ভাষা বিপ্লব থেকে স্বাধীনতা

হোসেন তওফিক চৌধুরী
বিশ^ ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রত্যক্ষ করা যায় যুগে যুগে বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক অধিকার আদায়, স্বাধীনতা অর্জন এবং ভূখন্ড প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিপ্লব, দুর্বার আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। কিন্তু ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে কোথাও আন্দোলন বা বিপ্লব হয়েছে এমন নজির ইতিহাসে নেই। ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাঙালিদের মরণপণ সংগ্রাম-নজির বিহীন ও অনন্য। ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের দুর্বার ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনই বাঙালিদের জাতিয়তাবাদ ও জাতীয়তাবোধের উদ্রেগ হয়। স্বাধীনতা চেতনায় মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়। ভাষা বিপ্লব থেকেই এক সাগর রক্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ অর্জিত হয়।
১৯৪৭ সালের পরে তদানিন্তন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু হবে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। স্বাভাবিক কারণেই তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উত্থাপন করে। কিন্তু দেশের রাষ্ট্র নায়ক থেকে শুরু করে ক্ষমতার মসনদে আসিন মুষ্টিমেয় কিছু নেতা প্রবল জনমতকে উপেক্ষা করে বাংলার বদলে উর্দু চাপিয়ে দেয়ার অশুভ তৎপরতায় লিপ্ত হবে। ঘোষণা ছিল উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। এতে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানবাসী রুখে দাঁড়ায়। ভাষা এবং কৃষ্টি সংস্কৃতির উপর এই চরম আঘাতে বাঙালিরা ফুঁসে উঠে এবং প্রবল আন্দোলন শুরু করে। ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ১৯৫২ সালে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে কার্যবিধি আইনের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে সরকারের আদেশে গুলি বর্ষণ করা হয়। এতে শহীদ হন রফিক, সালাম, শফিক, জব্বার প্রমুখ। শহীদদের রক্ত দানে ভাষা আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ভাষা দাবির আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এতে সরকার কম্পিত-প্রকম্পিত হয়।
১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচনের আগেই একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সুফলের ভিত্তিতে ২১ দফা প্রণিত হয় এবং তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো যুক্তফ্রন্ট নামে মোর্চা গঠন করে। সাধারণ নির্বাচনে মোর্চার সাথে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। নতুন সরকার ক্ষমতায় বসে রাংলা ভাষার দাবিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করে। ভাষা আন্দোলনকে ভাষা বিপ্লব বলে অবিহিত করা হয়েছে। এই বিপ্লব বাঙালিদেরকে স্বকীয়তা নিয়ে দৃপ্ত পদে এগিয়ে যেতে উজ্জীবিত করে। স্বায়ত্বশাসন, স্বাধীকার ও স্বাধনিতা চেতনার বিকাশ ঘটে এভাবেই। পরিণতিতে দীর্ঘ সংগ্রাম ও এক সাগর রক্ত পেরিয়ে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালিরা স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশে^র বুকে বাঙালিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও অর্জন। বাংলা এখন আন্তর্জাতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। হয়তো অচিরেই বাংলা জাতিসংঘের একটি দাপ্তরিক ভাষায় রূপ নেবে। সেই শুভ দিনের অপেক্ষায় আমরা প্রতিক্ষারত। সেজন্য বলা যায়-বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতেই আমাদের জাতীয়তাবোধের যাত্রার উন্মেষ হয়। বাংলা ভাষার দাবির প্রেক্ষিতে আমাদের জাতীয় রাজনীতি আবর্তিত। তাই বলা চলে ভাষা বিপ্লব থেকেই আমাদের স্বাধীনতা এসেছে। একুশ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার এবং শির উঁচু করে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তোলার।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিষ্ট।