বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (পূর্ব প্রকাশের পর)
নিউ ইয়র্কে এসেই আঁচ করতে পারলাম আমি এসেছি বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রনে গড়া এক শহরে। টাইম ম্যাগাজিনের ভাষায় যে মহানগরী ভাগ্যান্বেশীদের শেষ আশ্রয়স্থল (ঋরহধষ ফবংঃরহধঃরড়হ ড়ভ ভড়ৎঃঁহব যঁহঃবৎং) । আমি সউদ, জগলূল উঠেছি এলেমানের গাড়ীতে। আর রিন্টুর গাড়ীতে আমাদের বড় ভাই সিলেটের তোফাজ্জল করিম যাকে আমরা আবু ভাই বলে ডাকি। সউদের স্ত্রীর সাথে এর আগে আমার কোন সময় দেখা হয়নি তাই ভাবলাম প্রথম ভাবীকে দেখে যাই। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা সউদের জ্যামাইকার বাসায়। ভাবীর কথা ইতিপূর্বে জার্মানীতে থাকতে সউদের কাছে শুনলেও এই প্রথম দেখা। ভাবীর সাথে ঘন্টাখানেক গল্পগুজব করে রওয়ানা হলাম জগলূলের এলসহাইমের বাসায়। এই বাড়িটা সে কিনেছে বছর খানেক হবে। এলসহাইম এলাকাটি নিউ ইয়র্কের নাভী বলা যায়। পায়ে হেটেই জ্যাকসন হাইটে যাওয়া যায়। বাসাটা খুবই সুন্দর। দ্বিতল বাড়ির উপরতলায় হিস্পানিক এক দম্পতি ভাড়া থাকেন। সেখান থেকে যে ভাড়া পাওয়া যায় তাতে ব্যাংকের লোনের কিস্তি হয়ে যায়। চার ছেলে সবাই বড় হয়ে গেছে। বড় ছেলেটা ভালই চাকুরী করছে। ছেলেরা আমেরিকায় জন্ম, তাই সঞ্চয় করা তাদের ধাতের মাঝে নেই। কাজ করো, টাকা কামাও আর যা পারো খরছ করো। রাতে জগলূলের বড় ভাই ফয়সল ভাইর বাসায় দাওয়াত ছিল। ফয়সল ভাই এক সময় কৃষি ব্যাংকে চাকুরী করতেন। আশির দশকে চাকুরী ফেলে চলে আসেন আমেরিকায়। এলসহাইমেই সুন্দর ডুপেক্সø বাড়ি করেছেন। নীচতলায় ডাইনিং, ড্রইং এবং উপরতলায় তারা থাকেন। জগলূলের সাথে রাত কাটাতে গিয়ে সেই চল্লিশ বছর আগের সুনামগঞ্জ নিয়ে কথাবার্তা বলে আমরা নষ্টালজিয়ায় চলে গেছি। জগলুলই ফোন করল আমাদের স্কুল জীবনের বন্ধু ডা: সুব্রত রায়কে। সুব্রতের ডাক নাম তরুন। আমেরিকার ফ্লোরিডা ষ্টেটে থাকে। পেশায় একজন সাইকিয়াস্ট্রিস্ট। আমেরিকার মানুষ সোনার হরিণ খুজতে খুজতে এক সময় মানসিক ভারসাম্যতার শিকার হন। ছুটে যায় কাউন্সিলিং এর জন্য সাইকিয়াস্ট্রিস্টের কাছে। সাইকিয়াস্ট্রিটদের কাজ হল মন দিয়ে রুগীর কথা শুনা আর মোটা অংকের টাকা নেওয়া। তাতেই নাকি রুগীদের রোগ সেরে যায়। তরুনের সাথে দীর্ঘক্ষন আলাপ হল। সবারই একই অবস্থা। সেই ছোটকালের সুনামগঞ্জ কেমন আছে। পরদিন আমাদের যেতে হবে জ্যাকসন হাইটসে। আমাদের রুপু (ইসতিয়াক রুপু আহমেদ) আর অসিত চৌধুরী (অ্যাডভোকেট দ্বিগবিজয় চৌধুরীর শিবুর ভাই)নিউ ইয়র্কে থাকা সুনামগঞ্জবাসীদের দাওয়াত দিয়েছে। রুপু টেলিফোনে জানিয়েছে জ্যাকসন হাইটসের ‘ইত্যাদি রেষ্টোরেন্টের’ উপরতলায় জমায়েতটা হবে। ইত্যাদি রেষ্টোরেন্ট নামটা শুনেই আমার আকর্ষন বেড়ে গেছে। আমেরিকা এসে সুন্দর বাংলায় নামকরন তাও আবার ইত্যাদি। রুপু জানিয়েছে এই রেষ্টোরেন্টের মালিক জব্বার। তিনি দোয়ারাবাজার উপজেলার হাজারিগাও গ্রামের লোক। জব্বার সাহেব নাকি আমাকে চেনেন। রেষ্টোরেন্টটি আপনজনের থাকায় বেশী সময় আড্ডা দিলেও কেউ কিছু বলবেনা। রবিবারে জগলূলের ছুটি। সে একটা রেষ্টোরেন্টে চাকুরী করে। ছেলেরা বড় হয়ে