ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) সেই নীতি স্বকীয় ভাষা অর্থাৎ বাংলাভাষার পবিত্রতা রক্ষার্থে প্রয়োগ না করে প্রকারান্তরে ইংরেজি ভাষার মতো বাংলাভাষারও পবিত্রতা বলে কীছু থাকতে পারাটাকে অস্বীকার করে স্বকুলাঙ্গারিত্ব প্রকটিত করেন। এবং চতুর্থত, ভাষার পবিত্রতা রক্ষার্থে ইংরেজদের মতো কৃতঋণশব্দরূপে স্বভাষায় বিভাষী শব্দগ্রহণনীতি বর্জনকর্মের অনুসরণ না করে ইংরেজি শব্দকে নির্বিচারে স্বভাষায় প্রবসিতকরণকর্মে নিমগ্ন হয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার লেজুড়বৃত্তি অর্থাৎ রাজাকারজীবিতা অবলম্বনের দোষে পুষ্টি লাভ করে প্রকারান্তরে বাংলাভাষাদূষণের নিয়ামক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পেরে ধন্য বোধ করেন।
ইংরেজি ও চিনা ভাষার রক্ষণশীলতানুসারে উক্ত বাক্যগুলোকে কীছুতেই বাংলা বাক্যরূপে স্বীকৃতি দেওয়া সঙ্গত হবে বলে মনে হয় না। কেন না তারা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিজ্ঞানচর্চায় কিংবা ভাষাচর্চা ও অনুবাদের ক্ষেত্রে বিভাষা-প্রবসন-প্রতিরোধ-নীতি সর্বত্র সর্বাবস্থায় বহাল রেখেছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এ বাক্যগুলোকে বাংরেজি বাক্য বলাই সমীচীন হবে। লেখক এইরূপ বাকবিস্তারের দ্বারা কেবল বাংলা ভাষার দৈন্যকেই, বর্তমানে স্বপ্নেও যে দৈন্যর কথা ভাবলে তা হবে ডাঁহা মিথ্যাচার, প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন বলে ধারণা জন্মানোর পূর্বে এই রকম লেখকের মাতৃভাষাবিচ্ছিন্নতারূপ রাজাকারজীবিতায় প্রমত্ত থাকার ধারণা জন্মে। এসব লোকেরা প্রশ্ন করে যে, cognition -এর বাংলা তুমি কী করবা? তারা ইংরেজি ‘ড্রেইন’ শব্দের নোংরা ‘নর্দমা’ ভিন্ন অন্য কোনও প্রতিশব্দ খোঁজে পায় না। তখন ‘নির্গমমার্গ’ কিংবা ‘নির্গমপ্রণালী’র মতো পরিভাষা হিসেবে সঙ্গত ও যথাযথ মানানসই বাংলা শব্দ তাদের মাতৃভাষাদ্বেষণাজনিত নোংরা মানসতাকে উন্মোচিত করে মাত্র। ইংরেজির প্রতি তাদের প্রীতি এতই প্রবল যে, ইংরেজি ‘কগনিশন’ শব্দের বাংলা ‘অনুধাবন’ শব্দটাকে তারা সচেতনভাবে ভুলে থাকতে ভীষণ ভালোবাসে কিংবা ‘কগনিশন’ তাদের বোধগম্যতায় এলেও ‘অনুধাবন’ সহজে আসে না। বাংলাভাষাচর্চার ক্ষেত্রে এক শ্রেণির ক্ষুদ্রাল্প স্বার্থান্বেষী তাদের স্বভাবসুলভ রাজাকারজীবিতার বশবর্তী হয়ে পরভাষাপ্রীতিরূপ ঔপনিবেশিক দাসত্বকে বজায় রাখতে এখনও বদ্ধপরিকর অর্থাৎ ইংরেজিপ্রীতির মোহমুগ্ধতা থেকে তারা নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারছে না। তারা তলে তলে সানন্দে তবলা বাজাচ্ছে, এই কারণে যে, এখনও এই দেশে জাতিকে দ্বিভাষিক করে ফেলার অবৈজ্ঞানিক প্রকল্প বাস্তবায়নে নিম্ন থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি পাড়ানোর ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক আমলের মতো বহাল রাখা হয়েছে। যদিও তাদের সামনে চিন, মালয়েশিয়া, কোরিয়া প্রভৃতি দেশের শিক্ষা-সাহিত্য-বিজ্ঞানচর্চার বিভাষাবর্জিত (বিশেষ করে ইংরেজিবর্জিত) আধুনিকায়নের উদাহরণ সমুপস্থিত আছে। সত্বর এসব লেখকের বোধোদয় ঘটবে না, জানি চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। তবু মাতৃভাষানুগত্যতার উত্তম ও বাস্তব উদাহরণ উদ্ধৃত করে দিচ্ছি, “হালের পরাশক্তি চীন ১৯৪৯ সালে বিপ্লবের পর তার শিক্ষাপদ্ধতিতে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া শুরু করে। আমাদের আধুনিকায়ন মানে কেন জানি শিক্ষায় কয়েক পোঁচ ইংরেজি বুলিয়ে দেওয়া। চীনারা সেই রাস্তায় হাঁটেনি, তারা প্রাথমিক থেকে উচ্চতম স্তর পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে, এমনকি তারা খুব সামান্য পরিমাণে ইংরেজি পরিভাষাও গ্রহণ করেনি, কোনো না কোনোভাবে বিদেশি বস্তুগুলোকে চীনা ভাষায় অনুদিত করেছে। হালের কোরিয়া, মালয়েশিয়াও শিক্ষার এই আধুনিকায়নের মস্ত উদাহরণ। অথচ আমরাই আধুনিকায়নের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর ইংরেজির বোঝা চাপিয়ে দিয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার থেকে তাদরে বঞ্চিত করছি।”(২২) ক্ষমা করবেন, না বলে পারছি না যে, ইংরেজি শব্দসহযোগে এতাদৃশ বাক্যবিন্যাসের প্রকরণ প্রচলিত করে বাংলাভাষার পবিত্রতানাশের বা ভাষাদূষণের অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। অথবা যারা সাহিত্যচর্চার নামে নিজের ইংরেজি-জ্ঞানের পা-িত্য প্রকাশের, যে কোনও বিচারে, অনৈতিক বাসনাকে ব্যভিচারে পরিণত করেছেন, তাঁরা স্বাজান্তেই (<স্ব+অজান্তেই) মাতৃভাষাবিচ্ছিন্নতারূপ ব্যাধিতে সংক্রমিত হয়েছেন; অচিরাৎ তাঁদের চিকিৎসা প্রয়োজন। আজ যদি এই অপতৎপরতাকে প্রতিরোধ না করা হয় তবে ফাঁকিস্তান আমলে বাংলা ভাষার সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দ মিশিয়ে ‘মুসলমানি বাংলা’ সর্জনের প্রচেষ্টাকে উপনিবেশবাদী অপসংস্কার বা উৎপাত বলে সমালোচনা করার নৈতিক অধিকার বাংলাভাষী কারওরই থাকবে না। সর্বোপরি একুশের ভাষাআন্দোনের পথ বেয়ে বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গৌরবকে অপমানিত ও প্রকারান্তরে অস্বীকার করাসহ ভাষাশহিদদের পবিত্র রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। অন্যদিকে বালাভাষায় সাহিত্যচর্চার নামে বাংলাভাষারাজ্যে ইংরেজি শব্দের এইরূপ অবাধ প্রবসন অব্যাহত থাকলে বাংলাভাষা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পরিসরে রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দের বাংলাভাষা নয় বাংরেজি ভাষা রূপে পরিচিতি লাভ করবে, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। বলা যায়, একটি জগাখিচুড়ি ভাষা গড়ে উঠবে। সাম্রজ্যবাদী শত্রু ও রাজাকাররা (রাজাকার মানে বিদেশি শক্তির দেশি দালাল বা সেবক) সর্বান্তকরণে এটাই চায়। কারণ তারা ভালো করেই জানে, “যেহেতু যে কোনো জাতির সমস্ত অর্জিত সম্পদের প্রধান ও বৃহত্তর কোষাগার তার ভাষা, ভাষা চলে গেলে তো তার কৃতি, সংস্কৃতি, বিশ্বদর্শন সব চলে যাবে। তাই এ ব্যাপারে কোনো জাতিই কোনোরকম জায়গা ছেড়ে দিতে সহসা রাজি হয় না। আবার বিপরীতে, কোনো জাতির ভাষাকে মেরে ফেলতে পারলে, সেই ভাষাহীন জাতিটাকে না মারলেও চলে। নতুন এক মিশ্র সভ্যতায় সে নির্বিরোধে অনায়াসে বিলীন হয়ে যায়।”(২৩) কিন্তু জন্মলগ্ন থেকে রাজকারজীবিতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে পথ চলতে অভ্যস্ত বাংলাভাষা কোনও দিন এইসব অপশক্তির কাছে পরাভব মানেনি আর মানবেও না।
