ভ্রমণ কাহিনী- মালদ্বীপ, শ্রীলংকাÑসাত দিনের সাতকাহন-১

স্বপন কুমার দেব
সূচনা পর্ব
পেশায় যারা আইনজীবী তাদের মধ্যে একটা সাজ সাজ রব পড়ে প্রতি ডিসেম্বর মাসে। এটি বন্ধের মাস। জেলা জজ কোর্ট, সেশন কোর্ট এবং সিভিল কোর্ট পুরোটাই এ মাসে ভেকেশন বা ছুটি। ডিসেম্বরের দুই তারিখ থেকে একত্রিশ তারিখ পর্যন্ত। সিভিল কোর্টের আইনজীবীদের ব্যস্ত পেশা জীবন এক মাসের জন্য থমকে গিয়ে উপভোগের দুয়ার খোলে দেয়। সংশ্লিষ্ট সবাই আগে থেকেই নানা পরিকল্পনা  করতে থাকেন। কিভাবে এই লম্বা ছুটি কাটানো যায়। ভ্রমণে না গেলে বা বিশেষ কিছু একটা না করলে আবার একটা প্রেস্টিজের প্রশ্ন থেকে যায়।  ২০১৫ সালে উত্তর ভারত ঘুরে এসেছি। এবার কোথায় যাওয়া যায় চিন্তা করতে করতে কাজের ঝামেলায় পেরিয়ে গেল অক্টোবর, নভেম্বর মাস। প্ল্যান প্রোগ্রাম কিছুই হলোনা। বেড়াতে আদর্শ দেশ ভারত ছাড়াও এমন অনেক দেশ আছে যেগুলিতে অন্তত দু’তিন মাস আগে থেকেই ভিসা, টিকেট, হোটেল বুকিং প্রোগ্রাম ইত্যাদির সুব্যবস্থা করতে হয়। ডিসেম্বর মাস শুরু হয়ে গেছে, তাই ঐ সব দেশ বাদ। আবার অনেক দেশ আছে যে গুলিতে পৌছানোর পর এয়ারপোর্টে নির্দিষ্ট ফিস দিলে সঙ্গে সঙ্গে ভিসা দেয়া হয়। সে সব নিকটবর্তী দেশের মধ্যে আছে নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া সহ কিছু দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের এই ধরণের দ্বি-পাক্ষিক ভিসা পদ্ধতি চালু আছে। পদ্ধতির নাম হলো ON ARRIVAL VISA। অনেকে বলেন এয়ারপোর্ট ভিসা। নেপাল, ভুটান যাওয়া হবে না। সেখানে কড়া শীত পড়ে গেছে। আমার সফর সঙ্গিনী স্ত্রী সুদীপ্তা (শুভ্রা) অত্যন্ত শীত কাতর। আমরা প্রথমে ঠিক করেছিলাম ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে যাবো। সেখানে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পুরানো সংস্কৃতির নানা নিদর্শন আছে। তার উপর শীত নেই। সিলেটের ট্র্যাভেল অফিস বললেন বালি’তে সরাসরি ফ্লাইট নেই। একাধিক ট্রানজিট/বদলী ইত্যাদি আছে। আমাদের কাছে মনে হলো ঝামেলা হবে। আমরা বয়স্ক মানুষ। এগুলি সামলাতে এবং দৌড়াদৌড়ি করতে পারবো না। আমাদের প্যাকেজ ট্যুর নিজস্ব। কোন কোম্পানীর সঙ্গে প্যাকেজ থাকলে চিন্তা ছিলোনা, টাকা আমাদের দায়-দায়িত্ব তাদের। ঢাকা থেকে এরকম নানা প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা থাকে। আগে ভাগে প্রোগ্রাম করলে হয়তো সম্ভব হতো। দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে মালদ্বীপ, শ্রীলংকা বেছে নেই। যারা যান তারা সবাই এই দুটো দেশে সাধারণত এক সঙ্গেই প্রোগ্রাম করেন। যাতায়াতের সুবিধা আছে। আমাদের টিকেট, হোটেল বুকিং সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। সেই অনুযায়ী ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ সুনামগঞ্জের বাসা থেকে যাত্রা শুরু হয়। শেষ বিকালে ঢাকা পৌঁছে যাই। ১৩ তারিখ সারা দিন-রাত্রি ঢাকায় কাটালাম। এক দম্পতি বন্ধুর