ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর ) দেশের আইন প্রণয়নের সংস্থায় আইন বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এমন কি শিক্ষাগত যোগ্যতায় একেবারেই নিম্নস্তরের মানুষের স্বীকৃতি ও পদায়ন, সমাজনিয়ন্ত্রণে অমেধাবীদের দৌরাত্ম্য, সুবিধাবাদী পাতিবর্জোয়দের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, ক্ষমতা দখলে হিংস্রতার চর্চা, জাতীয় অনৈক্য, সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা, রাজনীতিক্ষেত্রে সর্বাস্তৃত অস্থিরতা ও পরনির্ভরতা, হঠকারী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিক আন্দোলন, জ্ঞানানুশীলনে পশ্চাৎপদতা, শিক্ষার পণ্যায়ন, যৌনতার পণ্যায়ন, ব্যক্তির রাজনীতিক পরিচয়ানুসারে আইনের প্রয়োগ, প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ, রাজনীতির বাণিজ্যিকায়ন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ঘুসগ্রহণ, সুদের কারবার, আত্মসাৎ, অর্থআত্মসাৎ, অর্থপাচার, পণ্যে ভেজালমিশ্রণ, খাদ্যে ভেজালমিশ্রণ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পণ্য মজুতকরণ, যানজট, জলজট, মিথ্যাচার, অপপ্রচার, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, ক্ষমাহীনতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, সংঘর্ষ, আক্রমণ, যুদ্ধ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, কুন্দল, উপদলীয় কুন্দল, দালালচক্র, অস্ত্রব্যবসা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা (স্নায়ুযুদ্ধ), আর্থনীতিক অবরোধ, ধর্মের রাজনীতিক ব্যবহার, সন্ত্রাস, জঙ্গিত্ব, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ক্ষমতাহীনতা, অর্থহীনতা, মজুরি দাসত্ব, আদর্শহীনতা, হস্তান্তর, আন্তর্জালে নিমগ্নতা, যান্ত্রিকতা, পরিবেশদূষণ, ফসলে কীটনাশকের ব্যবহার, জৈবসংকরায়ণ, বৃক্ষনিধন, বাল্যবিয়ে, পরকীয়া, বিবাহবিচ্ছেদ, নারীনির্যাতন, নারী উত্যক্তকরণ, ধর্ষণগণধর্ষণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ইত্যাদি ইত্যাদি, আরও অনেক অনেক প্রপঞ্চ। এক কথায় বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির খতরনাক রাজনীতিক সংস্কৃতির আগাপাছতলা, প্রকৃতপ্রস্তাবে, বিচ্ছিন্নতার নামান্তর। একজন লিখেছেন, “আমরা জানি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র শতভিড়ের ভেতরেও ব্যক্তি মানুষকে নিঃসঙ্গ করে দেয়। প্রতিটি মানুষ একাকী হয়ে যায়। ব্যক্তির মাঝে ঘটে আত্ম-বিচ্ছিন্নতা এবং সেই বিচ্ছিন্নতাকে প্রবল করে ভূমি-বিচ্ছিন্নতা ও রাষ্ট্র-বিচিছন্নতা। স্বপ্নের বিনাশ ঘটে দুঃখে, শোকে আর আত্মকু-লতায়।” (হরিপদ দত্ত ॥ দুঃখ নেই, দূর হোক বিষণœতা ॥ নতুন দিগন্ত, পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৬ ॥ পৃষ্ঠা : ২৫২)
