স্বপন কুমার দেব
ইন্ডিপেনডেন্স মেমোরিয়েল হল, কলম্বো
এই ধারাবাহিকে প্রতি সংখ্যায় যে ছবিটি লগো হিসেবে দেখানো হচ্ছে সেটিই ইন্ডিপেনডেন্স মেমোরিয়েল হল বা শ্রীলংকার স্বাধীনতা স্মারকের মনুমেন্ট। অবস্থান রাজধানী কলম্বো নগরী। বৃটিশ শাসন থেকে শ্রীলংকা ১৯৪৮ সনে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৯ সনের ফেব্রুয়ারি মাস হতে স্বাধীনতা স্মারকের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং কাজ শেষ হয় ১৯৫৩ সনে। নির্মাণ ও দেখভালের দায়িত্ব শ্রীলংকান সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত। ফ্লোর এরিয়া দশ হাজার স্কয়ার ফুট। প্রধান স্থপতি প্রতিষ্ঠানের নাম টম নেভিলি উইনি জোনস। কলম্বোর যে এলাকায় অবস্থিত তার নাম সিনামন গার্ডেন। বর্তমানে স্বাধীনতা চত্বর নামে অধিক পরিচিত। মনুমেন্টের সামনের দিকে শীর্ষে বেদীর উপরে যে স্ট্যাচুটি শোভা পাচ্ছে তা শ্রীলংকার প্রথম প্রধানমন্ত্রীর। উনার নাম ‘ডন স্টিফেন সেনানায়েকে’। যিনি শ্রীলংকান জাতির পিতা হিসাবে অবিহিত। শ্রীলংকান স্বাধীনতা দিবসের কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম এই মনুমেন্ট চত্বরেই অনুষ্ঠিত হয়। নূতন পার্লামেন্ট ভবন হওয়ার আগ পর্যন্ত এসেম্বলী এখানেই বসতো। মাহেন্দ্র জয়বর্ধনে গাড়ী চালিয়ে যখন মনুমেন্টের পাশের রাস্তায় থামলেন তখন রোদ তেতে আছে। শরীর থেকে ঘাম বেরুচ্ছে। পরনের ব্লেজারে ভীষন অস্বস্তি হচ্ছে। গা কুট কুট অনুভূতি। শারীরিক অবস্থা ধৈর্য্য ধরে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। মনে মনে ভাবছি শীতের দেশেই আছি। অসুবিধা নাই। কিন্তু যেই মাত্র খোলা প্রশস্ত হলে পা রাখলাম তখনই যেন ম্যাজিক ঘটে গেলো। ফুরফুরে হাওয়া যেমন বইছে তেমনি পাখিদের কিচির মিচির। সারাদিন বসে থেকে মন প্রাণ জুড়িয়ে নেওয়ার মতো একটি আদর্শ স্থান। ভেতরে এত হাওয়া আসছে কোথা থেকে কে জানে। খোলা হলের সঙ্গে লাগোয়া আরো স্থাপনা। কমপ্লেক্সটি অনেক বড়। চারিদিকে বাগান ও সুশোভিত পুষ্পরাজি। জাতির পিতার স্ট্যাচুটি যে বেদীর উপর তার পাদদেশে বড় আকৃতির একাধিক সিংহের প্রতিকৃতি। বৃত্তের ভিতরে ধরা শ্রীলংকান তরবারী। ১৯৭২ সন থেকে শ্রীলংকান জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সোনালী সিংহ স্বর্ণের রং এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। বৃত্তাকার শীল্ডের ভিতরে আরো আছে শষ্য ভান্ডারের নমুনা স্বরূপ ধানের ছবি। আছে জাতীয় ফুল পদ্মের প্রতীকী ছবি। নীল রং এর পদ্ম। পর্তুগীজরা ১৫০৫ খৃস্টাব্দ থেকে ১৬৫৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত শ্রীলংকা শাসন করেছিল। তাদের সময় প্রতীক ছিল হাতি। হাতির চর্তুদিকে পাম বৃক্ষ এবং পেছনে পাহাড়। পরবর্তী সময়ে ডাচরা কয়েক বছর শ্রীলংকা দখল করে শাসন চালিয়েছিল। তারাও পর্তুগীজদের অনুরূপ হাতিকেই প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। অত:পর স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত শ্রীলংকায় ছিল বৃটিশ রাজত্ব। তাদের আমলে ও প্রতীক ছিল হাতি।
