ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) আক্ষরিক অর্থেই গণভোটে লুটেরা কেউ হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের মন্ত্রী, সাংসদ বা নগরনায়ক পুরপতি। তেমনি ভাষার ক্ষেত্রে হচ্ছে হরহামেশা নির্বিঘ্নে। প্রতিরোধ করা যাচ্ছে কি ভাষার ভেতরে নিরন্তর নির্বিবাদে অস্তিত্বশীল এমন অনভিপ্রেত অরাজকতাকে ? একজন সাযযাদ কাদির বলেন, “[…] আমার অনেক দোষ। একজন লেখক-সাংবাদিক হিসেবে শুদ্ধ করে লেখার চেষ্টা করি। তাতেও দোষ খোঁজে পান অনেকে। কিন্তু এ চেষ্টা তো সকলেরই করা উচিৎ। সেরকম চেষ্টাচরিত্র আমিও করি, এর বেশিকিছু নয়। তবে আমি যে কাজটি করে বসি, তা হলো অশুদ্ধ কিছু দেখলে সঙ্গে সঙ্গে বড্ড চেঁচামেচি শুরু করি। তবে তা করলেও কাজের কাজ হয় না কিছু। সকল প্রকাশনতেই নিজস্ব বানানবিধি-প্রয়োগবিধি আছে। তাই আমি ‘মোহ্যমান’ লিখলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যায় ‘মুহ্যমান’। এভাবে ‘আশিস’ লিখলেও হয়ে যায় ‘আশীষ’। যতবার লিখি ‘শয়িত’ ততবার হয়ে যায় ‘শায়িত’। অথচ দু’টি শব্দের অর্থ আলাদা। ‘শায়িত’ অর্থ যাকে শোয়ানো হয়েছে, আর ‘শয়িত’ অর্থ যে শুয়েছে। এরকম উদাহরণ দিতে পারি অজস্র। এভাবে শুদ্ধ ভাষা, নির্ভুল বানান নিয়ে হৈচৈ করলেও পদে-পদে আমি হেরে যাই ক্ষমতাবানদের কাছে। তবে সবচেয়ে বেশি হারি রবীন্দ্রনাথের কাছে। কেউ ‘অশ্রুজল’ লিখলে রেগে যাই, কেটে দেই সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন “[…] তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে” (‘প্রশ্ন’) কিংবা “[…] কেন হেরি অশ্রুজল হৃদয়ের হলাহল, রূপ কেন রাহুগ্রস্ত মানে অভিমানে” (‘পুরুষের উক্তি’) কিংবা “আশ্রুজলে অন্তরের সমস্ত কঠিনতাকে গলাইয়া […] ” (‘চোখের বালি’) তখন গলা খুসখুস করলেও বলতে পারি না কিছু। […]”(২৯) তারপরেও, এই একই প্রবন্ধেই, রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রয়োগবাক্যসহ এরকম অশুদ্ধ শব্দের আরও ক’টি উদাহরণ তিনি উদ্ধৃত করেছেন। সেগুলো হলো : শিশিরজল, সর্বশ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠতম, কালেজ, হাঁসপাতাল, কেবলমাত্র, ইতিপূর্বে, ইতিমধ্যে, নটিনী, কাঙালিনী, অনাথিনী, নীলিমা, সকৃতজ্ঞ, সকাতর, সশঙ্কিত, সলজ্জিত, মন্থিত, সৃজন, নিরপরাধী, নিরপরাধিনী, নিশি, নিশীথ রাত্রি প্রভৃতি। শেষে মন্তব্য করেছেন, “ব্যাকরণসম্মত নয়, অনাভিধানিক অনেক শব্দ তিনি তৈরি করে নিয়েছেন কবিতায় নানা প্রয়োজনে।” দাহনা, যামী, স্থকিত, স্পর্শন, উজ্জ্বলিত, মৈতালি, শিথিলিত এইসব শব্দের উদাহরণ দিয়েছেন ফের এবং