আর কথা বাড়াতে চাই না, বিচ্ছিন্নতার বয়ার্ণনা থেকে আপাতত বিচ্ছিন্ন হতে চাই। তার আগে বলি, একজন বলেছেন, “মানবজাতি আসলে তো পশুরই একটি উন্নততর প্রজাতি, তারা একেবারে হীনতম স্বার্থের বোধ দ্বারাও তাড়িত হয়ে থাকে, এবং তাদের কাছে পুঁজিবাদী স্বার্থসিদ্ধিটাই আইনানুগ বস্তুবাদিতা।”(অ্যালেন বাদিয়্যু, অশুভ বিষয়ে : অ্যালেন বাদিয়্যুর সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকার গ্রহণে : ক্রিস্টোফার কক্স, মলি ওমালেন ও এ জি আর, ভাষান্তর : লায়লা ফেরদৌস, নাগরী, অমর একুশে বইমেলা ২০১৪, পৃষ্ঠা : ১৮।) এই ‘পুঁজিবাদী স্বার্থসিদ্ধির আইনানুগ বস্তুবাদিতা’ থেকে, প্রকারান্তরে মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধ বাণিজ্য থেকে মানুষের মক্তি চাই, যে-ব্যবস্থা মানুষকে অপাদমস্তক পণ্যে পরিণত করেছে ‘শ্রম আর মেধার দাসত্ববরণে মাতাল’ (হরিপদ দত্ত ॥ প্রাগুক্ত ॥ পৃষ্ঠা : ২৫৩) করে দিয়েছে। এই দাসত্ব আর এই পণ্যায়ন থেকে মানুষের মুক্তি (প্রকৃতপ্রস্তাবে বিচ্ছিন্নতা) চাই। হরিপদ দত্ত বলেছেন, “ব্যক্তি তো নয়, রাষ্ট্রই যেন ক্রীতদাস প্রজননের আঁতুরঘর।” (হরিপদ দত্ত ॥ প্রাগুক্ত ॥ পৃষ্ঠা : ২৫৩)। যে-রাষ্ট্র মানুষকে ক্রীতদাস বানিয়ে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় সে-রাষ্ট্রের আপাতত পরিবর্তন চাই। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে সভ্যতার মূলো দেখিয়ে ক্রমাগত ক্রীতদাসে পরিণত করে, রাষ্ট্রপরিসকে নাগরিকের অনুকূলে ঘর না বানিয়ে করে তোলে বেঘর, তাহলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে এবংবিধ রাষ্ট্রের প্রয়েজন কী ? উত্তর একটাই থেকে যায়, জনগণের অনুকূলে এর পরিবর্তন চাই এবং বলা বাহুল্য এই পরিবর্তনের নির্গলিতার্থ বিচ্ছিন্নতারই নামান্তর মাত্র, তবে সেটা নেতিবাচক নয় ইতিবাচক, অশুভ নয় শুভ।
একটু খানি আগে একজন বাদিয়্যুর উদ্ধৃতি দিয়েছি। এই দার্শনিক অশুভর একটি সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন। সংজ্ঞাটি এরকম, “অশুভ হচ্ছে বিশেষায়িত ব্যক্তিস্বার্থের চাপে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুতি।” (অ্যালেন বাদিয়্যু, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ১৮।) সংজ্ঞাটির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে যে-কেউ যদি ব্যাপৃত হোন, তাঁর পক্ষে অনিবার্যভাবে আর্থসামাজিক ব্যবস্থার বুনিয়াদ থেকে উদ্ভূত সামাজিক প্রপঞ্চ সত্য ও মিথ্যা, শুভ ও অশুভর ধারণা অনুধাবন করার অনুরোধে সম্পত্তির মালিকানার ধরণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জন করতে হবে। ‘বিশেষায়িত ব্যক্তিস্বার্থ’ একটি পুঁজিবাদী প্রপঞ্চ অর্থাৎ সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানার পরিসরে উদ্ভূত একটি সমাজবাস্তবতা, যে-সমাজবাস্তবতার চাপে লোকে সত্য থেকে বিচ্যুত বা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এই বিবেচনায় পুঁজিবাদ ক্রমাগত সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অশুভর আঁতুরঘর হয়ে উঠেছে।
তিন
ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বিচ্ছিন্নতা
