অ্যাডভোকেট এনাম আহমেদ
৩য় পর্ব
১ অক্টোবর, মঙ্গলবার। আমাদের মনের আকাশের মতো জাতির আকাশেও মেঘের ঘনঘটা। ভিসার জন্য অপেক্ষার শেষ দিন। ফাঁকিবাজ ছাত্রের পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষায় থাকার মতো হৃদয়হীন অপেক্ষায় থাকা। যেন থার্ড আম্পায়ারের রান আউটের সিদ্ধান্ত জানার জন্য আশাহীন ব্যাটসম্যান। সকালে ঘুম থেকে উঠে রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ নিয়ে বসলাম। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বিশ্বকবি বইয়ের প্রথম দিকেই রাশিয়ার যে বর্ণনা দিয়েছেন, এখন এত কাছে গিয়েও যদি ‘সামান্য ভিসার’ জন্য যেতে না পারি, তবে তা ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ হবে। বেলা ১১ টায়ও রাশিয়া এম্বেসি থেকে কোন সবুজ সংকেত না পাওয়ায় ভাঙ্গা মন নিয়ে কোর্টে চলে গেলাম। ‘মানুষের মনের ছায়া পড়ে তার চেহারায়’ সুনীলের এই লাইনটি সম্ভবত সঠিক। কোর্টে বন্ধুরা জানতে চাইল, আমার শরীর খারাপ কি- না। জানালাম, ঠান্ডা লেগে গেছে ! তারা আমাকে আর ঘাটাল না। দুপুর ১ টায় মোবাইলে পিনাকের মিহি গলা, ভাই তাড়াতাড়ি প্লেনের টিকেটের টাকা পাঠান! আমি আকাশ থেকে পড়লাম! তাকে বললাম, ব্যাপার কী? প্লেনে সুনামগঞ্জ থেকে কোথাও যাচ্ছি কি- না। সে জানাল রাশিয়া আমাদের পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে। ঢাকা থেকে জানানো হয়েছে দ্রুত টিকেট না কিনলে টিকেট পাওয়া যাবেনা। বললাম, ‘রাশিয়া ভিসা দিয়েছে, নাকি খালি পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে, আগে কনফার্ম হও’। সে আমার এখনও দ্বিধা- দ্বন্দ্ব দেখে রাগ করে মোবাইল অফ করে দিল।
শত অনিশ্চয়তার মাঝেও টিকেট কিনলাম। ৩ অক্টোবর খবর পেলাম আমাদের ফ্লাইট ১০ তারিখ। অথচ টিকেট কেনার সময় সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১৪ অক্টোবর। টিকেট তো হয়েই গেছে আর সত্যিই যদি ভিসা দিয়ে থাকে, তাহলে তো আমাদের একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। লাগেজ ধার করা, ওভারকোর্ট ধার আনা, যাওয়ার বিষয়ে ব্যাপক প্রচার দেয়া, ক… ত কাজ! এদিকে হাইকোর্টেও ৩/৪ দিনের কাজ অসমাপ্ত রেখে এসেছি। এদিকে ডলার কেনা সহ রাশিয়ার বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতাও বাকী রয়েছে। মোটামুটি আধাপাগল অবস্থায় ৭ অক্টোবর ঢাকা রওয়ানা হলাম। ১০ অক্টোবর ভোরে অ্যাডভোকেট মইনুদ্দিন আহমদ জালাল, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাড. আনোয়ার হোসেন সুমন ও যুবনেতা পিনাক দেবনাথ ঢাকা এসে ক্যাপিটালে উঠলেন। আর মৌলভীবাজার থেকে সিপিবি নেতা অ্যাড. মাসুক আহমদ ও রমাপদ যাদু এলেন। আমাকে বলা হলো দ্রুত ‘গাট্টি- বুচকা’ নিয়ে ক্যাপিটালে চলে যেতে। তা-ই গেলাম। নতুন পল্টন থেকে নতুন নতুন ডলার কিনে নিয়ে এলাম। লাঞ্চ করেই আমরা এয়ারপোর্ট রওয়ানা হয়ে যাব বলে ঠিক করলাম। কারণ অফিস- আদালত খোলার দিন, ঢাকা শহরের যে যানজট, আর আমাদের যা কপাল! আমাদের ফ্লাইট রাত ১০ টায়। রিপোর্টিং সন্ধ্যা ৭ টায়। যানজট মাথায় রেখেই আমরা দুপুরে খেয়েই পিনাকের উবারে চড়ে এয়ারপোর্ট