মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে

আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন
জীবন দু’ দিনের। ফলে মৃত্যু যখনই আসুক এজন্য মন খারাপ না করে কাজ যেন আমরা না ছাড়ি। কারণ কাজই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে। আসুন মনে এ আশা নিয়ে বুক বেঁধে সবাই মঙ্গলের প্রত্যাশায় কাজ করতে থাকি।
করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মিছিল ক্রমশঃ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এ অবস্থা আজ সারা পৃথিবী জুড়ে। এ ভাবেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনা মহামারী সর্বত্র। এ ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্তের হার থেমে নেই। সমান তালে তাও বেড়েই চলেছে। ফলে পরিস্থিতি ক্রমশঃ জটিল আকার ধারণ করেছে।
পরিচিত অনেকজন ইতিমধ্যে এ মিছিলে সামিল হয়ে চলে গেছেন এ পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে। দেশ ও বিদেশের বহু নামী দামী মানুষও রয়েছেন এ তালিকায়। রাত পোহালেই শুনতে হচ্ছে নতুন নতুন মৃত্যুর খবর। এ কারণে সবার মন খারাপ হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এ মহামারির কারণে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। ফলে কেউ আগের মত স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারছেন না। সবাইকে ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। এভাবে এক অসহনীয় জীবন যাপন করে চলেছি আমরা। এ অবস্থা কারোরই কাম্য নয়। এটাকে স্বাভাবিক ভেবে মেনে নেয়ারও কোন কারণ নেই। ফলে কবে সেই আগের মত স্বাভাবিক জীবনে আমরা ফিরতে পারবো, চলছে তারই প্রতীক্ষা।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজকে পাশ কাটিয়ে এভাবে আর কতদিন চলা যায়। এ থেকে উত্তরণের জন্য মানুষ হাঁসফাঁস করছে। কবে কীভাবে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে আমাদের জীবনে। এ কথাই আজ সবার মন মগজে ভাবিত হচ্ছে নিরন্তর। এজন্যই আমরা মাস্ক পরে, হাত ধুয়ে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখছি। এটা অবশ্য এ মহামারী রোধে আমাদের প্রধান বর্ম হিসাবে কাজ করবে।
মানুষ বাঁচতে চায়। বাঁচার আগ্রহ মুমূর্ষু রোগীরও। আবিষ্কৃত হয়েছে করোনার টিকা। বের হয়েছে বড়িও। তাই তো টিকা কেন্দ্রে বিস্তর ভিড়। আশায় বুধ বেঁধে মানুষ এ সময় অতিক্রম করতে চায়। পৃথিবী ছেড়ে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। এ কথা সবার জানা। তারপরও এখানে থাকার কত চেষ্টাইনা করে মানুষ।
মৃত্যু বড়ই নির্মম এক ধ্রুব সত্য। এর শীতল পরশ সবাইকে অনুভব করতে হবে। কেউ বাদ যাবে না। কাউকে মৃত্যু ক্ষমা করে না। করবেও না। আমি যখন কলেজে পড়ি তখন আমাদের বাংলার একজন অধ্যাপক আমাদেরকে ক্লাসে মৃত্যু সম্পর্কে উপস্থিত নিজ নিজ চিন্তা লিখে ফেলতে বলেছিলেন।
তখন কৈশোর পেরিয়ে মাত্র যৌবনে পা দিয়েছি। ফলে জীবন সম্পর্কে বুঝিই বা কতটুকু। মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করার সময় সেটা নয়। ফলে চিন্তা ও চেতনায় এ সম্পর্কে আমি ছিলাম সম্পূর্ণ আনকোড়া। এ পরিস্থিতিতে আমি লিখেছিলামÑ মৃত্যু সম্পর্কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন দ্বিধান্বিত আমরা এর বাইরে আর কীই বা ভাবতে পারি।
কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জায়গায় বলেছেন “মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে”। আবার অন্যত্র বলেছেন ‘মরনরে তুঁহুঁ মম শ্যামও সমান”।
মৃত্যু নিয়ে তখনকার আমার এ কাঁচা ভাবনা, আর এখন এ পরিণত বয়সের ভাবনা এক নয়। এক হতে পারে না। এটা সময় ও পরিস্থিতি অনুসারে পরিবর্তিত হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমি এখন আর আগের বয়স আর অবস্থানে নেই।
মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন মনীষীদের ভাবনা আমরা পড়েছি। তন্মধ্যে সক্রেটিসের কথাবার্তা ছিল ভিন্ন মাত্রার, ভিন্ন মেজাজের। তাকে যখন বলা হলো, তোমাকে মৃত্যুদ- দেয়া হবে, তার উত্তর ছিলÑ মৃত্যুর পর তাহলে তো আমি আমার আগে যারা মারা গেছেন তাদের সাথে মিলিত হতে পারবো। তাদের সাথে আমার কথা হবে। তখন তো কেউ আমাকে বাঁধা দিতে পারবে না। তাহলে মৃত্যুতে আমার অসুবিধাটা কোথায়। এতে তো আমার ভালোই হলো। আর কেউ যদি মৃত্যু মানে খারাপ কিছু হয় বলে দাবী করে তাহলে এরা মিথ্যাবাদী। কারণ যারা এটি বলে তারা নিশ্চয় এর আগে বারবার মরেছে। না হলে তাদের এ অভিজ্ঞতা হলো কীভাবে। এরপরও যখন তাকে মৃত্যুদ- শোনানো হলো তখন তিনি বলেছিলেন, আমি মরতে চলেছি। তোমরা বেঁচে রইলে। ঈশ^রই ভালো জানেন আমরা কারা সঠিক পথে চললাম। এর মর্মার্থ হলো মৃত্যু মানে ক্ষতি। আর বেঁচে থাকা লাভ তা কিন্তু নয়।
তুলশী দাশ নামক জনৈক হিন্দী কবি বলেছিলেন, তুমি জন্মের সময় কেঁদেছিলে আর বাকী সবাই হেসেছিলো। তুমি পৃথিবীতে এমন কাজ করো যাতে তোমার মৃত্যুর সময় সবাই কাঁদবে। কেবল তুমিই হাসবে।
জীবন দু’ দিনের। ফলে মৃত্যু যখনই আসুক এজন্য মন খারাপ না করে কাজ যেন আমরা না ছাড়ি। কারণ কাজই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে। আসুন মনে এ আশা নিয়ে বুক বেঁধে সবাই মঙ্গলের প্রত্যাশায় কাজ করতে থাকি। পরম করুণাময় সবার মঙ্গল করুন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মৃত্যু পূর্ব নির্ধারিত। সময় আসার এক মুহূর্ত আগে বা পরে কেউ মরবে না। অতএব প্রাণ ভরে বাঁচুন। অহেতুক মৃত্যুকে ভয় করবেন না।
লেখক: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও গবেষক।