(পূর্ব প্রকাশের পর) বাঁশঝাড় ও বাঁশির বিচ্ছেদ, এই বিচ্ছেদের অনিবার্য উদ্ভব সুর ও সুরের সঙ্গে সঙ্গীতের গভীর সম্পর্ক; অপরদিকে জীবের বিপাকীয় প্রক্রিয়া, অর্থাৎ খাদ্যগ্রহণ, পাকস্থলিতে খাদ্য পরিপাক শেষে রেচন ও জীবের জীবনধারণ; এই দু’টি বিষয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান। কোনও দু’টি বাস্তবক্রিয়ার সর্বশেষ উৎপাদ সঙ্গীত ও রেচন তুলনায় এক হতে পারে না। কীসে আর কীসে ধানে আর তোষে। ব্যবধানটা চকির তলা ও আগরতলায়। তা এই অসামান্য ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দু’টির মধ্যে নিহিত ‘কীছু যুক্ত হওয়া বা থাকা ও বিযুক্ত হওয়া বা না-থাকার’র প্রাকৃতিক প্রকরণ কিংবা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। প্রকৃতপ্রস্তাবে বিচ্ছিন্নতা বিচ্ছিন্নতাই, প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নতা একটি অবিকল্প প্রপঞ্চ ( phenomena) ।
খদ্যগ্রহণ ছাড়া মানুষ বাঁচে না। এই খাদ্য দেহের ভেতরে বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় মল হয়ে নিঃসরিত হয়। এই গ্রহণবর্জন এমনি এমনি হয়ে যায় না। কথায় বলে, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। এই গ্রহণবর্জনের নিয়ন্তা তাই কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনিবার্যভাবেই, প্রাণের প্রীতি ও অপ্রীতি। তবে বলে রাখা জরুরি যে, এই ‘প্রাণের প্রীতি ও অপ্রীতি’ আকাশ থেকে হুট করে নেমে এসে অন্তরের অভ্যন্তরে অনুপ্রবিষ্ট হয় না, আর্থসামাজিক বিন্যাসগত বাস্তবতার সঙ্গে এর একান্ত সংশ্লিষ্ট কোনও একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক থাকে, প্রকৃতপ্রস্তাবে সে-সম্পর্কটির সামগ্রিকতাই সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতির থাকে একটি মূর্তনির্দিষ্ট চেহারাচরিত্র।
একটু খোলতাই করার প্রশ্নে যথাসম্ভব প্রযতœ করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। পৃথিবীতে মানুষকে বেঁচে থাকা ও অবিরত ধারায় আরও পরাৎপরতা অর্জন করার অভিপ্রায়ে অনিবার্যভাবে উৎপাদনসম্পর্কের শরণাগত হতে হয়। মানবজীবনে এর কোনও ব্যত্যয় বা বিচ্ছিন্নতা নেই। অর্থাৎ মানুষের জীবন সমাজের একটি নির্দিষ্ট আর্থনীতিক গঠনের বা উৎপাদনসম্পর্কের দ্বারা অনিবার্য নিয়তিনির্দিষ্টতার মতো নিয়ন্ত্রিত একটি মূর্তনির্দিষ্ট প্রপঞ্চ। জায়মান এই উৎপাদনসম্পর্কের উপরিকাঠামোর সামগ্রিকতাকে জ্ঞানীরা সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছেন, অর্থাৎ উৎপাদনপদ্ধতিই সংস্কৃতির নির্ণায়ক। অর্থনীতির প্রগাঢ় অভিব্যক্তি ও সম্পূর্ণতানির্ভর রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের কর্মকৃতি সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনীতির এই মূর্তায়ন মোটেও কোনও সরলস্বাভাবিক কার্যকলাপ নয়। বরং বলা যায়, রাজনীতির সামগ্রিক পরিসরে মূর্তনির্দিষ্ট বিপরীত স্বার্থের বাহক ও রক্ষক শ্রেণিসমূহের পারস্পরিক অনিবার্য দ্বন্দ্ব সমাজের ভেতর প্রতিনিয়ত অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ উৎপাদনের উপায়ের উপর মালিকানার ভিত্তিতে শ্রেণিসমূহের আবির্ভাবকাল থেকে সমাজের সামগ্রিক ইতিহাস হলো, শোষক ও শোষিতের অবিরত শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। এইসব তত্ত্ব প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রায়ক্ষেত্রেই বাস্তবতাকে বা প্রকৃত ঐতিহাসিকতা বা সত্যকে ব্যাখ্যা কিংবা বিশ্লেষণ করে না, বরং বিপরীতে প্রচ্ছন্ন করে দেওয়া কিংবা সম্পূর্ণ আবৃত করে দেওয়ার দুরভিসন্ধিকে কার্যকর করে। অর্থাৎ এসবক্ষেত্রে