বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের প্রথম সারির করোনাযোদ্ধা তাঁরা। করোনাকালের শুরু থেকেই মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন এঁরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের প্রতি অসংখ্য সুনামগঞ্জবাসী সহমর্মিতা-সমব্যথী হয়েছেন। নানা কমেন্টস (উক্তি) লিখে তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন মানবিক মানুষেরা। জেলার এই করোনাযোদ্ধারা হলেন- ডা. সাঈদুর রহমান, ডা. কেএম শাহীন রেজা, ডা. কান্তা নারায়ণ চক্রবর্তী, ডা. মাকসুদা আক্তার রিমি, ডা. মানস তালুকদার, ডা. সুমাইয়া আফরিন শান্তা, ডা. আবুল বাশার মো. ওসমান হায়দার মজুমদার, ডা. আলামিন ও ডা. ইমরান সৈকত। এই ৯ জনের ৫ জন সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফিরেছেন। অন্য ৪ জনও সুস্থ অনুভব করছেন, উপসর্গ মুক্ত আছেন তাঁরা। করোনায় আক্রান্ত সহকর্মীদের সুস্থ হবার খবরে জেলার স্বাস্থ্য কর্মীদের সাহস বেড়েছে। মনোবল চাঙা হয়েছে।
ডা. ওসমান হায়দার ও ডা. শান্তা স্বামী- স্ত্রী। এই দুই চিকিৎসকের একজন ডা. শান্তা বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং তার স্বামী ডা. ওসমান হায়দার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। করোনাকালের শুরু’র দিকেই এই দুজনের নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ আসে।
নমুনা পরীক্ষার পর ২৪ এপ্রিল ডা. ওসমান হায়দারকে জানানো হয় তিনি করোনায় আক্রান্ত এবং ২৮ এপ্রিল জানানো হয় ডা. শান্তা আক্রান্ত।
ডা. ওসমান হায়দারের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। তাঁর বাবার নাম আব্দুল ওয়াহাব মজুমদার ও মা মাহবুবা আক্তার। ৩১ তম বিসিএস উত্তীর্ণের এই মেডিকেল অফিসার বিনয়ী ও কর্মট হিসাবেই সহকর্মীদের কাছে পরিচিত। আক্রান্ত হবার পর জ¦র, সর্দি ও কাশি ছিল এই চিকিৎসকের। আগে থেকেই অ্যাজমা থাকায় করোনা আক্রান্ত হলে চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি। স্ত্রী’র কর্মস্থল বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোয়ার্টারেই আইসোলেশনে ছিলেন তিনি। ১৪ দিন পর দ্বিতীয় পরীক্ষায় নেগেটিভ আসে অর্থাৎ করোনামুক্ত হন তিনি।
ডা. ওসমান হায়দার বললেন, আগে থেকেই অ্যাজমা থাকায় করোনায় আক্রান্ত হবার পর আমি কিছুটা চিন্তায় ছিলাম। পরে ২৮ এপ্রিল আমার স্ত্রী ডা. শান্তা আক্রান্ত হবার পর আরেকটু মন খারাপ হয়। তবে সাহস হারাইনি আমরা। আমি অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রুপের ওষুধ খেয়েছি। অ্যাজমা থাকায় ইনহেলারও নিতে হয়েছে। প্রোটিন খেয়েছি, যেমন মাছ, মাংস ও ডিম খাওয়ার চেষ্টা করেছি প্রতিদিনই। ভিটামিন সি ও ডি সমৃদ্ধ খাবার, গরম পানির বাপও নিয়েছি। আনন্দের মধ্যে থেকেছি, এজন্য দ্বিতীয় পরীক্ষায়ই আমার নেগেটিভ আসে। পহেলা জুন থেকেই আবার কাজে যোগদান করেছি।
তিনি জানান, তার স্ত্রী ডা. শান্তা’র গ্রামের বাড়িও একই এলাকায় অর্থাৎ কুমিল্লার লাকসামে। ডা. শান্তার বাবার নাম শামছুজ্জামান সেলিম ও মা তাহেরাজ্জামান। ৩৯ তম বিসিএস চাকুরি হয়েছে শান্তার। তিনি বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন। আক্রান্তকালে সামান্য উপসর্গ ছিল তাঁর। দুজনেই বিশ^ম্ভরপুর সরকারি কোয়ার্টারে আইসোলেশনে ছিলেন। ১৪ দিন পরের পরীক্ষায় ডা. শান্তারও নেগেটিভ আসে। কাজে যোগ দিয়েছেন তিনিও।
