বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
আগামীকাল জামালগঞ্জের দুই ইউপি নির্বাচনে সব জল্পনা-কল্পনার ইতি টানতে ভোটের ঘরে যাচ্ছেন ভোটাররা। ১৫ জুন পছন্দের মার্কায় গোপন ইচ্ছে প্রয়োগের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নিবেন তারা। উপজেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ওইদিন ২নং জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে ২০ হাজার ৬৯৩ জন ও ৬নং জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৮৯৬ জন ভোটার ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)-এ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
গতকাল সোমবার মধ্যরাতে দুই ইউনিয়নের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সময়সীমা শেষ হয়েছে। প্রচারণার নির্ধারিত সময় শেষে প্রার্থীদের প্রকাশ্যে ভোট প্রার্থনার সুযোগ না থাকলেও প্রার্থী সমর্থক ও ভোটারদের মাঝে নির্বাচনী শোরগোল এখনও রয়ে গেছে। দুই ইউনিয়নজুড়ে কে কার চেয়ে বেশি এগিয়ে সেই আলোচনায় নীরব বাকযুদ্ধ অব্যাহত আছে। বৃষ্টিবিঘিœত দিনেও যে যেখানে আছেন সেখানে বসেই নির্বাচনী উত্তাপ ছড়াচ্ছেন।
সদরে চশমা প্রার্থী মো. কামাল ও নৌকা প্রার্থী জামিল আহমেদ জুয়েল এবং উত্তরে ঘোড়া প্রার্থী হানিফ মিয়া ও আনারস প্রতীকের তরুণ চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈকত ঘোষ চৌধুরী আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তবে শেষমেষ উত্তরে নৌকা প্রার্থী এম নবী হোসেন ও সদরে আনারস প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার ভোটের প্রতিযোগিতায় চমক সৃষ্টি করতে পারেন এমন অভিমত অনেকের। এর বিপরীতে সদর ইউনিয়নে বিদ্রোহী ও উত্তরে আওয়ামী লীগ ঘরানার স্বতন্ত্রে নৌকা অনেকটা টলোমলো সাধারণ মানুষের কথোপকথনে এমনটাও উঠে এসেছে।
ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জামালগঞ্জ উত্তরের নির্বাচনে ৬ প্রার্থীর মাঝে ৩ জনের মাঝে হাড্ডাআড্ডি লড়াইয়ের জোর সম্ভাবনা উঁকি মারছে। এ ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নৌকা প্রার্থী এম নবী হোসেনের অবস্থান প্রথম দিকে নড়বড়ে ছিল। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণায় নৌকার পালে কিছুটা ভোটের হাওয়া লেগেছে। শেষ পর্যন্ত এ ঐক্যবদ্ধ রেশ বজায় থাকলে নৌকা ঘোড়া ও আনারসের সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরতে পারেন এমন ধারণা অনেকের।
এছাড়া উত্তরের চশমা প্রার্থী মো. শহীদুল ইসলাম নৌকা, আনারস ও ঘোড়ার লাগাম টেনে সামনের সারিতে চলে আসবেন এমন সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ। এক্ষেত্রে বর্তমান চেয়ারম্যান মোটরসাইকেল প্রার্থী মো. রজব আলী ভোটের হিসেবে খানিক পিছিয়ে রয়েছেন। তাছাড়া সাধারণ মানুষের হিসাব-নিকাশে হাতপাখা প্রার্থী মো. ইকবাল হোসাইন সব তলানিতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তবে উত্তর ইউনিয়নে অধিকাংশ প্রার্থী প্রায় সমানে সমান হওয়ায় কার গলায় বিজয় মাল্য উঠতে পারে তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করছে ভোটারদের মাঝে।
অপরদিকে, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে ৭ চেয়ারম্যান প্রার্থীর মাঝে ৩ প্রার্থী ভোটারদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। এর মাঝে উপজেলা আ.লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জামিল আহমেদ জুয়েল (নৌকা), উপজেলা কৃষক লীগের সহ সভাপতি নৌকা বিদ্রোহী মো. কামাল (চশমা) এবং বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদারের (আনারস) নাম রয়েছে। এছাড়া মোটর সাইকেলের ফারুক আহমেদ ও অটোরিক্সা প্রার্থী মো. ফয়জুল আলম মোহনের মধ্যে যে কেউ প্রতিযোগিতার সম্মুখ স্তরে উঠে আসতে পারেন এমন আভাসও পাওয়া গেছে।
গোপন পরিচয়ের শর্তে উত্তর ইউনিয়নের ভোটার ও আওয়ামী লীগ অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন এক নেতা জানিয়েছেন, উত্তরে বর্তমানে নৌকার অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আ.লীগের আপাদমস্তক কর্মী এবং যারা নৌকায় ভোট দেন তারা দলের টানে হলেও নৌকায় ভোট দেবে। সেটা যদি হয় তাহলে নৌকা বিজয়ী হবে। তবে এখানকার নৌকা, চশমা ও ঘোড়া যদি সমানতালে ভোট টানে তাহলে আনারস প্রার্থী সৈকতের সম্ভাবনা বেশী বলে জানান তিনি।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের ভোটার মহসিন কবির বলেন, আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী সদর ইউনিয়নে কামাল (চশমা), জুয়েল (নৌকা) ও সাজ্জাদ মাহমুদের (আনারস) মাঝে ত্রিমুখী লড়াই হবে। এর মাঝে চশমার অবস্থান যদিও একটু ভালো শোনা যাচ্ছে তবে শেষ পর্যন্ত নৌকাই বের হয়ে আসবে বলে আমি মনে করছি।
উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈকত ঘোষ চৌধুরী আনারস মার্কায় ভোট চেয়ে বলেন, এই তরুণ বয়সে নির্বাচনে আসার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো এখানকার গরিব, দুঃখী ও মেহনতি মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করা। আমি নির্বাচিত হলে গণমানুষের অধিকার আদায়, ন্যায় প্রতিষ্ঠাসহ উন্নয়নের পক্ষে নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখার পাশাপাশি উত্তর ইউনিয়নকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার চেষ্টা করব।
সদরের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা কৃষক লীগের সহ সভাপতি মো. কামাল বলেন, জনগণ আমাকে চায়। এলাকার ময়-মুরব্বীরা বসে আমাকে প্রার্থী করেছে। তাই আমি প্রার্থী হয়েছি। প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য কৃষক লীগের সভাপতি একবার আমাকে বলেছিলেন। পরে আমি বলেছি যদি আপনারা আমাকে নিয়ে বসতে চান তো বসেন। কিন্তু বিষয়টি পরবর্তীতে কেউই গুরুত্ব দেয়নি।
কামালের জন্য সদর ইউনিয়নে নৌকা ঝুঁকিতে পড়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরা তাঁকে বসানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। উপজেলা কৃষক লীগের নেতৃবৃন্দকে বলেছি, কৃষক লীগ তো আওয়ামী লীগেরই অঙ্গ সংগঠন, তোমরা তাকে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য বলো। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি, সে নির্বাচন করবে।
সোমবার ২১টি কেন্দ্রে ইভিএম প্রদর্শনী চলছে জানিয়ে উপজেলা নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আজ (সোমবার) রাত ১২টায় প্রচার-প্রচারণা শেষ হচ্ছে। নির্বাচনী পরিস্থিতি অনেক শান্ত আছে। অস্থিতিশীল পরিবেশ মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত আছি। আশা করি সুন্দর এবং সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।