‘ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা’র বিষয়টি চিন্তার মধ্যে গোড়া থেকেই ছিল। মানুষের নামসহ শহরের এতোসব নামপাটায় (অথবা নামচাটাই), যাকে বলে নামফলকেও, বাংলা শব্দের ব্যবহার খুবই কম। সুনামগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র পৌরবিপণিতে একটি দোকানের নাম ‘মধ্যবিত্ত’। কোন দোকান কিংবা প্রতিষ্ঠানের এরকম বিশুদ্ধ বাংলা নাম এ শহরে গুটিকয়েকের বেশি হবে না হয় তো। তাছাড়া নামকরণে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে সর্বাগ্রে সুনামগঞ্জের নামোৎপত্তির ব্যুৎপত্তির প্রসঙ্গটি সমুপস্থিত হয় এবং এমন হওয়াটা অবশ্যই অস্বাভাবিক কীছু নয়। এই ‘সুনামগঞ্জ’ নামকরণের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার লগ্নতা কিংবা সম্যক সংশ্লিষ্টতার উপস্থিতি বিদ্যমান অথবা ‘সুনামগঞ্জ’ শব্দটির সঙ্গে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গটি ওতপ্রোত বলে যে-কারও মনে হতে পারে, বলছি না, তবে যাঁরা এইরূপ ‘নামোৎপত্তির ব্যুৎপত্তি’ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে বিভিন্নরকম তৎপরতায় ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের কাছে মনে হতেই পারে, এবং তেমন হলে অর্থাৎ তাঁরা যদি মনে করেন সুনামগঞ্জের নামোৎপত্তির সঙ্গে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রপঞ্চটির সংলগ্নতা আছে তা হলে বোধ করি বিষয়টির যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা উপস্থাপনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা পায়। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের নামোৎপত্তির ইতিহাস সন্ধানে ‘সুনামদি’র উৎস ‘সুনামউদ্দিন’ হতে কসুর করে নি, যদিও এমন হওয়াটা কারও কারও কাছে যুক্তিসঙ্গত কারণেই একটি অনৈতিহাসিক ব্যাপার ( phenomena) বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। এমন হলে এর (‘সুনামদি’র উৎস ‘সুনামউদ্দিন’) সহজ অনুকরণে এবম্প্রকার আরও অনেক অনৈতিহাসিক মালমসলার যে-কেউ সন্নিবেশ ঘটাতে পারেন, তা সেটা যতোই অনৈতিক হোক না কেন। যদিও প্রায় শত বছর আগেই অত্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি তাঁর বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে (উত্তারাংশ) লিখেছেন, ‘সুনামগঞ্জ বাজারের নামটি এইরূপ জনৈক ব্যবসায়ী কর্তৃক প্রদত্ত হয় বলিয়া শুনা যায়।’ (উৎস প্রকাশন : ২০১৭, পৃষ্ঠা : ৩৯৯।) প্রকৃতপ্রস্তাবে সুনামগঞ্জের নামোৎপত্তির ইতিহাস সম্পর্কে এইটুকুমাত্রই ইতিহাস। এর বাইরে অর্থাৎ পূর্বাপর যে-কেউ যে-কোনও কীছু কল্পনা করে নিতে পারেন সহজেই, সে অধিকার তাঁর আছে। তাঁর কাছে ‘সুনামদি’র উৎস হয়ে উঠতে পারে ‘সুনাম মুদি’, ‘সুনামউদ্দিন’কে তিনি বাতিল করে দিতে পারেন। কোনও ইতিহাসবিদের স্বকপোলকল্পিত প্রপঞ্চ, বিষয়গত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সেটার উৎস তাঁর মর্জিমতোন কার্যকরণ, তেমন ব্যক্তি অভিপ্রায়সাপেক্ষ ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ইতিহাসের