ডা. ওসমান হায়দার বলেন, করোনার ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হঠার কোন সুযোগ নেই। আমি আগেও করেনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে কাজ করেছি, এখনো করবো।
ডা. কান্তা নারায়ণ চক্রবর্তী সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আরেক জনপ্রিয় চিকিৎসক। করোনাকালে ২৫০শ’ শয্যার এই হাসপাতালে একমাত্র মহিলা চিকিৎসক তিনি। তাঁর স্বামী ডা. অতনু ভট্টাচার্যও জনপ্রিয় চিকিৎসক। ডা. কান্তা ৩৩ তম বিসিএস’র মেডিকেল অফিসার। কুমিল্লার বুড়ি’র চঙ উপজেলার রাজাপুরের বাসিন্দা নারায়ণ চক্রবর্তী ও রতœা চক্রবর্তীর মেয়ে ডা. কান্তা চক্রবর্তী সদালাপি-বিনয়ী চিকিৎসক। করোনাকালে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আউটডোরে ঝুঁকি নিয়েই দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। কর্মনিষ্ঠ এই চিকিৎসক ১৩ জুন করোনা আক্রান্ত হন। দুইদিন পর তাঁর সাড়ে ছয় বছরের শিশু পুত্রেরও নমুনা পরীক্ষার ফলও করোনা পজিটিভ হয়।
ডা. কান্তা জানিয়েছেন, তিনি এবং ছেলে দুজনেই উপসর্গহীন। দ্রুতই সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফেরার প্রত্যাশা করেন এই চিকিৎসক।
চাকুরী জীবনের শুরুতেই মানবিক লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছেন জেলার জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মাকসুদা আক্তার রিমি। ৩৯ তম বিসিএস উত্তীর্ণ এই চিকিৎসকের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার জেলার নাগরায়। বাবা মমতাজ উদ্দিন ফকির মা সাজেদা খানম। সরকারি চাকুরিতে নতুন এই ডাক্তার কাজে আন্তরিক বলেই জানান সহকর্মীরা। গত ২৭ মে নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয় তাঁর শরীরে।
ডা. রিমি জানালেন,, গলা ব্যথা, সর্দি ও জ¦র ছিল তাঁর। তিনি বলেন, আমি একেবারেই ঘাবরাইনি, খুব সিরিয়াসলি নেইনি অসুখকে। অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রুপের ওষুধ খেয়েছি, গরম পানির বাপ নিয়েছি। নরমালি যা খাওয়া হয়, তাই খেয়েছি, তাতেই সেরেছে। হাসপাতালে নিজের কোয়র্টারে একা থেকেছি। ১৪ দিন পরের পরীক্ষায় নেগেটিভ আসে আমার।
সরকারি চাকুরিতে নতুন আরেক চিকিৎসক সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ডা. আলামিন শাওন। সুনামগঞ্জ সদরে করোনা আক্রান্তদের বড় অংশের নমুনা সংগ্রহের কাজ করেছেন এই মানবিক চিকিৎসক। শহরের পুলিশ লাইন্স ও র্যাব ক্যাম্প’এর র্যাব সদস্যদের নমুনা সংগ্রহের কাজ করেছেন তিনি। গত পহেলা মে তাঁর শরীরে করোনা শনাক্ত হয়।
তবে শরীরে কোন উপসর্গ ছিল না। ১৬ মে পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে ছিলেন তিনি। পর পর ২ বারের নমুনা পরীক্ষায় ১৬ মে করোনা নেগেটিভ আসে তাঁর। পহেলা জুন তিনি কাজে যোগদান করেন। জরুরি বিভাগে ৩ ও ৫ তারিখে দায়িত্ব পালন করেন। ৮ তারিখ সকাল থেকে তিনি আবার অসুস্থ্য অনুভব করেন। গলা ব্যথা, বুক ব্যাথাসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয় তাঁর। ওই দিনই আবার নমুনা পরীক্ষায় দেন। ৯ তারিখ রাতে জানানো হয়, তিনি আবারও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর হাসপাতালের সামনে নিজের ভাড়া বাসায়ই একা কাটিয়েছেন তিনি। অ্যান্টিবায়োটিক ও নাপা খেয়েছেন, মেডিটেশন করেছেন। গরম পানির বাপ নিয়েছেন। প্রোটিন জাতীয় খাবার ও ফল খেয়েছেন প্রচুর।
নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার আব্দুল বাতেন ও আয়েশা বেগমের সন্তান দেশপ্রেমিক এই চিকিৎসক শুক্রবার বিকালে জানিয়েছেন তিনি সুস্থ অনুভব করছেন। শুক্রবার আবার নমুনা পরীক্ষায় দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে উপসর্গহীন।
সুনামগঞ্জ শহরের পশ্চিম নতুনপাড়া’র বাসিন্দা শিক্ষাবিভাগে দীর্ঘদিন চাকুরি করে বর্তমানে অবসরে থাকা মনোরঞ্জন তালুকদার ও শিক্ষিকা রতœা তালুকদারের ছেলে ডা. মানস তালুকদার মুকুট। ৩৯ তম বিসিএস’এ উত্তীর্ণ এই তরুণ চিকিৎসক করোনা কালের শুরু থেকেই ছাতকে সক্রিয়ভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগে ও আউটডোরে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৪ জুন তাঁর শরীরে করেনা শনাক্ত হয়।
ডা. মানস জানালেন, তিনি সিলেটের পাঠানটুলায় ভাড়া বাড়িতে আইসোলেশনে রয়েছেন। তাঁর শরীরে করোনার কোন উপসর্গ নেই।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেন্টাল চিকিৎসক ইমরান সৈকত করোনাকালে কেবল দাতের চিকিৎসা নয়, করোনা ইউনিটেও কাজ করেছেন।
বৃহস্পতিবার করোনা শনাক্ত হয়েছে এই চিকিৎসকের শরীরে। প্রথমদিন গলায় ব্যাথা ও সামান্য কাঁশি ছিল তাঁর। তিনি অ্যাজিথ্রোমাইসিন, নাপা ও ভিটামিন খাচ্ছেন। প্রোটিন জাতীয় খাবার ও ফল খাওয়ার চেষ্টা করছেন, শাল্লা হাসপাতালের আইসোলেশনেই আছেন।
৩৯ তম বিসিএস’এ চাকুরি হওয়া এই সহকারী ডেন্টাল সার্জন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার এতবারপুর গ্রামের মো. ইদ্রিছ মিয়া সরকার ও কুহিনুর আক্তারের ছেলে।
এছাড়া, ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেষজ চিকিৎসক ডা. কেম এম শাহীন রেজার শরীরে গত ২৮ মে করোনা শনাক্ত হয়েছিল। ভেষজ চিকিৎসায় তিনি করোনামুক্ত হয়েছেন। ১৩ জুন দ্বিতীয় দফার নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। এখন তিনি সুস্থ।
এই সময়কালের সম্মুখসারির এই যোদ্ধারা জানালেন, নতুন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিজেরা যুক্ত হতে পেরে তারা গর্বিত। কাজ করার সময় মাঝে মাঝে নিজের স্বজন ও পরিবারের অন্যদের কথা মনে হলে খারাপ লাগে। কিন্তু একজন করোনা রোগী যখন তাঁদের সামান্য প্রচেষ্টায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে, তখনকার আনন্দে অন্য সবকিছু ছোট হয়ে যায়।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শামস উদ্দিন বললেন, ডাক্তারসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মী আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। এই পর্যন্ত ৯ ডাক্তার, ৯ জন সেবিকা, ৫ জন হেলথ অ্যাসিটেন্ট, ৪ জন টিএলসিএ এবং ৪ জন সিএইচসিপি করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কেউ দ্রুত সেরে ওঠেছেন। অন্যদের শারিরিক অবস্থাও ভালো, তাঁদের দ্রুত সেরে ওঠায় অন্যদের মনোবল চাঙা হচ্ছে।


