মাছ চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল

আসাদ মনি
সুনামগঞ্জ জেলাকে মাদার অফ ফিশারি বলা যায়। প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে হাওর। ছোট বড় অসংখ্য বিলের সমাহার হাওরগুলোতে। সে সব হাওরে সরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে সুনামগঞ্জ সহ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে মাছ রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এছাড়াও তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
বছরের ৬ মাস মানুষ চাষাবাদের সাথে যুক্ত থাকলেও বর্ষার ৬ মাস থাকতে হয় বেকার। শুষ্ক মৌসুমের উৎপাদিত ফসল দিয়েই চলে বর্ষার ৬ মাস। কিন্তু ধানের দাম না থাকার ফলে সেটি আর হয়ে উঠছে না। খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে ক্রমাগত স্থায়ী সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে। বৈশাখে ‘ফসল ঘরে উঠলে আপদ আর না উঠলে বিপদ’ এই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে হাওর পাড়ের কৃষকদের। ফসল পেলে দাম না থাকার জন্য আপদ হয়ে দাঁড়ায় সেটি। ঋণের চাপে কম দামেই বিক্রি করতে হয় তখন। প্রাকৃতিকভাবে ডুবে গেলে মহাজনী ঋণের কারণে বিপদ হয়ে দাঁড়ায়, ফলে ভিটে মাটি ছাড়তে হয়। সুনামগঞ্জে এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। হাওরের সম্পদকে সংরক্ষণ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
হাওর পাড়ের মানুষ বলছেন, ইজারা প্রথা উচ্ছেদ করে এখানে মাছ চাষাবাদ করা যেতে পারে। এজন্য একটি মাস্টার প্ল্যানের প্রয়োজন। হাওর পাড়ের জেলেদের নিয়ে সমবায় সমিতি করে মাছের চাষাবাদ করা যেতে পারে। বিলগুলো গভীর করে ফাল্গুন- চৈত্র বা বর্ষার শুরুতে মাছের পোনা ছেড়ে দিতে হবে। ভরা বর্ষায় পুরো হাওরজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে মাছ। এতে করে হাওরে উৎপাদিত মাছ সুনামগঞ্জ সহ সারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। গড়ে উঠতে পারে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ফ্যাক্টরি। সে ফ্যাক্টরিতে কাজ করবে জেলার বেকার জনগোষ্ঠী। এতে সুনামগঞ্জের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
জেলা মৎস্য অফিসের সূত্রে জানা যায়, জেলায় ছোট বড় মিলিয়ে হাওরের সংখ্যা ৮২ টি। যার আয়তন ৬০ হাজার ১৫৩.৫৭ হেক্টর। খালের সংখ্যা ১৩৩ টি। যার আয়তন ৬৮৩. ১৩ হেক্টর। ৮২ টি হাওরে বিল রয়েছে ৯৭৬ টি। যার মোট আয়তন ২১ হাজার ৬১৫.৬১ হেক্টর। এসব হাওরে গেল বছর মাছ উৎপাদন হয়েছে ৯১ হাজার ৩৬.৯৪ মে. টন। পুরো জেলায় মাছের চাহিদা ছিলো ৫৬ হাজার ৩৭২ মে. টন মাছ।
সরকারি হিসাব অনুয়ায়ী জেলার মোট চাহিদা থেকে বেশি পরিমাণে মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে প্রতি বছর। গেলো বছর ৩৪ হাজার ৬৬৪. ৯৪ মে. টন মাছ উদ্বৃত্ত ছিলো। বিপুল পরিমাণে মাছ হাওরের উদ্বৃত্ত হলেও বাজার দখল করে থাকে পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাস মাছে। যা নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জ থেকে আমদানি করা হয়।
জানা যায়, ইজারাদাররা বর্ষা মৌসুমে পুরো হাওর শাসন করেন। কোনো জেলেকে হাওরের পাড়ে মাছ ধরতে দেয়া হয় না। এসময় জমির মালিক জমির উপর মাছ ধরতে পারেন না। বর্ষাকালের শেষের দিকে পানি কমতে শুরু হলে মাছ গুলোও হাওরের তলদেশে নামতে শুরু করে। এক সময় হাওরে সমস্ত পানি শুকিয়ে যায়। শুধু বিলগুলোতে পানি থেকে যায়। তখন ইজারাদাররা বিলগুলো শুকিয়ে বিলের তলদেশ থেকে মাছ শিকার করে বাইরে পাঠিয়ে দেন। এতে সমস্ত টাকা অল্প কিছু মানুষের কাছে জমা হয়ে যায়। অল্প কিছু ইজারাদার লাভবান হলেও হাওর পাড়ের বেশির ভাগ মানুষকে লোকসানে পড়তে হয়। সারা বছর তাদের মাছ কিনে খেতে হয়। আমিষের অভাবে বিভিন্ন রোগে ভোগতে হয় তাদের।
অ্যাড. এনাম আহমেদ বলেন, যখন হাওরে ইজারা প্রথা ছিলো না তখন বর্ষাকালে হাওরগুলোতে মাছে কিলবিল করেছে। মানুষের মাছের কোনো অভাব ছিলো না। কারণ শুষ্ক মৌসুমে হাওরে পানি না থাকার কারণে সব মাছ বিলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেলো। সেখানে মাছের বংশ বিস্তার করেছে। আবার বর্ষায় হাওরে পানি এলে বিল থেকে পুরো হাওরে ছড়িয়ে পড়েছে সে মাছ। এতে ইচ্ছে করলেই মাছ ধরা যেতো। সে মাছ তাদের আমিষের ঘাটতি মিটিয়েছে।
গৌরারং ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের রহমত আলী বলেন, আমাদের করছার হাওরে প্রায় ৫ টি বিল আছে। হাওরগুলো ইজারা না দিয়ে যদি মাছ চাষ করা যায় তাহলে জেলায় মাছের অভাব থাকবে না। বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে আমাদের বেকার ছেলে মেয়েদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্মের যুগ্ম আহবায়ক শরিফুজ্জামান শরিফ বলেন, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের একটি হাওরে আবেদ নামের একজন ইউএনও এরকম ব্যবস্থা করেছিলেন। সম্ভবত উনি এখন যুগ্ম সচিব হয়েছেন। আবেদ কমিউনিটির মাধ্যমে হাওরে মাছ চাষ করেছিলো। দেখা গেলো সরকার প্রতিবছর সরকারকে ৫ গুণ বেশি রাজস্ব দেয়া সম্ভব হয়েছিলো। সেখানে সবাইকে মাছ ধরার সুযোগ করে দিয়েছিলো।
তিনি আরো বলেন, সুনামগঞ্জের হাওরগুলো প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এই হাওরগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের ইজারা প্রথা সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ পুঁজিপতি হচ্ছে। আর হাওরের বেশিরভাগ মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আগে ইজারা প্রথা বাতিল করতে হবে।
জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তা মো. আমিনুল হক বলেন, চাহিদার থেকে বেশি পরিমাণে মাছ উৎপাদন আছে কিন্তু জেলার সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা থেকে অধিক মূল্য সে মাছের। মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে মূল্য থাকায় অন্য জেলা ও বিদেশে চলে যাচ্ছে। ফলে সুনামগঞ্জ জেলার মাছের চাহিদা পূরণ করছে পাঙ্গাস মাছ।