বাসায় দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত ছিল। তারা দু’জনে বছর দেড়েক আগে মালদ্বীপ-শ্রীলংকা ঘুরে এসেছেন। আলাপে আলাপে বেশ কিছু তথ্য ও অভিজ্ঞতার কথা জেনে নেই। পরের দিন ১৪ ডিসেম্বর আমাদের উড়ান। শ্রীলংকান এয়ারলাইনসে স্থানীয় সময় অনুযায়ী ঢাকা থেকে বিকেল আড়াইটায় কলম্বো যাত্রা। শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে পৌঁছাবো সেখানকার স্থানীয় সময় পাঁচটা পঁচিশ মিনিটে। শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান আধঘন্টা। আর মালদ্বীপের সঙ্গে এক ঘন্টা। বাংলাদেশ আগে, তারা পিছে। ঢাকা থেকে যখন আমাদের উড়োজাহাজ আকাশে উঠার জন্য দৌড়াতে শুরু করবে তখন শ্রীলংকায় বিকাল দুইটা আর মালদ্বীপে দেড়টা। কলম্বোতে   এক ঘন্টা বিরতি। এরপর মালদ্বীপের ফ্লাইট। ঢাকাতে এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাই বেশ সময় হাতে নিয়েই। যানজটের চিন্তায় সব সময় তটস্থ থাকতে হয়। প্রায় ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় শ্রীলংকান এয়ারলাইন্সের বিরাট আকৃতির এয়ার বাস আকাশে ডানা মেলে ভেসে গেলো। বাংলাদেশের বেশিরভাগ যাত্রীই মালদ্বীপ যাবে। বয়সে যুবক তরুণ এরা। মালদ্বীপে চাকুরী করে। বৃহত্তর ঢাকা কুমিল্লার ছেলেপিলেরাই বেশীর ভাগ। বিদেশী যাত্রীও আছেন। এতবড় উড়োজাহাজ হলেও বেশ সিট দেখলাম খালি। এয়ার হোস্টেসরা অত্যন্ত স্মার্ট এবং সুন্দরী। প্রথমে পত্রিকা তারপর খাবার পরিবেশনা শুরু হয়ে গেলো। নারকেল দিয়ে তৈরী নানা ছোট-বড় স্ন্যাকস, ফলের জুস ইত্যাদি । সারাদিনের টেনশনে বেশ ক্ষুধা পেয়েছিল। খাওয়ার পর সিলোন টি/কফি পরিবেশিত হয়। ঘুম আসছে। কলম্বো পৌঁছাবে সেখানকার স্থানীয় সময় পাঁচটা পঁচিশ মিনিটে। সময়ের হেরফেরে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার উড়াল যাত্রা। চোখে ঘুম এসে গেছে। পেছনে সিট হেলিয়ে দিয়ে বেশির ভাগ যাত্রীরাই ঘুমিয়ে গেলেন। তবে আমাদের আধো ঘুম। মাঝে মাঝে চোখ মেলা। এক সময় ঘোষণা হলো কলম্বো নিকটবর্তী। সিট বেল্ট বেঁধে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ এলো। শ্রীলংকান সময় পাঁচটা পঁচিশ মিনিটে কলম্বোর বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে উড়োজাহাজ রানওয়ে স্পর্শ করে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে স্থির হয়। নামার সময় বেশ জটলা। শক্ত সমর্থ এক বাংলাদেশী যাত্রীর সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি কুয়েতে ব্যবসা করেন। কুয়েত থেকে টিকেট কেটেছেন। দামে অনেক সস্তা। কয়েকজন উনার সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন। ঐ যাত্রী জানালেন তিনি শ্রীলংকায় দুই মাস থাকবেন। এখানে তার শ্বশুর বাড়ী। একজন মহিলা যাত্রীর প্রশ্নের উত্তরে আরো জানালেন, কুয়েতে এক বিয়ে এবং দেশে আরেক বিয়ে আছে। শ্রীলংকান শ্বশুর বাড়ীর জন্য ঢাকা থেকে আটশত টাকা কেজি দরে মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। এয়ারপোর্টে প্রবেশ করার পর মালদ্বীপের যাত্রীদের আলাদা ফ্লোরের একটি ওয়েটিং রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয় সময় ছয়টা চল্লিশ মিনিটে আলাদা একটি ফ্লাইট যাবে কলম্বো থেকে মালদ্বীপ। একই এয়ার লাইনস। আমরা ট্রানজিট যাত্রী হিসেবে বসে আছি। এমন সময় ঘোষণা এলো চল্লিশ মিনিট লেট্। এটি বাড়তে বাড়তে সাড়ে তিন ঘন্টা হলো। এর মধ্যে দেখি বিভিন্ন ফ্লাইটে মালদ্বীপে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা আসছেন। মনে হলো দেরী ইচ্ছাকৃত হতে পারে। কয়েকজন যাত্রীও তাই বলছেন। উদ্দেশ্য সব ফ্লাইটের যাত্রীদের একত্র করে মালদ্বীপ যাত্রা হবে। এখন দেশে মেয়েদের খবর জানাই কি করে। তারা তো চিন্তা করছে। ওয়াইফাই জোনে থাকলেও কোড নাম্বার সংগ্রহ করতে পারছি না। এক যাত্রী কি করে যেন পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে সামান্য কিছু সময়ের জন্য আমার মোবাইলে ইন্টারনেট কানেকশন করে দিলেন। তাৎক্ষণিক ভাইবার চালু করে ঢাকায় মেজো মেয়ে বন্যাকে জানিয়ে দিলাম কলম্বো এয়ারপোর্টে আটকে থাকার কথা। দেরির সময়সীমা বাড়ছে দেখে মাঝখানে কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের উপরে রেস্টুরেন্টে নিয়ে নাস্তা খাইয়ে দিলেন। দ্বিতীয়বার ঢুকতে আবার চেকিং। অবশেষে উড়োজাহাজ যাত্রী বোঝাই দিয়ে শ্রীলংকান সময় রাত সাড়ে দশ টায় আকাশে উড়াল দিলো। কালো রাত, নিচে ভারত মহাসাগর। এয়ার হোস্টেসরা চিকেন বিরিয়ানি পরিবেশন করলেন। পুরোপুরি ডিনার। এরপর চা, কফি। খেতে খেতে সোয়া ঘন্টায় মালদ্বীপের আকাশে এসে গেল আমাদের উড়োজাহাজ। অতঃপর অনেকটা নিচে নেমে আসল। দ্বীপে দ্বীপে আলোর মালা আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে। ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়োজাহাজ নামলো মালদ্বীপের ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সাগর আর বিমানবন্দরে মাখামাখি। হু হু বাতাস। শীত নেই। আমাদের হোটেল থেকে লোক এসেছে আমাদের নেয়ার জন্য। হাতে প্ল্যাকার্ড। নিজেদেরকে বেশ ভি.আই.পি মনে হলো। ঝট্পট্ পাসপোর্টে সিল দিয়ে দিলো ইমিগ্রেশন। বাইরে এসে হোটেলের গাড়িতে উঠি। গাড়ি আমাদের নিয়ে যাবে মালদ্বীপের আরেক দ্বীপে। সেই দ্বীপের নাম ‘হুলু মালে’। সেখানে আমাদের হোটেল ‘কোরাল ইন’। সাগরের উপর দিয়ে তৈরি করা রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটলো। প্রায় আধ ঘন্টা পরে মালদ্বীপের স্থানীয় সময় রাত প্রায় বারোটায় (আমাদের রাত একটা) হোটেলে পৌঁছে যাই। ম্যানেজার, বয়, বাবুর্চি সবাই বাঙালি। রুমে পৌঁছে দিয়ে বয় জানিয়ে দিলো জানালা খুললেই সাগর। আমরা গর্জন শুনতে পাই। শীত নেই। সাগরের বাতাস গায়ে লাগিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। পরদিন ভোরে উঠে প্রথমেই জানালা দিয়ে তাকাই। চোখের সামনে অনন্ত নীল সমুদ্র। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক