ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) শহীদুল জহিরের বর্ণনা, “[…] একদিন দুপুরে, মহল্লার লোকজন ‘মিলিটারি আইছে’, ‘মিলিটারি আইছে’ বলে কাকের তাড়া খাওয়া উইপোকার মতো দৌড়াচ্ছিল এবং যেদিন বদু মওলানা এবং ক্যাপ্টেন ইমরান পরস্পরকে আবিষ্কার করে, আলাউদ্দিনের প্রাণ-বিযুক্ত দেহ মহল্লায় তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় চিৎ হয়ে আছড়ে পড়ে।”(১২) এই হত্যাকাণ্ডটি যে বদু মওলানার নির্দেশে ক্যাপ্টেন ইমরানের কাণ্ড তা মহল্লার সকলেরই বোধগম্য হয়। তেরো বছরের বালক আলাউদ্দিনের অপরাধ সম্পর্কে শহীদুল জহিরের বর্ণনা, “হাফপ্যান্টের একপাশ গুটিয়ে দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে পেশাব করার সময় তার শিশ্নের ওপর নজর পড়ায় বদু মওলানা ক্ষেপে গিয়েছিল একদিন, হারামজাদা, খাঁড়ায়া খাঁড়ায় মোতচ, খাঁড়ায়া মোতে কুত্তা। তখন আলাউদ্দিন কয়েকদিন পর নির্মমভাবে নিহত হওয়ার শর্ত পূরণ করেছিল। প্রথমত, সে বদু মওলানার কথা শুনে গালের ভেতর জিভ নেড়ে তাকে ভেঙায়, তারপর বলে, কুত্তা তো মুখ দিয়া খায়বি, আপনে অখনথন হোগা দিয়া খায়েন।”(১৩) এই হল ‘অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন’-এর মতো ভয়ঙ্কর বিংশশতাব্দীর শেষার্ধের রাজাকারের রূপদর্শন। এখানে বদু মওলানা রাজাকারের পূর্ণ প্রতিরূপে আবির্ভূত। সে জনগণের অধিকারকে অস্বীকার করে দখলদার বাহিনীর প্রতি রাজনীতিক আনুগত্য প্রকাশ করেছে, তৎপর শত্রুপক্ষকে সমর্থন ও সাহচর্য প্রদান করে স্বজাতির মৌলিক অধিকারবিরোধী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছে, আক্রমণকারী আততায়ী সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধে সে সমান শরিক। হত্যাযজ্ঞকে পুন্যকর্ম ও মহৎ বলে প্রচার করে ধর্মের রাজনীতিক ব্যবহারকে, অবশ্যই যা যে-কোনও বিবেচনায় চূড়ান্ত নোংরামি ও মানবতাবিরোধী, পরিপূর্ণতা প্রদান করেছে। তার রাজাকারজীবিতার পরম রূপগরিমা প্রকাশ পেয়েছে ‘কাক ওড়ানো’র দৃশ্য বর্ণনায়। শহীদুল জহির লিখেছেন, “লক্ষ্মীবাজারের লোকদের মনে পড়ে, একাত্তর সনে বদু মওলানা নরম করে হাসত আর বিকেলে কাক ওড়াত মহল্লার আকাশে। এক থালা মাংস নিয়ে ছাদে উঠে যেত বদু মওলানা আর তার ছেলেরা। মহল্লায় তখনো যারা ছিল, তারা বলেছিল, বদু মওলানা প্রত্যেকদিন যে মাংসের টুকরাগুলো আকাশের দিকে ছুড়ে দিত, সেগুলো ছিল মানুষের মাংস।”(১৪)
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কেমন ছিল ‘পরাধীন ভারতবর্ষের স্বেচ্ছাসেবক না-হয়ে ইংরেজদের স্বেচ্ছাসেবক’ হওয়া রাজাকারদের রূপ, তার যৎকিঞ্চিৎ বিবরণ উদ্ধার করা যায় জওহরলাল নেহেরুর লেখা থেকে। এঁদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “ইংরেজ রাজকর্মচারীদের মনে সর্বদাই বিদ্রোহের ভয় থাকত এবং একথা তারা লিখেও গেছে। বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক ১৮২৯ খৃসটাব্দে লিখে গেছেন, ‘ব্যাপকভাবে কোনো বিদ্রোহ, কি অন্য কোনো বিপ্লব উপস্থিত হলে, তা হতে রক্ষা পাওয়ার উপায় সম্বন্ধে বলতে চাই যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যদিচ অনেক ব্যাপারে বিফল হয়েছে, কিন্তু এর ফলে অন্তত একটা সুবিধা এই হয়েছে যে বিরাট এক ভূস্বামীর দল সৃষ্টি করা গেছে, যারা সর্বান্তঃকরণে চাইবে যে ইংরেজ রাজত্বই চলুক, আর লোকসাধারণের উপর যাদের সম্পূর্ণ দখল থাকবে।’
