মাছের বংশ হচ্ছে সমূলে ধ্বংস

বিশেষ প্রতিনিধি ও ইয়াকুব শাহ্রিয়ার
বিল শুকিয়ে মাছ ধরার মহোৎসব শুরু হয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে। তাতে বোরো’র কৃষকরা পড়ছেন মহা সংকটে। সমূলে মাছের বংশ হচ্ছে ধ্বংস। বেপরোয়া কিছু মৎস্যজীবী ও ইজারাদাকে ঠেকানোরও যেন কেউ নেই।
জেলার শান্তিগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বিশাল দক্ষিণের হাওর এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কালিপুর ও মল্লিকপুরের মাঝামাঝি হাওর (পুকুর ডুবি বড় নালা চান্দি) শুকিয়ে মাছ ধরার বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। এসব এলাকার বোরো কৃষকরা হা-হুতাশ করেই সময় পার করছেন।
সোম ও মঙ্গলবার এই দুটি হাওরে সরেজমিনে গেলে কৃষকরা বিলাপ করে বলছিলেন, ‘জমিনো (জমিতে) একফোঁটা পানি নাই (নেই)। আগন (অগ্রহায়ণ) মাসে চৈত (চৈত্র) মাসের অবস্থা। জমিন (জমি) পাইট্টা (ফেটে) হাকরি (চৌচির) দিছে।’ কৃষকরা জানালেন, বাঁধ কেটে মৎস্য নিধন করতে গিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে হাওরের হাজারো কৃষকদের এমন সর্বনাশ হয়েছে।
ভাঙা ছেড়ে দেওয়ায় কারণে আগাম পানি শুকিয়ে যাওয়ায় শান্তিগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বিশাল দক্ষিণের হাওরের প্রায় ১৫শ’ একর জমি শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে।
কৃষকরা জানালেন, এই জমি চাষাবাদ করতে হলে খরচ হবে দ্বিগুণেরও বেশি। জমির মালিকদের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিতে (রং-জমায়) জমি এনে ইতোমধ্যে একর প্রতি পাঁচ-ছয় হাজার টাকা খরচ করেছেন কৃষকরা। এখন জমিতে পানি নেই। এই অবস্থায় দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে হাজারো কৃষকের।
হাওরপাড়ের শত্রুমর্দন গ্রামের বর্গাচাষী ষাটোর্ধ্ব হিরা দেব নাথ চোখ মুছতে মুছতে বলছিলেন, ‘ইবার (এবার) আনা খাইয়া (না খেয়ে) মরা লাগবো। জমিনে পানি নাই, কিলা চাষাবাদ করমু’।
একই গ্রামের অপর কৃষক রনজিত পাল বললেন, নিজের আছে মাত্র দেড় কেয়ার (৪৫ শতক) জমি। প্রত্যেক বছর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে সাত আট একর জমি বর্গা চাষ করেন। মাস খানেক আগে দুটি ব্যাংক থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ তুলেছেন। এই টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচও করে ফেলছেন। হাওরের পানি নেমে যাওয়ায় তার সকল জমি ফেটে চৌচির।
এ গল্প শুধু কৃষক হিরা দেবনাথ ও রঞ্জিত পালের নয়। পশ্চিম পাগলার নান্টু সূত্রধর, দরগাপাশা ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের মাহমদ আলী, পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের সলফ গ্রামের কৃষক উকিল আলীসহ হাজারো কৃষকের এবার মাথায় আকাশ লেগে গেছে।
কৃষকরা বললেন, পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের প্রভাবশালী আইয়ুব উদ্দিন বুদ্ধি, আফিজুর রহমান, নূরুল ইসলাম ওরফে ছুলুক মিয়া মিলে প্রতি বছরই পিঁপড়াকান্দি সড়কের পাশের খাল নিলামে ডাক দেন। সব সময়ই তারা অগ্রিম পানি সেচে মৎস্য আরোহণের চেষ্টা করেছেন। সাধারণ কৃষকদের বাধার মুখে অন্যবছর তারা তা করতে পারেন নি। এবছর এলাকার আবদুস সামাদ কাচা মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে হাওরের সব পানি ছেড়ে দিয়েছে তারা। এ কারণে তিন ইউনিয়নের হাজারো কৃষকের ১৫শ’ একর জমি শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। পানি না থাকায় এ বছর অনাবাদি থাকবে এসব জমি। যেখানে প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হতো।
অভিযুক্তদের উপযুক্ত শাস্তি, তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ীভাবে পিঁপড়াকান্দি সড়কের পাশের খাল ও আশপাশের ডুবা নিলাম বন্ধের দাবি করেন কৃষকরা।
এ ব্যাপার পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