তত্ত্বগুলো নির্মিতই হয় কোনও না কোনও শ্রেণি বিশেষের স্বার্থসংরক্ষণের প্রকল্প বাস্তবায়নের বাসনায়, যা প্রকারান্তরে ও শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বকেই বিনির্মাণ কিংবা প্রতিপন্ন করে। এই বিচ্ছিন্নতাতে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব। বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই বিশাল ও বিপুল বিস্তৃত এর পরিসর। সর্ববাদীসম্মত একটি অভিমত এই যে, যে-কোনও মতাদর্শিক তত্ত্বনির্মাণ প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিকতার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীরূপে সংশ্লিষ্ট। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-মাও প্রত্যেকের রচনাতেই, অর্থাৎ তাঁদের বিভিন্ন রচনায়, কমবেশি এই বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে কার্ল মার্কস এই বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বিশেষভাবে ভাবিত ছিলেন। ভøাদিমির ইলিচ লেনিন এইসব তত্ত্ব সম্পর্কে যা বলেছেন, তা থেকে যে-কারও মনে বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বগত ধারণা সম্পর্কে সম্যক আলোকসম্পাৎ হতে পারে অনায়াসেই। তিনি বলেছেন, “সবকিছু নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি না তারা এ কথা বোঝে যে, যত অসভ্য জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোনো না কোনো শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে।”(২) সত্যিকার অর্থে এইসব মতাদর্শ (ধর্ম, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি, নৈতিকতা, প্রথা, ন্যায়, অন্যায়, আইন ইত্যাদি) সংক্রান্ত নীতিতত্ত্ব মানুষকে হয় প্রতারিত করেছে কিংবা আত্মপ্রবঞ্চণার জালে বন্দি করেছে। ইতিহাসের পরতে পরতে এমন মতাদর্শের অজ¯্র উদাহরণ পরিলক্ষিত হয়, যে-সব মতাদর্শ মানুষকে মিথ্যায় দীক্ষিত করে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি কিংবা আশার শরণাপন্ন করে। আর এইসব করে চৈতন্যের বিকার ঘটায় ও অধ্যাসাক্রান্ত করে, পরিশেষে আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে হৃদয়ঙ্গম হতে দেয় না, বোধাতীত করে তোলে। এসবই আসলে বিচ্ছিন্নতার প্রকৃষ্ট উপকরণ। লেনিন যখন বলেন, ‘লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে […]’ তখন তিনি একধরণের নয় বিভিন্ন ধরণের ও বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতার (যে-বিচ্ছিন্নতা মানুষের সঙ্গে বস্তু কিংবা ভাবের) প্রসঙ্গকেই উপস্থাপন করেন, যৎকিঞ্চিৎ মগজ খাটালেই বিষয়টির সারার্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হয়।
মহাভারতের কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে প্রথমাবস্থায় সম্মত ছিলেন না অর্জুন। ‘নিষ্কামকর্ম’র তত্ত্ব শ্রবণ করিয়ে অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণের ব্যাখ্যানুসারে এই ‘নিষ্কামকর্ম’র অর্থ হলো, কর্তাকে কর্ম করতে হবে কর্মফল ভোগ করার কামনা পরিত্যাগ করে। তানাহলে সংস্কার নিঃশেষ হবে না, সংস্কারানুসারে কর্মফল ভোগ করতে পুনর্জন্ম নিয়তিনির্দিষ্ট অনিবার্যতায় পর্যবশিত হবে, পুনরায় অতৃপ্ত কামনানুযায়ী যে-কোনও জীবরূপে জন্মান্তর অনিবার্য, মোক্ষপ্রাপ্তি অসম্ভব। মোক্ষপ্রাপ্তি হলো, জীবাত্মার পরমাত্মায় বিলীন হয়ে যাওয়া। অর্জুন ক্ষত্রীয়। জগৎসংসারে তাঁর নির্ধারিত কর্ম, যুদ্ধ করা। যুদ্ধের কর্মফল মুত্যু। নিষ্কামকর্মানুসারে অর্জুনের অন্তরে নিকটাত্মীয়র মৃত্যুর জন্য বেদনাবোধ জাগ্রত হওয়ার অর্থ কর্মের ফল ভোগ করা, অর্থাৎ যুদ্ধকর্মটি নিষ্কামকর্ম