“এইভাবে ইংরেজ এদেশে আপন স্থান দৃঢ় করে নিয়েছিল এমন একদল লোক সৃষ্টি করে দিয়ে, যাদের সুখ-সুবিধা ইংরেজ শাসনের স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করত। জমিদার ও দেশীয় রাজারা তো ছিলই, আর তাছাড়া ছিল গভর্নমেন্টের বিভিন্ন বিভাগের বহু কর্মচারী, পাটওয়ারি বা পল্লীপ্রধান থেকে শুরু করে তার উপরের বিভিন্ন পদস্থ ব্যক্তি পর্যন্ত। গভর্নমেন্টের দুই প্রধান বিভাগ ছিল রাজস্ব ও পুলিশ।”(১৫) ভারতকে শোষণ করার কাজে ভারতীয় সহায়কদেরকে, সেবার বহরানুযায়ী ইংরেজ প্রশাসন পুরস্কৃত করতো। অন্যত্র নেহেরু লিখেছেন, “ইংরেজ যাদের খেতাব, ইনাম, জায়গীর দিয়ে সাগ্রহে সম্মানিত করেছে, দেশের বেশিরভাগ লোকের কাছে তারা দেশদ্রোহী কুইস্লিঙ ছাড়া আর কিছুই নয়।”(১৬) এখানে ‘কুইস্লিঙ’ শব্দটির বদলে দয়া করে ‘রাজকার’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করুন, তা হলেই হবে, হৃদঙ্গমে কোনও হাঙ্গামা হবে না।
এই রাজাকার রামমোহনের ঐতিহাসিক বংশধররা রাজাকারিত্বে এখন আগের চেয়ে বেশি দড়। গত শতকের একাত্তরে তাঁরা হাত পাকিয়েছেন হানাদার ফাঁকিস্তানিদের (কাজী নজরুল ইসলামকৃত পাকিস্তানের শব্দানুগশব্দবয়ন) দালালি করে। তারপর দীর্ঘ চার দশকের বেশিকাল ধরে স্বকপোলকল্পিত কর্তব্যকর্মকে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ পর্যন্ত প্রসারিত করেছেন এবং মানুষের চেতনায় সন্ত্রাসের ত্রাস সংক্রমণে অপার সামর্থ্য প্রদর্শনপূর্বক বীরদর্পে বঙ্গদর্প চূণবিচূর্ণ করে বঙ্গেই বহালতবিয়তে এখন বিরাজিত। সুনামগঞ্জের সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদ প্রথিত মাহমুদ আলীর মতো কেউই সাহসী নন, পাকিস্তানে চলে যেতে পারেন নি। বুকে থেকে মুখে মারার পারদরঙ্গমতা (পারদর্শী+পারঙ্গম+তা) চরিতার্থকরণ বাসনায় বাংলাদেশেই থিতু হয়েছেন এবং বাংলাস্তানকে তালেবানি আফগানিস্তান বানানোর সোনালি স্বপ্ন মনের মণিকোঠায় একান্ত সঙ্গোপনে লালন করতে করতে জেহাদ করতে তাঁরা এখন বদ্ধপরিকর। এই জন্যেই কেউ কেউ, মুজিবোত্তরকালে জিয়া কর্তৃক দালাল আইন বাতিল করাসহ রাজাকারদের রাজনীতির অঙ্গনে পুনর্বাসিতকরণ ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের আচরণে জামাতি রাজনীতিকে বিভিন্ন রাজনীতিক কর্মসূচিতে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় প্রদান করার প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় এনে ক্ষেপে গিয়ে, একাত্তরে অর্জিত স্বাধীনতাকে ‘রাজাকারের স্বাধীনতা’ বলে