ইংরেজরা তাদের ভাষায় বিদেশি-বিভাষী শব্দ প্রক্ষিপ্তকরণ নিরোধকল্পে কৃতঋণশব্দ গ্রহণের যে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে, সে নীতিটার অলঙ্ঘনীয়তা ইংরেজি ভাষায় অবাঞ্ছিত অইংরেজি শব্দের প্রবসনকে সত্যিকার অর্থেই একরকম অসম্ভব করে তুলেছে। একজন ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করে প্রজননে প্রমত্ত হয়ে ইংরেজ জাতির রক্তে বাঙালি জাতির রক্ত প্রবিষ্টকরণ যতটা সহজ একটি বাংলা শব্দকে ইংরেজি ভাষায় প্রবসিতকরণ তারচেয়ে হাজার গুণে দুরূহ কেবল নয়, বলা উচিত অসম্ভব। একজন বাঙালি লেখক তাঁর মাতৃভাষায় যেভাবে অবলীলায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন, তেমনি করে মাতৃভাষাবিচ্ছিন্নতারূপ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একজন ইংরেজ লেখকের পক্ষে, বাঙলা তো দিল্লি দুরস্ত, যে-কোনও একটি বিদেশি-বিভাষী শব্দ ইংরেজি ভাষায় ব্যবহার করা কল্পনাতীত। এমনকি অইংরেজ কর্তৃক খাঁটি ইংরেজি শব্দে নবসৃষ্ট শব্দ বা শব্দবন্ধকে তারা স্বীকৃতি দিতে নারাজ। অর্থাৎ শব্দ প্রবসনের ক্ষেত্রে ইংরেজিভাষীরা যৎপরনাস্তি রক্ষণশীল। শ্রীচাকী বিদেশি শব্দগ্রহণে তাদের রক্ষণশীল নীতির পক্ষে যে যুক্তি-ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন, তাদের জবানিতে বর্ণনা করলে বক্তব্যটি দাঁড়ায় এ রকম, “দেখুন, শুচিতার প্রশ্ন নয়, বাস্তব সমস্যাও প্রচুর। এই ধরুন আপনারা, ভারতীয়রা বলছেন load-shedding মালয়েশিয়ানরা বলছেন brown out এই রকম একই বিষয়কে ইংরেজি শব্দেই বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আমরা যদি সব শব্দকে ঠাঁই দিতে যাই তা হলে আমাদের নিজেদের শব্দ সংসারটার নাভিশ্বাস উঠবে। তা ছাড়া আপনারা যেটাকে আমাদের স্বভাবধর্মী বলছেন তা না-ও হতে পারে। যেমন আপনারা STD বলছেন, ISD বলছেন। আমরা IDD বলছি। IDD অর্থাৎ International Dieect Dialling পৃথিবীর সর্বত্র বোধগম্য, কিন্তু STD-ISD তো তা নয়। আমরা পরিভাষায় subscriber-কে আনতেই চাই না, আপনারা চান। এই ধরনের অনেক সমস্যাই আছে যার জন্যে আমরা দুয়োরটাকে একটু ফাঁক রেখেও মাঝে মাঝে একবারে বন্ধ করে দিই।”(২৪) । এই একটু ফাঁক গলে সংস্কৃতাগত বাংলা অবতার ( avatar), গুরু (guru), স্বস্থিকা (swastika), জগন্নাথ ( juggernaut) ও পাকা ( pukka), গুজরাটি হরতাল ( hortal ), তুর্কি কুলি ( coolie ), ফারসি বাজার ( bazar ) প্রভৃতি অঙ্গুলিমেয় শব্দ ইংরেজি অভিাধানে কৃতঋণশব্দ হিসেবে স্থান পেয়েছে। কিন্তু খাঁটি ইংরেজি শব্দে ভারতীয় উপমহাদেশীয় সর্জন love marriage, white money, black money, bed-sheet, load-shedding, play-back singer, co-wife, junior college, teleteasing, eveteasing প্রভৃতি শব্দজুড়কে ইংরেজরা তাদের অভিধানে ঠাঁই দেয়নি। কিন্তু love marriage, white money, black money সাংবাদিক অনুবাদের কল্যাণে বঙ্গভাষার রঙ্গরসবৃত্তির বৃদ্ধি-পুষ্টি পেলো, দিকে দিকে শুরু হলো ভালোবাসার বিয়ে, ভালোবাসা দিবস পালন ও কালো টাকাকে সাদা টাকা করতে সানন্দে সম্মত হলেন আমাদের কোনও কোনও দলীয় নেতানেত্রীরা, রাজনীতিক রথী-মহারথী।
পত্রিকান্তরে পড়েছিলাম ভাষা সংক্রান্ত চিনাদের কঠোর রক্ষণশীলতা সম্পর্কে। শিরোনাম ছিল, “চীনা ভাষায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ”। চীনারা কারণ দেখিয়ে জিএপিপি (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন)-এর ওয়েব সাইটে বলেছেন, “ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে চীনা ভাষার বিশুদ্ধতা ও মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতির সম্প্রীতিমূলক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই চীনা ভাষায় প্রকাশনার ক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষার শব্দ বা শব্দসমষ্টির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।”(২৫)
অন্যদিকে বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা ও মান ক্ষতিগ্রস্ত হবার কোনওই সম্ভাবনা নেই বলে আমাদের লেখকরা মনে করেন এবং কেবল মনে করেন না, কার্যত তাঁরা বাংলা ভাষার বাক্যের ভেতরে গাদন দেবার মতো করে দেদার ইংরেজি শব্দ ঠেলে প্রবিষ্ট করাতে সদাসর্বদা সানন্দে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। তাঁরা মনে মনে গোঁফে তা দিতে দিতে ভাবেন, এমন গাদন মারায় বাংলা ভাষার পবিত্রতা বা কৌমার্য নষ্ট হয় না বরং রমণীর পেটে ‘পোতা জাগা’র মতো সমৃদ্ধ-পুষ্ট-ভরপুর হয়ে ওঠে ও পরিণামে নব শব্দসম্ভারে ভরে ওঠে ভাষার কোল। হয় তো এই চিন্তার বশবর্তী হয়েই উভয় বঙ্গের কীছু কীছু বাঙালি লেখক তাঁদের লেখায় অবিকৃত ইংরেজি শব্দের ব্যবহার এমন মাত্রায় বাড়িয়েছেন যে সেটাকে বাড়াবাড়ির অপবাদে নিন্দিত করেও ছাড় দেবার উপায় নেই, বাড়াবাড়ির অতিরিক্ত যৎপানাস্তিই বলা সঙ্গত। তাঁরা শত শত হাজার হাজার ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছেন তাঁদের বাংলা লেখায়। মনে হয় গোটা ইংরেজি