যাওয়ায় ভাবীও কাজ করেন। সুনামগঞ্জের শহীদ (আরপিননগরের শফিকুল চৌধুরীর ছোট বোনের স্বামী) তার গাড়ী নিয়ে আমাদের জ্যাকসন হাইটস নিতে আসলেও গাড়ীতে আমরা বেশী দূর যেতে পারিনি। নিউ ইয়র্কে ট্রাফিক জ্যাম আর পার্কিং পাওয়ার অসুবিধার জন্য গাড়ীর চাইতে সবাই পাতাল রেলে যেতে পছন্দ করেন। আমরা শহীদের গাড়ী ছেড়ে হেটে হেটেই জ্যাকসন হাইটসে রওয়ানা হলাম। জ্যাকসন হাইটসকে আমার কাছে লন্ডনের ব্রিক লেইনের মত মনে হয়েছে। এই দুই জায়গাতে হাটলে পরিচিত লোকজন পাওয়া যায়। বাংলাদেশীদের আনাগোনা এখানে বেশী। দোকান, হোটেল রেষ্টোরেন্টে বাংলা সাইনবোর্ড ঝুলছে, বাংলা গান বাজছে। রেস্টোরেন্টে লতা, সুটকি, মাছ, ভাত সবই পাওয়া যায়।
আমি জ্যাকসন হাইটসে এসে দোকানের সাইনবোর্ডগুলো পড়ছি। কি সুন্দর নাম হাটবাজার, ইত্যাদি, খামারবাড়ি, প্রিমিয়াম রেষ্টোরেন্ট, কাবাব কিং, মন্নান সুইটস, আব্দুল্লাহ সুইটস, কবির বেকারী, খাবার বাড়ি রেষ্টোরেন্ট । পড়ছি আর মনে হয়েছে আমি কি ঢাকার কোন এক পথে হাটছি। জ্যাকসন হাইটসের মোড়ে আমি আর জগলূল দাড়িয়ে আছি হঠাৎ দেখলাম আমার দিকে একটা বাংলাদেশী মেয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি অনেকক্ষন তাকিয়ে একদম পাশে এসে বলল খসরু ভাই কবে আমেরিকা আসলেন। আমি অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখি আরে এযে আমাদের টুকু। সেই ছোট্ট টুকু এখন অনেক বড়। স্বামীর সাথে জ্যাকসন হাইটসে এসেছে বাজার করতে। বাংলাদেশের সুটকি, লতা আর ইলিশ মাছ বাজার করেছে। মাসে একবার হলেও নিউ ইয়র্কে থাকা বাংলাদেশীরা এই জ্যাকসন হাইটসে আসেন। নিদেন পক্ষে একটা বাংলা খবরের কাগজ না হয় বাংগালী খাবারের বাজার করার উত্তম জায়গা হচ্ছে নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস। লন্ডনের আল্ড গেইট, ব্রিক লেইন, হোয়াইট চ্যাপেলে এভাবে হেটে আমি পরিচিতজন পেয়েছি। ঠিক একই ভাবে আজ জ্যাকসন হাইটসে পরিচিত মুখ পেলাম।
সাইনবোর্ডগুলো দেখতে দেখতে এক সময় পেয়ে গেলাম ইত্যাদি রেষ্টোরেন্ট। ভেতরে ঢুকেই দেখি বাংলাদেশীদের সমাহার। যারা কাজ করছেন তারাও প্রায় সবাই বাংলাদেশী। কয়েকজন বাংলাদেশী মহিলাকে কাজ করতে দেখলাম। এরি মাঝে আমাদের হোষ্ট রুপু , অসিত এসে হাজির। রেষ্টোরেন্টটির উপরতলায় ছোটখাটো হল রুমে আমাদের জমায়েত হবে। রুপু আমাকে জব্বার ভাইর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ভদ্রলোক খুবই অমায়িক। আমেরিকার জ্যাকসন হাইটসের মত জায়গায় রেষ্টোরেন্টের মালিক হয়েছেন এটা কম কথা নয়। ভদ্রলোক খুবই বিনীত হয়ে বললেন এখানেই আমি প্রথম কিচেনের কাজে যোগ দেই। একসময় কিচেনের শেফ হয়ে যাই। সে সময়কার মালিক কাজে সন্তষ্ট হওয়ায় আমাকে পার্টনার করে নেন। রুপু বলছিল সততা, পরিশ্রম আর অধ্যবশায় থাকলে আমেরিকাতে যে কেউ তার ভাগ্য গড়তে পারে। জব্বার ভাই তার প্রমান। জব্বার ভাই একজন স্বল্প শিক্ষিত মানুষ। বাংলাদেশে স্কুলের গন্ডিই পেরুতে পারেননি কিন্তু পরিশ্রম, অধ্যবশায় তাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। জব্বার ভাই আমাদের উপরতলায় হলরুমে নিয়ে গেলেন। সুন্দর ছিমছাম হলরুম। একজন মহিলা