ফেলতে কসুর করেন না। অপরদিকে জনমানসের গভীরে এক ধরণের রাজাকার-আতঙ্ক বদ্ধমূল হয়ে তো আছেই। একটি উপন্যাসের একটি চরিত্র উপলব্ধি করে যে, বাংলাদেশের মোল্লা-মওলানা আর ইসলাম ভাঙিয়ে রাজনীতি করা অসৎ লোকদের হাত থেকে মুসলমানদের বাঁচাতে হলে ঠিকঠাক ইসলামি জ্ঞানকে মানুষের মধ্যে প্রচার করতে হবে। অন্য একটি চরিত্র তখন বলে, “আমাদের মোল্লা-মওলানারা অশিক্ষিত বটে, কিন্তু নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা ষোলআনা বোঝে। তার ওপর তাদের পরিচালনা করে, যারা ইসলাম বিক্রি করে আমাদের দেশে রাজনীতি করে, সেই ধুরন্ধর লোকগুলো। আপনি এমন কাজ করতে গেলেই ওরা আগে আপনাকে ঘোষণা করবে মুরতাদ। তারপর মসজিদে মসজিদে প্রচার করবে যে অমুক লোকটা ইসলামবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে, মুসলমানদের ক্ষতি করছে। আমাদের দেশের অশিক্ষিত মানুষের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। তারা তখন আপনার ফাঁসি চেয়ে রাস্তায় নেমে পড়বে। আপনি কী বলেছেন বা কী করেছেন সেটা কেউ শুনতে পর্যন্ত চাইবে না। তখন হয় আপনাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে, নয়তো জেলে যেতে হবে, নয়তো দেশত্যাগ করতে হবে। এখন তো আবার তালেবান-বাংলাভাইরা হয়েছে। ওরা গুপ্তঘাতক লেলিয়ে দেবে আপনার পেছনে।’’(১৭)
মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের দ্বারা ধর্মের নামে পরিচালিত প্রতারণামূলক আচরণ চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই এবং মানবতাবিরোধী এই আচরণকে এখনও পর্যন্ত ধর্মরূপে প্রতিপন্ন করার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে মানুষই। এককথায় সর্বযুগেই ধর্ম একশ্রেণির মানুষের দ্বারা আর এক শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে সাধিত্র হয়ে অবির্ভূত হয়েছে এবং ব্যবহৃতও হয়েছে। পৃথিবীতে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে। এই দুই বিশ্বযুদ্ধে যত না মানুষ মরেছে তার চেয়ে শতসহস্র গুণ মানুষ মরেছে যুগ যুগ সংঘটিত ধর্মযুদ্ধে। প্রাচীন ভারতের কুরুক্ষেত্রে সংঘটিত ধর্মযুদ্ধ তার প্রমাণ। মহাভারতের জ্ঞানীরা (বৃহস্পতি, চার্বাক, জাবালি) ধর্মকে সমাজের মুষ্ঠিমেয় ধুরন্ধর মানুষের হাতে অন্য বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষকে বশীভূত করা ও ঠকাবার অস্ত্র বলে বিবৃত করেছেন। বিদগ্ধ কেউ কেউ ধর্মকে যুক্তি, জ্ঞান, প্রগতির প্রতিবন্ধক এবং কতিপয়ের জীবিকার উপায় বলে গণ্য করেন। ধর্ম নিয়ে নেপোলিয়ানের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, তিনি বলেছেন : ধর্ম ধনিক শ্রেণির ঢালস্বরূপ এবং ধর্ম না থাকলে গরিবদের হাতে অনেক আগেই ধনীরা খুন হয়ে যেতো। ধর্মের প্রতারণামূলক একটি চমৎকার ঐতিহাসিক উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে। লাতিন আমেরিকার প্রথিত লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানোর বর্ণনায় বিষয়টির ভয়ঙ্করতা বিবৃত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘আবিষ্কারের তিন বছর পরে ক্রিস্তোবাল কোলন নিজে দেমিনিকানের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে সৈন্য অভিযানে নেতৃত্ব দিলেন। খুব অল্প কয়েকজন অশ্বারোহী, ২০০ জন পদাতিক সৈন্য এবং বিশেষভাবে শিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকটি মাত্র কুকুর ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে তাদের ধ্বংস করল। ৫০০ জনের বেশি লোককে বন্দি করে সেখানে পাঠানো হল, সেভিইয়াতে তাদের ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করা হল, তারা মারা গেল করুণভাবে। কিন্তু কিছু ঈশ্বরবাদী এর প্রতিবাদে মুখর হল এবং ইন্ডিয়ানদের ক্রীতদাসে পরিণত কারার এই প্রথা ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নিষিদ্ধ হল। প্রকৃতপক্ষে নিষিদ্ধ করা হল না, কিন্তু ঈশ্বরত্ব আরোপ করা হল। প্রত্যেক সৈন্য অভিযানের আগে অভিযানের সেনাপতিকে এক নোটারি পাবলিকের উপস্থিতিতে ইন্ডিয়ানদের সামনে এক দীর্ঘ এবং বাগাড়ম্বরপূর্ণ নির্দেশাবলী পড়ে শোনাতে হত যাতে তাদের পবিত্র ক্যাথলিক অনুগামী হওয়ার জন্য আদেশ দেওয়া হত : “যদি তোমরা না কর অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব কর, সে ক্ষেত্রে ঈশ্বরের সাহায্য নিয়ে আমি বল প্রয়োগ করতে ও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হব এবং গির্জার দাসত্ব ও অধীনতা গ্রহণে তোমাদের বাধ্য করব, তোমাদের নারী ও শিশুদের ক্রীতদাসরূপে পরিগণিত করব। প্রভুর ইচ্ছানুসারে তাদের বিক্রয় করার অধিকার থাকবে আমার। তোমাদের সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে তোমাদের যথাসাধ্য ক্ষতি এবং লোকসান করার অধিকার থাকবে আমার।” আমেরিকা ছিল বিশাল শয়তানের সা¤্রাজ্য, এর পুনর্মুক্তি ছিল অসম্ভব ও সন্দেহজনক। দেশীয়দের বিরুদ্ধে পাগলপারা অভিযান আসলে ছিল বিজেতাদের নতুন পৃথিবীর সম্পদের প্রতি লালসা।’(১৮) আসলে মানুষের ইতিহাস মানুষে মানুষে বিবাদের ইতিহাস, দ্বন্দ্বের অথবা যুদ্ধের ইতিহাস এবং প্রকারান্তরে আধিপত্যের ইতিহাস। ধর্ম সে দ্বন্দ্বের ব্যাকরণ এবং দ্বন্দ্বের উৎস সম্পদ। ধর্মের কিংবা ঈশ্বরের নামে পৃথিবীর সর্বত্র দুর্বলের উপর সবলের আধিপত্যকেই ভ-রা নাম দিয়েছে মানবতা এবং আধিপত্যের উৎস সম্পদ। ধর্ম, দর্শন, নীতি, মতাদর্শ সবকীছুই সম্পদ অর্জনের উপায়, মানুষের উপর মানুষের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। যুগে যুগে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের প্রতিপক্ষ মহাভারতের শকুনির আবির্ভাব অব্যাহত আছে, এখনও মানবসমাজের অনাচেকানাচে তারা সদর্পে বহালতবিয়তেই বিচরণশীল। হিন্দি থেকে ডাবিং করা টিভি সিরিয়াল মহাভারতের চরিত্র শকুনির একটি বিখ্যাত, অন্তত আমার তা-ই মনে হয়েছে, সংলাপ এরকম, ‘যারা ধর্মের পথে চলে, তদের সঙ্গে অনেক অধর্ম করা যায়।’ বর্তমানকালের অত্যাধুনিক শকুনিরাও পৌরাণিক শকুনির মতোই বিশ্বসেরা এই আপ্তবাক্যটি ভালো করেই জানে ও বুঝে এবং প্রতিনিয়ত ধর্মের নামে এক প্রকার ধর্মদ্রোহিতা বিশ্বজুড়া ধর্মভীরু আমজনতার বিরুদ্ধে আর্থসামাজিক বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে সুকৌশলে দেশে দেশে পরিচালিত করে আসছে। আর বাংলাদেশ তো বিশ্বমধ্যে শকুনি জন্মের সর্বকালের সেরা একটি উর্বর ক্ষেত্র।
এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় প্রবসনপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। কাজী আবদুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দকোষ ও বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘পর্বত’ শব্দের উপভুক্তিতে ‘পর্বতপ্রমাণ’ শব্দবন্ধটির সাক্ষাৎ সম্ভব। অর্থ করা হয়েছে যথাক্রমে পর্বতাকার ও পর্বতের মতো বিশাল। কিন্তু সুভাষ ভট্টাচার্যের সংসদ বাগ্ধারা অভিধান (প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ১৯৯৩,) সংস্করণে ‘পর্বতপ্রমাণ’ শব্দবন্ধটিকে উপজীব্য করে সর্জিত ‘পর্বতপ্রমাণ ভুল’ বাগ্বিধিটি লাপাত্তা। জ্যোতিভূষণ চাকীর একটি লেখায় এই বাগ্বিধিটির উল্লেখ মেলে। তিনি বলেন, “আমরা যখন বলি ‘পর্বতপ্রমাণ ভুল’ তখন মনের মধ্যে হিমালয়কে রেখেই বলি। Himalayan blunder -এ ভ্রান্তির বিশালত্বই অভিব্যক্ত। কিন্তু এই বাগ্বিধিটি ইংরেজি অভিধানে অপাঙ্ক্তেয় Indian English বলে। গাঁধিজি প্রমুখ ইংরেজিদুরস্ত নেতারাও এই ওফরড়সটি ব্যবহার করেও একে জাতে তুলতে পারেননি।’’(১৯) অর্থাৎ মাতৃভাষার পবিত্রতা রক্ষাকল্পে ইংরেজরা এতটাই রক্ষণশীল যে বিভাষীদের ইংরেজিচর্চার স্বাভাবিক প্রকরণে সৃষ্ট কোনও একটি নতুন শব্দ বা শব্দজোটকে স্বীকৃতি দিতেও তারা নারাজ। Indian English বর্তমান বিশ্বে ইংরেজি ভাষার একটি বিশেষ প্রকারভেদ বলে স্বীকৃত। কিন্তু এই প্রকারভেদটি ইংলিশ ভাষার পবিত্রতাহারক বলে ইংরেজদের কাছে অপাংক্তেয়। তাই তারা Indian English থেকে তাদের অভিধানে একটি শব্দও ভুক্তিকরণে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে আমাদের বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে কেবল /স্ট/ দিয়ে শুরু এমন উনিশটি ইংরেজি শব্দ ভুক্তিকৃত হয়েছে। যে প্রকরণ-প্রক্রিয়াকে ভাষার পবিত্রতা ক্ষুণœকরণের অপবাদে ইংরেজরা নির্দ্বিধায় বর্জন করে, আমাদের বাংলা একাডেমি ভাষাদূষণকারী সে প্রকরণটিকেই প্রকারান্তরে জামাই আদরে গ্রহণ করে এবং বাংলা অভিধানে অবিকৃত ইংরেজি শব্দের সাগ্রহ ভুক্তিকরণ প্রমাণ করে যে, এই বিশেষ প্রকরণটি একাডেমির কাছে বিশেষভাবে পূজনীয়। অন্যদিকে ইংরেজি ভাষায় অন্য ভাষার শব্দানুপ্রবেশের প্রকরণ প্রসঙ্গে ইংরেজদের এই রকম রক্ষণশীল নীতিচর্চার বিপরীতে কতিপয় বাঙালি লেখক এতোটাই উদার যে, তাঁরা সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে সরাসরি এক একটা ইংরেজি শব্দ বা শব্দবন্ধকে ইংরেজি অভিধান থেকে কুড়িয়ে এনে