প্রথম বন্ধনীর ভেতরে বলেছেন, “এগুলি কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। রবীন্দ্র-গবেষকদের ভা-ারে আছে আরও অনেক কিছু।” এরকম ‘ব্যাকরণসম্মত নয়, অনাভিধানিক’ অর্থাৎ কোনও না কোনও ব্যাকরণিক যুক্তিতে অশুদ্ধ সমসাময়িক, অর্থনৈতিক, বিচারিক, শরৎচন্দ্র, সুস্বাগত, ভাষাভাষী, চটজলদি, কলামিস্ট ইত্যাদি শত শত শব্দ ভাষার ভিতরে সদাসর্বদা মর্যাদার আসনে আরোহণ করে সাহিত্যের মাঠে ক্রিকেটমাঠের সৌরভ-সচিন-সাকিব হয়ে জনপ্রিয়তা ও চিরপ্রতিষ্ঠার মজা মেরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বৈয়াকরণিকরা এইসব অশুদ্ধ শব্দের, অর্থাৎ যে-সব শব্দের “গঠনে ব্যাকরণেরর নিয়ম ঠিকভাবে অনুসৃত হয় নি” (৩০) তাদের একটি গালভরা নাম দিয়েছেন, ‘প্রতিষ্ঠিত অশুদ্ধ শব্দ’। এবং সেই সঙ্গে সন্নিবেশিত করেছেন বেশ কীছু শব্দের উদাহরণ, যে-গুলোর মধ্যে রবীন্দ্রব্যবহৃত ইতিপূর্বে, ইতিমধ্যে, সৃজন ও নিশি এই ক’টি শব্দও আছে। মজার কথা এই সব অশুদ্ধ শব্দের মিছিলে খোদ ‘সাহিত্যিক’ শব্দটাও আছে, অভিযোগ করেছেন স্বয়ং সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী। ভাবুন তো একবার ! যে কোনও জীবন্ত ভাষার মধ্যে শব্দের অর্থান্তর, অর্থের প্রসার কিংবা সংকোচন, বানানের বিকৃতি, সন্ধির নিপাতনে সিদ্ধতা ইত্যাদি অরাজকতার স্বীকৃতি নিরন্তর জায়মান থাকে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই একটি জীবন্ত ভাষার লক্ষণ।
একজন প্রাবন্ধিক লিখেছেন, “১৯১৩ সালে রবি ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়াটাকে যদি একটা চূড়াবিন্দু ধরি, তারও কয়েক বছর পর, আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে রবি ঠাকুরের বয়স যখন প্রায় ষাট, বাংলা ভাষার চলিত রীতি প্রবর্তনের সেনাপতি প্রমথ চৌধুরী ‘সাহিত্যিক’ শব্দটার যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানান, “নব্য ‘সাহিত্যিক’দের বিশ্বাস যে, বিশেষ্যের ওপর অত্যাচার করলেই তা বিশেষণ হয়ে ওঠে।” প্রমথ চৌধুরীর মতে বাঙলা ও সংস্কৃত কোনো ভাষাতেই ‘সাহিত্যিক’ শব্দটা বৈধ নয়। এরও বেশ কিছুকাল পরে (সম্ভবত) পূর্ববঙ্গজাত ‘সাহিত্যিক’ শব্দখানা রবিঠাকুরেরও অভিধানে ঠাঁই পায়, সাহিত্যিক শব্দটার অভাব পূর্ণ করে এমন শব্দ আজ কি আর বাংলা ভাষায় আছে ! প্রমথ চৌধুরীর ওই একই লেখার আরেকটা মজার মন্তব্য “ভাষাভাষী” সমাসটা এতই অপূর্ব যে হাসাহাসি করা ছাড়া আর কিছু করা চলে না।” ভাষাভাষী শব্দটা আজ আমরা কত সহজে ব্যবহার করি, রবীন্দ্রনাথ করেননি, যদিও তিনি আইরিশভাষী শব্দটা ব্যবহার করেছেন।