অভিধানটাই লেখক তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন। একজন লেখক (অর্বাচীন বলতে ইচ্ছে করছিল। আসলে তাঁর বয়স জানি না।) নিম্ন লিখিত ইংরেজি শব্দগুলো বাংলা শব্দের সঙ্গে মিশিয়ে বাংলাবাক্যের অপূর্ব অদ্ভুত জগাখিচুড়ি (সঙ্গত কারণেই ইংরেজি ‘কোলাজ’ শব্দটা এখানে প্রয়োগ করা গেলো না। ভুবনগাঁয়ে ‘কোলাজ’ একটি উত্তম শিল্প বলে স্বীকৃত।) তৈরি করেছেন। লেখকের ব্যবহৃত শব্দের নমুনা : সেক্স, স্টাভার্ড, কনফেকশন, প্রেফারেনস, বিয়ার, ড্রাইভ, ফার্স্ট স্টেজ, ইউরিনারি ট্র্যাক, লাইফ, অ্যাকচুয়ালি, হোমোসেক্সুয়াল, বাইসেক্সুয়াল, প্লেজার, ওরিয়েন্টেশন, হোল, পেনিস, স্প্যাজম, টিচার, ইনসেন্ট, নয়েজ, সায়কায়াট্রিস্ট, কমপ্লেক্স, রেপড, ফলো, হেড লাইট, টয়লেট, রেপ, অ্যাডভেঞ্চার, সারভাইভ, হিপনোথেরাপিস্ট, গ্রাউন্ড, ড্রাইভিং, রুম, সাপার, লাইন, ল্যাম্প, স্কার্ট, প্যান্টি, নাইট সিফট, জিনস, ইউনিভার্সিটি, জয়েন্ট ফ্যাসিলি, হরর মুভি, ডিনার, ক্যাফেটরিয়া, ডায়েট, রিলেট, পিন, রোড, অ্যাভিনিউ, সাদার্ন ব্রিজ, ব্যারিকেড, ম্যাটাডোর, সাইট, স্টেটমেন্ট, পার্কিং এরিয়া, ওভারটেক, ব্রেক, ড্রাইভার, ব্যাক ডোর, পকেট, বাই ডিফল্ট, প্লিজ, মুভমেন্ট, স্পিসিস, জার্নি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইংরেজি ভাষায় পরম পারঙ্গম এই লেখক একজন পশ্চিম বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবী (আসলে কি তাই?), নাম সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সানন্দা পুজো সংখ্যা ১৪১৮-তে একটি উপন্যাস লিখেছেন এবং সেটাতেই তিনি এত সব উটকো ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষাকে বাংরেজিভাষা বানানোর সচেতন প্রয়াসে নিমগ্ন হয়েছেন। তাঁর উপন্যাসের প্রথম চার পৃষ্ঠাতেই(২৬) উপরে উদ্ধৃত ছিয়াত্তরটি ইংরেজি শব্দের সাক্ষাৎ মেলে। অবশ্য কীছু কীছু শব্দ গণনায় বাদ পড়েছে। এই লেখক যখন লেখেন, ‘প্রকৃত প্রস্তাবে, মেঘদূত বলে ইলোনা কুহু মিত্রার জীবনে কেউ কখনও ছিল না।’ বা ‘চোখ থেকে রোদচশমা খুলে ফেলে মেঘদূত রায়কে ইলোনা কুহু মিত্রা বলল, “না, এগুলো কোনও ব্যাপারই নয়! […]”।’(২৭) তখন অবাক হতে হয়। কারণ ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’, ‘জীবনে’, ‘রোদচশমা’ ও ‘ব্যাপার’ এই চারটি বাংলা শব্দ বা শব্দবন্ধেরও ইংরেজি চমৎকার শব্দপ্রতীক আছে (যথাক্রমে অ্যাকচুয়ালি, লাইফ, সানগ্লাস ও ম্যাটার), সে ব্যাপারে তিনি একেবারেই নির্বিকল্প মূর্খ। তাঁর লেখার ধাঁচ অনুসারে এই বাক্য দু’টি হতে পারতো : (ক) অ্যাকচুয়ালি, মেঘদূত বলে ইলোনা কুহু মিত্রার লাইফে কেউ কখনও ছিল না। এবং (খ) চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ফেলে মেঘদূত রায়কে ইলোনা কুহু মিত্রা বলল, “না, এগুলো কোনও ম্যাটারই নয়!” যিনি ইংরেজি ‘সানগ্লাস’-এর বাংলা ‘রোদচশমা’ করতে পারেন তিনি কেন তাঁর লেখায় এতো এতো ইংরেজির ছাইপাঁশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাঁর লেখাকে নষ্টসময়ের ভ্রষ্টরচনার প্রয়াসে ভরপুর করে কষ্টকর করে তোলেন, বোধগম্য নয় কীছুতেই। তবে এর একটা উত্তর তো আমার কাছে সেই আবদুল হাকিমের কাল থেকেই প্রস্তুত আছে। অর্থাৎ এই সব বঙ্গে জন্ম তাই বঙ্গবাসী, কিন্তু বাংলাভাষাবিদ্বেষীরা ছিল এবং এখনও আছে। যেমন পাকিস্তান-কালপর্বে তারা তো রাষ্ট্রক্ষমতার কৃপাপুষ্ট হয়ে বাংলাকে রীতিমতো ‘খতনা’ করানোর ব্যবস্থা করেছিল, আর এখন বাংলাভাষাকে বাংরেজি বাননোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। আর এর বিপরীতে আছেন সর্বসাকুল্যে ত্রিশ কোটি বাংলাভাষী। এদের অস্তিত্বের গর্বে গৌরবাণ্বিত হয়ে একজন ইয়াসমিন বলেন, “বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশÑ এই তিনটি ব-যুক্ত শব্দের মধ্যে যে মমতা, শক্তি, জাগরণের উচ্ছ্বাস মিশে আছে তা প্রতিটি বাঙালিই অনুভব করেন, অন্তত যাঁরা এ শব্দগুলোর মধ্যে খুঁজে পান নিজের সত্তার অস্তিত্ব।”(২৮) কিন্তু উভয় বঙ্গে রাজাকারজীবিতায় মোহাচ্ছন্ন কোনও কোনও লেখক আছেন যাঁরা স্বসত্তাকে পরসত্তার কাছে বিকিয়ে দিতে পছন্দ করে যৎপরনাস্তি প্রসন্নতায় আপ্লুত হন। এইরূপ কোনও কোনও বাঙালি মাতৃভাষারূপ বঙ্গভাষাকে নিয়ে ভঙ্গিভাঙ্গা বা বালখিল্যতা, যাকে বলে যা ইচ্ছে তা-ই করতে করতে একেবারে যাচ্ছেতাই লঙ্কাকা- বাঁধিয়ে ফেলার ব্যাপারে ওস্তাদেরও ওস্তাদ, যাকে বলে মহাগুরু। ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ব্যাধি তাদের পিছন ছাড়ে না। এ কথা যেমন তাবৎ বিশ্ববাসী জানে, তেমনি তারা জানে : মান্দারিনভাষী চিনারা প্রমিত চিনাভাষা মান্দারিন নিয়ে যে কারওর যাচ্ছেতাই করা বরদাস্ত করবে কি, সে ব্যাপারে পান থেকে চুন খসালেই খবর আছে। চিনারা মাতৃভাষার ব্যাপারে এতটাই রক্ষণশীল যে, তারা বাঙালির মতো এই একটু ছোটমুটো মতো কীছুতে কীছু যায় আসে না, এমন ভাব করে, কীছুতেই বসে থাকার পাত্র নয়। বাঙালিরা কিঞ্চিতে বাজে না নীতির নৈতিকতায় বিশ্বাসী। তারা বিরাট বিরাট ব্যাপারকে ক্ষুদ্র ব্যাপারের অভিজ্ঞান এঁটে দিয়ে সেটাকে পাত্তা দেওয়ার অপরিহার্য বিষয়টিকে লাপাত্তা করে ফেলে বসে থাকে।
৩ মে ২০১৪ তারিখের ‘দৈনিক আমাদের সময়’ পত্রিকার (মোট ১২ পৃষ্ঠা) সংবাদশিরোনামসহ অন্যান্য বিষয়ের শিরোনামে মোট ৩১টি এবং ৫ অক্টোবর ২০১৩ তারিখের দৈনিক সমকাল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ৪০টিরও (মু-মালশব্দসহ) বেশি ইংরেজি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে (অনবধানতাবশত দুয়েকটির কমবেশি হলেও হতে পারে)। সেদিন সমকাল-এর প্রকাশ ব্যাপকতা ছিল মোট ২০ পৃষ্ঠা। প্রতি পৃষ্ঠায় গড়ে ৪০টি করে ধরে নিলে শব্দসংখ্যা দাঁড়ায় ৮০০। অনুসন্ধান করলে হয় তো দেখা যাবে এই বিপুল সংখ্যক শব্দের একদশমাংশ পরিমিত শব্দও কৃতঋণশব্দরূপে বাংলাভাষায় প্রবসিত কিংবা আমাদের বাংলা অভিধানের শব্দভুক্ত্যন্তর্ভুক্ত নয়। সমকালের সাধারণ পাঠক বা এ দেশের প্রাকৃত সরকার নিত্যদিনকার পত্রিকার এই বাংরেজিপনাকে উটকো বাতেলা মনে করে জীবন থেকে সরিয়ে রাখে, যেনো কীছুই নয়, এইরূপ ভাষাদূষণে সমাজের কীছুই যায় আসে না, কিন্তু এইরূপ বিষয়ে ইংরেজদের যেমন যায় আসে তেমনি যায় আসে মান্দারিনভাষীদের। মান্দারিনভাষা অর্থাৎ চিনাভাষায় এমন বাংরেজিপনার মতো দেদার মান্দারেজিপনা (< মান্দারিন+ইংরেজি+পনা) একবারেই কল্পনাতীত, সম্পূর্ণ অসম্ভব, আগেই বলেছি চিনে আইন করে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে বিভাষার প্রবসন প্রবণতাকে। অধুনা ভুবনায়নের কল্যাণে স্বভাবে সাম্রাজ্যবাদী ও উত্তরোত্তর অতি আগ্রাসী-সন্ত্রাসী হয়ে ওঠা ভাষা ইংরেজির উৎপাত চিনারা সহ্য করতে একদম নারাজ। চিনাদের জিএপিপি ঠিকই সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বিধি ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘প্রশাসনিকভাবে শাস্তি দেওয়া হবে’। অর্থাৎ গোলকায়িত বিশ্বে ভাষাসা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিহত করতে সদাসতর্ক রাষ্ট্র স্বয়ং স্বভাষার চারপাশে একটি ভাষাসাংস্কৃতিক রক্ষাকবচ তৈরি করে নিয়েছে। এই ভাষাসাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা স্বভাষারক্ষণ কেবল নয়, গোলকায়িত বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন জাতি কিংবা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মরক্ষারও একটি কৌশল বটে। তবে ভুবনগাঁয়ের বাজারে জোর খবর আছে, চিনারা পরভাষা চর্চার রক্ষণশীলতার অচলায়তন ভেঙে ইদানিং তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববিস্তৃত অপরিহার্যতার প্রতি যৎকিঞ্চিৎ সম্মান প্রদর্শন করে ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় উৎসাহী হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে। সে সংখ্যাটাও একবারে ফেলনা নয়, প্রায় ৩০ কোটির অধিক সংখ্যক চিনাভাষী ইংরেজি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেছে। যে সংখ্যাটা হয়তো পৃথিবীতে বাংলাভাষী জনসংখ্যার চেয়ে বেশি না হলেও একেবারে কম কীছু নয়।
তা হলে সার্বিক বিবেচনায় বিষয়টি এই দাঁড়ালো যে, বাংলাভাষীরা ইংরেজির অনুপ্রবেশের জন্যে ভাষাগৃহের দুয়োর হাট করে খেলে রেখেছে, বিপরীতে চিনারা বিভাষা-প্রবসন প্রকরণরূপ ভাষাসাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতাকে প্রতিরোধকল্পে গড়ে তুলেছে আইনি দেওয়াল (আইনি ছাকনি বোধ করি বলা যাবে না)। ভাষাদূষণপ্রিয়তায় মজে বঙ্গবাসী রঙ্গে দিন কাটায়, বিপরীতে চিনারা ভাষারাজ্যের পবিত্রতা রক্ষার্থে আরেকটা চিনের প্রাচীর তোলে। ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে এই হলো গৌড়ে আর বঙ্গের ব্যবধানের মতো বঙ্গ আর চিনের মধ্যে তফারেন্স (তফাৎ+ডিফারেন্স)।
তথ্যসূত্র :
১. …, রাজনীতির কথা, অনুবাদ : ননী ভৌমিক, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭০, পৃষ্ঠা : ১১।
২. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আমি কি বাঙালি?, (বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়), পত্র ভারতী, জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা : ১৭।
৩. জ্যোতিভূষণ চাকী, বাগর্থকৌতুকী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড (কলকাতা), দ্বিতীয় মুদ্রণ : আগস্ট ২০০৬, পৃষ্ঠা : (১৪-১৫)।
৪. নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনন্দর জার্নাল (প্রবন্ধ : জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি), মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি., প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১৪০৮, কলকাতা পুস্তকমেলা ২০০২- এর অষ্টম মুদ্রণ : মাঘ ১৪২২, পৃষ্ঠা : ২৭৪।
৫. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস, দেশ (বইমেলা ২০০৩), ৭০ বর্ষ ৭ সংখ্যা, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৩, পৃষ্ঠা : (৬৭Ñ৬৮)।
৬. নন্দিতা বাগচী, সমাধান (গল্প), সানন্দা পুজো সংখ্যা ১৪১৮, পৃষ্ঠা : ৩৫৭।
৭. নন্দিতা বাগচী, সমাধান (গল্প), সানন্দা পুজো সংখ্যা ১৪১৮, পৃষ্ঠা : ৩৬০।
৮. সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্মোহন (উপন্যাস), সানন্দা, পুজো সংখ্যা : ১৪১৮, পৃষ্ঠা : ৮৮, স্তম্ভ : (১-২)।
৯. ইমদাদুল হক মিলন, পর (ধারাবাহিক উপন্যাস), কালি ও কলম, দ্বিতীয় বর্ষ : প্রথম সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ ১৪১২ (মে ২০০৫), পৃষ্ঠা : (১০৮Ñ১১১)।
১০. আবদুর শাকুর, উপমহাদেশের প্রথম রাজাকার, রম্যসমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ : মার্চ ২০০৭, পৃষ্ঠা : ২১৩)।
১১. আবদুর শাকুর, উপমহাদেশের প্রথম রাজাকার, রম্যসমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ : মার্চ ২০০৭, পৃষ্ঠা : ২১৪।
১২. শহীদুল জহির, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, শালুক, বর্ষ নয় সংখ্যা ১০, সেপ্টেম্বর ২০০৮, পৃষ্ঠা : ২১৭।
১৩. প্রাগুক্ত।
১৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : (২১৫Ñ২১৬)।
১৫. জওহরলাল নেহেরু, ভারত সন্ধানে, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড (কলকাতা), দ্বিতীয় মুদ্রণ : জুলাই ১৯৯১, পৃষ্ঠা : ২৬২।
১৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ২৪৮।
১৭. জাকির তালুকদার, মুসলমানমঙ্গল, রোদেলা প্রকাশনী, দ্বিতীয় মুদ্রণ, নভেম্বর ২০১০, পৃষ্ঠা : ১০১।