বালাভাষাভা-ারে প্রক্ষিপ্ত করা অব্যাহত রেখেছেন, যখন বাংলা কৃতঋণশব্দের বিধিবিধান বৈয়াকরণরা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তখন। তাঁরা বাংলাভাষাভা-ারে প্রক্ষিপ্ত ইংরেজি শব্দগুলোকে বাংলা শব্দের মতোই বাংলাভাষায় অনায়াসে প্রয়োগযোগ্য মনে করেন। বাংলাভাষাভা-ারে এই ইংরেজি শব্দপ্রক্ষেপণকর্ম অবলীলায় সাধারণ বঙ্গভাষীরা ও সাধারণ লেখকরাই কেবল নয়, এমনকি কিংবদন্তিপ্রতিম কোনও কোনও লেখক লেখার সময় বাঙালিদের কাছে পরিচিত-অপরিচিত বা বাংলাভাষায় প্রচলিত-অপ্রচলিত ইংরেজি শব্দ বেশি বেশি করে বাক্যের ভেতরে প্রবসিত করার সানন্দ মওকানুসন্ধান করতে পছন্দ করে ধন্য হন। বাক্যের যত্রতত্র দেদার ইংরেজি শব্দের ব্যবহার গল্পের আখ্যান ও চরিত্রচিত্রণে সহায়ক ও শিল্পশৈলীর বা মুন্সিয়ানার মানোন্নয়নের বিবেচনায় যথাযথ বা সঙ্গত কি না, অথবা বাক্যে এ রকম যথেচ্ছা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বাংলা ব্যাকরণের অবাংলা শব্দকে কৃতঋণশব্দরূপে গ্রহণের বিধানুসারে সিদ্ধ কি না, সে ব্যাপারে যদি লেখক সতর্ক না থাকেন তবে তাঁকে অবশ্যই ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিহ্নিত করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে। যে-কোনও বাঙালি লেখক, যিনি বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চা করেন, তাঁর পক্ষে কোনও রচনায় অবাঞ্ছিত ইংরেজি শব্দের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার অবশ্যই নবপর্যায়ে ঔপনিবেশিকতার সাংস্কৃতিক উৎপাত অর্থাৎ সাহিত্যে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা চর্চার নামন্তর। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, ঔপনিবেশিক সংস্কার অনুযায়ী বাংলাভাষায় ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ স্বাভাবিক, এরকম একটি খোঁড়া যুক্তি খাড়া করে ইংরেজি শব্দের বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ প্রবণতাকে চলতে দেওয়া অবশ্যই সঙ্গত হব না। সাহিত্যে এমন উৎপাতের একটি দৃষ্টান্ত, গল্পের একটি চরিত্রের সংলাপ : “চাইল্ডবার্থ ! আমাদের বাচ্চা যেভাবে খুশি এলে তো হবে না, তার আগমনটাকে স্মুদ করতে হবে। আই মিন, পেটে যতদিন আছে তার যেন কোনও প্রবলেম না হয়, দুনিয়ায় এসেও সে যেন কোনও ডিফিকালটিতে না পড়ে, এটসেট্রা, এটসেট্রা। আর তার জন্য দরকার প্রপার প্ল্যানিং।’’(২০) লেখক এখানে যে কয়টি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন সেগুলোর কোনোটিই এমন শব্দ নয় যে বঙ্গানুবাদ বা ভাবপ্রকাশ করতে গেলে তাদের সমার্থক বা সমভাবপ্রকাশক বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যাবে না। কেউ যদি বাক্যে প্রযুক্ত ইংরেজি শব্দগুলোর স্থলে বাংলা প্রতিশব্দ ‘শিশুজন্ম’, ‘মসৃণ’, ‘আমি মনে করি’, ‘সমস্যা’, ‘অসুবিধা’, ‘ইত্যাদি ইত্যাদি’, ‘যথাযথ পরিকল্পনা’ বসিয়ে বা এ সব শব্দের কাছাকাছি অর্থপ্রকাশক শব্দ যথাক্রমানুসারে প্রতিস্থাপন করে বাক্য কটিকে একটু কষ্ট স্বীকার করে পড়ে ফেলেন, তাহলে ভাব ও অর্থবোধে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বা অচরিত্রানুগ হবে বলে তো মনে হয় না। অর্থাৎ এই শব্দগুলোর কোনওটিই প্রকৃতপ্রস্তাবে বাংলা-প্রতিশব্দ-বিরল অবিকল্প ইংরেজি শব্দ নয়। বাংলাদেশের বড় মাপের এক কবি-গল্পকার তাঁর গল্পের চরিত্রের সংলাপে কিংবা কখনও কাহিনি বর্ণনায় বাকবিস্তার করেছেন, “তুমি কিন্তু শ্লিপ কেটে যাচ্ছো দাদু।, জোতদারদের গলা কাটতে অর্ডার দিয়েছিল কে ?, ওল্ডম্যান ঘুমায়নি তাহলে ?, এত রিস্ক নিয়ে শেষে এই তার নিটফল ?, মাথার বালিশ সরে গেছে সাইডে।, এখন আর টাইম নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।, হারি আপ! নো ডিলে!, বই-ফাইল সবকিছু চাদরে বেঁধেছেঁদে মাঝারি সাইজের গাঁটরি বানিয়ে ফেলে।, ব্যস! মাল কমúিøট!, বিশ-পঁচিশ দিন পরে আজকের ফুলকোর্স সঙ্গমে একটু জেরবার হয়ে পড়েছে সন্দেহ নেই।, পেস্টিজ আর রেখেছে নাকি শুয়রের বাচ্চা।, নিউজপেপার রাখাটা একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হালে।, কাগজ খুললেই যত রাজ্যির নেগেটিভ খবরÑ, বাস্টার্ড কাঁহাকা ! অল লুম্পেন লুটেরা !”(২১) ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলা বাক্যরচনায় এবংবিধ বাংরেজিপনার কোনও সাহিত্যসম্মত প্রয়োজন আছে বলে তো মনে হয় না। যদি কেউ এইরূপ বাংরেজিপনাকে বাংলাভাষার বিকাশসাধনে একটি অপরিহার্য প্রকরণরূপে স্বীকার করে নিয়ে বাংলাবাক্যে দেদার ইংরেজি শব্দ প্রক্ষিপ্তকরণে উৎসাহী হয়ে ওঠেন এবং প্রকারান্তরে বাংরেজিপনাকে স্বকীয় রচনায় স্বপ্রণোদিত প্রশ্রয় প্রদানে ব্রতী হন, তবে তিনি অবশ্যই নেতিবাচক দিক থেকে একধরণের গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ কাজ সুসম্পন্ন করেন। প্রথমত, তিনি বাংলাভাষার ভাবপ্রকাশের দার্ঢ্যতাকে অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে ভাবপ্রকাশের পারদরঙ্গমতায় উচ্চশক্তিধর বিশ্বের যে কোনও উন্নত ভাষার চেয়ে বাংলাভাষা মোটেও পশ্চাৎপদ নয় বরং সমপর্যায়ের তো বটেই, এবং কোনও কোনও অপর ভাষার চেয়ে অগ্রসর পর্যায়ে তার অবস্থান নির্দেশিত, স্বীকৃত সে সত্যের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেন। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি ভাষার প্রতি অনুরাগের বশবর্তী হয়ে বাংলাভাষায় ইংরেজি শব্দ প্রবসনে নিমগ্ন থেকে রাজাকারজীবিতার প্রকাশস্বরূপ মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ব্যভিচারে লিপ্ত হন। তৃতীয়ত, ইংরেজিভাষায় অন্যভাষা প্রক্ষেপণ রোধকল্পে স্বয়ং ইংরেজরা মাতৃভাষার পবিত্রতা রাক্ষাকল্পে যে কঠোর রক্ষণশীলতার নীতি অনুসরণ করেন, (চলবে)
- ভরা বর্ষায় নৌচলাচলে ভোগান্তি
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণকাজে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়বে না-পরিকল্পনামন্ত্রী


