ভ্রমণ-বেড়াতে ভারত-উত্তর থেকে উত্তরাখণ্ড২২

স্বপন কুমার দেব
শেষ বেলায় ট্রেন লেট্-অন্য অভিজ্ঞতা এবং বিলম্বিত যাত্রা
আজ ২৬ শে ডিসেম্বর ২০১৫ খ্রি: শনিবার। হরিদ্বার থেকে মধ্যরাতের ট্রেন ‘উপাসনা’ এক্সপ্রেসে উঠব রাত ১১.৫৫ ঘটিকায়। ট্রেন যখন ছাড়বে তখন ক্যালেন্ডারে তারিখ হয়ে যাবে ২৭ শে ডিসেম্বর। ২৮ শে ডিসেম্বর ভোর রাতে কলকাতার হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে যাত্রা শেষ হবে। আশা করি সবাই বুঝতে পারছেন এই ধারাবাহিকের যবনিকা পতন হতে চলেছে। এই পর্বের পরে আরেকটি পর্ব থাকবে ‘উপসংহার’ পর্ব নামে। সেই সঙ্গে পর্দা নামবে। দিনভর হরিদ্বার শহরে ঘোরাঘুরি করতে থাকি। গঙ্গার পাড়ে পাড়ে অনেক লম্বা আকৃতির হরিদ্বার শহর। ‘হর কি পেইড়ী’র পাশ দিয়ে পুরান বাজারে ঢুকলাম। অনেক গলি আর ক্ষুদ্রকায় সারি সারি দোকানপাট। উপমহাদেশের সব পুরান বাজারই বোধ হয় একই রকম। আধুনিক শপিং মল কিংবা হাইফাই দোকান নেই। অলিগলিতে যথেষ্ট ক্রেতা সমাগম আছে। শীতের বাজার জমজমাট। গরম কাপড় চোপড়, চাদর, টুপি, কম্বল, পূজার সামগ্রী, তামা, পেতল, কাসা নানাবিধ ধাতুর তৈরী জিনিসপত্র, চন্দনকাঠ, ধূপকাঠি, পুতিরমালা সবরকমের দোকানই আছে বাজারে। পুরান বাজার ঘুরে বড় সড়কে উঠে রেল স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রওয়ানা দিলাম। উদ্দেশ্য যাত্রার আগে একবার দেখে আসা। অনেকটা রেকী করার মতো। রাস্তার দু’দিকেই দোকানপাট, হোটেল, যাত্রী নিবাস ইত্যাদি। হরিদ্বারে ‘দাদা-বৌদি’র’ হোটেল নামে একটি বাঙালি হোটেলের নামধাম তথা খাওয়া থাকার সুনাম অনেক বইয়ে পড়েছি। কিন্তু এর খোঁজ পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ যেতে যেতে বাঁ-দিকে চোখে পড়ল বাংলা সাইনবোর্ডে লিখা ‘দাদা-বৌদি’র’ হোটেল। কিন্তু আমার কল্পনার সঙ্গে মিললো না। কল্পনায় ছিল আকারে বড়, দেখতে দৃষ্টিনন্দন একটি খাবারের দোকান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সামনে অনেক খোলা জায়গা আর ছড়ানো ছিটানো টেবিল চেয়ার পাতা এবং ম্যানেজারের টেবিলে লালপেড়ে শাড়ি পড়া বাঙালি গৃহবধূ বৌদি, আর ধূতি পাজ্ঞাবী পরিহিত দাদা টেবিলে টেবিলে ঘুরে ঘুরে সবাইকে আপ্যায়নে ব্যস্ত। খেতে আসা লোকজন কলাপাতায় কিংবা শালপাতায় জুঁই ফুলের মতো সাদা চিকন চালের ঝরঝরে ভাতের সঙ্গে খাঁটি গাওয়া ঘি মাখিয়ে বেগুন ভাজা দিয়ে ভাত খাচ্ছেন, সঙ্গে মুগের ডাল, আনাজপাতি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। যাই হোক একটা প্রবাদ বাক্য আছে স্বপ্নেই যখন খাবো তখন পোলাও কোরমা নয় কেন? আমরা কল্পনাতেই দাদা বৌদির হোটেলে গরম ঘি ভাত আর বেগুন ভাজা দিয়ে খেয়ে নিলাম। হরিদ্বারের রেল স্টেশনটি বেশ বড়। শহরের একপ্রান্তে আমাদের হোটেল, আরেক প্রান্তে রেল স্টেশন। স্টেশন দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। কিছু ভালো