সঙ্গে নারকেল গাছ এবং পরবর্তী সময় স্বাধীনতার পর সংস্কার হতে হতে বর্তমান প্রতীক। শ্রীলংকার জাতীয় পতাকায় উল্লেখিত তরবারি সহ সিংহের প্রতীক স্থান পেয়েছে। পতাকার রং সবুজ, কমলা, মেরুন। সিংহের অংশে চার কোনায় চারটি গাছের পাতা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক। সবুজ রং মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করে আর গেরুয়া রং হিন্দুদের। তরবারী বলতে কর্তৃপক্ষকে বুঝায়। বেশ কিছু সময় নিয়েই ইন্ডিপেন্ডেস মেমোরিয়েল হল ঘুরে ফিরে দেখে নিয়ে বাইরে যখন বেরুলাম তখন রৌদ্রের তাপ একটুও কমেনি। মাহেন্দ্র কে নিয়ে তুলনামূলকভাবে একটা সস্তার রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে নিলাম। এখানকার সব খাবারই নারকেল তেল দিয়ে তৈরী হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন রকম নারকেলের আইটেম তো থাকবেই। গরম না কমলেও বেকেল হয়ে গেছে। হোটেলে ফিরে এলাম। মাহেন্দ্র বিদায় নিলেন। পরের দিন বেলা ঠিক দশটায় আমাদের নিয়ে ক্যান্ডি রওয়ানা দেবেন। শ্রীলংকান হোটেলগুলিতে পার্টি লেগেই আছে। বার চব্ব্শি ঘন্টাই খোলা। সামনে ক্রীসমাস, সবকিছু মিলিয়ে জমজমাট ভাব। আমাদের স্মার্ট মোবাইল সেট হঠাৎ গড়বড় শুরু করে দেয়। ভাইবার চালু করা যাচ্ছে না। কাজেই বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। এবারে ঠিক করে নিলাম একটা শ্রীলংকান সিম কিনেই নেব। সন্ধ্যার পর বেরুলাম হোটেল থেকে। আগেই বলেছি হোটেলটি বাজার এলাকায়। সড়কের দু’পাশে অজস্র দোকানপাট। গাড়ী চলাচল তো আছেই। প্রাইভেট কার ছাড়া গণপরিবহন বাস আর আমাদের মতো অটো। অটোকে এখানে স্থানীয় ভাষায় পিঁয়াজু বলে ডাকে। আমাদের ডালের বড়া/পিয়াজী কিনা জানি না। আমরা ফুটপাত দিয়ে উল্টো দিকে হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূর গিয়ে আবার হোটেল পেরিয়ে পাশেই একটা মোবাইলের দোকানে ঢুকলাম। যে ছেলেটির সঙ্গে আলাপ হলো তার নাম হোসেন বা এ রকম কিছু। নামটা ঠিক মনে নেই। আমরা বাংলাদেশের শুনে ছেলেটি বেশ আগ্রহ দেখাল। বাড়িয়ে দিল সহযোগিতার হাত। এর একটা আলাদা কারণও আছে। এই ছেলেটির আপন ছোট বোন পড়াশুনা করছে চট্টগ্রাম সরকারি মেডিকেল কলেজে। মোবাইল ফোনে বোনের ফটোও আমাদের দেখালো। যেহেতু আমরা বাংলাদেশ থেকে আসছি কাজেই তার আত্মীয়সম। আমাদের সাহায্য করতে উন্মুখ হয়ে আছে। সে দোকানের মালিক না হলেও যথেষ্ট দাপুটে। তাছাড়া অত্যন্ত স্মার্ট এবং দক্ষ। ভালো একটি সিম কেনার ইচ্ছা জানালে সে ‘ডায়ালগ’ কোম্পানীর সিম কেনার পরামর্শ দিলো। এটি শ্রীলংকার সবচেয়ে চালু সিম। তাছাড়া দেশে বিদেশে সব