কাঁচামালের মর্যাদা পেতে পারে না, পেলে সেটা অবশ্যই যৌক্তিক বিচারে সঙ্গত বলে বিবেচিত হবে না। ইতিহাসকে হতে হবে বিষয়গত স্বাভাবিক ব্যাপার, যা প্রকৃতির মতো বিকশিত হয়েছে ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিপ্রায় থেকে অনপেক্ষভাবে। ঐতিহাসিকতাবর্জিত ‘স্বকপোলকল্পিত কল্পনা’ বড়জোর গল্প হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস নয়। অথবা বলা যায়, কোনও ‘ঘটনা’ তখনই ইতিহাস পদবাচ্য হয়ে উঠতে পারে যখন সেটা ব্যক্তিগত অভিপ্রায় থেকে অনপেক্ষ মূর্তনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরীক্ষণের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে নিশ্চয়তা অর্জন করে। কোনও ব্যক্তি বিশেষের ‘মনোক্তি’ ঐতিহাসিক সত্যকে কেবল ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতার শরণাগত করে তোলতে পারে, ঐতিহাসিক সত্যের নির্দেশক হতে পারে না। যেমন মেজর জিয়াকে গায়ের জোরে, প্রায় দুই দশক যাবৎ অনবরত, ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ ঘোষণা করলেই লোকে সেটাকে ‘গুয়েবলসীয় সত্য’ বলে মেনে নিতেই পারে এবং তাইবলে সেটা, অর্থাৎ ‘গুয়েবলসীয় সত্য’টা, ইতিহাস বা ঐতিহাসিক সত্য হয়ে উঠে না। বরং সময়ান্তরে ইতিহাস সমুদ্ভাসিত হয়। মাঝে মাঝেই ভাবতাম : সুনামগঞ্জের নামোৎপত্তির সঙ্গে ওতপ্রোত লোকটির নাম বোধ করি ছিল ‘সুনাম’। তাঁর ছিল একটি মুদির দোকান। লোকের কাছে তাই তিনি ‘সুনাম মুদি’। এ শহরের বিখ্যাত ‘বলরাম দে-এর স্টল’ (দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার) লোকনিরুক্তিতে যে-ভাবে ‘বলার স্টল’ হয়ে গেছে তেমনি ‘সুনাম মুদি’র ‘মুদি’ থেকে ‘মু’ খসে গিয়ে হয়ে গেছে ‘সুনামদি’। অথবা ‘সুনামদি’ হওয়ার আগে ছিল ‘সুনামুদি’, আসলে লোকটির নাম ছিল ‘সোনা’ (স্বর্ণ), মুদির দোকানদার ছিলেন বলে লোকমুখে তিনি ছিলেন ‘সুনামুদি’। লোকোচ্চারণে ‘মু’ শেষ পর্যন্ত ব্যঞ্জনান্ত ‘ম’ হয়ে উঠেছে। এইরূপ ‘মনোক্তি’ কারও কারও কাছে ‘ইতিহাস’ হলেও হতে পারে, কিন্তু যৌক্তিক বিবেচনায় ইতিহাস নির্মাণের অনুরোধে এমন চিন্তার উদ্রেক হওয়াটা ইতিহাস থেকে সত্যকে বিচ্ছিন্নকরণের দুরভিসন্ধি ভিন্ন অন্য কীছু হতে পার না। সুতরাং ইতিহাসকার হওয়ার বাসনা পোষণ করে এমন ধরণের চিন্তা, প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রতারণার দুরভিসন্ধি থেকে উদ্ভূত ঐতিহাসিক জ্ঞানবঞ্চনার উদ্রেক করে বিধায়, অবশ্য পরিত্যাজ্য।
সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ার ‘রিভার ভিউ’ নামপাটাটি যে-দিন চোখে পড়েছিল সেদিনই মনটায় কেমন একটু খচখচানি শুরু হয়েছিল। এইসব (‘সুনামদি’র উৎস ‘সুনামউদ্দিন’, ‘রিভার ভিউ’ ইত্যাদি যাবতীয়) কীছুই যে প্রকৃতপ্রস্তাবে বিচ্ছিন্নতার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিরূপ, এই বোধটুকু চেতনায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিঘাতের চাপে ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল ‘রিভার ভিউ’ না হয়ে ‘নদীনিসর্গ’ নয় কেন ? স্কুল না হয়ে বিদ্যালয় কিংবা বিদ্যাদেশ, বিদ্যাস্থান, বিদ্যাভবন, বিদ্যাগার, শিক্ষাদেশ, শিক্ষাস্থান, শিক্ষাঘর, শিক্ষাগার, শিক্ষাভবন নয় কেন ? এইটুকু কা-জ্ঞান (এইভাবে ভাবনা করার যোগ্যতা) অর্জনের আগে কিন্তু এই বিষয়টি যে একেবারে নতুন কীছু নয় এবং কার্ল মার্কসসহ আরও বড় বড় ভাবুক-চিন্তকরা বিষয়টি নিয়ে ভাবিত হয়েছেন, কম বেশি, এবং কেউ কেউ ব্যাপক গবেষণাও করছেন, অবগত ছিলাম না। আসলে বিচ্ছিন্নতা এমন একটি সমাজবাস্তবতা, যা অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে মানবসমাজের ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে, ইতিহাস চর্চায় এর আলোচনা অপরিহার্য। বিচ্ছিন্নতাকে উপেক্ষা করে ইতিহাস রচনা অসম্ভব। এমনকি মানুষের ভাববিনিময়ের অস্ত্র ভাষার ভেতরেও এই বিচ্ছিন্নতা পাকাপাকি আসন গেড়ে নিয়েছে অনেক আগেই। ভাষাচর্চার সঙ্গে তাই বিচ্ছিন্নতার একটি যোগসূত্র থেকেই যায়, সেটাকে উপেক্ষা করা যায় না, অনিবার্যভাবেই ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিরূপে সমুপস্থিত হয়। চেষ্টাচরিত্র করে বিষয়টি যখন যৎকিঞ্চৎ অবগত হওয়া গেলো, ক্রমে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও, প্রপঞ্চটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো, তখন খুব ইচ্ছে হলো বইয়ের প্রারম্ভেই বিচ্ছিন্নতা প্রপঞ্চটি নিয়ে একটি রচনা সন্নিবেশিত করার। কিন্তু শেষপর্যন্ত অজ্ঞতাকে (প্রকৃতপ্রস্তাবে মূর্খতাকে) বিজ্ঞতায় পর্যবসিত করার দুরভিসন্ধি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করলাম। বিচ্ছিন্নতা আমার চেতনায় যেভাবে ভাষাসাংস্কৃতিক বাস্তবতার স্বাভাবিক অভিঘাতে প্রতিফলিত হয়েছে তার বাকচিত্র আঁকতে, সফল হওয়া তো দিল্লি দূরস্থ, যথার্থ অর্থে চেষ্টা করেছি এমন দাবি করাও বোধ করি সঙ্গত হবে না। তারপরেও বোধ করি একদিক থেকে মন্দ হয়নি বরং ভালোই হয়েছে এবং বিষয়টা কেবল ব্যক্তিগত অবধারণার ব্যাপার হয়েই থাকলো। যা কীছু ভুল তার সব দায় কেবল এই অধম অবধারণওয়ালার প্রাতিস্বিক।
চার.
বানানভুলের অভিশপ্ত অভিযোগ থেকে আপাতত মুক্তি
পরিশেষে বানান প্রসঙ্গ। বই ছাপতে গিয়ে বানানভুল হবে না এটা হতেই পারে না। ছাপার কাজে বানানবিভ্রাট একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা, যাকে শুদ্ধতা থেকে অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা বলা চলে। প্রিয়জন কল্লোল তালুকদারকে পাণ্ডুলিপি দেখে দিতে বলেছিলাম। কা কস্য পরিবেদনা। অভাজনের আবেদন তাঁর কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হলো না এবং তিনি খঞ্জ যুক্তিওয়ালা একটি কারণ, অবশ্য সেটি আদর্শিকতার রঙে রাঙা ছিল, প্রদর্শনে নিরতিশয় নিবিষ্ট হলেন। কিন্তু প্রত্যাখ্যানের মর্মবেদনার জলবিছুটিস্পর্শ ভুক্তভোগী ব্যতীত কারও বুঝাবার কথা নয়। বানানভুলের সমুদয় দায় তাই প্রত্যাখ্যানের বদলাস্বরূপ তাঁকেই বইতে হবে। আমার তাতে কোনও অংশভাক নেই। যে যা-ই বলুন, এই অখঞ্জ যুক্তিতে বানানভুলের অভিশপ্ত অভিযোগ থেকে আপাতত আমি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ যাকে বলে মুক্ত।
ইকবাল কাগজী
সুনামগঞ্জ
পশ্চিম নতুনপাড়া
নিলয়-১২৪/১
২৫ জানুয়ারি ২০২২ ।
০১. বাঙালি মুসলমানের পরভাষাপ্রীতি
গ্রহণ ও বর্জন পরস্পরবিরোধী শব্দ, অর্থদ্যোতনায় আকাশ পাতাল ব্যবধান, একটি আর একটির বিপ্রতীপ এবং জীবের বিপাকক্রিয়ার বায়নাক্কা প্রকাশে পারঙ্গম। পৃথিবীতে জীব বেঁচে থাকে গ্রহণবর্জনের একটি অনির্বায জৈবিকক্রিয়া সম্পাদন সাপেক্ষে। বাঁচার প্রশ্নে জীবের ক্ষেত্রে এই বিপাকক্রিয়ার কোনও বিকল্প নেই। এই গ্রহণবর্জনের, আরও সুনির্দিষ্ট বাতাবরণ হলো, শরীরে খাদ্যের পরিণাম অর্থে ‘বিপাক’, যাকে ইংরেজিতে ‘মেটাবলিজম’ বলে, তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে, “একটা জীব বেঁচে থাকে শুধু যতক্ষণ চলে সেটার বিপাক, এই বিপাক হলো দুটো বিরুদ্ধ প্রক্রিয়া নিয়ে- যথা, আত্তীকরণ (অর্থাৎ, খাদ্য রূপান্তরিত হয়ে দেহপদার্থে রূপান্তরিত হওয়া) আর দেহ-পদার্থের ভাঙন এবং এই ভাঙনের উপাদানগুলোর নিঃসরণ। বিপাক থেমে গেলে জীবন আর থাকে না।”(১) গৃহীত খাদ্য আত্তীকৃত হয় এবং রূপান্তরিতাবস্থায় নিঃসরণ ঘটে। যাকে বলে খাওন ও রেচন (মল, মূত্র, স্বেদ শরীর থেকে নিঃসরিত হওয়া), কিংবা বলা যায়, গ্রহণ ও বর্জন। সহজ কথায়, দেহের ভেতরে ঢুকা ও বেরিয়ে যাওয়া।
একটি উদাহরণ উপস্থাপন করা যাক। লোকে গান গায়, ‘হায় রে মানুষ রঙের মানুষ, দম ফুরাইলে ঠুস’, অর্থাৎ এই তিন শব্দের (দম ফুরাইলে ঠুস’) সম্মিলিত নিহিতার্থ নির্ঘাৎ মৃত্যু। মানুষ মরে গেলে লোকে বলে, ‘দম নাই’। এই ‘দম নাই’ মানে নাকের ছিদ্রপথে ভেতরে দম টানা ও ফেলার (বাতাস গ্রহণ ও বর্জনের) কাজে অপারগতা কিংবা সে কাজের অনুপস্থিতি। এ থেকে এই সহজ বোধোদয় সম্ভব যে, গ্রহণবর্জনক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন, অর্থাৎ যুগপৎ বিচ্ছিন্নতা ( alienation) ও অবিচ্ছিন্নতা থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন, প্রকৃতপস্তাবে, অচল ও অসম্ভব।
জীবন সম্পর্কে এমন ভাবনা, ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’-এর মতো করে আমাদের বাতেলাবীর গোলাম গুলমগীরের চিন্তামূর্তি কিংবা যুক্তিমূর্তির সঙ্গে মিলে যায়, যদিও বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয়। তিনি বলেন, ‘রসবতী থেকে গলাধঃকরণ এবং ছোট বাইরে ও বড় বাইরে যাওয়ার অনিবার্যতার নামই বাঁচা।’ তিনি সাধারণত এভাবেই বয়ান প্রক্ষিপ্ত করেন।
তাঁর বাতাবরণের ব্যাসকূট ভেদ করার মতলবে কোনও এক অর্বাচীন সাকরেদের তৎক্ষণাৎ বাক্যবিস্তার, ‘এই যাকে বল, “ছোট বাইরে ও বড় বাইরে যাওয়ার” বিষয়টি না হয় বুঝলাম, মলমূত্র ত্যাগের অপরিহার্য বিষয়াদি সাঙ্গ করার নিমিত্ত্বে ঘরে বাইরে করা। কিন্তু রসবতী! রসবতী আবার কী? সে কি রসে টইটম্বুর রমণী?’
‘রমণী মানে রমণযোগ্য। রসবতী হলো রসবৎ-এর স্ত্রীবাচকতা। ঔপপত্তিক বিবেচনায় রসবতীকে রমণী বলা বোধ করি সঙ্গত হবে না।’
‘কেন?’