“ভাষা তার নিজের সুবিধার্থেই অর্থের সীমা সম্প্রসারণ করে, প্রয়েজনের চাপে নতুন শব্দও নির্মাণ করে, প্রয়োজনের তাপে অশুদ্ধ শব্দকে শুদ্ধিকরণ কেরে নেয়। ব্যাকরণের আদালতের রায় যা-ই হোক না কেন ‘সাহিত্যিক’ আর ‘ভাষাভাষী’ উভয়টির প্রয়োগ নিয়ে যেমন আজ আর কেউ প্রশ্ন করবেন না, তেমনি আদালতের নিয়োগপ্রাপ্ত তদারককারীদের রায় যা-ই হোক না কেন, অন্যতম শব্দটির অর্থের যে সম্প্রসারণ ঘটেছে, তাকে আর পুরনো সীমায় বেঁধে রাখা যাবে না। কি ক্ষতি ‘অন্যতম ব্যক্তি’ ব্যক্তির বেলায় যেমনটা আমরা বুঝি, ‘অন্যতম গ্রন্থ’ বলে ব্যক্তির কীর্তিকে [তেমনটা যদি] আমরা বোঝাতে পারি? ভাষা এইভাবেই নিয়ত তার অর্থ সম্প্রসারণ করে চলে।’’(৩১) তবে এখানে বলে রাখা আবশ্যক যে ‘ভাষাভাষী’ শব্দটিকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাভাষী বা আইলিশভাষী বোঝাতে ‘বাংলাভাষাভাষী বা আইরিশভাষাভাষী’-র মতো প্রকৃত অর্থেই অর্থহীন ও হাস্যকর শব্দ সর্জন করা সঙ্গত হতে পারে না, হলে সেটা ‘বিপণি মার্কেট’-এর চেয়ে কম হাস্যকর ভাষিক নির্মাণ অবশ্যই হবে না।
এখানে অর্থাৎ শহর সুনামগঞ্জে নামফলকের নমুনার মধ্যে সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান লঙ্ঘিত হলেও ইংরেজি শব্দের ক্ষেত্রে সে-বিধান সাগ্রহে আরোপ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। লেখা হয় ফার্ণিচার, কর্ণার। এখানকার লোকেরা অভিধান খোলতে মোটেও অভ্যস্ত নন কিংবা তাঁরা আদপেই অভিধান খোলতে ভালোবাসেন না, হয় তো বা বাড়িতে কোনও অভিধানই নেই কিংবা রাখেন না। বাংলা একাডেমী (পুরনো আমলাতান্ত্রিক বানান রক্ষিত হয়েছে) প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম হল, “তৎসম শব্দে /ট/, /ঠ/ বর্ণের পূর্বে /ষ/ হয়। যেমন : বৃষ্টি, দুষ্ট, নিষ্ঠা, পৃষ্ঠা। কিন্তু বিদেশী শব্দে এই ক্ষেত্রে /স/ হবে। যেমন স্টল, স্টাইল, স্টিমার, স্টুডিয়ো, স্টেশন, স্টোর, স্ট্রিট।’’(৩২) কিন্তু ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বিবৃতির উদাহরণের তালিকায় ‘স্টল’ শব্দটি প্রতিষ্ঠা পেলেও বাংলা একাডেমির ২০০০ সালে পরিমার্জিত অভিধানে নিরুদ্দিষ্ট।
‘দাস ব্রাদার্স’ বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণে বাংরেজ, যেটিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার চিহ্ন প্রকটিত হচ্ছে অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে। দাস ব্রাদার্স-এর নামকরণটা ‘দাস ভ্রাতৃবর্গ’ বা ‘দাস ভ্রাতৃগণ’ এমন কি ‘দাস ভাইয়েরা’ হতে পারতো অনায়াসে, দাস ব্রাদার্স-এর অর্থের কোনও তারতম্য হতো না বা