এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি, এই দিন তার পূর্ণতার স্মারক। ১৯৭১ সালে আজকের দিনেই তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান পেশাদার বাহিনী বাংলাদেশের দামাল তরুণদের কাছে হার মেনেছিল। বর্বরতার বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল শান্তির বিহঙ্গ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ছাড়াও দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে পূর্ব দিগন্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে রক্তিম সূর্য উদিত হয়েছিল, তা ছিল সেদিনের বিশ্বের বিস্ময়। সুমহান বিজয়ের এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, শরণার্থীসহ মুক্তিকামী সব মানুষকে। যাদের আত্মত্যাগ ও স্বজন হারানোর বেদনার মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি, আমরা তাদের ভুলতে পারি না। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহানায়ক আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও সংগঠকদের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেসব ভারতীয় সেনা এই মাটিতে জীবন দিয়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন, তাদের প্রতিও আমাদের বিন¤্র শ্রদ্ধা। যাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তেই আমরা এই দিনে আরেকবার শপথ নিতে চাই যে, বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করেই থাকবে। স্বীকার করতে হবে, পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ অধ্যায়ের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার বিপরীত মুখে হাঁটা দিয়েছিল। গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক সাম্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য আমাদের যৌথ স্বপ্ন ছিঁড়ে গিয়েছিল মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অবিমৃশ্যকারিতায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পথে। সামরিক, আধা সামরিক, ছদ্ম সামরিক শাসনের বদলে এখন দেশে প্রতিষ্ঠা হয়েছে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা। স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বৈষম্যহীনতার যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তাও আজ হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দৃশ্যমান অর্জনও করেছে। একদা বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ ছাড়া মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন অকল্পনীয় ছিল। এখন আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতুর মতো মেগা প্রকল্পও প্রমত্ত পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতার জয়গান গাইছে। বিশ্বব্যাংক তাদের আগের এক গবেষণায় বলেছে, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। বিচারহীনতার এক নিকষ আঁধার আমাদের ঘিরে ধরেছিল। জাতির পিতা হত্যারই বিচার হবে না- খোদ সংবিধানে এমন ধারা সংযোজিত হয়েছিল। এ দেশের স্বাধীনতার যারা বিরোধিতা করেছে, বিদেশি প্রভুর আজ্ঞায় দেশীয় মা-বোন-ভাইয়ের ওপর যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; তাদেরও বিচারের দাবি গুমরে গুমরে কেঁদে ফিরেছে। আমরা দেখছি, ইতোমধ্যে নেতৃস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। অন্যরাও প্রায় পাঁচ দশক পরে হলেও কৃতকর্মের শাস্তির দিন গুনছে। এবার বিজয় দিবসের আগে প্রকাশ হয়েছে রাজাকারদের প্রাথমিক তালিকা। আমরা আশা করি, এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রতিষ্ঠা হবে যে, দেশ ও দেশের মানুষের বিরোধিতা করে যত দিনই চলে যাক, কেউ পার পাবে না। কেবল দেশের অভ্যন্তরে নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ এখন আগের তুলনায় শক্তিশালী। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা প্রতিবেশী দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলাম; আর এখন বাংলাদেশই হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়, খাদ্য ও বরাভয়ের জোগানদাতা। মনে রাখতে হবে- এটা বাংলাদেশের মানবিকতা, দুর্বলতা নয়। আমরা নিশ্চয়ই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। কিন্তু একই সঙ্গে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রতিও আমাদের অঙ্গীকার কোনো অংশে কম নয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি; কিন্তু তাদের নিজ দেশেই যত দ্রুত সম্ভব ফেরত যেতে হবে। আমাদের অপর প্রতিবেশী দেশেও যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার ছায়াপাত যেন আমাদের এখানে না ঘটে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় আমরা এগিয়ে রয়েছি সত্য; কিন্তু অপর দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট আমাদের কাঁধে নিতে পারি না। আমরা শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে হলেও প্রয়োজনে কতটা লড়াকু হয়ে উঠতে জানি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়েই তা প্রমাণ করেছি।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সবাইকে রক্তিম শুভেচ্ছা জানাই।
- শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালেব উদ্দিন, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কন্ঠে ‘জয় বাংলা’ যাঁর
- বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে মানববন্ধন