লাগছে না। ঘরে ফেরার টান পড়েছে। বিকেলে এলাম গঙ্গা ঘাটে। এখানে এলেই মন স্থির হয়। সন্ধ্যারতি প্রাণভরে উপভোগ করে গঙ্গাজলে প্রদীপ ভাসিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়ে সন্ধ্যার পর আবার হোটেলে। গোছগাছ তেমন কিছু নেই। ব্যাগ, স্যুটকেস রেডি হয়ে গেল। এবার শুধু প্রতীক্ষার পালা। আগেভাগেই রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। অত:পর রাত দশটার দিকে নিচে রিসেপশনে এসে চাবি গছিয়ে বিদায় নিয়ে গেটে চলে আসি। লম্বা-চওড়া দারোয়ান পান্ডেজী সদা প্রফুল্ল। আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন। পান্ডেজী অটোরিক্সা ঠিক করে রেখেছেন। পান্ডেজীর কাছ থেকে বিদায় নেয়া হলো। রাতের হরিদ্বারে অটো রওয়ানা দিলো রেল স্টেশনের দিকে। প্রচন্ড শীত ও কুয়াশা পড়েছে। লোকজনের চলাচল অনেক কম। তবে রেল স্টেশনে যথেষ্ট লোক সমাগম আছে। স্টেশনে এটাই স্বাভাবিক। প্লাটফর্মে প্রচুর যাত্রী আর মালপত্রে ঠাসাঠাসি। একটা উদ্বেগের ছায়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খোঁজ খবরে যা জানলাম তাতে মাথায় বজ্রাঘাত হলো। আমাদের ট্রেন ‘উপাসনা এক্সপ্রেস’ দশ ঘন্টা লেটে চলছে। এখন কোথায় আছে কেউ জানে না। রাত ১১টা ৫৫ মি. নির্ধারিত আছে ছাড়ার সময়। এটি এখন পরের দিন বেলা দশটায় ছাড়বে। এই ট্রেনের গতিপথ হলো কলকাতার হাওড়া-দেরাদুন-হাওড়া। দেরাদুনের আগের স্টেশন হরিদ্বার। হরিদ্বারে যাত্রী নামিয়ে সোজা চলে যাবে দেরাদুন। ফিরতি যাত্রায় আবার হরিদ্বার থেকে যাত্রী তুলে নেবে। কলকাতার অনেক যাত্রী হরিদ্বারে নামেন আবার এখান থেকেই উঠেন। ভারত এক বিরাট দেশ। হাজার হাজার মাইলের দূরত্বে জালের মতো ছড়ানো আছে রেলপথ। এত দূরের পাল্লায় রেল ছাড়া অন্য পথ বিশেষ করে সড়ক পথে চলাচলের সুবিধা নেই এবং বাস্তব সম্মতও নয়। প্লেন ভীষণ ব্যয় বহুল। তদুপরি এত আনাচে কানাচে বিমান পরিসেবা বিস্তৃত নয়। এমনিতে ভারতে রেল সার্ভিস যথেষ্ট ভালো। তবে সমস্যা হয় শীতকালে। ঘন কুয়শার চাদরে ঢাকা পড়ে শীতের রাত ও দিনের অনেক বেলা। ফলশ্রুতিতে ট্রেন লেট্ ও যাত্রী দুর্ভোগ। প্রায়ই এমন ঘটে থাকে। দূরপাল্লার যাত্রীদের তখন বিড়ম্বনা। আমরা পড়ে গেলাম এই কঠিন দূরবস্থায়। দিশেহারা ভাব, এখন কি করি? ট্রেন লেটের পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার ছিল। নিশ্চিন্ত জানি যে দশ ঘন্টা থেকে লেটের সময়সীমা ক্রমশ: বাড়বে। নিয়ম অনুযায়ী বিলম্বের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। সেটি অতিক্রম করলে মধ্যপথে ট্রেন বাতিল বা ক্যান্সেল করে দেয়া হবে। তখন মহাবিপর্যয়। আর ভাবতে পারছি না। কলকাতায় দাদাকে ফোন দিলাম। দাদার পরামর্শ হলো অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া আর উপায় নেই। ক্যান্সেল হলে তখন পরবর্তী ভাবনা। আমাদের হাতে আর বিকল্প নেই। দেশে