শ্রুতিকটূ হয়ে যেতো এমনও নয়, এমন কি ধ্বনির সৌকর্য ও সৌজাত্য বা যাকে বলে ধ্বনিকৌলীন্য সংরক্ষণও সম্ভব হয়ে উঠতো সহজে ও জনবোধ্যতার মাত্রা পূর্ণতা পেতো শতভাগ। আর ‘ট্রাফিক পয়েন্ট’ নামটি তো পুরোটাই ইংরেজির বঙ্গবর্ণীকরণ, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার পূর্ণ প্রতিরূপ, এই বাংলায়নে বাঙালিত্বের চিহ্ন বাংলালিপির স্পর্শভিন্ন বাকি সবটুকুই ইংরেজ সাহেবিয়ানার বিজয় পতাকার চিত্রকল্প, কিন্তু আমরা এটি ববহার করতে কোনও অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। আর এই দাস ব্রাদার্সের সোজা রাস্তার পশ্চিম কিনারায় দাস ব্রাদার্সের হাঁটুর বয়সী বইয়ের দোকানটির নাম ‘এমদাদিয়া লাইব্রেরী’। এটিতে মিশে আছে আরবি আর ইংরেজির প্রতিরূপ, লিপির লিকিরে কেবল লটকে আছে বাঙালিয়ানার ছিটেফোঁটা। এমনি আরবি-ফারসির অভাব নেই বাংলাদেশে। যে-কোনও বিচারে ফারসি বাজার শব্দটি আমাদের জীবনের এখন এক অপরিহার্য শব্দ। আমাদের বাংলাদেশে একটি পত্রিকার নাম বাংলাবাজার পত্রিকা, পশ্চিমবঙ্গে একটি পত্রিকার নাম আনন্দবাজার পত্রিকা, বাংলা-ফার্সির কী অপূর্ব গাঁটছড়া। বিষয়টা অনেকটা : অধিকন্তু ন দোষায়।
অতপর একটি কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন বোধ করছি, নিজের গরজে। এই “বলা’র স্টল, গীতাঞ্জলি এবং ইত্যাদি” শিরোনামের নিচে অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে প্রসঙ্গান্তরে ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দদ্বয় বাংলা একাডেমিকৃত অভিধানে শব্দভুক্ত্যন্তর্গত না হওয়ার অনভিপ্রেত বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এখন চলছে ২০১৪ সাল। অনুমান করি, আগামী দু’য়েক বছরের মধ্যে পরবর্তী যে-কোনও সংস্করণে বাঙালির প্রাণপ্রিয় এই শব্দ দু’টিকে বাঙলা একাডেমির বাংলা অভিধানে সন্নিবেশিত করা হবে এবং সেজন্য সঙ্কলককে আগাম অভিনন্দন জানিয়ে রাখছি।
তথ্যসূত্র :
১. নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনন্দর জার্নাল, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, প্রথম প্রকাশ : পুস্তক মেলা ২০০২-এর অষ্টম মুদ্রণ : মাঘ ১৪২২, পৃষ্ঠা : ২৭৪।
২. কাওসার আহমেদ চৌধুরী, ‘সাপ্তাহিক’ ভ্যাল্যাংটাইনস্ ডে, সপ্তাহের বাংলাদেশ সাপ্তাহিক, ১২ জানুয়ারি ২০০৯, বর্ষ ১ সংখ্যা ৩৯, পৃষ্ঠা : ১৮, স্তম্ভ : ৩।
৩. রমাপদ চৌধুরী ॥ ১৬ জুলাই, ১৯৪৫ ॥ দেশ (৬৪ বর্ষ ৬ সংখ্যা) : ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৭ ॥ পৃষ্ঠা : (৪৫-৪৬)।
