মাঠে মাঠে ফুটবলানন্দ

সুব্রত কুমার দাশ, শাল্লা
ক্রীড়ার দিক দিয়ে শাল্লা উপজেলা ছিল এক সময় সমৃদ্ধ। প্রতি গ্রামেই ছিল নিজস্ব খেলার মাঠ। যুব ও পৌররা মিলে দল বেঁধে ফুটবল খেলত। প্রতিটি গ্রামে আয়োজন হতে ফুটবল প্রতিযোগিতার। ৬০ থেকে ৮০ দশকে বৈশাখ মাসে হাওরের একমাত্র বোরো ফসল কৃষকের গোলায় তোলার পর পুরো জ্যৈষ্ঠ মাস ছিল ফুটবল খেলার মৌসুম। পুরো মাস ভাটীর জনপদ শাল্লা ফুটবলানন্দে মেতে উঠত। বিগত ১৫-২০ বছর যাবত অসময়ে বর্ষার পানি চলে আসায় গ্রাম বাংলার ফুটবল আনন্দ আর হয় না। ফসল হারানোর কষ্টে কমে গিয়েছিল এমন আনন্দ। কিন্তু এ বছরের ফসলের বাম্পার ফলন ও অসময়ে পানি না আসায় পুরো শাল্লা ফুটবল আনন্দে মেতে উঠেছে। প্রতিটি গ্রামেই আয়োজন হচ্ছে ঘরোয়া লীগ। এই সমস্ত লীগে ৮-১০ দল অংশগ্রহণ করছে। দলগুলো হতে হবে গ্রামের ভিতরেই।
দলের নাম যেমন- ছাত্রদের দল, কামলাদের (শ্রমিক) দল, কিশোরদের দল, পৌরদের দল ইত্যাদি। নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিয়ে দলে অন্তর্ভূক্ত হতে হয়। বিজয়ী ও বিজিত উভয় দলকে পুরস্কৃত করা হয় খাঁসি দিয়ে। তারপর এই দুই খাঁসির সাথে আরো কিছু খাঁসি কিনে পুরো টুর্নামেন্টের আয়োজক ও খেলোয়ার মিলে ভুরিভোজের আয়োজন করা হচ্ছে।
গেল দুই দিন শাল্লার বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- ইতিমধ্যে ঘরোয়া লীগ সম্পন্ন হয়েছে হরিপুর, মেঘনাপাড়া, বাহাড়া, সুলতানপুর, সুখলাইন, সাউধেরশ্রী সহ ২০-২৫টি গ্রামে চলছে ফুটবল টুর্ণামেন্ট।
উপজেলার ভেড়াডহর মাঠে ভেড়াডহর যুব সংঘের উদ্যোগে চলছে ফুটবল টুনার্মেন্ট। পুরস্কার থাকছে ১টি ঘোড়া ও ১টি খাঁসি। আঙ্গারুয়া গ্রামে শুরু হয়েছে শেখ রাসেল ফুটবল টুনার্মেন্ট, পুরস্কার থাকছে টেলিভিশন। শাসখাই মাঠে ফুটবল টুনার্মেন্ট, পুরস্কার থাকছে সোনার নৌকা সোনার বৈঠা ও রুপার নৌকা রুপার বৈঠা। দামপুর মাঠে ফুটবল টুনার্মেন্ট, পুরস্কার থাকছে টেলিভিশন, মুক্তারপুর মাঠে ফুটবল টুনার্মেন্ট, পুরস্কার থাকছে সোনার নৌকা সোনার বৈঠা ও রুপার নৌকা রুপার বৈঠা। প্রতিটি টুনার্মেন্টেই ১৬ দল অংশগ্রহণ করবে এবং প্রতিটি টুনার্মেন্টই উদ্ভোধন করেছেন শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু তালেব, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আলা উদ্দিন ও শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম।
রোববার থেকে ভাটী ইয়ারাবাদ মাঠে শুরু হচ্ছে ১৬ টিমের ফুটবল টুনার্মেন্ট যেটিতে পুরস্কার থাকবে সোনার নৌকা ও রুপার নৌকা। উদ্ভোধন করবেন শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু তালেব।
নাইন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিজন চৌধুরী বলেলন- আমাদের গ্রাম হরিপুরের যুব সমাজের উদ্যোগে সবাই মিলে কয়েকদিন আগে ঘরোয়া ফুটবল লীগের আয়োজন করি। এতে ৬টি দল অংশ গ্রহণ করে। বিজয়ী ও বিজিত দল উভয়কেই খাঁসি উপহার দেওয়া হয়। এসব আয়োজনে গ্রামের মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা যেমন বাড়ে, তেমনি ভাটীর মানুষের বিনোদনেরও একটি উপলক্ষ্য হয়। খাঁসি ২টি দিয়ে শুক্রবার গ্রামের সব পুরুষ মিলে একসাথে ভুরিভোজের আয়োজন হয়েছিল। এই আনন্দের সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় না।
শিক্ষক ও ফুটবল ধারাভাষ্যকার সুদীপ্ত কুমার দাস বললেন- হাওরে ফসল ভালো হওয়ায় ও অসময়ে পানি না আসায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই হাওরের জৈষ্ঠ্য মাসের একমাত্র বিনোদন ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত।
সাবেক কৃতি ফুটবলার হিমাদ্রী সরকার হিমেল বললেন- আমাদের গ্রামে আমরা শেখ রাসেল ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছি। আশে পাশের গ্রাম থেকে দল বেঁধে আমাদের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে আসে এবং খেলা শেষে এক সাথে হই-হুল্লোড় করে বাড়ী যায়। এটার মজাই আলাদা।
শাল্লা উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রীড়া সম্পাদক কালীপদ রায় বললেন- এ বছর গ্রামে গ্রামে ঘরোয়া লীগ, বিভিন্ন টুর্নামেন্টের কারণে মানুষের মাঝে ফুটবলের এক অন্যরকম আমেজ সৃষ্টি হয়েছে।