অভিযুক্ত আইয়ুব উদ্দিন বুদ্ধি, আফিজুর রহমান বলেন, আমাদের উপর আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এমনিতেই এবছর বিভিন্ন হাওরে পানি কম। তাছাড়া দক্ষিণের হাওরে আগুন খাড়ার দাঁড়াসহ আরো চারটি ভাঙা আছে, যে খাল আমরা নিলামে ডাক দিয়েছি তা দিয়ে পিঁপড়াকান্দি সড়কের কালভার্ট ও হাওরের বাঁধ সব সময় সংস্কার করি। আমরা বাঁধ দিয়ে কোনো পানি ছেড়ে দেই নি। রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে আমাদের উপর এমন অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইজারাদারদের কাছ থেকে সাব লিজ গ্রহিতা আবদুস সামাদ ওরফে কাচা মিয়া বললেন, প্রতি বছরই হাওরে নির্দিষ্ট পরিমাণে পানি রাখা হয়। এবছরও রেখেছি। মূলত হাওরে আরো তিন-চারটি বাঁধ আছে, সেদিকে পানি নেমে গেছে। আমাদের উপর আনা অভিযোগ সত্য নয়।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামান বললেন, এই বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি হাওর, বাঁধ, খালসহ সব জমি পরিদর্শন করে আমাকে জানাবেন। তদন্ত মোতাবেক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, সুনামগঞ্জ শহরতলির কালিপুর ও মল্লিকপুরের মাঝামাঝি হাওরে (পুকুর ডুবি বড় নালা চান্দি) পানির অভাবে জমিতে ধরেছে ফাটল। এতে চাষাবাদে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে কৃষকদের।
হাওরপাড়ের কৃষক মো. আব্দুল হান্নান জানালেন, এই হাওরের জমিতে আবাদ করে সারা বছরের খাবার সংগ্রহ করেন তিনি। এবার বিলের ইজারাদার বেশি মাছ ধরার জন্য হাওরের পানি নিষ্কাষণের নালা কেটে দিয়েছে। এতে হাওর শুকিয়ে জমি ফেটে গেছে। এই অবস্থায় তার সম্পূর্ণ জমি অনাবাদি থাকার আশংকা রয়েছে।
শুধু মো. আব্দুল হান্নান নয়, এই হাওরে আবাদকৃত সকল কৃষকদেরই একই অবস্থা। বোরো জমিতে অসময়ে পানি নেমে জমি শুকিয়ে ফেটে গেছে। ‘পুকুর ডুবি বড় নালা চান্দি’ হাওরের মাঝেই ছোট একটি বিলের ইজারা দিয়েছে প্রশাসন। ‘পুকুর ডুবি মৎস্য সমবায় সমিতি নামে’ একটি সংগঠনকে এই বিলের ইজারা দেয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আহমদ নুর বললেন, এই বিলের চারপাশে প্রায় তিনশ একর ফসলি জমি রয়েছে। প্রতিবছরই বিলের পানি নিষ্কাষণ নিয়ে বিলের ইজারাদারের সঙ্গে আলাপ হয় আমাদের। আমরা বারবার নিষেধ করার পরেও তারা আমাদের কথা শুনেন না। আরও মামলা মোকদ্দমার হুমকি দেয়।
পুকুর ডুবি মৎস্য সমবায় সমিতির সহসভাপতি মো. ওসমান গনি বললেন, বিল শুকিয়ে কখনও মাছ ধরি না। সব সময় জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। আর পানি নিষ্কাষণের খাল আমরা কেটে দেই নি। এখানে কেউ বাঁধ দেয় নি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নয়ন মিয়া বললেন, দেখার হাওরের একাংশ (কালিপুর ও মল্লিকপুরের মাঝের জমি) প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়। এবছরও বীজ তলা তৈরি হচ্ছে। কিছু অসাধু লোক পানি শুকিয়ে মাছ ধরছে। আমরা কৃষক ও স্থানীয় কমিশনারের সঙ্গে আলাপ করেছি। মৎস্য অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। পানি যাতে শুকিয়ে না যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছি।
কেবল এই দুটি হাওর নয় জেলাজুড়েই বিল শুকিয়ে মাছ ধরা শুরু হয়েছে।
বিশ^ম্ভরপুরের শক্তিয়ারখলার কৃষক সালেহ আহমদ বললেন, উপজেলার ৮০ ভাগ জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরা হয়। তাতে কৃষকরা যেমন বিপদে পড়েন, মাছের বংশও সমূলে হয় ধ্বংস। ইজারাদাররা বিল শুকিয়ে কাঁদা মাটিতে লবণ, ইউরিয়া সার বা কীটনাশক ছিটিয়ে মাটির নীচের বাইম চিকরা, টাকি মাছসহ নানা জাতের ছোট মাছও আহরণ করে। তাতে মাছের ডিমসহ সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়।
শাল্লার বড় কৃষক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুস ছাত্তার বললেন, বিল শুকিয়ে মাছ ধরায় প্রাকৃতিক আধার নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবছরই বেশির ভাগ বিল শুকিয়ে মাছ ধরা হয়। বিল শুকানোর মৌসুম কেবল শুরু হয়েছে। আর কিছুদিন পরই বিল শুকানো শুরু হবে। জলাশয়ে পানি থাকলে মাছ ধরার পর মাছের ডিমেও মাছ হয়। এখন সেই সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। পানি না থাকলে পাখি বসারও সুযোগ থাকে না বিলে। এই অবস্থা কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে বন্ধ করতে হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনিল মন্ডল বললেন, বিল শুকিয়ে অহরহ মাছ ধরা হচ্ছে। অথচ নীতিমালায় আছে কোনভাবেই পানি শুকিয়ে মাছ ধরা যাবে না। অনেকেই সেটি মানছেন না। লোকবলের অভাবে বিশাল এই হাওর এলাকায় সেটি মৎস্য বিভাগের পক্ষে রোধও করা যাচ্ছে না। এজন্য বিশেষ মনিটরিং কমিটি করা জরুরি মন্তব্য করে তিনি বললেন, বিল শুকানো বন্ধ করা না গেলে দীর্ঘ মেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে হাওর এলাকায়।