রওয়ানা হলাম। তবে মহাখালির মাথায় এসেও রাস্তা খালি থাকায় বিকেলেই এয়ারপোর্ট পৌঁচ্ছে গেলাম। সেখানে সিলেট থেকে ফ্লাইটে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকা নাজিয়া ভাবীকে আন্তর্জাতিক বর্হিগমনে নিয়ে আসি। আমাদের নাজিয়া ভাবী, জালাল ভাইয়ের সহধর্মিনী। শাবিপ্রবি’র পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরী। তিনি আমাদের সাথে উৎসবে যোগ দেয়ায় আমাদের আনন্দের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে আসে আমাদের সুনামগঞ্জের মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার শুভ্রা কর ও ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তুহিন। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের মোট ৮৭ জনের জনের মধ্যে ঐ দিন আমরা ২২ জন যাত্রা করি। একে একে সবাই আসতে থাকেন। আমাদের এই টিমকে নেতৃত্ব দেন পিএনসি সদস্য সচিব হাফিজ আদনান রিয়াজ, এ টিমেই ছিলেন যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সুহেল।
সন্ধ্যা ৭ টায় ফ্লাই ‘দুবাই এয়ারলাইনস’ এর চেক-ইন শুরু হলে আমরা ভীড় এড়াতে প্রথম দিকেই লাইনে দাঁড়িয়ে যাই বোডিং কার্ড সংগ্রহ ও লাগেজ বেল্টে দেয়ার জন্য। কিন্তু শুরুতেই বাধে বিপত্তি। বিপত্তি বাধবে জানতাম। তা শুরুতেই শুরু হয়ে যাবে, সেটি উপলব্ধি করতে পারিনি। কর্মকর্তারা যখন শুনলেন আমরা ২২ জন রাশিয়া যাচ্ছি, তাদের চোখ কপালে উঠে গেল। আমরা জানালাম ২২ জন নয়, যাচ্ছি ৮৭ জন। প্রতিদিন ১৫/২০ জন করে আমরা ৪/৫ দিনে সবাই সেখানে পৌঁছাব। তারা জানতে চাইলেন, এর আগে আমরা কেউ রাশিয়া গিয়েছি কি-না। দেখা গেল জালাল ভাই ছাড়া আমরা আর কেউ এর আগে রাশিয়া যাইনি। আমরা বিশ্ব যুব উৎসবের ব্যাপারটা তাকে জানালাম। কর্মকর্তারা বিষয়টি কনফার্ম হওয়ার জন্য আমাদের কাছে কিছু সময় চাইলেন। আমরা বিক্ষিপ্তভাবে অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রায় আধঘন্টা পর জানা গেল আমাদের বোডিং কার্ড দেয়া হবে। লাইনে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে কাউন্টারে পৌঁছালাম।
কর্মকর্তা যখন আমার পাসপোর্ট নেড়েচেড়ে বোডিং কার্ড ইস্যু করবেন, তখন সুমন আমার পেছন থেকে তার পাসপোর্টটি টেবিলে রেখে বলল, প্লিজ আমাকে জানালার পাশে সিট দিয়েন। কর্মকর্তা কম্পিউটার থেকে চোখ না ফিরিয়েই বললেন, ঠিক আছে। জানালার পাশে সিটের কথা আমি বলেছি মনে করে তিনি দুই ফ্লাইটের ক্ষেত্রেই আমার সিট জানালার পাশে দিয়ে দিলেন। সুমন তা টের পেলনা। ইতিমধ্যে আমার একটি লাগেজ বেল্টে গেল। দেশ থেকে স্যুভেনির হিসেবে আড়ং থেকে ছোট রিক্সা, পালকি, কুড়েঘরসহ কিছু আইটেম কিনেছিলাম বিদেশী বন্ধুদের উপহার দেয়ার জন্য। সেগুলো একটি হালকা ব্যাগে ভরে বেল্টে দিয়ে দিলাম। কর্মকর্তা বললেন, ‘এটিতে কী আছে? এতো হালকা! এটার উপর শত শত টন মাল পড়বে। টিকবে তো’? আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হাতে আরও তিনটি ব্যাগ। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগতে থাকলাম। দীর্ঘদিন আম্পায়ারিং করে আমার এ অবস্থা হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগি এবং পরবর্তীতে ভুল সিদ্ধান্ত দেই। এবার সিদ্ধান্ত দিতে দিতে ব্যাগটি আমার চোখের সামনে বেল্ট দিয়ে চলে গেল। দিব্য চোখে দেখতে পেলাম আমার রিক্সা, পালকি, কুড়েঘর সব পিষে ভর্তা! আমার হাতে আরও তিনটি ব্যাগ দেখে কর্মকর্তার চোখ ছানাবড়া। বললেন, ‘আপনাকে কোন ভাবেই তিনটি ব্যাগ নিয়ে প্লেনে উঠতে দেয়া হবে না। হাতে শুধু একটি ব্যাগ নেয়া যাবে’। বললাম, ‘ব্যাগগুলো পকেটে নিয়ে উঠতে দিবেন? তিনি আকাশ থেকে পড়লেন’। তার চোখের সামনেই একটি ব্যাগ খুললাম। ভেতর থেকে প্রথমে সুয়েটার বের করে গায়ে দিয়ে দিলাম। এর পর যথাক্রমে গায়ে দিলাম জাম্পার, জ্যাকেট, অভারকোট….। ব্যাগ খালি হয়ে যাওয়ায় তা ভাজ করে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম! পরে খুললাম ২য় ব্যাগ। কর্মকর্তা আপ্লুত হয়ে বললেন, ‘ভাই আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আর ব্যাগ খুলতে হবেনা। আপনি ৩টি ব্যাগ নিয়েই প্লেনে উঠুন। তবে উত্তরমেরুতে আমাদের ফ্লাইট চালু হলে আপনাকে খবর দেব। আপনি কি পড়ে যান তা দেখার আমার বড় শখ’! চিন্তা করলাম পরবর্তী প্রতি ঘাটে একাধিক ব্যাগ জনিত ঝামেলায় পড়ব। এর চেয়ে আরও একটি ব্যাগের কাপড় অন্তত গাত্রস্থ্য করে ফেলি! যেই চিন্তা সেই কাজ করে ইমিগ্রেশনের দিকে রওয়ানা হলাম। কিন্তু দরজাতেই আটকে গেলাম। আটকা পড়ব জানতাম। তাই বলে দরজায়? পেছন থেকে ৩ জন- কথিত আমাকে, আসলে আমাকে মোড়ানো কাপড় চোপড়কে- ঠেলে ভেতরে ঢুকাল। ৪ জন পুলিশ সদস্য স্লো মোশনে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হীনমন্যতায় ভোগতে লাগলেন। তাদের জন্য বড় মায়া হল! তাদের চোখ-মুখের অসহায়ত্বই বলে দিল, আমাকে আটকে রাখার মতো ফোর্স তাদের হাতে নেই। একজন কর্তা পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বললেন, পাসপোর্টের ছবির সাথে তো আপনাকে মিলানো যাচ্ছে না। বললাম, ছবির সাথে আমি মিললে বোডিং কার্ডের সাথে ব্যাগ গুলো মিলবে না!
যা-ই হোক, মূল প্রসঙ্গে আসি। ইমিগ্রেশনেও আমাদের অনেক দেরী হল। তবে আমার টগবগে আত্মবিশ্বাস শীতের কাপড়ের নিচে চাপা পড়ে গেল। প্লেনে উঠার আগে সর্বশেষ চেকিং হলো। জ্যাকেট, ওভারকোট ইত্যাদি গা থেকে খোলে স্কেনিং এর বেল্টে দিতে হয়। সুমন বলল, ‘এতোগুলো পোশাক খোলতে তো তোমার জন্য আমাদের অনেক দেরী হবে। এর চেয়ে এগুলো নিয়েই যদি নিজেই স্কেনিং মেশিনে….।’ হ্যাঁ, পার হলাম, শেষ ঘাটও পার হলাম! কিন্তু চমক অব্যাহত। এতোসব ঝামেলা শেষ করে শেষ পর্যন্ত কি-না উঠতে হলো বাসে! বসার সিট খোঁজে পাবার আগেই বাস থেকে নেমে যাওয়ার সময় হলো আমাদের। ‘ফ্লাই দুবাই’ প্লেন দেখে আমাদের অন্তর-আত্মা ফ্লাই করতে শুরু করল। মৌলভীবাজারের রমাপদ যাদু তো বলেই বসল, ভাই! ‘এতো দেখি হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’!’ আসলেও তাই! কেন্দ্রীয় কমিটিকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম সবচেয়ে কম দামে যে প্লেনের টিকেট পাওয়া যায় তা কেনার জন্য। তাই বলে হবিগঞ্জ……! (চলবে)
- বারকি শ্রমিক সংঘের নেতা সিরাজ মিয়া স্মরণে শোকসভা
- জেলা সরকারি গণগন্থাগারে মহান বিজয় দিবসের নানা আয়োজন