হবে না এবং এমন হলে অর্জুনের মোক্ষপ্রাপ্তি নৈবচ। নিষ্কাম ভাবে প্রপন্ন হয়ে অর্জুনকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। কৃষ্ণের প্রদত্ত এই যুক্তির বশবর্তী হয়ে অর্জুন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত হন। কৃষ্ণকর্তৃক প্রস্তাবিত এই তত্ত্বকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাস্তবকে আবৃত করবার’ তত্ত্ব (৩) বলে অভিহিত করেছেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ‘নিষ্কামকর্ম’র তত্ত্বদ্বারা অর্জুনকে যুদ্ধের সামগ্রিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হয়েছে। ব্রিটিশরা ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি কার্যকর করার জন্যে ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’র প্রয়োগ ঘটিয়ে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে হিন্দু ও মুসলিম দুই ধর্মে ভাগ করে দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামের অভিশাপের জন্ম দিয়েছিল এবং পরিণামে ভারতবর্ষ হয়েছিল দ্বিখণ্ডিত। মনে রখতে হবে এই তত্ত্বে ‘জাতি’র প্রসঙ্গকে ‘ধর্ম’ প্রসঙ্গের সঙ্গে গুলিয়ে দিয়ে গভীর বিচ্ছিন্নতার জাল বিস্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং শোষক ও শাসকশ্রেণির স্বার্থরক্ষার্থে অহিংসাতত্ত্ব ও অছিতত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন, যদিও এই অহিংসার আড়লে তিনি একজন হিংসুক হিংস্র মানুষই ছিলেন। এদিক থেকে বিবেচনায় তিনি ছিলেন ভণ্ডদের বিশ্বগুরু। বোধ করি তাঁর মতো এতো বড় মাপের ভ- পৃথিবীতে কমই এসেছে এবং তারচেয়েও বড় কথা হলো আমজনতার কাছে ভ-দের জনপ্রিয়তা সবসময় থাকে আকাশচুম্বী। জনতা সকাশে তাঁরা কেউ মহাত্মা হয়ে উঠেন, কেউ হয়ে উঠেন কায়েদে আজম।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন কালপর্বে আমজনতাকে মোহাচ্ছন্ন করার বিভিন্ন তত্ত্ব আবির্ভূত হয়েছে, যেমন : পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ, মৌলিক গণতন্ত্র, উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা, মুসলমানি বাংলা নির্মাণ, ভারতপ্রীতি, ভারতভীতি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রধর্ম, ধর্মযুদ্ধ, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি। এবংবিধ তত্ত্বসমূহ শ্রেণিসমূহের দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট সামাজিক বাস্ততাকে যেমন অস্পষ্ট করে তোলে তেমনি ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তির চেতনাকে। এই চেতনা নিয়ন্ত্রণই প্রকারান্তরে ‘প্রাণের প্রীতি ও অপ্রীতি’কে অর্থাৎ ‘গ্রহণ ও বর্জন’কে প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ভেতর দিয়ে কার্যকর করে সকল প্রকার সামজিক প্রপঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্নতার নিয়মকে। এইসব তত্ত্ব সর্বোপরি ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপের আগে প্রকারান্তরে সকল সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে এমনকি শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যে নির্মম শোষণ ও বঞ্চনার সম্পর্ককেও অনিবার্যভাবে অস্বীকার করে। বর্তমান সমাজবাস্তবতা এমন যে, এ সময়ে সকল সামাজিক সম্পর্ক বস্তুতপক্ষে শোষকশ্রেণির হিংসার উপর প্রতিষ্ঠিত এক শত্রুসম্পর্ক, যা অধ্যাত্মিকতার বুরকায় আপাদমস্তক আবৃত এবং প্রকারান্তরে প্রচ- সংঘাতশঙ্কুল এবং সার্বিক বিবেচনায় অপ্রতিরোধ্য। সমাজবাস্তবতার এই সংঘাতশঙ্কুল অস্থির পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে কোনও না কোনওভাবে কোনও না কোনও গ্রহণবর্জনের, প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতার, অনিবার্যতা স্বাভাবিক নিয়মে নিয়ত কার্যকর ও মূর্তনির্দিষ্ট প্রপঞ্চ রূপে বিকশিত।
