হিসেবে স্বকৃত নোমানকে (সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থী শ্রদ্ধেয় স্বকৃত নোমানের কাছে, আবদুশ শাকুর ‘ফিউশন’ শব্দটি হয় তো ব্যবহার করতেন না যদি না অনবধানতাবশত শব্দটির অবতারণা আপনি না করতেন, এমনটি কল্পনা করে নিয়ে।) তো হাতের কাছেই মিললো, সেটা থেকে যখন স্বকৃত নোমানের মতো সম্পন্ন লেখকেরা বেরিয়ে আসতে পারছেন না আমরা সাধারণরা তো কোন ছার। তা ছাড়া আরবি থেকে বাংলাভাষাদেশে আগত এবং প্রবসিত বহুরূপী ‘মহল’ শব্দটিকে নিয়ে যে-কারও আপত্তি থাকতে পারে। শব্দটি বহুরূপী, এর একাধিক অর্থ আছে। মহল বলতে সমাজ, সংঘ, শ্রেণি বুঝি । তেমনি বুঝি গৃহ, ঘর, বাড়ির অংশ। ক্ষেত্র বিশেষে তালুক বা জমিদারির অংশ অর্থাৎ বিস্তৃত ভূসম্পত্তিও বুঝতে পারি। সুতরাং ‘ফ্লাট’ শব্দটির বাংলা বহু অর্থবোধক ‘মহল’ ব্যবহার না করে আলয়, আবাস, ভবন, সদন, নিলয়, গৃহ, ঘর ইত্যাদি বাংলা শব্দ থেকে পছন্দসই যে-কোনও একটাকে ব্যবহার করা কি বেশি সঙ্গত নয়?
স্বীকার করছি আমি অধম ইংরেজিতে একবারেই ক-অক্ষরগোমাংস। তবু ‘ফিউশন’ শব্দটি কর্ণকুহরে প্রক্ষিপ্ত হলেই এটমবোমা আর এটমবোমার বিস্ফোরণের ভয়াবহ প্রসঙ্গ মনে পড়ে যায়। প্রায়োগিক পদার্থবিদ্যার সঙ্গে শব্দটির আত্মীয়তা খুব। এটি কী করে বাংলাভাষার ক্ষেত্রে নিজের সম্পৃক্ততাকে পাকাপোক্ত করতে চায় সেটা আমার একেবারেই বোধাগম্য নয়। দায়সারা গোছের একটি গরুখোঁজা করে যা পেলাম তাতে মনে হলো ‘ফিউশন করেছে’ মানে ‘গলিয়ে দিয়েছে’ যদি হয়, তবে এই শব্দটির অনায়াসে বাংলা করা যায় একীকরণ বা প্রক্ষিপ্ততা। আবদুশ শাকুর যদি ‘বাংলা ভাষায় শব্দটি ফিউশন করেছে কারা?’ না বলে ‘বাংলা ভাষায় শব্দটি সংমিশ্রণ করেছে কারা?’ বা ‘সংমিশ্রণ করেছে’-এর স্থানে ‘মিশিয়ে দিয়েছে’ বলতেন, তা হলে কি ভাবপ্রকাশে ঘাটতি দেখা দিত, না কি ভাববিনিময়ের কার্যসিদ্ধি হতো না, কথোপকথনরত দু’জনের মধ্যে ভাষিক সংযোগ স্থাপনে কোনওরূপ বিঘ্ন ঘটতো? আমাদের বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধানে শব্দটির বাংলা অর্থ করা হয়েছে : ‘গলন, একীভবন, সংমিশ্রণ’। অন্যদিকে কলকাতার সাহিত্য সংসদ ইংরেজি-বাংলা অভিধানে শব্দটির বাংলা অর্থ করা হয়েছে : ‘গলন, গলাইয়া বা গলিয়া মিশ্রণ, একীকরণ বা একীভবন’। একটি কথা স্পষ্ট যে, ইংরেজি ফিউশন শব্দের বাংলা নেই বা জুতসই বাংলা করা যাবে না এমন যুক্তি উত্থাপন করে শব্দটিকে বাংলাভাষায় অপরিহার্য কৃতঋণশব্দ হিসেবে (চেয়ার, টেবিল-এর মতো) গ্রহণের কোনও যৌক্তিকতা নেই। অপরদিকে যদি কেউ আবদুশ শাকুরের মতো ‘ফ্লাট’ শব্দটিকে বাতিল করে দিয়ে ‘মহল’ (< আ. মহুল) শব্দটিকে ছাড়পত্র দেবার সমীচীন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকেন তবে সেটা সর্বার্থে ভাষাবিচ্ছিন্নতার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারিন্দাগিরি (দালালি) ভিন্ন অবশ্যই অন্য কীছু হবে না। আর এ কথাটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, একজন বাঙালির পক্ষে ভাষাবিচ্ছিন্নতাকে অনুমোদন করার অর্থ হলো বাঙালি জাতিসত্তা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করা।
তথ্যসূত্র :
১. শুভ কিবরিয়া, আত্মঘাতী বাঙালি, সপ্তাহের বাংলাদেশ সাপ্তাহিক, ‘স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা, ৩১ মার্চ ২০১১, বর্ষ-৩ সংখ্যা- ৪৬, পৃষ্ঠা : ২৯, স্তম্ভ : ১-২।
২. …, ইংরেজি ও মাতৃভাষা, সম্পাদকীয়, দেশ, ২৩ ডিসেম্বর ২০০০, ৬৮ বর্ষ ৪ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ৫।
৩. মহাশূন্য, সপ্তাহের বাংলাদেশ সাপ্তাহিক, ৮ এপ্রিল ২০১২, বর্ষ ২ সংখ্যা ৪৭, পৃষ্ঠা : (৫৯-৬৩)।
৪. রূপ, সানন্দা পুষ্পাঞ্জলি ২০০১, পৃষ্ঠা : (১৬৪-১৭৪)। (চলবে)
- প্রবাসীর স্ত্রী’র খুনের ঘটনায় জিতেশ গোপ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার, মামলা তদন্ত করবে সিআইডি
- ফার্মেসীতে প্রবাসীর স্ত্রীর হত্যার রহস্য উদঘাটন