কোথাও আটকে গেলে আমরা মাইক্রোবাস/কার ইত্যাদি ভাড়া করে গন্তব্যে চলে যাই। টাকা পয়সা বেশী লাগলেও সংকট এড়ানো যায়। কিন্তু এখানে কলকাতা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আরো সাত রাজ্য পেরিয়ে এভাবে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এই অজানা অচেনা পরিবেশে অসহায় লাগছে। নিচে সবগুলি ওয়েটিং রুমে তিল ধারণের জায়গা খালি নেই। সবাই খবর জেনে গেছে। অনেক যাত্রী ওয়েবসাইট থেকে আগেই যাত্রা বিলম্বের খবর সংগ্রহ করে হোটেল/ধর্মশালা ত্যাগ করেননি। স্ব স্ব স্থানে রয়ে গেছেন। রাতে আরামে ঘুমিয়ে পরের দিন বেলা দশটার আগে স্টেশনে চলে আসবেন। দোতলায় সাধারণ ওয়েটিং রুমে কোনভাবে বসার জায়গা পাওয়া গেল। তাও আবার মহিলা ওয়েটিং রুম। স্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে আমার স্থান হয়। এরকম আরো কয়েকজন আছেন। সবাই ‘উপাসনা এক্সপ্রেসের’ যাত্রী। ভারতে তীর্থযাত্রী ও ভ্রমণকারীদের একটা বৈশিষ্ট আছে। এরা দলবেঁধে ঘুরেন। পুরো পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বাচ্চা-কাচ্চা, জোয়ান-বুড়ো সবাই দলে থাকেন। বুড়োরা যথেষ্ট শক্ত সমর্থ। পাঁচজনের কম কোন দলে নেই। সঙ্গে থাকে একাধিক ব্যাগ। শীতকাল বিধায় ঢাউস বড় ব্যাগে থাকে কম্বল। প্লাটফর্ম বলেন আর ঘরের ভিতর বলেন তারা ঝট করে মেঝেতে কম্বল পেতে সবাই কম্বলের নিচে সারি সারি শুয়ে যান। তারপর আরামসে ঘুম। ট্রেন লেট হোক কিংবা বাতিল হোক ঘুমের কোন ব্যাঘাত নেই। এমনকি বেঞ্চে বসেও কম্বল মুড়ি দিয়ে শরীর মুচরে টুচরে ঘুমাতে তারা অভ্যস্ত। আমাদের সে উপায় নেই। সঙ্গে কম্বলও নেই। আছে সাধারণ চাদর। হিমালয়ের পাদদেশে প্রচন্ড শীতে উষ্ণ কম্বলের কোন বিকল্প নেই। বিনিদ্র রজনী কাটছে। ঠিকমতো বসতেও পারছি না। লোকজন ঢুকছে বেরুচ্ছে। বাথরুম পাচ্ছে বারবার। শীতের রাত এমনিতে লম্বা। কিছুক্ষণ পর পর নিচে নেমে অনুসন্ধান ডেস্কে গিয়ে হারানো ট্রেনের খবর নেয়াই ছিল আমার প্রধান কাজ। মাংকি ক্যাপ মাথায় দেওয়া যিনি এনকোয়ারী ডেস্কে বসে আছেন তিনি কোন কথা বলেন না। শুধু শুনেন। আর হাতের লম্বা ছড়ি দিয়ে দেয়ালে টাঙানো চার্ট দেখিয়ে দেন। আশার খবর এতটুকু যে তখনও ট্রেন বাতিল হয়নি। দশ ঘন্টা লেটেই ট্রেন এগুচ্ছে। রাত তখন প্রায় ৩টা বাজে। বসে ঝিমুচ্ছি। এমন সময় রেলওয়ে মাইক্রোফোনের ঘোষণায় একটা সুখবর ভেসে এলো। বড়ই সুমধুর বার্তা। ঘোষণাটি হলো হাওড়া থেকে ছেড়ে আসা দেরাদুন গামী ‘উপাসনা এক্সপ্রেস’ কিছুক্ষণের মধ্যে হরিদ্বারে পৌঁছাবে। এই ট্রেনটিই দেরাদুন থেকে ফিরতি যাত্রায় আমাদের নিয়ে যাবে। কিছুটা নিশ্চিত হওয়া গেল। যাত্রা বাতিল হয়নি। ফিরতে পারবো। ট্রেন যখন স্টেশনে ঢুকলো তখনও ঘোষণা শুনলাম। আবার দেরাদুনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণাও শুনলাম। যতবার ঘোষণা হলো ততবারই শুনতে