স্বভাষা ও পরভাষার ক্ষেত্রেও, বলা যায়, এই প্রীতি ও অপ্রীতির প্রেরণায় গ্রহণবর্জন চলে নিরন্তর সমানতালে। এই গ্রহণবর্জনের খেলায় মেতে কেউ কেউ নিজের জবান থেকে পাকঘরকে পরিহার করে কিচেনকে পরমাদরে বরণ করে নেয়। ইংরেজি মার্কেটের প্রতি প্রীতি এতাটাই যে, বাংলা ‘বিপণি’ ও ইংরেজি ‘মার্কেট’ সমার্থক হওয়া সত্ত্বেও ‘পৌরবিপণি’ হয়ে পড়ে ‘পৌরবিপণি মার্কেট’। এমনি কতকীছু হয়, তার কোনও ইয়াত্তা নেই। এন্তার উদাহরণ সন্নিবেশিত করা সম্ভব। সমাজের প্রত্যেক শ্রেণিস্তরে, অর্থাৎ মানবিক পরিবেশে, এই গ্রহণবর্জন সাপেক্ষেই সংস্কৃতির মেদমজ্জাঅস্থিচর্মসারের সৃষ্টি। যেমন ফারসি ভাষার নিজস্ব বর্ণ ছিল, কিন্তু ইরানিরা সে-বর্ণ বর্জন করে আরবি বর্ণ গ্রহণ করেছেন। বর্ণগ্রহণের এমন দৃষ্টান্ত আমাদের বাংলাভাষায়ও আছে। আমরা সিলেটি বাঙালিরা বাংলাবর্ণকে একপাশে সরিয়ে রেখে একদা নাগরীলিপি গ্রহণ করেছিলাম। শিতালং, শেখভানু প্রমুখ লোককবিরা নগরিলিপিতে তাঁদের রচনা লিখে রেখে গেছেন এবং কিংবদন্তি আছে যে, তাঁদের রচনা নাগরিলিপি ভিন্ন অন্যলিপিতে না লিখার জন্য সাকরেদ সকাশে নির্দেশ রেখে গেছেন। সে-নির্দেশ মতে তাঁদের লেখা বাংলাবর্ণে প্রতিবর্ণীকরণ করা বা প্রকাশ করা নিষেধ, যদিও সাম্প্রতিককালে সে-নিষেধ মানা হচ্ছে না। বিখ্যাত উৎস প্রকাশন কথিত ‘সিলেটী নাগরীসাহিত্য’কে বাংলাবর্ণে লিপ্যন্তর করে প্রকাশ করছেন।
বাঙালি মধ্যবিত্তের গ্রহণবর্জনের একটি সংস্কৃতি আছে। সে-সম্পর্কে পুরোদস্তুর একটি দার্শনিক বাতেলা এরকম, “বর্জনের ব্যাপারে বাঙালি মধ্যবিত্ত বরাবরই সিদ্ধহস্ত। যেমন ধরা যাক সমুদ্রের ব্যাপারটা। সমুদ্রকে সে বর্জন করেছে ফলে নিজেই খর্ব হয়ে গেছে। এখনও সে বন্দরের গুরুত্ব বুঝতে চায় না, যে জন্য আশঙ্কা রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর চলে যাবে বিদেশিদের হাতে। ভাষার ক্ষেত্রে তার যে বর্জনবাতিক সেটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এ তার সাধারণ ও প্রসিদ্ধ বর্জনবাদিতারই অংশ। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণরা পরম্পর ভাষা থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছেন। একপক্ষের ইচ্ছা ছিল ভাষাকে অনুস্বার-বিসর্গ দিয়ে ভরপুর করবে, অন্যপক্ষ আকাক্সক্ষা করেছে তাকে আরবি-ফারসি শব্দ দিয়ে সাজিয়ে তুলবে; ফলত উভয় পক্ষের হাতেই বাংলা ভাষা নিপিষ্ট হয়েছে। সে সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাও পুষ্ট হয়েছে এবং পরিণামে অবিভক্ত বঙ্গ দ্বিখ-িত হয়েছে। মস্তবড় এই কাটাছাঁটায় ব্যক্তিগতভাবে লাভ হয়েছে কারও কারও, মধ্যবিত্তের একাংশেরই মূলত, কিন্তু খুব বড় ক্ষতি হয়ে গেছে বাংলার অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং প্রকৃতির।”(৪) প্রকৃতপ্রস্তাবে অতীতের মতো বাংলাদেশের বাঙালিত্বের মুখ্য নিয়ামক এখনও বাঙালি মধ্যবিত্ত, এতে কোনও সন্দেহ নেই। ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতা থেকে রাজনীতিক মুক্তি ও ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র অর্জন, সে অর্জনকে রাজাকারপ্রীতি বা রাজাকার পুনর্বাসন-লালনের রূপকে নির্জিতকরণ ও আবার শাহবাগের গণজাগরণরূপ প্রগতিশীলতার পথে যাত্রাপরতা ইত্যাদি এইসব নানাবিধ রাজনীতিক-সাংস্কৃতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দোলাচলে বাঙালির স্বনিদান এই মধ্যবিত্ত। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কথিত ‘বাঙালি মধ্যবিত্তের বর্জনপ্রীতি’ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় উপজাত একটি সাম্প্রদায়িক ব্যাধি। এর বৃহৎবলয়ের অন্তর্বর্তী একটি বলয় বাংলাভাষা বর্জনপ্রীতি। ‘বাংলাভাষা বর্জনপ্রীতি’-র প্রতিনামই পরভাষাপ্রীতি।
