বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আগামীকাল ৬ জুন থেকে শুরু হবে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস। বাংলাদেশে সেটা শুরু হবে ৭ জুন থেকে। জগলূলের বাসায়ই প্রথম রোজার সেহরি খেলাম। সেহরির সময় ভাবী ঢাউস মার্কা একটা থাই কই মাছ প্লেটে দিয়েছেন যেটার অর্ধেকও আমি খেতে পারিনি। আগামীকাল চলে যাব লং আইল্যান্ডে শাহীর বাসায়। শাহী তার গাড়ীতে করে জেসমিনকে নিয়ে এসেছে তাকে আনুলের বাসায় দিয়ে তার পরে আমাকে নিতে আসবে। এই অসুস্থতা নিয়েও গাড়ী চালিয়েছে। নিউ ইয়র্কের রাস্তা ঘাট তার নখদর্পনে। বহু বছর এই শহরেই ট্যাক্সি চালিয়েছে। এর পরে বাড়ি কেনা বেচার ব্যবসা করার কারণে কোন এলাকায় বাড়ির দাম কত সেটা সে পটাপট বলতে পারে। বিকালেই এল শাহী এলসহাইমের জগলূলের বাসায়। সে টাইম টিভির তাহের সাহেবের সাথে এপয়নমেন্ট করেছে। টাইম টি,ভি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমার একটা সাক্ষাতকার নিবে। সবই শাহী ঠিক করেছে। টাইম টি,ভি অফিসেই আমাদের ইফতার করার কথা। তাহের সাহেব সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কের জ্যাম, ট্রাফিক সিগন্যাল থাকায় এস্টোরিয়া আসতেই ইফতারের সময় চলে আসে। এস্টোরিয়াতে থাকে মোস্তফা। শাহী তাকে ফোন করে বলল আমরা আসছি ইফতার করব। গাড়ীকে কোনভাবে পাকিং এরিয়াতে রেখে মোস্তফার বাসায় আসতেই ইফতারের সময় হয়ে গেল। আমেরিকাতে আমার প্রথম রোজার ইফতার মোস্তফার বাসায়। সেখানেই দেখা হয়ে গেল জেসমিনের সাথে। সেও এখানে ইফতার করছে আজ। মোস্তফার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল মরহুম এডভোকেট সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে। সিরাজের খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল মোস্তফা। নব্বইয়ের দশকে চলে আসে আমেরিকা। তারপরে আমেরিকা থাকার সংগ্রাম। এখন সে ভালভাবেই দাড়িয়ে গেছে। মোস্তফাও কল্পনা করতে পারেনি আমার সাথে দেখা হয়ে যাবে। প্রায় ত্রিশ বছর পর দেখা। আল্লাহ রিজেকের মালিক। আমরা মোস্তফার বাসায় ইফতার করার কোনো কথাই ছিলনা। টাইম টি,ভিতে না গিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম লং আইল্যান্ডের দিকে। প্রায় দেড় ঘন্টা ড্রাইভ করে আমরা চলে আসলাম লং আইল্যান্ডের ডিয়ার পার্ক এলাকায়। শাহীর বাসায় যারা আছেন তারা সবাই আমার পূর্ব পরিচিত। মনোয়ারা ভাবীকে চিনি সেই ছোটকাল থেকে। উনার আম্মা মানে শাহীর শাশুড়ির সাথেও আমার খুব ভাল জানাশুনা। উনি আমাকে দেশে থাকতেই খুব আদর করতেন তাই সেখানে আমি নিজের বাসার মতই উঠলাম। আমার জন্য শাহীর আলিশান বাড়ির একটা রুম বরাদ্দ করা আছে। নিউ ইয়র্ক আর লং