ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি

এস ডি সুব্রত
ফেব্রুয়ারি এলেই যেন বাংলা আর বাঙালি জেগে উঠে। পলাশে শিমুলে রঙের আগুন লাগে। শোকে আর গর্বে বুক ভরে উঠে বাঙালির। মর্মে শিহরণ জাগে। আবার ফেব্রুয়ারি চলে গেলে যেন স্তিমিত হয়ে যায় ভাষার প্রেম। বাঙালি হচ্ছে সেই জাতি যে জাতিকে মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে,জীবন দিতে হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর উর্দু কে চাপিয়ে দেয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর যে চক্রান্ত শুরু হয় তার প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত । ১৯৪৮ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসে। কংগ্রেসের এম পি হিসেবে নয়, বাঙালি হিসেবে, ব্যাক্তি হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে প্রথম দিনেই প্রস্তাব করেন উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করা হোক। সেদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কে সংসদে চরম কটাক্ষ ও অবহেলার শিকার হতে হয়েছিল পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের গনপরিষদ সদস্যদের কাছে। তখন বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও ধর্মান্ধ মহল তাকে হিন্দু সম্প্রদায়িকতার ধারক ও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে জন্ম নেয়া এই মহান ভাষা সৈনিক কে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এ মৃত্যুবরণ করতে হয় তার ছেলে দিলীপ দত্তসহ। অথচ সেই ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতির প্রতি আমরা বাঙালি বড়ই উদাসীন। এমনকি তার স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি আজ বড় অনাদরে অবহেলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে যা ধর্ম সাগর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত।
গতকাল বাংলাদেশ সমবায় একাডেমি কোটবাড়ি কুমিল্লায় আসি একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ এ। তো প্রশিক্ষণে আসার আগেই পরিকল্পনা করি এবার কুমিল্লা গিয়ে ধর্ম সাগর পশ্চিম পাড়ে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িতে যাব। তো যেই কথা সেই কাজ। ক্লাস শেষে বিকেল ৫ টা ২০ মিনিটে হোস্টেলে ফিরে রুমমেট ও আমার সহকর্মী জালাল কে (জলাল উদ্দিন আহমদ ) বলি এক জায়গায় যাব কুমিল্লা শহরে। তবে একা যাব। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি বার্ড এর সামনে থেকে সিএনজি নিয়ে সোজা কান্দিরপাড়। সেখান থেকে নেমে ধর্ম সাগর পশ্চিম পাড় ঝাউতলা রোড। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাওয়া এই রাস্তাটির বর্তমান নামকরণ করা হয়েছে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক। তো এখানে বেশ কয়েকজন এলাকাবাসী কে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির কথা বললে তারা আমাকে সঠিক সঠিক লোকেশন দিতে পারেনি। শেষে একজন প্রায় ষাটোর্ধ্ব লোককে বললে তিনি একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে দিয়ে বলেন এটীই শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি। ভাঙা টিনের গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই পরিত্যক্ত প্রায় দুই তিনটা ঘর। একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন বয়স্ক মহিলা।নাম জাহানারা বেগম। বললাম , চাচী আপনি এখানে কি করেন ? উনি বললেন , আমরা এই বাড়ি দেখাশোনা করি। আগে আমার স্বামী মোঃ সুজন মিয়া ডাকনাম সুধন মিয়া এই বাড়ি দেখাশোনা করত উনি মরা গেছেন ৭/৮ বছর হয়। এখন আমি আর আমার ছেলে রিপন এ বাড়ি দেখাশোনা করি। তখন বললাম রিপন কোথায়? চাচী বললেন সামনে চায়ের দোকানে।আবার গেট ঠেলে বেরিয়ে চার দোকানে গেলাম। তখন রিপন মিয়াকে এক কাপ চা দিতে বলি। চা খেতে খেতে রিপন মিয়ার সাথে গল্প করি। রিপন মিয়া জানান তাদের গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার চালিয়াকান্দি গ্রামে। তারা এ বাড়ি দেখাশোনা করে আর বাড়ি র সামনের দিকে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান চালায়। তো তাকে বললাম বাড়িটি ঘুড়িয়ে দেখানোর জন্য। রাত্রি হয়ে গেছে। সব ভালোমত দেখা যাচ্ছে না। তো একটা ঘরে নিয়ে গেল যেটা রিতিমত বসবাসের অযোগ্য। রিপন মিয়া বলল এটা তার অফিস কক্ষ ছিল। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আইনজীবী ছিলেন।এটা তার চেম্বার ছিল। আমি বললাম উনার শোবার ঘর টা দেখতে চাই।রিপন বলল , ওটাতে যাওয়া যাবে না। নোংরা, ময়লা আবর্জনা। এমনকি সাপও থাকতে পারে। বৃষ্টি হলে এখানে প্রায় হাঁটু পানি হয়ে যায়। বড় কষ্ট লাগল ।যে মানুষ টা বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য প্রথম দাবি জানাল , দেশের জন্য জীবন দিল,সে মহান ভাষা সৈনিক এর বাড়ির এ হাল। বাঙালি হিসেবে লজ্জিত হলাম ভেতরে ভেতরে। সরকার এ বাড়ি নিয়ে কোন পরিকল্পনা অর্থাৎ এ অঞ্চলের মানুষের দাবী এ বাড়ি কে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি যাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে এখনো কিছু করছে না কেন। ব্যথিত হলাম। রিপন মিয়ার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এ বাড়িতে মোট জায়গার পরিমাণ ৬ গন্ডা অর্থাৎ ১২ শতক। আরো জানতে পারলাম শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি এ্যরোম দত্ত কুমিল্লার সংরক্ষিত নারী আসনের এম পি। আরো কষ্ট পেলাম। একজন এমপি হয়েও তিনি তার পূর্ব পুরুষ অর্থাৎ দাদু র বাড়িটি নিয়ে কোন পরিকল্পনা করছেন না কেন। রিপন মিয়ার কাছ থেকে এ্যারোমা দত্তের মোবাইল নাম্বার নিলাম। হোস্টেলে ফিরে ফোন দিলাম , কিন্তু ফোন রিসিভ না করায় কথা বলতে পারলাম না।এ বাড়ির এমন অবস্থার কারনটি না জানা পর্যন্ত স্বস্তি মিলছে না কিছুতেই।