১৮. এদুয়ার্দো গালোয়ানো, লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাস, অনুবাদ : অশেষ রায়, র্যাডিক্যাল (কলকাতা), জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা : (২৮Ñ২৯)।
১৯. জ্যোতিভূষণ চাকী, বাগর্থকৌতুকী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ : আগস্ট ২০০৬, পৃষ্ঠা : ১৩।
২০. সুচিত্রা ভট্টাচার্য, গল্প : (বান্টি, বাবলি আর সে), সানন্দা, পুজো সংখ্যা ১৪১৮, পৃষ্ঠা : ১৬৮, স্তম্ভ : ২ ।
২১. আবুবকর সিদ্দিক, বিপ্লবের শ্বেতপত্র, কালি ও কলম (প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা), দশম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, ফাল্গুন ১৪১৯ (ফেব্রুয়ারি ২০১৩), পৃষ্ঠা : (৮৯-৯২)]।
২২. ফিরোজ আহমেদ, বিজ্ঞানচিন্তার ভাষা, কালের কণ্ঠ : ঈদ সংখ্যা ২০১৩, পৃষ্ঠা : (৯০Ñ৯১)।
২৩. কলিম খান, পরমাভাষার সংকেত, প্যাপিরাস, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০১, পৃষ্ঠা : (১১-১২)।
২৪. জ্যোতিভূষণ চাকী, বাগর্থকৌতুকী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ : আগস্ট ২০০৬, পৃষ্ঠা : ১৪।
২৫. …, কালের কণ্ঠ, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১০, পৃষ্ঠা : ২২, স্তম্ভ : (৪-৫)।
২৬. প্রাগুক্ত, সানন্দা, পুজো সংখ্যা ১৪১৮, পৃষ্ঠা : ৬৩, ৬৬, ৬৮, ৬৯।
২৭. প্রাগুক্ত, সানন্দা, পুজো সংখ্যা ১৪১৮, পৃষ্ঠা : যথাক্রমে ৬৮ ও ৬৯।
২৮. মাহফুজা ইয়াসমিন, ফিরে আসে একুশ, কালি ও কলম, (প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা), সপ্তম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, ফাল্গুন ১৪১৯ (ফেব্রুয়ারি ২০১০), পৃষ্ঠা : ৩৪৯।
০৯. একাডেমির বঙ্গপ্রতিবর্ণায়ন এবং ইত্যাদি
বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির অনুশীলন কিংবা অনুশীলনের উপক্রম হলে বাংলা একাডেমির প্রসঙ্গটা কারণে অকারণে ঘুরেফিরে এসে যেতেই পারে এবং সাধারণত সেটাই স্বাভাবিক। জনান্তিকে বলে রাখি, বর্তমানে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বানানে / ী/ বর্জন করে //ি সহযোগে ‘একাডেমি’ লেখা হচ্ছে। তার বড় প্রমাণ অতিসম্প্রতি ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ [প্রথম খ- (অÑঞ)]’র যুগান্তকারী প্রকাশনা (জুন ২০১৩)। এই অভিধানের নামাঙ্গে এই প্রথম পরিলক্ষিত হয় (এর পূর্বে যদি বানান সংক্রান্ত এই পরিবর্তনটা হয়ে থাকে, হলে হতেও পারে, আমার দৃষ্টিগোচর হয় নি) পূর্বেকার ‘একাডেমী’ বানানটাকে বদলে দিয়ে অথবা পরিহার করে ‘একাডেমি’ বর্ণবিশ্লেষণে প্রশাসনিক স্বীকৃতি প্রদান এবং প্রকারান্তরে আমলাতান্ত্রিক ভাষানিয়ন্ত্রণের বদ্ধমুঠি থেকে ‘একাডেমী, শহীদ’ ইত্যাদি শব্দে অকারণ / ী/-কার প্রয়োগ-ব্যবহার নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু লোকে সাধারণত বাংলা একাডেমির অভিধান ব্যবহারেই বেশি অভ্যস্ত। অভিধানে অভ্যস্ততার প্রসঙ্গ এলেই একজনের অম্লান স্মৃতির সঙ্গে একটি ঘটনার কিরণসম্পাৎ মনের ভেতরটাকে স্নিগ্ধমধুর ঘরকালজিক (ঘরকাতুরে+নস্টালজিক) করে তোলে।
ছাত্রত্ব অবসানের আগেই রাজনীতিচর্চার প্রভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী চিন্তার শিকড় গজিয়ে গেছে মননের গভীরে এবং মন প্রকারান্তরে আমলাতন্ত্রবিমুখ, এই যাকে বলে, আমলাতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আদর্শিক বিবেচনায় আমলাতান্ত্রিকতাকে আপাতত আদি-অকৃত্রিম ব্রিটিশকারিন্দাগিরির উত্তরাধিকারের বেশি কীছু মনে করার কোনও কারণ নেই, আমলাকে সাধারণত শ্রেণিচেতনার নিরিখে ইংরেজ লর্ড মেকলে’র চেলা হিসেবেই এখনও গণ্য করা যায়, কারণ বাংলাদেশে আমলা এখনও মেকলের শিষ্যত্বকে শিরোধার্য করেই চলে, সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে না। সে বেতন যার খায় তাকে পায়ের তলে রাখতে বড় বেশি পছন্দ করে। এখানে কেউ আমলা হলে আর বঙ্গসন্তান থাকে না, আমজনতার প্রতি উন্নাসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একেবারে অকৃত্রিম ব্রিটিশভারতীয় মুৎসুদ্দির প্রতিমূর্তি লাভ করে। এই বিভীষণরূপী কারিন্দাগিরির বাংলাদেশ সংস্করণের প্রতি সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বৈরীভাবনায় নির্দ্বিধায় শরণাগত। আমিই বা এই সর্বাস্তৃত বিচ্ছিন্নতার প্রকোপ থেকে কী করে রক্ষা পাই, আর আমার ব্যতিক্রম হয়ে উঠারই বা অবকাশ কোথায় ? বাংলাদেশে বিদ্যমান আমলা এবং আমজনতার এই সামাজিক প্রভেদের প্রপঞ্চটিকে ( phenomena ) বিচ্ছিন্নতা কিংবা বিযুক্তি যাই বলা হোক না কেন তার সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না কীছুতেই। বাংলাদেশে এটি একটি অনতিক্রমণীয় সমস্যা হয়ে আছে, এর নিরসন চাই। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির চাকা যতোদিন সচল থাকবে ততোদিন আমজনতার বুকের উপর দিয়ে চালানো আমলাতান্ত্রিকতার চাকাটিও সচল থাকবে নির্বিঘেœ, তাতে সন্দেহের কোনওই অবকাশ নেই। প্রশাসনিক তদন্তের প্রহসনের অপূর্ব কেরদারিসমায় আমলারা সর্বাবস্থায় সর্বত্র একেবারেই ধোয়া তুলসি পাতার মর্যাদায় সমাসীন।
তখন ২০০২ সালের মাঝামাঝি। খান পদবির একজন সুনামগঞ্জের উপমহাধ্যক্ষ ছিলেন। এই খান কীভাবে যেনো এই বিরূপ তান্ত্রিকতার বাইরের ব্যতিক্রমী একজন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক অতুলনীয় এক সাংস্কৃতিক মানুষ। বিশেষ বিশেষ কারণে তাঁকে মেকলে’র সাকরেদ তরমুজ বলে মনে হতো না, যদিও তিনি আপাদমস্তক আমলাই ছিলেন, আমলাতান্ত্রিকতার প্রচলিত প্রকরণের নিরিখে একটু ব্যতিক্রমী, একটু বেমানান। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, আমলা তো এমনই হবেন, যিনি প্রকৃত অর্থেই জনস্বার্থের প্রতি অনুরক্ত ও দেশ সেবার কর্তব্যে বদ্ধপরিকর। যিনি অন্তত সরকারি পদের অপব্যবহারে নিমজ্জিত হয়ে বাড়তি কোনও বিধিবিরুদ্ধ অন্যায় সুযোগ-স্বার্থ গ্রহণে আগ্রহী হবেন না। কিন্তু পরক্ষণেই ভেবেছি, আমলা তো রাষ্ট্রযন্ত্রের নাটবল্টু, যখনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় কোনও শ্রেণি আবির্ভূত হয় সে শ্রেণি তার স্বস্বার্থ চরিতার্থ করার কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমলাদেরকে বিশেষ একটি সামাজিক বর্গ হিসেবে তার নিজের ভেতর থেকে সৃষ্টি করে, এই বর্গটির চরিত্র জনসেবকের হতে গেলে, সর্বাগ্রে রাষ্ট্রযন্ত্রটির ক্ষমতায়নে জনকল্যাণমূলক সাম্যবাদী সামাজিক শ্রেণির অধিষ্ঠান চাই।
যদিও হবার কথা নয় এবং সাধারণত হয় না, তবু কীভাবে যেনো এই অসম্ভবটা সম্ভব হয়েছিল যে, তাঁর সঙ্গে আমার একটা সখ্যসেতু তৈরি হয়েছিল। তার কারণ বোধ করি, তিনি সুবাস (মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিন) ও আমার কাছে সুনামগঞ্জের লোককবিদের প্রত্যেকের, এই যাকে বলে দু’তিনটি করে, গান আমাদের সংগ্রহীত সম্ভার থেকে তাঁকে দেবার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম ব্যাপক গবেষণা করবেন, কিন্তু তা নয়, তিনি মনস্ত করেছিলেন লোককবিদের কিঞ্চিৎ পরিচিতিমূলক বই প্রকাশ করবেন। আমরা এই প্রস্তাব লুফে নিয়ে তাঁকে সর্বাত্মক আনুকূল্য দেবার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে কসুর করি নি, সুনামগঞ্জের লোকসাহিত্য নিয়ে যৎসামান্য হলেও কাজ হবে, এই ভেবে। এদিকে কীছু দিনের মধ্যেই খানের দপ্তরে সুনামগঞ্জের লোককবিদের রচনার সংগ্রহ বহরে বিশাল হয়ে উঠলো। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায় থেকে লোককবিদের পা-ুলিপি, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে দুষ্প্রাপ্য, তাঁর টেবিলে ভোজভাজির মতো এসে হাজির হতে লাগলো। শত চেষ্টায়ও আমরা হয় তো যার সামন্যও সংগ্রহ করতে পারতাম না। অন্তরে এই আমলাটি ছিলেন আগাপাছতলা একেবারেই মরমিয়া। এদিক থেকে আমি সম্পূর্ণ তাঁর বিপরীত মেরুর মানুষ। আমার কাছে তাঁর তাৎপর্যটা একান্ত ব্যক্তিগত, একজন কাগজীর আত্মজাগৃতির পথিকৃত। আমি ‘গো-এষণাধর্মী’ রচনা থেকে তখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলাম, তিনি আমার সেই বিচ্ছিন্নতাটাকে চিরতরে মুছে দিলেন, অর্থাৎ তাঁর নির্দেশে অন্তরে ‘তুষের অনল’-এর ভূমিকা লিখে ফেলতে কসুর করি নি। আমার জন্যে সেদিন সেটা চাট্টিখানি কীছু ছিল না।
খান তখন ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ বের করার কাজে উঠেপড়ে লেগেছেন, যাকে বলে কোমর বেঁধে মাঠে নামা। এ কাজে রাতকে দিন করে চলেছেন। বিরাম নেই। প্রথমপুরুষের ভাষ্যে এই কর্মযজ্ঞের বয়ার্ণনাটা হতে পারে এরকম, “তিনি ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এই বইটিতে সুনামগঞ্জের যে-সব লেখকের ইতোমধ্যে বই প্রকশিত হয়েছে তাঁদের নামের একটি তালিকা সন্নিবেশনের পরিকল্পনা তিনি করেছেন। তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছেন ইকবাল কাগজীকে। তালিকা প্রণয়নে নিরত হয়ে কাগজী দেখলেন, সুনামগঞ্জের প্রতিথযশা লেখক-সাহিত্যিক বলে স্বীকৃতজনদের অনেকেই কোনও প্রকাশিত বই না থাকার শর্তে এই তালিকায় ভুক্তিবঞ্চিত হবেন। প্রকাশিত বই আছে বলে নাদান কাগজীর থেকেও নাদান অনেকেরই নাম এই তালিকায় সন্নিবেশিত হবে অথচ প্রকাশিত বই নেই বলে সন্নিবেশবঞ্চিত হবেন দেওয়ান মহসিনুর রাজা চৌধুরী ও মকবুল হোসেন চৌধুরীর মতো বিখ্যাত গুণি লেখক-সাহিত্যিকরা, যাঁরা প্রকাশবঞ্চিত একাধিক পাণ্ডুলিপির অধিকারী। এইসব পা-ুলিপির শিল্পমর্যাদা কোনও অংশেই কম যদিও নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চমানের। অপরদিকে প্রকাশিত সমস্ত বই বা পুস্তিকাই যে যথার্থ অর্থে মানসম্মত বা শিল্পমানে উত্তীর্ণ এমন তো নয়।
“সহসা অবগত হওয়া গেলো, খান বদ্ধপরিকর হয়েছেন কাগজীর একটি কবিতার বই বের করে তবেই ছাড়বেন। একেবারে ধনুকভাঙা পণ। নাছুঁড়বান্দা হয়ে উঠেছেন। তাঁর সম্পাদিত বইতে লেখক হিসেবে কাগজীর নাম যাবে না এবম্প্রকার খতরনাক অসম্পূর্ণতা ! কক্ষনও না । তিনি কীছুতেই এমন সৃষ্টিছাড়া কা- বরদাস্ত করবেন না। সুতরাং ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ গ্রন্থের প্রকাশের আগে কাগজীর কবিতা গ্রন্থের প্রকাশ অনিবার্য নির্বন্ধ হয়ে উঠলো। একটাই কথা, বই ছাপতেই হবে। কাগজীর নাম লেখক তালিকায় যাবে না, খান থাকতে তা কী করে হয় ? যথারীতি খানের হুকুম জারি হলো কবিতার পা-ুলিপি দাখিলের। সময় মাত্র এক বিস্যুদবার থেকে আর এক বিস্যুদবার। একেই বুঝি বলে, ‘উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’। কী আর করা, লোকে বলে ‘পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে’। না পারতে শেষ পর্যন্ত ‘নষ্ট কুসুমের কষ্ট’ গ্রন্থের পা-ুলিপি তড়িঘড়ি খানের সকাশে জমা করলেন কাগজী। কবিতা গ্রন্থের যে-পা-ুলিপি প্রদান করা হয়েছিল তাতে বেশ কীছু কবিতার ছত্রে ছত্রে স্ল্যাঙ্গুয়েজের সমাহার ছিল দেদার। খান বেছে বেছে সেগুলোকে প্রকাশবঞ্চিত করে প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি মনেপ্রাণে যাকে বলে এক সজ্জন, আমজনতা যাকে বিরক্তি ও বিদ্বেষ প্রকাশক ‘ভদ্দরনোক’ বলে তিনি সে-স্তরের কেউ আদপেই ছিলেন না, তিনি আসলেই ভাষার শব্দের শিষ্ট ও অশিষ্ট ভেদ অনুমোদনকারী ভদ্রলোক ছিলেন।”