‘আসলে রসের হরেক অর্থ। সে বিতংয়ে নাইবা গেলাম। এখানে কেবল বলি : রস অর্থে মধুর, অম্ল, লবণ, কটূ, কষায় ও তিক্ত এই ছয়টি স্বাদকে বুঝায়। রসবতী হলো তাদের সমাহার, অর্থাৎ অন্নাদিযুক্তা। এই লোকে যাকে বলে পাকঘর। প্রতিশব্দগুলো যেমন : পাকগৃহ, পাকশালা, পাকস্থান, বাবুর্চিখানা, মহানস, রন্ধনগৃহ, রন্ধনাগার, রন্ধনশালা, রসুইঘর, রসুইশালা, রান্নাঘর, হেঁশেল ইত্যাদি। তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে ‘কিচেন’ বলে মহাসমারোহে কীর্তিত। তারা এখন ‘হানখ’ (সানকি)-এর বদলে ‘প্লেট’-এ ভাত খায়। মহাভারতের কালে লোকসমাজে এই রান্নাঘরই রসেরভাণ্ডার হিসেবে রসবতী বলে অভিহিত হতো। এই ছয় রসের একত্র সমাহার ঘটে একমাত্র এই রসবতীতেই, রমণীতে নয়। তবু রসিক কেউ কেউ রমণীকে রসিকা (প্রেমরসের ভাণ্ডার) অর্থে রসবতী বলে রসিকতা প্রকাশ করেন। আসলে যাকে বলে রস, তা তো মেলে রসবতীতেই। বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ষড়রসের উৎস খাদ্য জীর্ণ হয়ে সৃষ্ট সে-সব রসের রসায়ন দেহের ভেতর বিস্তৃত হয়ে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। মহাভারতে আছে : পঞ্চপা-বের অজ্ঞাতবাসকালে বিরাট রাজার রসবতীতে, যাকে বলে রসুইঘরে, পাচকের চাকরি নিয়েছিলেন দ্বিতীয় পাণ্ডব বৃকোদর ভীম। তখন তিনি ছিলেন রসবত্যাধিকারী। যে যাই বলো, আমি বলি, রসবতী ব্যতীত মানবের জীবন অসার।’
‘অর্থাৎ রসগ্রহণ এবং মলমূত্ররূপে তা ত্যাগ। মানে রসবতী থেকে গলাধঃকরণ করে বসতঘরের বাইরে গিয়ে বর্জন। পাকঘর থেকে মলঘর পর্যন্ত বিস্তৃতির নামই জীবন। যাকে বলে যাপিত জীবনব্যাপী পেটুকদাসগিরি।’
‘সে তুমি যা-ই বলো।’
অনন্তর ক্ষণিকের এই নাটকীয় সংলাপের মর্মার্থ এই যে, জন্মজীবনমৃত্যুর সীমায় গ্রহণবর্জনকর্মই জীবনের মুখ্য ক্রিয়া। এক অর্থে মিলন বিচ্ছেদের খেলা। পৌরবিপণির মধ্যবিত্তের চাড্ডায় (চা+আড্ডা) মহাবিদ্যালয়ের মহান শিক্ষক এনামুল কবীর প্রায়ই কবি রুমিকে উদ্ধৃত করে বলেন, রুমি নাকি বলেছেন : বাঁশের ঝাড় থেকে বাঁশকে কেটে এনে বাঁশি তৈরির ফলে বাঁশঝাড়ের সঙ্গে বাঁশির নাকি একটি ঐতিহাসিক বিচ্ছেদ তৈরি হয়, বাঁশি বাঁশঝাড়ের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় সদাসর্বদা ব্যাকুল হয়ে থাকে আর বিচ্ছেদের বেদনায় বাঁশি নাকি জীবনভর কাঁদে, আর বাঁশির এই কান্নাই নাকি বাঁশিতে সুর হয়ে বাজে, এই বিচ্ছেদ না ঘটলে নাকি বাঁশিতে অপরূপ মাধুরীমাখা সুর সৃষ্টি হতো না। প্রকারান্তরে সুরের সঙ্গে সুরবঞ্চিত পৃথিবীর বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতো। যাকে বলে একেবারে খাঁটি বিচ্ছিন্নতা। সে যাই হোক।
(চলবে)