থাকি। একসময়ে ভোর হয়। নিচ থেকে চা নিয়ে আসি। কখন দশটা বাজবে এই ভাবনায় আর তর সইছে না। এমন সময় একটি তরুণী মেয়ে ঘরে ঢুকলো। দেখতে সুন্দরী। বড় বড় চোখ। গভীর দৃষ্টি। যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব আছে বুঝা যায়। রাতে নিচের ওয়েটিং রুমে ছিল। মোবাইল চার্জ করতে এসেছে। এক পর্যায়ে মেয়েটির সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়। নাম গায়ত্রী চৌহান। দেরাদুনে জার্নালিজমে পিএইচডি করছে, বাড়ি বিহারের পাটনায়। ছোট বোন পড়ে হরিদ্বারে। তাকে নিয়ে একসঙ্গে ট্রেনে উঠবে বলে দিনের বেলায় হরিদ্বারে এসে এখন আটকে গেছে। অত্যন্ত মার্জিত। গায়ত্রী মোবাইলের ইন্টারনেট থেকে  খবর নিয়ে জানালো আরো দু’ঘন্টা লেট। দশটার স্থলে বারোটায় আসবে হরিদ্বারে। আবার হতাশা। নিচে গিয়ে দেখি চার্টে দশটা কেটে বারোটা লেখা হয়ে গেছে। একবার ট্রেন লেট হলে সেটি আর সামনে আসার ব্যবস্থা থাকে না। সিডিউল ঠিক রাখতে অন্য ট্রেনগুলিকে যথাসময়ে চলার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। লেট ট্রেন চলবে আরো লেটে। উপায় নেই। এদিকে ধৈর্য্য বলতে আর কিছু বাকী নেই। কান্না আসছে। দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি নেই। গায়ত্রী আবার মোবাইল সার্চ করে জানালো বেশ আগেই দেরাদুন থেকে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। তাহলে আসছে না কেন? উত্তর নেই। দশ মিনিট বিশ মিনিট করে পেছাতে পেছাতে অবশেষে চূড়ান্ত সময় ঠিক হলো বেলা দুটো। সবাই তখন প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন আসার গুমগুম আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। গায়ত্রীর কামরা আলাদা। গায়ত্রী আমাদের প্রণাম করে বিদায় নিলো। সঙ্গে থাকা এক্সট্রা কম্বল অফার করলেও আমরা আর নিলাম না। বড়ই ভালো মেয়ে। এবার ইঞ্জিন দেখা যাচ্ছে। দারুণ ব্যস্ততা। কিন্তু এর পরে যা হলো তার নাম চরম তামাশা ও হতাশা। একটা খালি ইঞ্জিন সান্টিং করে সবাইকে বোকা বানিয়ে সামনে দিয়ে চলে গেলো। দৌড়ে গেলাম এনকোয়ারীতে। চার্টে সময় পিছিয়ে গেছে। এবারে দুটো বিশ। জানি না এরপর কি হবে। হায় ঈশ্বর! তবে দুটো বিশ মিনিটে সত্যিই চরম কাংখিত স্বপ্নের ‘উপাসনা এক্সপ্রেস’ ট্রেন ঢুকলো স্টেশনে। নির্দিষ্ট বগিতে উঠে আসনে বসলাম। কিছুক্ষণ পর ট্রেন ছাড়লো। বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হলো স্বপ্ন দেখছি। দাদাকে একটা ফোন দিলাম। ২৭শে ডিসেম্বর বেলা প্রায় তিনটায় রওয়ানা দিয়ে ২৮ শে ডিসেম্বর রাত প্রায় ৯ টায় হাওড়া স্টেশনে যাত্রা শেষ হলো। কলকাতা এসে গেছি। পহেলা জানুয়ারী ২০১৬ আমাদের ঢাকার ফ্লাইট।
(আগামী সংখ্যায় উপসংহার পর্ব দিয়ে শেষ হবে এই ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী)  
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক