ভুয়া সমাজসেবীদের মুখোশ উন্মোচন হতে সময় লাগে না

অতিবড় শক্তিমানও চিরকাল শক্তিমান থাকেন না। ক্ষমতাদম্ভীদের দর্প চূর্ণ হতে সময় বেশি লাগে না। ভুয়া সমাজসেবী কিংবা দানবীরদের মুখোশ উন্মোচিত হতেও সময় লাগে না। প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ আইনি হস্তক্ষেপে হাত ফসকে যাওয়াও অসম্ভব নয়। এই সবগুলো কথার বাস্তব উদাহরণ সাম্প্রতিককালে প্রতারণা করে ভূূমিদখলকার হিসেবে নামজাদা আবার অতীতে মহান দাতা, শিল্প-সংস্কৃতি-ক্রিড়ার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সমাজে বরেণ্য সিলেটের বিশিষ্ট চা-কর, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক রাগিব আলী। সিলেটের তারাপুর চাবাগানের জমি বন্দোবস্ত নিতে মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতির দুইটি ঘটনায় বৃহস্পতিবার সিলেটের মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. সাইফুজ্জামানের আদালত রাগীব আলী ও তার ছেলেকে ১৪ বছরের কারাদ- দিয়েছেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে রাগিব আলী নামের আড়ালে মুখোশ পড়া এক ভূমি প্রতারকের স্বরূপ সকলের সামনে উন্মোচিত হলো। প্রমাণ হলো আইনের চাইতে আর কারও হাত লম্বা নয়। সংগত কারণেই এই রায়টি নাগরিক সমাজের জন্য স্বস্তিকর। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই রায়টি মাইলফলক হয়ে থাকবে নিঃসেন্দহে।
কে ছিলেন এই রাগীব আলী? পাদপ্রদীপের আলোয় তার নাম আসে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাকুমার পাঠশালার জায়গা দখল করে মধুবন সুপার মার্কেট নির্মাণের অভিযোগে যখন সিলেটে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে উঠে তখন অর্থাৎ গত শতকের আশির দশকে। শুনা যায় এই আন্দোলন দমনে তিনি সিলেটের বহু নেতাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। দখলের ইতিহাসে যুক্ত হয় তারাপুর চা বাগানের দেবোত্তর সম্পদ। ওখানে গড়ে তুলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, রাবার বাগান ইত্যাদি। মিডিয়াসা¤্রাজ্যের অধিপতি হতে প্রকাশ করেন দৈনিক পত্রিকা। ঢাকায় গড়ে তুলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এইসব অর্থনৈতিক সা¤্রাজ্য থেকে আহরিত অর্থের একটি ছোট ভাগ তিনি বিলিয়ে দেওয়া শুরু করলেন শিল্প-সংস্কৃতি-ক্রিড়া খাতে। নিজের ও সহধর্মীনির নামে গড়ে তুলেন অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। ইতিহাসের পাতায় নায়ক হওয়ার অভিপ্রায় ছিলো তার। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। চিচিম ফাঁক হয়ে অন্ধকার গুহার ভিতরটা সকলের সামনে উন্মোচিত হলো আর তিনি নায়ক থেকে খল নায়কের কুৎসিৎ চেহারা নিয়ে পুনরাবির্ভাব ঘটালেন। এমনই দুর্ভাগা তিনি, যারা কয়েক দশক ধরে তার নিমক খেয়েছে, তার পৃষ্ঠপোষকতায় ধন্য-বিগলিত হয়েছে তাদের টিকিটিরও দেখা যায় নি এই দুঃসময়ে। এমনই হয়। লুটেরা পরাক্রমশালীর পতন ঘটে এমনই নৈঃশব্দ্যে। এ থেকে কি কোন কিছুই শিক্ষণীয় নেই?
চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। রাগিব আলীর পতন দেখেও বোধ করি সমাজে ঘাপটি মেরে বসে থাকা লুটেরারা নিজেদের সংশোধন করবে না। এটি শোষণবাদী অর্থনীতির একটি বৈশিষ্ট্যও বটে। প্রতিকূল পরিবেশে পতিত না হওয়া অবধি নিজ থেকে কেউ কখনও সংশোধন হন নি, ইতিহাসে এমন কোন উদাহরণ নেই। সুতরাং রাগীব আলীর দোহাই দিয়ে অধরা লুটেরাদের ভাল হয়ে যাওয়ার সবক আমরা দিচ্ছি না। আমরা চাচ্ছি রাগীব আলীর ক্ষেত্রে আইনের যে সহজাত প্রয়োগ ঘটতে দেখেছি আমরা সেটি যেন বহমান থাকে। এই ধরনের প্রতারণা ও অসততা কিংবা জালিয়াতির যত ঘটনা আছে তার সবগুলোই যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে বিচারের কাঠগড়ায় পৌঁছে।
রাগিব আলী বিচারিক আদালতে যে সাজা পেয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই এবার উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। আপিলের শেষ স্তরটি পর্যন্ত যাতে আইনি প্রক্রিয়াগুলো সুষ্ঠুভাবে অগ্রসর হয় তা নিশ্চিত করতে আমাদের আবেদন রাষ্ট্রের কাছে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে হতেই এক সময় জাল-জালিয়াতির আলগা গর্তগুলো বন্ধ হবে।