সময় নেট পাওয়া যায়। কিন্তু দাম হলো আসল। ইতোমধ্যে এয়ারপোর্টের দোকানের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। ছেলেটি এবারে সত্যিই আত্মীয়ের মতো সাহায্য করলো। ১২০০ রুপীর মধ্যে সিম লাগানো সহ টাকা রিচার্জ করে দিলো। বিদেশী হিসাবে সিম কিনতে পাসপোর্টের ফটোকপি লাগে। গল্প করতে করতে জানালো আমাদের এখানে বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, খৃস্টান সবাই মিলেমিশে খুব ভালো আছি। খুব ভালো ব্যবসা চলছে। আসার সময় বলে দিলো দেশে ফেরার আগে যদি সিম তাদের কাছে বিক্রি করে দেই তাহলে একই দামে কিনে নিবে। সবকিছু মিলিয়ে খুব ভালো লাগলো। হোটেল রুমে ফিরে এসেই মাহেন্দ্র কে একটা ফোন দিয়ে নূতন সিমের যাত্রা শুরু করে দিলাম। তারপর ঢাকাতে ফোন। ব্যাস এবারে বিশ্রাম। সৌজন্য হিসেবে চা/কফি রোজই দেয়া হয়। এবারে এগুলির সদগতি করা গেল। রুমে টিভি আছে কিন্তু খুলে লাভ নেই। বেশীর ভাগই সিলহোনী ভাষায়। কাজেই কাজেই চুপচাপ ডিনারের জন্য অপেক্ষা। যথা সময়ে ডিনার টাইমে নিচের রেস্তোরায় গিয়ে দেখি এটি পুরোপুরি বারে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। পার্টি চলছে ধুমধাম। আলোছায়ার পরিবেশ বেয়ারাদের নি:শব্দ পদচারণা। হাতের ট্রেতে নানা ধরণের ওয়াইন। খবর নিয়ে জানা গেল রেস্তুরা চলে গেছে দোতলার আরেক রুমে। সেটি আর খুঁজে পাইনা। তালাশ করতে করতে তিন তলার ছাদে চলে গেলাম। সেখানে সুইমিং পুল ঘিরে চলছে আরেক পার্টি। হাতে হাতে গেলাস। পরিচিত বেয়ারাকে পেয়ে যাই। সে জানালো সুইমিং পুলের পাশে ডিনার সার্ভ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে যে দামদর পড়বে তা শুনে চক্ষু চড়ক গাছ। আমরা শুধু বললাম আমাদের দোতলায় রেস্তোরায় নিয়ে যাও। বেয়ারাটি যথেষ্ট ভালো। আর হয়তো আমাদের মনের অবস্থা ও বুঝতে পেরেছে। সে এদিক সেদিক নানা অলিন্দ ঘুরিয়ে নিয়ে এলো নূতন রেস্তেুারায়। ছোটখাটো একটি রুমে অস্থায়ী খাবার ঘর করা হয়েছে। আরেক চেনা বেয়ারাকে পেয়ে যাই। দু’দিনে বেশ চেনা জানা হয়ে গেছে। তাকে আর বিশেষ বলতে হলো না। সে মাঝারি দামের ডিশ সার্ভ করল। তাকে জানালাম কালকে চলে যাব, সামান্য টিপস তোমাকে দিব। বিল মিটিয়ে ভাংতি শ্রীলংকান রুপী তুলে দিলাম তার হাতে। সে খুশিই হলো। হয়তো ভাবছে তাদের শ্রেণীর লোকই আমরা। বেড়ানোর তালে পরে ছিটকে এসে পড়েছি এই থ্রি স্টার হোটেলে। তার মুখে সহমর্মীতার আভাস। যেমনটি দেখেছি মাহেন্দ্রর মুখে। বিশ্বে এক সময় শ্রেণি সংগ্রাম প্রবল ছিল। এখন আর সে রকম নেই। ডিনার সেরে রুমে ফিরে এসে কিছু গোছগাছ। সুটকেস, ব্যাগ রেডী করে আমরা ঘুমিয়ে গেলাম। আগামীকাল ক্যান্ডি যাত্রা। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক
বি:দ্র: এই লেখা লেখতে লেখতে প্রচন্ড বসন্তে আক্রান্ত হই। বসন্ত বাতাস নয় রোগ। বসন্ত শরীরে শক্তি বলতে কিছু নেই।


