ভিজিএফ বিতরণে অনিয়ম দূর করা হোক

ভিজিএফ গ্রহীতাদের নিকট থেকে কোন টাকা পয়সা না নেয়ার কথা থাকলেও গত সোমবার তাহিরপুর  সদর ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ভিজিএফ পণ্য বিতরণকালে ভিজিএফগ্রহীতাদের নিকট থেকে পরিবহন খরচের নামে জনপ্রতি ১৫ টাকা করে আদায় করা হয়। পরে এ বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উঠলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হস্তক্ষেপে টাকা নেয়া বন্ধ করা হয় এবং যাদের কাছ থেকে এই টাকা নেয়া হয়েছিল তাদেরকে গৃহিত টাকা ফেরত দেয়া হয়। একেবারে হতদরিদ্র শ্রেণির জন্য সরকারের চলমান ভিজিএফ কর্মসূচীতে এরকম কর্মকা- চরম অনৈতিক ও নিন্দনীয় কাজ বটে। পরিবহন খরচ বাবদ টাকা নেয়ার কারণ সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বলা হয় যে, খাদ্যগোদাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করতে যে টাকা খরচ করা হয় তা সরকার থেকে না পাওয়ার কারণে তারা বাধ্য হয়ে এমন কাজ করেছিলেন। এই যুক্তিটি আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা যতদূর জানি খাদ্যগোদাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা সরকার থেকে দেয়া হয়ে থাকে। তবে এই টাকা প্রকৃত খরচের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। পরিবহন খরচের এই অপ্রতুলতার কথা বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নিকট থেকে প্রায়সই শোনা যায়, অনেক চেয়ারম্যান পরিবহন খরচের সিংহভাগ নিজ পকেট থেকে গচ্চা দেন বলেও জানা যায়। পরিবহন খরচের এই স্বল্পতার বিষয়টি সরকারের নজরে নিয়ে যথাযথ পরিমাণে আদায় করার চেষ্টা করা উচিৎ ইউনিয়ন চেয়ারম্যানগণের। কিন্তু এটি না করে গরিব ভিজিএফগ্রহীতার নিকট থেকে এই টাকা আদায়ের চেষ্টা করা একেবারেই অনুচিত।
পরিবহন খরচের নামে টাকা নেয়া ছাড়াও ভিজিএফ বিতরণকালে ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ ব্যাপকভাবে শোনা যায়। এ নিয়ে নানাস্থানে হৈ-হাঙ্গামা হওয়ারও খবর রয়েছে। এছাড়া প্রকৃত গরিব লোকজনকে বাদ দিয়ে চেয়ারমান-মেম্বারদের প্রিয়ভাজনদের ভিজিএফ তালিকাভূক্ত করার অভিযোগটি পুরনো। সরকার খাদ্যনিরপাত্তাবিহীন হতদরিদ্রদের খাদ্যসুরক্ষা দানের জন্য ভিজিএফ কর্মসূচীর আওতায় খাদ্যসহায়তা দিয়ে থাকেন। এটি প্রকৃত গরিবদেরই পাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতা আজকাল এতোটাই নিষ্ঠুর যে চরম গরিব লোকটিকে বাদ দিয়ে নিজেদের প্রীতিভাজন অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ব্যক্তিদের এই সহায়তা দিতে আমরা দ্বিধাবোধ করি না। এই গরিবের হক কেড়ে নেয়ার কাজটি যেন অনেকের অধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা যদি সুষম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের পরিবর্তে গোষ্ঠী ও স্বজনপ্রীতির ঘেরাটোপে আটকে থাকেন তাহলে আমাদের জনপ্রতিনিধিত্বের চরিত্রটিও মাহাত্ম্য অর্জন করতে পারবে না। নিজ পদ-পদবী ও ব্যক্তিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জায়গায় সংশ্লিষ্টদের তেমন দায়বোধও দেখা যায় না। জনপ্রতিনিধিত্বের এই গণবিমুখ চরিত্র আমাদের দারুণভাবে হতাশ করে। আমরা যে গণতান্ত্রিক রীতি ও সংস্কৃতি চর্চার স্বপ্ন দেখি, প্রত্যাশা পোষণ করি সেখানে এমন অবস্থা বিসদৃশ্যই বটে।
তাহিরপুর কিংবা আর কোথাও যাতে ভিজিএফ বিতরণকালে পরিবহন খরচের নামে টাকা আদায় না করা হয়, ওজনে কম দেয়া না হয় এবং অতিঅবশ্যই প্রকৃত গরিবদের তালিকাভূক্ত করা হয় সেটি নিশ্চিত করতে আমরা জড়িত সকলের নিকট অনুরোধ জানাই। এই অনুরোধের পেছনে একটি সুসভ্য ও কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান দেখার আকাক্সক্ষা প্রবল।