যে-কোনও বিচ্ছিন্নতা পরপ্রীতিরূপে বিকশিত হয়ে বিয়োগান্তক ঘটনার জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এর প্রকৃষ্ট উদাহারণ বাংলাদেশের বায়ান্নের ভাষাআন্দোলন : একুশে ফেব্রুয়ারি। এখানে অর্থাৎ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে মাতৃভাষাবিচ্ছিন্নতা বা বাংলাভাষাবর্জনের পরিণতিরূপে হিন্দুদের (সনাতনধর্মাবলম্বীদের) সংস্কৃতপ্রীতিসহ মুসলমানদের আরবি-ফারসি-উর্দুপ্রীতিসন্নিভ ঐতিহাসিক প্রপঞ্চের উদ্ভব সম্ভব হয়েছে। যেহেতু ভাষাবিচ্ছিন্ন মানবিক অস্তিত্ব কল্পনাতীত অর্থাৎ ভাষাব্যতীত পৃথিবীর সর্বত্র জীবন স্থবির, সেহেতু যে-কোনওভাবেই মানুষকে ভাষা কিংবা বিভাষা যে-কোনও একটার সঙ্গে আজন্ম অবিচ্ছিন্ন থাকতেই হয়, উপার্জন করে বেঁচে থাকার স্বার্থেই। অর্থাৎ উৎপাদনসম্পর্কের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত থাকার অনিবার্যতার কারণেই, ভাষাচর্চা থেকে মানুষ বিযুক্ত থাকতে পারে না।
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের পরতে পরতে পরভাষাপ্রীতিরূপ স্বভাষার প্রতি বিদ্বেষ-বিরাগ-বিরূপতার অজস্র ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু এই পরভাষাপ্রীতিরূপ স্বভাষাবিদ্বেষিতার অপবাদ সকলের প্রতি প্রযোজ্য নয়, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অপবাদটি যেমন বাঙালি মধ্যবিত্তের ঘাড়ে তোলে দিয়েছেন তেমনি তাঁর আগে গ্রিয়ারসন হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ‘শিক্ষিতদের ভাষা’ শব্দবন্ধের বৃত্তে প্রকৃতপ্রস্তাবে মধ্যবিত্তদেরকেই নির্দেশ করেছেন। গোলাম মুরশিদ লিখেছেন, “গ্রিয়ারসন তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় মন্তব্য করেছেন যে, গ্রামের নিম্ন শ্রেণীর হিন্দু এবং মুসলমানদের ভাষায় আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও ভাষাগত কোনো পার্থক্য নেই, অল্প কিছু ধর্মীয় শব্দ ছাড়া। পার্থক্য লক্ষ্য করা যেতো প্রধানত শিক্ষিতদের ভাষায়। এঁদের ভাষাকে দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়- পণ্ডিতী বাংলা আর মুসলমানী বাংলা। গ্রিয়ারসনের মতে, পণ্ডিতী বাংলায় সংস্কৃত শব্দের ছড়াছড়ি, আর আরবি-ফারসি-উর্দুর ছড়াছড়ি মুসলমানী পুঁথিতে। সরকার এই পার্থক্যকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছে তাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির পোষকতা করার উদ্দেশ্যে। সে জন্য বিশ শতকের গোড়ার দিকে বঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মক্তব-মাদ্রাসায় সাধারণ বাংলার পরিবর্তে ‘মুসলমানী বাংলা’ পড়ানোর জন্য সুপারিশও করা হয়েছিলো।”(৫) গ্রিয়ারসনের বক্তব্যের সারার্থ : প্রকৃতপ্রস্তাবে বাঙালিদের মধ্যে সংখ্যায় অত্যল্প কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী আর্থব্যবস্থার প্রতিনিধি অর্থাৎ মধ্যবিত্তসহ উচ্চবিত্ত শ্রেণি, যাঁরা নিজেদেরকে আশরাফ বা অভিজাত বলে দাবি করতেন, তাঁরা বাংলাভাষাবিরোধিতার অপবাদের ভাগীদার। স্বশ্রেণিস্বার্থান্ধ এই সব হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ‘ভদ্দরলোক/ভদ্দরনোক’-এর মননে দেশমাতৃকার কল্যাণকামনা, দেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিত গণমানুষের স্বার্থসংরক্ষণকর চিন্তা কখনওই