আইল্যান্ড এর বাড়িগুলোর তফাৎ অনেক। নিউ ইয়র্কে রুমগুলো ছোট ছোট। অনেকটা এপার্টমেন্ট টাইপের। এখানকার বাড়িগুলো আমাদের বাড়ির মত। সামনে পিছনে প্রচুর জায়গা। সবাই বাগান করেছেন। সামারে অনেকেই ফুলের বাগান, সবজির বাগান করেছেন। নীচের তলায় আপাতত শাহীর ভায়রা জাবেদ আর তার শালা মনিরের পরিবার থাকে। পাশাপাশি বাড়ি খুজছে তাদের জন্য। নীচের তলায় একটা বাথরুমের কাজ হচ্ছে। একজন প্লাম্বারকে কাজ দেওয়া হয়েছে । সে মেক্সিকান নাগরিক। আমেরিকাতে প্রায় দশ বছর থাকলেও এখনও বৈধতা পায়নি।
রমজান মাসের প্রথম জুম্মার নামাজ আদায় করলাম লং আইল্যান্ড এর ডিয়ার পার্ক এলাকায়। এখানকার মুসলিম সম্প্রদায় একটা মসজিদ করার জন্য জায়গা ক্রয় করেছেন কিন্তু এখনও মসজিদ নির্মান করা শুরু হয়নি। আমরা যেখানে জুম্মার নামাজ আদায় করলাম সেটা একটি চার্চ। খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরা প্রতি রোববারে চার্চের উপরতলায় প্রার্থণা করেন। নীচতলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন শুক্রবারে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। জানতে পারলাম চার্চের পাদরি নিজেই পৌর কর্ত্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে মুসলিমদের জুম্মার নামাজ আদায় করার অনুমতি নিয়েছেন। দুই সম্প্রদায়ের মিলনমেলা দেখে অনেক ভাল লাগল। সব জায়গাতেই যদি এই সহবস্থান থাকত তাহলে পৃথিবীটা অস্থির হতনা। আমি এব্যপারে ফেইস বুকে একটা স্ট্যটাস দিয়েছিলাম। এই স্ট্যটাসে রুপু জানিয়েছিল ম্যরিল্যান্ডে থাকতে সে হাসপাতালে কাজ করত। সেখানেও চার্চেই তারা একজন ভারতীয় মুসলিম ডাক্তারের ইমামতিতে জুম্মার নামাজ আদায় করত। সুলেখক, ছড়াকার রব্বানী চৌধুরী জানিয়েছেন ইংল্যান্ডে এরকম চার্চে তারা নামাজ ও মিলাদ শরীফ পড়েন। বাংলাদেশ থেকে শামস শামীম লিখেছেন এরকম অবস্থা যদি আমাদের এখানে হত তাহলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থাকতনা। আমরা এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের ঘরকে অচ্চুত মনে করি। আমরা এখনও না ধার্মিক না মানুষ। আমেরিকা থেকে আনোয়ার চৌধুরী আনুল লিখেছেন চার্চটাই উপাশনার জায়গা, সেটা কোন ধর্মের সেটা বড় কথা নয় এবং সেটা আমেরিকাতেই সম্ভব।
লং আইল্যান্ডে থাকাবস্থায় শাহীদের বন্ধুবান্ধব অনেকের সাথেই পরিচয় হল। তারা সবাই মিলে বাড়ি কেনা বেচার ব্যবসা করেন। একটা অফিস আছে তাদের। আসলে এই শেষ বেলায় সময় কাটানোর জন্য এরকম একটা কাজ তারা রেখেছেন। এই অফিসেই তারা এক সাথে আড্ডা দেন, গল্পগুজব করেন। শাহী বলল তোমাকে কাজলের চায়ের দোকানে নিয়ে যাব। আমরা যখন ছাত্র তখন কাজলের দোকানটা আমাদের খুব পরিচিত ছিল। ষোলঘর কাজির পয়েন্টে কাজল নন্দীর চা’এর দোকানে ছাত্র রাজনিতীর আখড়া ছিল। এক কাপ চা খেয়ে সারাদিন রাজা উজির মারা হত। শাহী সহ আমরা এখানে বসতাম। অনেকে সকালে বাসায় চা পান না করে কাজলের দোকানেই এসে চা নাস্তা করত। লং আইল্যান্ডে এ রকম একটা রেষ্টোরেন্টে গিয়ে বসেন সবাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থা, রাজনিতী এগুলো নিয়েই আলোচনা করেন। এই আসরেই আমেরিকায় বাংলাদেশীদের ভিসার শ্রেনী বিন্যাস নিয়ে শুনছিলাম। ওপি-১, ডিভি, রাজনৈতিক আশ্রয়, পড়তে আসার পর লিগ্যাল হওয়া তাছাড়া শাড়ী ভিসা ইত্যাদি। শাড়ী ভিসা নিয়েই আমার কৌতুহল ছিল বেশী। এত ভিসার নাম জানলেও শাড়ী ভিসা কি সেটা জানতামনা। বৈঠকের মধ্যমনি গাউস ভাই বললেন এদেশে অনেকেই ঘরের বধুর মাধ্যমে এসেছেন । পরে এরা আবার তাদের ভাই বোন এদেরকে নিয়ে এসেছেন। এই ভিসাগুলোকেই শাড়ী ভিসা বলা হয়। এতক্ষনে বিষয়টি আমি ধরতে পেরেছি। এখন যারা ইমিগ্রেন্ট হচ্ছেন তাদের অনেকেই এই ভিসার আওতায় পরেন। এটা শুধু আমেরিকাতে আছে। ইংল্যান্ড, কানাডা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোন দেশেই এই রকম ভিসা নাই।
রোজার সময় তাই সবাইর কাছ থেকে ইফতারের দাওয়াত পাচ্ছি। সব ইফতারে গেলে আমাকে আমেরিকাতে থাকার মেয়াদ আরো বাড়াতে হবে। আমাদের সাবেক সাংসদ আব্দুজ জহুর সাহেবের মেয়ে স্বপ্নার ফোন। ইফতার করতে হবে। স্বাধীনতার পরে আব্দুজ জহুর সাহেব আমার প্রতিবেশী ছিলেন। একটা ছোটখাটো বাসায় ভাড়া থাকতেন। ১৯৭০ থেকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও সুনামগঞ্জ শহরে তার কোন বাসা বাড়ির জায়গা ছিলনা। একজন সহজ , সরল সাধারন মানুষের মত জীবন যাপন করতেন । বাড়ি থেকে খাবারের ধান আসত সেটা নিজেই ঘরের সামনে শুকাতেন, নিজেই নাড়াচাড়া করতেন । এরি মাঝে গ্রাম থেকে মানুষজন আসলে তাদের অভাব অভিযোগ শুনতেন। মেয়ে স্বপ্না তখন ছোট। কামিজ পরা স্বপ্নাকে ডেকে বলতেন মানুষদের চা নাস্তা দেওয়ার জন্য। সেই স্বপ্না এখন আমেরিকার নাগরিক। তার স্বামী আমাদের আনোয়ার চৌধুরী আনুল। এক সময়ের ছাত্র লীগের তুখোর নেতা। প্রায় ৪০ বছর পরে দেখা স্বপ্নার সাথে। তাদের ছেলে মেয়ে দুজনেই এখন বড় হয়ে গেছে। পরের দিন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক এর সাবেক সভাপতি বিয়ানিবাজারের কামাল সাহেবের বাসায় ইফতারের দাওয়াত। কামাল সাহেবের সাথে আমার কোনো পরিচয় নেই। শাহীর বন্ধু। উনার পরিবারের প্রায় ২০০ জন মানুষকে তিনি আমেরিকায় এনেছেন। তাদের আত্মীয় স্বজন মিলিয়ে প্রায় হাজার খানেক লোক এখন আমেরিকায়। বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার আবার নির্বাচন করবেন। (চলবে)