এই ‘নষ্ট কুসুমের কষ্ট’-এর দ্বিতীয় কবিতার প্রথম তিন চরণ এরকম, “বঙ্গভবন শহীদ মিনার এই পতাকা/ সংবিধানের বাক্যগুলো টাকশালের একটি টাকা/ কেউ নয় তার”। পাণ্ডুলিপিতে ‘শহীদ’ বানানটি লিখেছিলাম ই-কার ()ি দিয়ে ‘শহিদ’। কিন্তু খান ই-কার ()ি কেটে ঈ-কার (ী) লাগিয়ে নির্দ্বিধায়, একেবারে যাকে বলে চোখ বুজে, ‘শহিদ’কে করে দিলেন ‘শহীদ’ এবং কোনও আপত্তিই পাত্তা পেলো না, টেবিলে পড়ে থাকা বাংলা একাডেমীর বানান অভিধান খোলে দেখিয়েও দিলেন। আর ‘শহিদ’-এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ‘মিনার’ ই-কার ()ি নয়ে পড়ে রইলো সেটা ঈ-কার (ী) করে দিতে কোনও প্রয়াস পরিলক্ষিত হলো না তাঁর পক্ষ থেকে, এ ব্যাপারে একেবারেই যাকে বলে নির্লিপ্ত থাকলেন তিনি। অথচ দু’টি শব্দই আরবি থেকে বাংলায় প্রবসিত। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পরে যে, ‘মিনার’ যদি //ি দিয়ে লেখা যায় তবে ‘শহীদ’ কেন /ী/ দিয়ে লিখতে হবে ? ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর পরিশিষ্টাংশে ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ ২.০১. ক্রমিক নিয়মে বলা হয়েছে, “সকল অ-তৎসম অর্থাৎ তৎভব, দেশী, বিদেশী, মিশ্র শব্দ কেবল ই এবং উ এদের কার চিহ্ন ি ু ব্যবহৃত হবে। এমন কি স্ত্রীবাচক ও জাতিবাচক ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।”(১) লক্ষ্যণীয় যে, ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম বিবৃতকরণের ভাষ্যে সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো অকারণ /ী/-সমৃদ্ধ ‘একাডেমী’, ‘দেশী’ ‘বিদেশী’ রয়ে গেছে। আমার দুর্ভাগ্য ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ ধারেকাছে ছিল না। সেখানে শীর্ষশব্দ হিসেবে ‘শহিদ’ ও ‘বিকল্প শীর্ষশব্দ’ হিসেবে ‘শহীদ’ শব্দটির ভৌক্তিক সম্মতি কিংবা ভুক্তিগত স্বীকৃতি, যা-ই বলি না কেন, সেটা প্রদর্শন করে প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘শহিদ’ শব্দটির পক্ষেই ব্যাকরণগত সম্মতি-স্বীকৃতি প্রদত্ত হয়েছে। কিন্তু ঘটনাক্রমে ব্যাকরণবিধি অনুসারে ভুলভাবে শব্দটির সাধারণ্যে বহুল প্রচলন ও ব্যবহারের সমাজস্বীকৃতি অর্থাৎ ব্যবহারিক বাস্তবতার প্রতি তাঁর স্বাভাবিক প্রাতিস্বিক আনুমোদনের সঙ্গে তাঁর অমলাতান্ত্রিকতার আমলামির মিথষ্ক্রিয়াসঞ্জাত সামর্থ্য আমার বিপক্ষে মূর্তিমান প্রতিষ্ঠন্তরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। বলা যায়, সেদিন দৈবক্রমে বাংলা একাডেমী (তখন বানানটা / ী/ দিয়েই সারা হতো) আমার পক্ষে দাঁড়িয়ে একটুও অনুকম্পা প্রকাশ করে নি, এবং নির্ঘাত আমার হার হলো। ভেতরে ভেতরে একটুখানি পিঁপড়েকামড় টের পেয়েছিলাম। জ্বলতিটা এখনও টের পাই।
প্রসঙ্গের অবতারণার বাতাবরণটা দীর্ঘ হয়ে গেলো। তেকারণে সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থী। একজন প্রিয় মানুষের প্রসঙ্গ তো অবতারণা করা গেলো, মন্দ কী ? এমন সুবর্ণ সুযোগ তো, বোধ করি আর আসবে না এবং জানা কথা, সুযোগের সদ্ব্যবহার করাটা মন্দ কীছু নয়।
বানান সংক্রান্ত সেদিনের ঘটনাটি আজকের দিনের মতো এতোটা তাৎপর্যম-িত ছিল না আমার কাছে। তখন ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ভাবিত ছিলাম না । প্রসঙ্গটিই মাথায় ছিল না কস্মিনকালেও। আজ কেবল মনে হচ্ছে, সেদিন একটি ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতায় প্রছন্ন ছিলাম। এই বিচ্ছিন্নতার হোতা ছিল বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির অভিধান অনুসারে ‘শহিদ’ কিংবা ‘একাডেমি’ ইত্যাদি অনেক শব্দে ঈ-কার (ী) ব্যবহার করা অপরিহার্য ছিল। এইভাবে প্রমিত বনানবিধি থেকে দূরে সরে থাকাও একধরণের ভাষিক বিচ্ছিন্নতা। এখানে এই বিচ্ছিন্নতার অর্থ ছিল, একটি পরিচিত ও শুদ্ধ বনানবিধি থেকে বাংলাভাষীকে সরিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র, প্রকারান্তরে বাংলাভাষার অবিকল্প বানানবিধির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা। academy’র বাংলা প্রতিবর্ণায়নে //ি-এর আত্তীকরণ সম্পন্ন করে প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রমিত বনানবিধি কিংবা শুদ্ধ বানানবিধি থেকে দূরে সরে থাকা কিংবা যাকে বলে ভাষিক বিচ্ছিন্নতাকে পরিহার করা হলো। অবিকল্পবানানবিধি প্রতিষ্ঠার এই নীতি গ্রহণের জন্যে কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।
বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান, প্রথম খ- (অ-ঞ)-এর প্রকাশকাল জুন ২০১৩। এই গ্রন্থার্ণবে ইংরেজি academy’র ছয়টি (গরুখোঁজা করে এই ছয়টিই পেয়েছি। দৈবক্রমে দুয়েকটি বাদ পড়েও যেতে পারে। গেলে কী আর করা।) বাংলা প্রতিবর্ণায়ন প্রদত্ত হয়েছে : আকাদিমি (১৮৩২), আকাদেমি (১৮৩২), একডিমি (১৮৩১), একাডেমি (১৮৬৩), একাডেমী (১৮৩১) ও একিডিমি (১৮৩৪)। একাডেমী, একডিমি, আকাদিমি ও আকাদেমি এই চারটি প্রতিবর্ণীবয়ন ‘সামাচার দর্পণ’ পত্রিকায় সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রথম দু’টি ১৮৩১ সালে ও পরের দু’টি ১৮৩২ সালে। প্রয়োগবাক্য হিসেবে দু’টি প্রতিষ্ঠানের নাম উৎকলিত হয়েছে : বেরুলিম একাডেমী ও ধর্ম্মতলা একডিমি। অর্থাৎ সেই ১৮৩১ সালে বিদেশি শব্দের বানানে স্বরবর্ণ বা স্বরবর্ণের ‘কার’ ব্যবহারে হ্রস্ব-দীর্ঘের কোনও নির্দিষ্টতা ছিল না।
বাংলাভাষায় অনেক কৃতঋণ শব্দের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে, এমন কি সংস্কৃতাগত শব্দের ক্ষেত্রেও। বিকল্পবানানের খপ্পরে পড়ে নাজেহাল হতে হয়েছে এবং এখনও সে-উটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলছে না। আজ থেকে ছয় দশকাধিক কাল আগে এমন বেশ কীছু শব্দের বিকল্পবানানের প্রচলন নিয়ে অনুযোগ করেছেন কাজী দীন মোহাম্মদ। তাঁর একটি সরস, যাকে বলে একেবারে রসে টইটম্বুর, ভাষ্য এরকম, “যেদিন অভিধান খুলিয়া দেখিলাম, জমিদারি, জমিদারী, জমীদারি ও জমীদারীÑ এই চারিটী জমিদারি-ই কায়েম, সেদিন ঐ গুলি খুঁজিয়া বাহির করিতে যতটুকু কষ্ট হইয়াছিল তাহার চাইতে ঢের বেশী আনন্দ হইয়াছিল এই ভাবিয়া যে,- গলিত-দন্ত, পলিত-কেশ, শ্লথ-অঙ্গ, শিথিল-প্রতিভ, অথর্ব্ব অথচ অভিজ্ঞ অভিধান লেখকেরা বাঙ্লা-ভাষার উদীয়মান তরুণ সাহিত্যিকদিগের ঠেলা সামলাইবার কম কষ্ট স্বীকার করেন নাই। শাশুড়ি, শ্বাশুড়ি, শাশুড়ী, ও শ্বাশুড়ী, এই চারিটি শ্বাশুড়ি-ই খাঁটি। এখন কোন্টীকে রাখি, কোন্টীকে ছাড়ি।”(২) জমিদারি ও শ্বাশুরি এই উভয় শব্দ নিয়ে তাঁর একই আপত্তি। এখানে শব্দ দু’টি যথাক্রমে ফারসি ও সংস্কৃত থেকে প্রবসিত। উভয় শব্দের ক্ষেত্রে তিনি চার রকম বানান উদ্ধৃত করেছেন।
