‘মরো আর বাঁচো, কিস্তি দিতায় অইবায়’

বিশেষ প্রতিনিধি
‘আমার স্বামীয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করইন, বন্যার আগে যার কাম করছিলা, তার কাম শেষ অইবার আগেই (নির্মাণাধীন) ঢলে আইয়া ঘর ভাঙ্গিলিছে, মাজনে ( ঘরের মালিক) কইন কের (কিষের) টেকা (টাকা), ঘর ভাইঙ্গা গেল গি। অখন লেবার আইয়া টেকা চায়, টেকা কই থাকি দিতা, নিজেরার ঘরদুয়ার ভাইস্সা গেছেগি, থাকি বাপের (বাবার) বাড়ী, বন্যার আগেঔ ঘর বানাইবার লাগি গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, ব্র্যাক থাকি ঋণ আনছিলাম, অখন কাম-কাজ নাই, ঘরের ধান-পানও নষ্ট। ঋণ কইরা আইন্না খায়রাম, খাওয়া-দাওয়া আর কিস্তির লাগি ১৬ হাজার টেকা হাওলাতি ঋণ, আর এনজিও’র কিস্তির লাগি ২০ হাজার টেকা সুদে আনছি। অখন সুদ দিতাম কিলা, আর কিস্তিঔ দিতাম কিলা। হাটতে গেলে পাওঔ চলের না।’
‘আমার আব্বা কাম কাজ কইরা খাইন, এনজিও থাকি ঋণ আনছিলা, পরে অসুখও পড়ি গেছইন, আম্মায় যোগালোর (মিস্ত্রিও সহযোগী) কাম কইরা-কইরা কিস্তি দিছইন, শনিবারে আব্বা মারা গেছইন, তারারে (এনজিও আশা) গাঁওয়ের মাইনসে ফোনে জানাইছইন, আজকে (সোমবার) কিস্তির স্যারে আইয়া ফোন দিছইন, বই লইয়া গেলাম, তাইন কইন ৫ কিস্তির টেকা বকেয়া, টেকা তো দেওয়া লাগবো, আমি পরে সঞ্চয়ের টেকা থাকি কিস্তির টেকা কাটাইয়া দিয়া হিসাব শেষ কইরা আইছি।’
মর্মস্পর্শি এসব কথা জানালেন, গ্রামের মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী হামিদা বেগম ও মৃত আব্দুল ওয়াহাবের মেয়ে মনিরা বেগম। মনিরা বেগম বললেন, ‘মরো আর বাঁচো, কিস্তি দিতায় অইবায়’।
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী নূর জাহান বেগম জানালেন, তার কোন এনজিওর ঋণ নাই, তিনি এসেছিলেন এনজিওর ঋণ কর্মকর্তাকে (ওমর ফারুককে) জিজ্ঞেস করতে, তারা এতো পাষাণ কেন। একটা মানুষ মারা গেছে। তার মৃত্যু সংবাদটি জানানো হয়েছে। তাদের (মৃতের) ঘরে খাবার নেই। থাকার ঘরটাও একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এরপরও আজ তারা ওই পরিবারকে ডেকে কিস্তির তাগাদা না দিয়ে, কয়েকদিন সময় দিলে কি হতো।
সুনামগঞ্জ শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরের কোরবাননগর ইউনিয়নের হাছনবাহার গ্রামে গিয়ে সোমবার সকাল ১০ টায় এমন মর্মস্পর্শি কাহিনী শোনা গেছে। গ্রামের ২৫০ পরিবারের ২০০ পরিবারই এনজিও’র ঋণের জালে বন্দি। কিছু কিছু পরিবার তিন-চারটি এনজিও থেকে ঋণ তুলেছে। গত ১৬ জুনের ভয়াবহ বন্যায় এসব পরিবারের সবকিছু ভেসে যাবার পর। এরা এখন নিঃস্ব। বেশির ভাগের খাবারেরই সংস্থান নেই। কিন্তু কিস্তির মাপ নেই। কিস্তি পরিশোধের জন্য হামিদা বেগম, নূর নেহার বেগমসহ অনেকেরই যেতে হচ্ছে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা এনজিও’র কিস্তি পরিশোধের জন্য সুদে টাকা নিয়ে বিপদে পড়ছেন


গ্রামের মোসাদ্দেক আলী ও হেপি বেগম বললেন, কিস্তি নেবার জন্য সকল এনজিও’র লোকজনই এসে বসে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংক ও টিএমএসএস’র ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তার সাথে কিস্তি দেওয়া নিয়ে কথা কাটাকাটির কথাও জানালেন এরা। বললেন, আমরা তাদের বলেছি, খেতেই পারছি না, ঋণ দেব কিভাবে। তারা জানিয়েছে, ‘খাও আর না খাও, ঋণের টেকা আগে দেওয়া লাগবো।’
সোমবার সকালে এ প্রতিবেদক হাছনবাহার গ্রামের বন্দেবাড়ী এলাকায় পৌঁছে বিষণœ মন নিয়ে কমপক্ষে ২০ জন নারীকে কিস্তির টাকা ও বই হাতে নিয়ে আশার ঋণ কর্মকর্তা ওমর ফারুককে ঘিরে দাঁড়াতে দেখা গেছে। সংবাদ কর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়েই ওমর ফারুক ওঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আজকে ঋণ দিতে হবে না, যারা আমাদের দেওয়া সহায়তার এক হাজার টাকা পান নি। তারা ছাড়া অন্যরা চলে যান। অথচ. এর আগেই এই ঋণ কর্মকর্তা ওমর ফারুক হাজেরা বেগম, রাবিয়া বেগম, বাহার বেগম, সাহানারা বেগম, রাহেলা বেগম ও মাসুদা বেগমসহ অনেকের কিস্তির টাকা নিয়ে বইয়ে হিসাব লিখে দিয়েছেন।
আশার ঋণ কর্মকর্তা ওমর ফারুক বললেন, আমরা কিস্তি আদায় করছি না। ঘর মেরামতের জন্য কেউ কেউ ঋণ চেয়েছেন। তাদের দুয়েকটা কিস্তি বকেয়া আছে, সেগুলো আদায় করে নতুন ঋণ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আমাদের ঋণ গ্রহিতাদের এক হাজার টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো বিতরণের জন্য এসেছি আমরা।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, সুনামগঞ্জের ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ আদায় স্থগিত রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ঋণ আদায় আপাতত স্থগিত রাখার জন্য সার্কুলার প্রদান করা হয়েছে। রোববার জেলা কৃষিঋণ কমিটির সভায় এই বিষয়ে কথা ওঠেছিল। সকল ব্যাংকের প্রতিনিধিরা ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধির সামনেই তারা সকলে বলেছেন, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী কাজ করবেন। এনজিও কর্মকর্তাদের সকলেই বলেছেন, তারা ঋণ আদায় করছেন না, কিন্তু আমার কাছেও অভিযোগ এসেছে, দুয়েকটি এনজিও ঋণ আদায় অব্যাহত রেখেছে। পরে এনজিওগুলোর ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তারা বলেছে, স্বেচ্ছায় কেউ ঋণ দিতে চাইলে নেওয়া হচ্ছে, কাউকে কিস্তির জন্য চাপাচাপি করা হচ্ছে না। এরপরও এই বিষয়ে কোন অভিযোগ জানা গেলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবার জন্য পত্র প্রেরণ করা হবে।
গত ১৬ জুনের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জের সিংহভাগ এলাকা দিয়ে আট থেকে ১০ ফুট উচ্চতায় পানি বয়ে যায়। একতলা বা একছালা বাড়ীঘর ডুবে যায়। ফসলী জমি, ঘরের গোলার ধানসহ সবকিছুই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বিপূল সংখ্যক গবাধিপশুর প্রাণহানি ঘটে। খামারের মাছ, পোলট্রি খামারিসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হন। লক্ষাধিক ঘরবাড়ি ভেসে ও ভেঙে যায়। দুইতলা বাড়ী, সরকারী দুইতলা অফিস আদালত, হাসপাতালে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচান লাখো মানুষ। এক মাসেরও বেশি সময় পরও এখনো মানুষের কাজ নেই, বেশিরভাগ ভেসে যাওয়া ঘর মেরামত করা যায় নি। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো আপাতত মেরামত করে কোনভাবে কিছু এলাকায় যান চলাচল স্বাভাভিক রাখা হয়েছে।