বাংলাদেশী ওয়েটার দেওয়া হয়েছে। আমাদের জন্য চা দিতে ইশারা করায় ভদ্রমহিলা ট্রেতে করে চা নিয়ে এসেছেন। এরি মাঝে সুনামগঞ্জের আপনজনরা আসতে শুরু করেছেন। এদের সবাই আমার বয়সে ছোট। অনেকেই কাজ ফেলে এই জমায়েতে যোগ দিয়েছেন। একে একে আসলেন মাহমুদুল, মিসেস মাহমুদুল, মাসুদুল, শহীদ, রিন্টু, সাগর রায়, রোমেনা, ডাবলু, সউদ সহ অনেকেই। আমরা ফিরে গেলাম সুনামগঞ্জ শহরের স্মৃতি রোমন্থন করতে। রুপু তার স্মৃতির ভান্ডার থেকে নুতন নুতন গল্প বলছে আর সবাই সেটা উপভোগ করছে। রুপু আসর মাতিয়ে রাখতে পারে। এমন আড্ডায় মনে হয়েছে এখানে এক খন্ড সুনামগঞ্জ দুলছে। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটালেও কেউ উঠতে চাইছেনা। এদিকে আমাদের জব্বার ভাই একের পর এক বিভিন্ন ধরনের খাবারের ডিস পাঠাচ্ছেন। শাক, সবজি, মাছ, ভর্তা, মোরগের মাংশের সমাহার থাকলেও ভর্তাগুলো ছিল দারুন। আমেরিকার জ্যাকসন হাইটসে এসে বাংলাদেশী খাবার খাব এটা ভাবতেই পারিনি। রাতে আমার দাওয়াত আছে এলেমানের বাসায়। এলেমান আমাদের এডভোকেট জহুর আলী সাহেবের মেয়ে চাঁদনির স্বামী। এয়ারপোর্ট থেকে তার গাড়ীতে করেই এসেছিলাম। গাড়ীতেই আমাকে বলেছিল রবিবারে রাতে তার এখানে খাওয়া দাওয়া করতে হবে। আমাদের বন্ধু শাহী এবং মনোয়ারা ভাবী লং আইল্যান্ড থেকে আসবেন। তাই সবাইর কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলেও যেন শেষ হয়না। এদিকে ভাতিজা সাগর রায়, রুপু, অসিত, মাহমুদুল সবাই একটা একটা করে উপহারের প্যাকেট সাথে নিয়ে এসেছে। তারা আমার অনেক ছোট। কিছুটা লজ্জাই লাগছিল তাদের কাছ থেকে উপহার নিতে কিন্তু এটাই প্রবাসিদের ভালবাসা, আন্তরিকতার নিদর্শন। দেশের মানুষ পেলে তারা যেভাবে আপন ভুবনে নিয়ে যান সেটার প্রতিদান কি আমরা দিতে পারি। চাঁদনির বাসায় আরো বিরাট জমায়েত। লং আইল্যান্ড থেকে শাহী, মনোয়ারা ভাবী এবং শাহীর শালা মনিরের স্ত্রী এসেছেন। শাহীদের কাছেই শুনলাম আমাদের ছোট বোন জেসমিন আরা (জেলা ও দায়রা জজ) এসেছে মহিলা জজদের একটা কনফারেন্সে। তাদের কনফারেন্স ছিল ওয়াশিংটনে। কনফারেন্স শেষ করে এখন সে সুনামগঞ্জবাসীদের আতিথেয়তা নিচ্ছে। আজকে তাকে নিয়ে যাবে লং আইল্যান্ডে শাহীর বাসায় । মারুফ চৌধুরী তাকে ওয়াশিংটন থেকে নিয়ে এসেছে। এখানেই দেখা হয়ে গেল চাঁদনির ছোট বোন ন্যান্সির সাথে। সেও এখন আমেরিকাতে আছে। চাঁদনি নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তার বোন, ভাই সবাইকে আমেরিকায় নিয়ে এসেছে। আমাদের অ্যাডভোকেট জহুর আলী আর ভাবীও আমেরিকার গ্রিন কার্ড হোল্ডার। আমেরিকার অভিবাসি আইনের এটাই সুবিধা। একজন নাগরিক হয়ে গেলে তার ভাই, বোন, মা, বাবা সবাইকে নিয়ে আসতে পারে। এরিমধ্যে এই আইনের সুযোগে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম চৌধুরী, জনাব জহুর আলী, জনাব আব্দুল গফফার, বাবু মানিক লাল দে, বাবু মৃনাল কান্তি চৌধুরী, জনাব এ,বি,এম জাফরান কুসুম, জনাব হোসেন আহমেদ আমেরিকাতে থাকার অনুমতি পেয়েছেন তাছাড়া আরো অনেকেই অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান দলের সিনেট অভিবাসি আইনে কোন পরিবর্তন না ঘটায়। (চলবে)