মূল গ্রিক শব্দ akademeia’র ইংরেজিতে প্রবসিতরূপ academy’র বাংলা প্রতিবর্ণীবয়ন সাহিত্যিকদের লেখায়, তাঁদের মর্জিমতো, /ঈ/’র পরিবর্ত /ই/ অর্থাৎ / ী/’র পরিবর্ত //ি’র ব্যবহার প্রচলিত ছিল, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আমলেরও আগে থেকেই। ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ [প্রথম খ- (অ-ঞ)]-এ ‘একাডেমি’ শব্দের ভুক্তিতে প্রথম প্রয়োগবাক্যটি একটি প্রতিষ্ঠানের নাম (বেরুলিম একাডেমী) ১৮৩১ সালের ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকা থেকে উৎকলিত। দ্বিতীয় প্রয়োগবাক্যটি চয়ন করা হয়েছে স্বয়ং বিদ্যাসাগরের ১৮৬৩ সালের রচনা থেকে, যেখানে ইংরেজি academy’র বাংলা প্রতিবর্ণীকরণে //ি’র প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। প্রয়োগবাক্যটি এরকম, “পারী নগরে, ফ্রেঞ্চ একাডেমি নামে এক প্রসিদ্ধ সমাজ আছে।” বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করার বিষয় এই যে, বাক্যটিতে তিনটি বিদেশি শব্দ প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। ‘ফ্রেঞ্চ’ শব্দটি ভিন্ন একটি ‘পারী’ ও অন্যটি ‘একাডেমি’। এখানে আলোচ্য ‘পারী’ ও ‘একাডেমি’। যে-কোনও শব্দের বানানসমতা রক্ষার প্রয়োজনে //ি অথবা / ী/’র যে-কোনও একটির প্রয়োগই ব্যাকরণবিধিসম্মত অর্থাৎ একই শব্দের বানানে একবার //ি ও আরেকবার / ী/ ব্যবহার অসঙ্গত। আবার সকল অসংস্কৃত (সংস্কৃত ভিন্ন অন্য যেকোনও প্রকার শব্দ) বা বিশেষ করে বিদেশি শব্দের বানানের ক্ষেত্রে //ি ও / ী/ এই দু’টির যে-কোনও একটিকে নির্দিষ্ট করা দরকার। যেহেতু অসংস্কৃত শব্দে এই দু’টি কারের ব্যবহার অর্থ পার্থক্য নির্দেশ করে না। এই নিয়মানুযায়ী সকল বিদেশি বানানের ক্ষেত্রে হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরের যে-কোনও একটি কিংবা হ্রস্ব ও দীর্ঘ কারের যে-কোনও একটিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন। এইরূপ একটি সুনির্দিষ্ট বিধি প্রণয়নের আবশ্যকতা নিয়ে তখন ভাষাবিদরা কতোটা ব্যতিব্যস্ত ছিলেন সে সম্পর্কে খুব বেশি একটা কীছু আপাতত জানা না গেলেও সাহিত্যিকরা যে খুব একটা ভাবিত ছিলেন, তা কিন্তু মনে হয় না। উক্ত প্রয়োগবাক্যটি উনবিংশ শতকে বিদেশি শব্দের বানানে //ি ও / ী/’র যথেচ্ছ ব্যবহারের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৮৩১ থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত সময়ে [বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান, প্রথম খ- (অÑঞ)-এর অনুসন্ধান অনুসারে)]’ academy’র বাংলা প্রতিবর্ণীবয়নের বানানে //ি ও / ী/-কার ব্যবহারে কোনও ইতর বিশেষ ঘটে নি। তৎকালে অতৎসম শব্দের অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ ভিন্ন অন্য শব্দের, বিশেষ করে বিদেশি শব্দের বাংলা-প্রতিবর্ণীকৃত বানানে //ি ও / ী/ ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট বিধির তখনও প্রচলন ছিল না, এমনকি বিষয়টা এমন যে, কারও কল্পনাতেই আবির্ভূত হওয়ার কথা নয়। বিদ্যাসাগরের রচনা থেকে উৎকলিত এই বাক্যটিতে ‘পারী’ ও ‘একাডেমি’ শব্দ দু’টির একটি যথাক্রমে বিদেশি শহরের ও অন্যটি একটি বিদেশি সংস্থার নাম বিবৃত করছে। এই বাক্যটির আরও বিশেষ একটি তাৎপর্য এই যে, বাক্যটি বিদেশি শব্দের বাংলা-প্রতিবর্ণীকৃত বানানে /ই/, /ঈ/, /উ/ এবং /ঊ/ কিংবা //ি, / ী/, / ু / এবং / ূ /’র ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট কোনও বিধি অনুসরণে অবলীলাক্রমে উপেক্ষার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। এখানে উদ্ধৃত ভুক্তির প্রথম প্রয়োগদৃষ্টান্ত থেকে অবগত হওয়া যাচ্ছে, ১৮৩১ সালে ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় academy’র প্রতিবর্ণীকৃত বাংলাশব্দরূপ ছাপা হয়েছে / ী/-কার সম্বলিত ‘একাডেমী’ এবং বিদ্যাসাগরের ১৮৬৩ সালের রচনা থেকে উদ্ধৃত দ্বিতীয় প্রয়োগদৃষ্টান্তে একটি বিদেশি শহরের নাম ‘পারী’ / ী/-কার সম্বলিত। সুতরাং একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের সোপানে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ ২০১৩ সালে উপনীত হয়ে ইংরেজি academy’র প্রতিবর্ণীকৃত বাংলারূপের যে-‘একাডেমি’ বানানকে আমাদের বাংলা একাডেমি অবিকল্প প্রমিত বানান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সে-প্রমিত বানানবিধির স্বতঃস্ফূর্ত সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ থেকে পৌনেদু’শ’ বছর আগে।
পশ্চিমবঙ্গে একটি ‘সাহিত্য অকাদেমি’ আছে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিখ্যাত অভিধানকার শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষের প্রকাশক। কিন্তু তাই বলে বঙ্গীয় অভিধানে ‘সাহিত্য অকাদেমি’র ‘অকাদেমি’ (১৮৩২ সালের ‘আকাদেমি’র থেকে একটি / া/ খসিয়ে দিয়ে সৃষ্ট) শব্দটিকে সন্ধান করতে যাবেন না যেনো। সেখানে শব্দটির কোনও ভুক্তি সন্নিবেশিত হয় নি। ইংরেজি academy’র সর্বাধুনিক বাংলা প্রতিবর্ণীবয়নের একটি রূপ ‘অকাদেমি’। এই শব্দটি ‘বাংলা একাডেমি’র স্বীকৃতি পেলে মন্দ হতো না, অন্তত একটু এগিয়ে থাকা যেতো।
ইংরেজি academy’র যথাযথ উচ্চারণ বাংলা বর্ণে সাধারণত লেখা হয় ‘অ্যাকাডেমি’ (স্বীকার করে নিচ্ছি : মতান্তর থাকতে পারে)। ইংরেজি বানানটিতে দু’টি / a / আছে। এই দু’টি /ধ/’র উচ্চারণ স্থান বিশেষে (চলবে)