৪. সাক্ষাৎকার, অশুভ বিষয়ে, অনুবাদ : লায়লা ফেরদৌস, নাগরী, দ্বিতীয় প্রকাশ : একুশের বইমেলা : ২০১৫, পৃষ্ঠা : ০৭।
৫. পথিক গুহ, ধ্বংসের দুন্দভি, দেশ (৬৪ বর্ষ ৬ সংখ্যা) ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৭, পৃষ্ঠা : ১৪০, স্তম্ভ : ২।
৬. পথিক গুহ, মারণ আয়ুধের আরাধনা, দেশ (৭১ বর্ষ ৭ সংখ্যা) : ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৪, পৃষ্ঠা : ১২১, স্তম্ভ : ১।
৭. পথিক গুহ, মারণ আয়ুধের আরাধনা, দেশ (৭১ বর্ষ ৭ সংখ্যা) : ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৪, পৃষ্ঠা : ১১৮, স্তম্ভ : ১।
৮. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, দ্বিতীয় মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃষ্ঠা : ২৩৪।
৯. সত্রাজিৎ গোস্বামী, বাংলা অকথ্য ভাষা ও শব্দকোষ, প্রকাশক : প্রসেনজিৎ সান্যাল (কলকাতা), পৃষ্ঠা : ৪-৫।
১০. সতাজিৎ গোস্বামী, বাংলা অকথ্য ভাষা ও শব্দকোষ, প্রকাশক : প্রসেনজিৎ সান্যাল (বলকাতা), পৃষ্ঠা : ৪।
১১. (অভ্র বসু, বাংলা স্ল্যাং : সমীক্ষা অভিধান, প্যাপিরাস কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ : আগস্ট ২০০৮, পৃষ্ঠা : ১৫১-১৫২।
১২. সিগমুন্ড ফ্রয়েড, টোটেম ও টাবু, ভাষান্তর : ধনপতি বাগ, সুবর্ণরোখ কলিকাতা, প্র. প্রকাশ : ১৯৯৩, পৃষ্ঠা : ২১ ।
১৩. সত্রাজিৎ গোস্বামী, বাংলা অকথ্য ভাষা ও শব্দকোষ, প্রকাশক : প্রসেনজিৎ সান্যাল (কলকাতা), পৃষ্ঠা : ৪।
১৪. সত্রাজিৎ গোস্বামী, বাংলা অকথ্য ভাষা ও শব্দকোষ, প্রকাশক : প্রসেনজিৎ সান্যাল (কলকাতা), পৃষ্ঠা : ৪।
১৫. সত্রাজিৎ গোস্বামী, বাংলা অকথ্য ভাষা ও শব্দকোষ, প্রকাশক : প্রসেনজিৎ সান্যাল (কলকাতা), পৃষ্ঠা : ৪।
১৬. সুকুমার রায়, শ্রীগোবিন্দ-কথা, অতীতের ছবি।
১৭. অশোক মুখোপাধ্যায়, সংসদ সমার্থশব্দকোষ, সাহিত্য সংসদ (কলকাতা), জানুয়ারি ১৯৯৪, পৃষ্ঠা : ২।
১৮. অশোক মুখোপাধ্যায়, সংসদ সমার্থশব্দকোষ, সাহিত্য সংসদ (কলকাতা), জানুয়ারি ১৯৯৪, পৃষ্ঠা : যথাক্রমে ৩০, ২৯, ৪, ৪।)
১৯. মুহাম্মদ এনামুল হক, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী ও স্বরোচিষ সরকার, ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’, বাংলা একাডেমি, জানুয়ারি ২০১২ (পঞ্চদশ পুনর্মুদ্রণ), পৃষ্ঠা : (পাঁচ-ছয়)।
২০. …, আমাদের সময়, ১৮ অক্টোবর ২০১০, পৃষ্ঠা : ১, সংবাদশিরোনাম : নিউজিল্যান্ডকে ধবল ধোলাই।
২১. মুহাম্মদ এনামুল হক, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী ও স্বরোচিষ সরকার, ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’, বাংলা একাডেমি, জানুয়ারি ২০১২ (পঞ্চদশ পুনর্মুদ্রণ), পৃষ্ঠা : দশ।
২২. মুহাম্মদ এনামুল হক, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী ও স্বরোচিষ সরকার, ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’, বাংলা একাডেমি, জানুয়ারি ২০১২ (পঞ্চদশ পুনর্মুদ্রণ), পৃষ্ঠা : দশ।
২৩. গোলাম মুরশিদ, ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’, বাংলা একাডেমি ঢাকা, প্রথম প্রকাশ : জ্যৈষ্ঠ ১৪২০/ জুন ২০১৩, পৃষ্ঠা : সতেরো।
২৪. অধ্যাপক পি. আচার্য, শব্দসন্ধান শব্দাভিধান, বিকাশ গ্রন্থ ভবন কলকাতা, বইমেলা : ১৯৯৫ (আদ্যন্ত পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সপ্তম সংস্করণ)।
২৫. সুবলচন্দ্র মিত্র, সরল ছাত্রবোধ অভিধান, নিউ বেঙ্গল প্রেস (প্রা.) লি., জানুয়ারি ১৯৯৬, পৃষ্ঠা : [গ]।
২৬. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী ঢাকা, চতুর্দশ পনর্মুদ্রণ , জুন ২০১১, পৃষ্ঠা : পনেরো ।
২৭. নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনন্দর জার্নাল (অখ- সংস্করণ), প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৪০৮/ কলকাতা পুস্তকমেলা ২০০২, পৃষ্ঠা : ২৬৬ (নিবন্ধ : একটি রিপোর্ট।
২৮. অরুণাভ সরকার, লেখালেখি ও সম্পাদনা, বাংলা একাডেমী ঢাকা, জুন ২০৯, পৃষ্ঠা : ১০।
২৯. সাযযাদ কাদির, ‘অসংস্কৃত যদৃচ্ছের পথে …’, আমার দেশ, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ (আন্তর্জাতিক মাতৃভাসা দিবস সংখ্যা), পৃষ্ঠা : ১০।
৩০. সুভাষ ভট্টাচার্য, আধুনিক বাংলা প্রয়োগ অভিধান, ডি. এম. লাইব্রেরী কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ : নভেম্বর ১৯৮৬, পৃষ্ঠা : ১৮৭।)
৩১. ফিরোজ আহমেদ, পূব-পশ্চিমের বাঙলা ভাষা, আলোকিত বাংলাদেশ, ঈদ সংখ্যা : ২০১৩, পৃষ্ঠা : ৩৮১, স্তম্ভ : ২।
৩২. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী ঢাকা, ডিসেম্বর ২০০০-য়ে পরিমার্জিত সংস্করণের চতুর্দশ পুনর্মুদ্রণ : জুন ২০১১, পৃষ্ঠা : ১২২১।
০৭. ইংরেজি ‘টাওয়ার’-এর বঙ্গায়ন ‘স্টাওয়ার’
ইংরেজি ‘টাওয়ার’ কোনও কোনও বঙ্গজজনের বাগযন্ত্রের কেরদারিশমায় কখনও কখনও ‘স্টাওয়ার’ হয়ে যায়। তা ‘ভেরাইটিজ’ যদি সুনামগঞ্জের কোনও এক দোকানের নামপাটায় ‘ভ্যারাইস্টিজ’ হতে পারে, ভারতের ‘সিন্ধু’ মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে এসে ‘হিন্দু’ হতে পারে, প্রতিবেশী অসমিয়ার যৎকিঞ্চিৎ প্রভাবে ‘সন্ধ্যা’ ‘হাঞ্জা’ হয়ে যায়, তো ‘টাওয়ার’ কেন ‘স্টাওয়ার’ হতে পারবে না ? এমন হতেই পারে এবং হওয়াই বরং প্রকৃতিগত ও স্বাভাবিক। তাতে কোনও প্রতিষ্টম্ভকতা নেই। কার এতো বুকের পাটা বাধা দেয়, বারণ করে, লোকনিরুক্তির ধ্বনিবিপর্যয়ের মুখে লাগাম পরায় ? শব্দের এবম্প্রকার ধ্বনিরূপান্তর যে-কোনও জীবিত ভাষার একটা অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ। বঙ্গভাষীর বাকযন্ত্রের উচ্চারণঘটিত পাকেচক্রে পড়ে স্বভাষার শব্দ ‘সাগর’ বার কতক পাল্টে গিয়ে ‘হাওর’ হয়ে যেতে পারে অনায়াসে, সেখানে বিভাষার যে-কোনও শব্দ তো ধ্বনিবিপর্যয়ের দাপটে পড়ে নাস্তানাবুদ হবেই। তাতে কার কীইবা করার আছে ? ব্যাকরণ তার নিজের ক্ষেত্র-পথ নিজের মতো করে মসৃণ-সুগম-প্রশস্ত করে নেবেই।
উচ্চারণ বিকৃতির প্রপন্ন হতে বলতে গেলে প্রায় অনিবার্যভাবেই দুনিয়াজুড়া যে-কোনওভাষী প্রকৃতিগতভাবেই ভীষণ পারদরঙ্গম (পারদর্শী+পারঙ্গম)। এই পারদরঙ্গমতা প্রকারান্তরে একধরণের ভাষাবিচ্ছিন্নতারই নামান্তর। একজন ইংলিশভাষীর কানে ‘টাওয়ার’-এর বদলে ‘স্টাওয়ার’ প্রবিষ্ট হলে তাঁর মগজে কোনও বস্তুর প্রতিকৃতি তৈরি হবে বলে মনে হয় না। ইংরেজি ভাষাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় ‘টাওয়ার’-কে ‘স্টাওয়ার’ করে দেওয়াটা ভাষাবিচ্ছিন্নতা বলে বিবেচিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইংল্যা-, আমেরিকা কিংবা ওস্ট্রেলিয়ার ইংরেজি ভাষাদেশে এমন ঘটাটা নিতান্তই আপতিক ও অদ্ভুত তো হতেই পারে না বরং অসম্ভব।
ঘটনাটা তা হলে খোলেই বলি।
আমাদের গ্রামের নাম শাহাপুর। পুবে লাগোয়া গ্রাম লখা। সুনামগঞ্জ থেকে টুকের ঘাট হয়ে বড় রাস্তা লাখাকে পশ্চিমে রেখে একেবারে তার কোল ঘেঁষে আলমাডহরকে পূর্বে রেখে লখার হাওরের পুবপাড় ধরে চলে গেছে তাহিরপুর উপজেলা সদরে। আর নয়াবাজার হতে একটি রাস্তা শাহাপুরের নয়াহাটি, লখাকে দক্ষিণে এবং উত্তরে আলমাডহরকে রেখে রঙ্গেচর খেয়াঘাট পেরিয়ে চলে গেছে একেবারে উপজেলা বিশ্বম্ভরপুর সদরে। এই দুই রাস্তার বর্ণিত পরিসরে লখাকে দক্ষিণে এবং আলমাডহরকে উত্তরে রেখে এ পাশে এক ডাকের আর ওপাশে এক ডাকের পথ ফাঁকের মধ্যে সৃষ্টি করেছে একটি চৌরাস্তা। এখানে দুয়েকটি দোকানঘরের সঙ্গে একটি বসতবাড়িও আছে। একবার এই চৌরাস্তার এক চা-স্টলে বসে যখন চা খাচ্ছিলাম (বাঙালি চা পান করে না, চা খায়, বাংলাভাষায় চা গলাধঃকরণের এটাই যথার্থ ভাষিকবিধি বা লোকনিরুক্তি)। তখন এক অনতিতরুণ গল্প করছিল : সে নাকি গ্রামীণফোন টেলি ‘স্টাওয়ার’-য়ের পাশ দিয়ে হেঁটে এসেছে এই স্টলে (‘স্টল’-এর স্থলে ‘চাখানা’ পাঠে অনাপত্তিযুক্ত)। ব্যাপারটা অনেকটা রূপকথার কিচ্ছার নায়কের মতো একেবারে আদি ও অকৃত্রিম পয়ারছন্দে ‘আস্তে ধীরে গিয়া মর্দ দিল দরশন’। বলাবাহুলা এই চৌরাস্তার পশ্চিম দিকে লখার উত্তর পাশে কাছাকাছি দূরত্বেই গ্রামীণফোনের একটি টাওয়ার আছে, দূরত্বের মাপে এক ডাকের পথ।