প্রাধান্য পায়নি বা তাঁদের অনুসৃত রাজনীতিক কর্মসূচিতে কখনওই অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। গোলাম মুরশিদের লেখায় তাঁদের সম্যক পরিচয় মেলে। তিনি লিখেছেন, “১৯৪০-এর দশকের গোড়ায় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হয়নি। এমন কি, গঠিত হবে এমন নিশ্চয়তাও ছিলো না। কিন্ত তা সত্ত্বেও এ সময় কিছু তরুণ মুসলিম লেখক দাবি করলেন যে, তাঁদের স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানে যে-বাংলা ভাষা চালু থাকবে, সে ভাষার চরিত্র হবে ‘হিন্দুত্ব’ বর্জিত, অর্থাৎ প্রামাণ্য বাংলা থেকে আলাদা। আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন প্রমুখ লেখক এই মুসলমানী বাংলার পক্ষে ওকালতি করেন। তাঁদের যুক্তিতে অয়ারল্যান্ডের ইংরেজি সাহিত্য যেমন মূল ধারার ইংরেজি থেকে খানিকটা ভিন্ন চরিত্রের, পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকেও তেমনি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হতে হবে। দেশ বিভাগের আগেই এই জাতীয়তাবাদী তরুণরা ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ গঠন করেছিলেন। এঁরা প্রচুর আরবি-ফারসি উপাদান আমদানি করে বাংলা ভাষাকে একটা স্বাতস্ত্র্যবাদী বৈশিষ্ট্য দিতে চান। কেবল তাই নয়, কেউ কেউ আবার আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেন। এ সময়ে গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, রওশন ইয়াজদানী, তালিম হোসেন, মোফাখখারুল ইসলাম, মীজানুর রহমান, শাহেদ আলী প্রমুখের রচনায় এই মুসলমানী বাংলা লেখার মানসিকতা অভ্রান্তভাবে প্রকাশ পেয়েছিলো।”(৬)
বুঝাই যায়, শ্রেণীস্বার্থ উদ্ধারের একদেশদর্শী একটি রাজনীতি তখন জায়মান ছিল। যে-রাজনীতি ধর্মকে রাজনীতিক স্বার্থ উদ্ধারের কাজে ব্যবহার করেছিল, অর্থাৎ মোটকথা সামগ্রিক রাজনীতি ইসলামের স্বার্থে নয়, প্রকারান্তরে ইসলামের নামে পরিচালিত হয়েছিল শ্রেণিস্বার্থ উদ্ধারের অভিপ্রায়ে। যা ছিল নিতান্তই একটা লোকদেখানো বিশাল কর্মকা-। আর দেশজুড়ে এই রাজনীতিক বাস্তবতা সাধারণ ধর্মভীরু মানুষের যাপিত জীবনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল, তদুপরি আত্মপরিচয়ের প্রাথমিক সূচক ব্যক্তিনামে ধর্মপরিচয় উৎকীর্ণকরণের দ্বারা হিন্দুদের থেকে পৃথক পরিচিতি অর্জনের অনুপ্রেরণায় মুসলমান জনগোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবেই চূড়ান্ত মাত্রায় অনুপ্রাণীত হয়ে ওঠেন এবং কালক্রমে এই ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে যে, বাঙালি মুসলমানের পরভাষাপ্রীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান, প্রাথমিক ও প্রকটরূপ হলো তাঁর নিজের নাম। স্বনামের মাধ্যমেই মুসলমানরা প্রথম জানান দেন তাঁরা একটি বিভাষাপ্রেমী বা স্বভাষাবিচ্ছিন্নতাব্যাধিতে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী। বাঙালির এই স্বভাষাবর্জনের, প্রকারান্তরে আত্মবিস্মরণের, ইতিহাসকে কালপরিধির বিবেচনায় বলা যায় বেশ দীর্ঘ। এ বিষয়ে হুমায়ুন আজাদের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য, তিনি বলেন, “বাঙলা ভাষার সাথে বাঙালি মুসলমানের শত্রুমিত্রতার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, যদিও অত্যন্ত সরল। বাঙালি মুসলমান কয়েক শো বছর ভুগেছে স্বরূপশনাক্তি ও আপন ভাষাশনাক্তির সমস্যায় বা রোগে। ফারসি-ইংরেজি যুগে শাসকসম্প্রদায়, সাধারণত, বাঙলার সাথে শত্রুতা করেনি, বরং মিত্রের মুখোশ পরেছে অনেক সময়, কিন্তু পাকিস্তানকালে বাঙলা ভাষা অর্জন করে সামন্ত শাসকদের শত্রুতা। মধ্যযুগেই বাঙালি মুসলমানরা ভাষাপ্রশ্নে দ্বিখ-িত হয়ে গিয়েছিল : একগোত্রে ছিল গুটিকয় সুবিধাবাদী, সুবিধাভোগী, যাদের স্বপ্নে ছিল ইরানতুরান, আরবিফারসি; অন্য গোত্রে ছিল বিশাল বাঙালি মুসলমান শ্রেণী, বাঙলাদেশ ও বাঙলাই ছিলো যাদের বাস্তব ও স্বপ্ন।”(৭)
জন্মলগ্ন থেকে শত্রুর সঙ্গে লড়ে বাংলাভাষা বড় হয়েছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে বাংলাভাষার জীবনব্যাপী ঘরে-বাইরে দ্বিবিধ শত্রু পরিলক্ষিত হয় এবং ঘরশত্রু বিভীষণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী বাঙালি মুসলমানদের, যারা বাঙালি জাতির ললাটে আত্মপ্রবঞ্চকতার তিলক সেঁটে দিয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনও ভাষাভিত্তিক জাতিসত্ত্বার ক্ষেত্রে বিরল। সম্যক অনুসন্ধান পরিচালনা করে বাংলাভাষাবিদ্বেষ-বৈরিতার নিদর্শনের একটি সুদীর্ঘ তালিকা করা সম্ভব। বাংলাভাষাবিদ্বেষণার প্রথম ঐতিহাসিক নিদর্শন মেলে তথাকথিত আর্যদের সাহিত্যে। অর্থাৎ প্রাচীনকালে বেদাদিগ্রন্থে বঙ্গভাষাকে পাখির কিচিরমিচিরের সমরূপ বিবেচনা করা হয়েছে। বিখ্যাত ভাষাবিশেষজ্ঞ শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী বলেন, “এমন কি বৈদিক যুগেও বাঙ্গালীদের ভাষা বুঝিতে না পারিয়া আর্যরা বাংলার কোল-ভীল-সাঁতাল-দ্রাবিড়জাতির ভাষাকে পাখীর কিচির-মিচির বলিয়া ঠাট্টা করিতেন।”(৮) শ্রীলাহিড়ী বাংলাভাষার নিন্দাবাচক একটি বাক্য ঐতরেয় আরণ্যক থেকে পাদটীকায় উৎকলিত করেছেন, সেটি এ রকম : “ইমানি বয়াংসি বঙ্গবগধাশ্চৈরপাদাঃ – ২।১।১।৫।”(৯) আর্যদের পরে মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত এক শ্রেণির মুসলমান বাংলাভাষার শত্রুরূপে আবির্ভূত হয়। তাদের সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ বলেন, “বাংলার মুসলমানদের মধ্যে বিদেশ থেকে আসা মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো খুবই কম- আগেই তা লক্ষ্য করেছি। মধ্যযুগে যাঁরা বিদেশ থেকে এসে বঙ্গদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই এ দেশেই বিয়ে করেছিলেন। এবং তাঁদের সন্তান-সন্ততিরা কয়েক প্রজন্মের মধ্যে বাঙালি হয়ে যান। কিন্তু তার পরেও মুসলমানদের মধ্যে এমন একটি ছোট্ট জনগোষ্ঠী থেকে যান, যাঁরা বাংলা ভাষাকে আপন বলে কখনো মেনে নিতে পারেননি। বঙ্গদেশকেও এঁরা নিজেদের দেশ বলে স্বীকার করতে পারেননি। […] এঁরা বাস করতেন শহরে, কথা বলতেন উর্দুতে এবং নিজেদের দাবি করতেন আশরাফ বা অভিজাত বলে।”(১০) তা ছাড়া অন্য একটি অবাঙালি বা বিভাষী আক্রমণ শানিত হয়েছিল একেবারেই আধুনিক কালে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি (পাঠ করুন ফাঁকিস্তানি) স্বাধীনতা অর্জনের পর। অর্থাৎ ১৯৪৭-য়ের দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছিল।
বলাই বাহুল্য, বাইরের এইরূপ আক্রমণ ব্যতীত অন্য আক্রমণগুলো বাঙালি জাতিসত্ত্বার অন্তর্গত ব্যাধি। ভারতীয় উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যকার শ্রেণিদ্বন্দ্ব কালক্রমে এই ব্যাধিবিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের একচ্ছত্র আধিপত্যে এখানকার নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার এবং এই অত্যাচার থেকে মুক্তির বাসনায় মধ্যপ্রচ্যের ধর্ম-সংস্কৃতিকে নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠী কর্তৃক অবলম্বনের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা থেকে এই ব্যাধির উৎপত্তি বা সূত্রপাত। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ভারতীয় আশরাফ (অভিজাত) শ্রেণি সাধারণ মানুষের এই ধর্মভীরুতা থেকে উৎপন্ন রাজনীতিক অদূরদর্শিতাকে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এই ঐতিহাসিক-রাজনীতিক ব্যাধিকে একটি জাতির তথা বাঙালি মুসলমানের আত্মপ্রবঞ্চনার ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ব্যাপক ও গভীর অনুসন্ধান ছাড়াই, অনায়সলব্ধ ঐতিহাসিক তথ্য সন্নিবেশন করে, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষাবিদ্বেষণার একটি সর্বার্থে অসম্পূর্ণ, দায়সারামতো করে ও অতি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করলে সেটা হবে এ রকম :
(১) মধ্যযুগের কবি অব্দুল হাকিমের (১৬২০-১৬৯০) ছিল বাংলাভাষা-বিদ্বেষীদের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধ। তিনি লিখেছিলেন, “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥” এ সম্পর্কে আহমদ ছফা বলেছেন, “নিশ্চয়ই সে সময় এমন লোক ছিলেন যারা সত্যি সত্যি বাংলাভাষাকে ঘৃণা করতেন।”(১১) কিন্তু তাঁরা সকলেই অবাঙালি ছিলেন না।
(২) ১৮৬০-১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা স্বধর্মসত্তা রক্ষা করে ইংরেজি শিক্ষার সুবিধা অর্জনে উদ্যোগী হন। তৎকালে ফরিদপুরের মৌলভি আবদুল লতিফ খানবাহাদুর (১৮২৮-১৮৯৩) ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের প্রধান মুখপাত্র। তিনি ইংরেজ সরকারকে জানিয়ে ছিলেন যে, মুসলমানদের ভাষা উর্দু, বাংলা নয়। হুমায়ুন আজাদ উল্লেখ করেছেন, “আঠারো-উনিশ শতকেও একদল বিরুদ্ধতা ক’রে যাচ্ছিলো বাঙলা ভাষার সাথে; কেউ কেউ প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চাইছিলো ফারসিকে, কেউ নতজানু হচ্ছিলো ইংরেজির শুভ্র পদতলে। আবদুল লতিফ সরকারকে জানিয়েছিলো মুসলমানের ভাষা উর্দু, বাঙলা নয়। উনিশ শতকে স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে অনেক হিন্দুও বাঙলার সাথে শত্রুতা করেছিলো, যা দেখে হাহাকার ক’রে উঠেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত; ‘হায় হায় পরিতাপে পরিপূর্ণ দেশ। দেশের ভাষার প্রতি সকলের দ্বেষ ॥’ কিন্তু এই শত্রুতাও দ্রোহীসুন্দর ভাষাকে ধ্বংস করতে পারেনি; বরং তা দশকেদশকে অধিকতর শক্তিশোভা অর্জন করেছে।
“আবদুল লতিফের মতো সুবিধাবাদী সমাজবিলগ্নরাই উনিশ-বিশ শতকে সৃষ্টি করে উর্দু-বাঙলাকলহ। সমাজবিলগ্নরা দাবি করতে থাকে যে উর্দুই মুসলমানের ভাষা; এক আহামরি ভাষা, যার পদ্যেপদ্যে ইসলামি সুগন্ধ আর পেশিতে ইসলামি জোশ! অন্যদিকে বাঙলা অমুসলমানের ভাষা- ভীরু ও পৌত্তলিক।”(১২) আবার এ সম্পর্কে মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, “বলা প্রয়োজন, উনিশ শতকের উত্তরার্ধে নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলীর সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনসমূহে বাংলা ভাষার যথাযথ গুরুত্ব প্রদান তথা বাঙালির আত্মপরিচয়ের ধারনাটি অস্পষ্ট ছিল।”(১৩)
(৩) উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে বাংলাভাষার সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দ মিশিয়ে কাব্য রচনা হয়েছিল দেদার। সেগুলো দো-ভাষী পুঁথি বলে প্রখ্যাত ও বাংলাভাষাদূষণের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গ্রিয়ারসন যে-গুলোকে ‘মুসলমানী পুঁথি’ ও এসব পুঁথির ভাষাকে ‘মুসলমানী বাংলা’ বলে অভিহিত করছেন। ‘দো-ভাষী’ নামটাই বাংলার সঙ্গে অবাংলার যাচ্ছেতাই মিশ্রণে খিচুড়িমতোন ভাষাদ্রবণসর্জনের ইঙ্গিত বহন করে। পৃথিবীতে অন্য কোনও ভাষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষীদের দ্বারা এমন অনাচার কি সংঘটিত হয়েছে কোথাও? অন্তত আপাতত আমার জানা নেই। (চলবে)


