মহাকবি সঞ্জয়কে নিয়মিত স্মরণ করার জোর দাবি উঠেছে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই কে এই সঞ্জয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মহাকবি সঞ্জয় মহাকাব্য মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদক। অবশ্য তাঁর রচিত বাংলা মহাভারত এখন বাজারে দুর্লভ কিন্তু তাঁর অনুদিত বাংলা মহাভারতের নিদর্শন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। এই মহাকবি সঞ্জয় ছিলেন সুনামগঞ্জের অধিবাসী। তাহিরপুর উপজেলার লাউড় এলাকা ছিল তাঁর জন্মস্থান। সঞ্জয় লাউড় নামেও এই মহাকবি পরিচিত। গবেষকদের দাবি, পঞ্চদশ শতকে অর্থাৎ প্রায় ৫ শ’ বছর আগে তিনি মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। মূল সংস্কৃত ভাষা থেকে ভারতীয় প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে সঞ্জয়ের বাংলা অনুবাদটিই প্রথম বলে পণ্ডিতগণের অভিমত। সঞ্জয়বিষয়ক এই গবেষণালব্ধ তথ্য বাংলা সাহিত্য চর্চা তথা মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য চর্চার সুবর্ণ সময়ে সুনামগঞ্জের অবস্থান যে অতি উজ্জ্বল ছিল তার প্রমাণ বহন করে। তবে সঞ্জয়সংক্রান্ত এই গবেষণাকর্ম ভারতে সম্পাদিত হওয়ায় আমাদের দেশে এই বিষয়ক আলোচনা এখনও সীমিত। আমাদের দেশে কেউ সঞ্জয় বা মহাভারতের বাংলা অনুবাদ নিয়ে গবেষণা করছেন, এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে বাংলাদেশে বিশেষ করে সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ইদানিং সঞ্জয়বিষয়ক অনুসন্ধিৎসা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এর প্রমাণ মিলল, জেলা শহরে চলমান লোক উৎসবে। উৎসবের আলোচনাপর্বে সঞ্জয়চর্চার দাবি উঠে এসেছে প্রায় জোরালোভাবেই। এই দাবি এতোটাই যুক্তিসঙ্গত যে, এর সাথে দ্বিমত করার কোন অবকাশ নেই।
যেকোন অঞ্চলের ঐতিহ্য তার প্রাচীন ইতিহাসের উপর নির্ভর করে। এজন্য সর্বত্র প্রতœতত্ব কিংবা ঐতিহাসিক নিদর্শন-তথ্যাদি সযতেœ রক্ষা ও এনিয়ে নিত্যনতুন গবেষণা, অনুসন্ধান ও চর্চার পরিচয় মিলে বিশ্বের সকল সভ্য জাতির মধ্যে। আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের নানা অজানা কথা এখনও উঠে আসছে দীপ্যমান হয়ে। জেলা সুনামগঞ্জের হাওর বিধৌত সংস্কৃতির যে উত্তরাধিকারের গর্বে আমরা গৌরবান্বিত, প্রতিনিয়ত সেই গৌরবের পাখায় যুক্ত হচ্ছে এক একটি উজ্জ্বল পালক। আমাদের সংস্কৃতি বিশ্ব বাঙালি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। আজ বাঙালি সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হিসাবে আমাদের রাধারমণ-হাছন-করিম-দুর্ব্বীণ শাহ সহ অসংখ্য লোককবি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছেন। এই ধারাবাহিকতার ঐতিহ্যের আরও গভীরে আরও মূলে যাওয়ার একটি সুরঙের সন্ধান যখন আজ পাওয়া গেছে তখন ওই পথ ধরে তো আমাদের এগিয়ে যেতই হবে। মহাকবি সঞ্জয়কে উপযুক্ত মর্যাদায় অভিষিক্ত করা একইসাথে সঞ্জয়চর্চার সকল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো তাই অতি জরুরি দায়িত্ব আমাদের সকলের।
সিলেট অঞ্চল প্রাচীন কালে যে কয়টি রাজ্যে বিভক্ত ছিল তার অন্যতম লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল তাহিরপুরের হলহলিয়ায়। এখনও ওখানে রয়েছে প্রাচীন নিদর্শন। হলহলিয়া লাউড় এলাকার নিকটবর্তী। বর্তমান লাউড়েরগড়কে ঘিরে ভারত সীমান্তবর্তী যে বাংলাদেশি ভূখণ্ড বিস্তৃত রয়েছে সেখানে শ্রীচৈতন্যের অন্যতম পারিষদ অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মস্থান। মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের অনেক অমরকীর্তি এই এলাকায় এবং এলাকার মানুষের হাতে রচিত হয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে সেইসব ঐতিহাসিক নিদর্শন এখন জলের তলে কিংবা মাটি-বালিচাপা হয়ে আছে। তাই প্রতœতাত্বিক দিক বিবেচনায় এই অঞ্চলের সবিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আজ সময় এসেছে নিজেদের এই মহামূল্যবান ঐতিহ্যিক উৎস সন্ধানের।
আমরা দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ রাখছি, মহাকবি সঞ্জয়কে জাতীয়ভাবে স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করার। সঞ্জয়কে কেন্দ্র করে লাইড় অঞ্চলের অজনা ইতিহাসকে সকলের সামনে উন্মোচন করার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা বিদগ্ধ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