বাঙালির মুখে যত্রতত্র বহুব্যবহারে পুরনো হতে হতে একেবারে আটপৌরে বাংলা হয়ে যাওয়া ‘টাওয়ার’-য়ের মতো একটি ইংরেজি শব্দের আগে তরুণটি একটি ‘স’ বিনা শুল্কে আমদানি করে ফেলেছে, খেয়ালই করে নি। আর এসব ক্ষেত্রে বেখেয়ালিপনাই তার, তথা বাঙালির, স্বাভাবিক ভাষিক নিয়ম। অথবা সে ‘টাওয়ার’ শব্দটাকেই হয় তো অশুদ্ধ ও ‘স্টাওয়ার’ শব্দটাকে শুদ্ধ বিবেচনা করছে, অর্থাৎ বেমালুম ভেবে নিয়েছে। এমন কল্পনা করে নিতে কোনও বাধা নেই। সৈয়দ মুজতবা আলীর এক চটকী গল্পের ত্রিচক্রযানের চালক যদি ‘বিশ্ববিদ্যালয়’কে দুর্বোধ্য ইংরেজি এবং ইংরেজি ‘ইউনির্ভাসিটি’র সংক্ষেপ ‘ভার্সিটি’কে সুবোধ্য বাংলা ভেবে নিতে পারে অনায়াসে। এইভাবে যদি ভার্সিটি বাংলা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি হয়ে উঠে, তাহলে ‘টাওয়ার’-এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘স্টাওয়ার’ হতেই পারে, অনিবার্য পরম নিশ্চিন্তে। সত্যি বলতে কি তার (কথিত অনতিতরুণের) শুদ্ধ্যশুদ্ধি জ্ঞানের তারিফ না করে পারা যায় না। এমনি করেই সে অভ্যস্ত। তার বলনচলন এমনিই। তবে বলতেই হবে যে, কথার ফেরে ‘টাওয়ার’কে ‘স্টাওয়ার’ করে ফেলার মধ্যে উচ্চারণ সহজীকরণের বিপরীত প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, এই প্রয়াসটি কেমন যেন একটু ব্যতিক্রমী বলেই মনে হয়, কাঁটার মতো বিদ্ধ হয়ে মনে খটকা হয়ে থাকে। এমনকি মনের ভেতরে আশঙ্কা জাগরুক থাকে, ‘স্বরযোগের দ্বারা সহজ করে নেয়া’র প্রক্রিয়ার কবলে পড়ে আবার ‘স্টাওয়ার’ থেকে ‘ইস্টাওয়ার’ হয়ে না যায়।
আমরা প্রায়ই ইংরেজি ‘স্কুল’ শব্দটি উচ্চারণের সময় একটু সহজ-সুবিধা লাভ করার লোভে শব্দটির আগে একটি ‘ই’-কে বসিয়ে ‘ইস্কুল’ করে বলি ‘ইস্কুল বাড়ি’। প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে কথা বলার সময় কিংবা ভাষণ দিতে গিয়ে অনেক উচ্চশিক্ষিত সর্বমান্যরা পর্যন্ত ‘স্থায়ী’ শব্দটির আগে একটি ‘ই’ ধ্বনি আমদানি করে ফেলেন নিজেরই অজান্তে। এমনটা হতেই পারে। এটা ভাষারই নিয়ম। এতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। অথবা তখন কেউ শব্দটিকে ভুল বলে খারিজ করে দিতে মুখিয়ে থাকেন না। (চলবে)
- সরকার স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে-পরিকল্পনামন্ত্রী
- বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ওপর সর্ববৃহৎ স্ক্রল পেইন্টিংয়ের উদ্বোধন


