Deprecated: Required parameter $display_count follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292

Deprecated: Required parameter $total_shares follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292
মানবতাবাদী দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ – সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক

মানবতাবাদী দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ

এস ডি সুব্রত
“জাগো বীর ঘুচায়ে স্বপন ,
শিয়রে শমন, ভয় কি তোমার সাজে ?
দুঃখভার , এ ভব ঈশ্বর,
মন্দির তাঁহার প্রেতভূমি চিতা মাঝে।” (স্বামী বিবেকানন্দ)
মানবতাবাদী দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি নরেন্দ্র নাথ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার শিমলা পল্লীতে। পিতার নাম বিশ্ব নাথ দত্ত এবং মাতা ভূবনেশ্বরী দেবী। অনেক সাধনার পর কাশীধামের বীরেশ্বর শিবের প্রাসাদে পুত্র হয় বলে নাম রাখা হয় বীরেশ্বর। সংক্ষেপে বিলে। সাহচর্য পান গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের। এক সময় শুরু হয় গুরু শিষ্যের দিব্যলীলা , যার পরিশেষে পাই নরেন্দ্র নাথের পূর্ণ বিকাশ স্বামী বিবেকানন্দ । “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাডি় কোথা খুঁজিছো ঈশ্বর, জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ এই চরণের প্রবক্তা আমাদের সকলেরই পরিচিত স্বামী বিবেকানন্দের কথাই বলছি। ১২ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিবস ।তাঁর কর্মপ্রেরণায় অনুপ্রাণীত হয়েই দিনটি ভারতে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কলকাতার এক বাঙালি পরিবারে এই সংস্কারক মহাপুরুষের জন্ম। নিজের উপর বিশ্বাস না আসিলে ঈশ্বরে বিশ্বাস আসে না।’ অথবা ‘সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা চলে কিন্তু কোন কিছুরই জন্য সত্যকে বর্জন করা চলে না।’কিংবা ‘বাহিরের কিছুর উন্নতি হয় না, জগতের উন্নতি করিতে গিয়া আমারই উন্নতি হয়।’- এই কথামৃতগুলো এই মহাপুরুষের। এমন অসংখ্য বাণী তিনি মানবের জন্য রেখে গেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের পিতৃপ্রদত্ত নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৮৮১ সালে তিনি সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সান্নিধ্যে আসেন এবং ১৮৮৭ সালে সন্ন্যাস গ্রহণের পর ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নাম ধারণ করেন। জীব প্রেমই ছিল স্বামী বিবেকানন্দর জীবনদর্শন। জীবের কল্যাণ এবং সার্বিক উন্নতিতে কাজ করার অভিপ্রায়ে তিনি হাজার বার জন্মগ্রহণেও রাজি ছিলেন। এমনকি এ জন্য নরকে যেতেও ছিলেন প্রস্তুত। অজ্ঞ, কাতর, পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর এ কারণেই তার ধর্ম-দর্শন-অধ্যাত্মচিন্তার সবটুকু জুড়ে রয়েছে মানুষের কথা। তার নিজের হাতে গড়ে তোলা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনেও সেই মানুষের কল্যাণই প্রাধান্য পেত। তিনি মানুষ, যথার্থ মানুষ, ভালো মানুষ, সচেতন-শুভ্র-সুন্দর-শুদ্ধসত্ত্ব মানুষ চান। তার মতে, জন্মালেই আমরা সবাই মানুষ হয়ে উঠি না। মানুষ হয়ে উঠতে হয়। মানুষ অন্যান্য পশুর মতোই। এই অ্যানিম্যালিটি থেকে তার উত্তরণ বুদ্ধি ও চিন্তার বিকাশে। যা অন্যান্য পশুর মধ্যে ঘটতে দেখা যায় না। পরবর্তী স্তর হলো ইন্টেলেকচুয়ালিটি। অর্থাৎ মনন ও প্রজ্ঞায় উত্তরণ। পরের স্তর হিউম্যানিটির, অর্থাৎ মানবতার আলোকিত ভুবন। জীবনে জীবন সংযুক্তির প্রত্যয়। সবশেষে দেবত্বের উত্তুঙ্গে উত্তরণ। এই দেবতা হয়ে ওঠার অর্থ স্বামীজির কথায়, ‘মান’ আর ‘হুঁশ’ সংবলিত প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। আধ্যাত্মিক বিষয়ে বিবেকানন্দের বিশেষ আগ্রহ ছিল ছেলেবেলা থেকেই। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের অংশ; তাই মানুষের সেবার মাধ্যমেই ঈশ্বরের সেবা করা যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যটন করেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করেন। যদিও ছেলেবেলা থেকেই তার মধ্যে জ্ঞানস্পৃহা লক্ষ্য করা গিয়েছিল । এ প্রসঙ্গে পরে বিবেকানন্দ নিজেই বলেছেন, ‘আমার জ্ঞানের বিকাশের জন্য আমি মায়ের কাছে ঋণী।’ তিনি তার মায়ের একটি কথা বার বার বলতেন, ‘সারা জীবন পবিত্র থাকো, নিজের সম্মান রক্ষা করো, অন্যের সম্মানে আঘাত করো না। কোমল হও, কিন্তু প্রয়োজনবোধে নিজের হৃদয়কে শক্ত রেখো।’১৮৮৮ সালে পরিব্রাজকরূপে মঠ ত্যাগ করেন বিবেকানন্দ। তিনি স্বাধীনভাবে পর্যটন করে বেড়ান কোনো স্থায়ী বাসস্থান বা বন্ধন ছাড়াই। পাঁচ বছর ধরে ভারতের সর্বত্র ভ্রমণ করেন বিবেকানন্দ। সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্টের প্রতি তার সহানুভূতি জন্মায় এবং তিনি জাতির উন্নতিকল্পে আত্মনিয়োগ করেন। ভ্রমণকালে হথরাসে তার সঙ্গে স্টেশন মাস্টার শরৎচন্দ্র গুপ্তের সাক্ষাত হয়, যিনি পরে বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ‘সদানন্দ’ নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন বিবেকানন্দের প্রথম যুগের শিষ্য। ১৮৯০ সালের জুলাই মাসে গুরুভ্রাতা স্বামী অখ-ানন্দের সঙ্গে তিনি পুনরায় পরিব্রাজক সন্ন্যাসীরূপে দেশভ্রমণে বের হন। মঠে ফেরেন একেবারে পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে। প্রথমে যান নৈনিতাল, আলমোড়া, শ্রীনগর, দেরাদুন, ঋষিকেশ, হরিদ্বার এবং হিমালয়ে। ১৮৯১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে দিল্লির পথে অগ্রসর হন।
এরপর জয়পুর, মাউন্ট আবু, খেতরি। ১৮৯১ সালের অক্টোবরে যান রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রে। পশ্চিমে যাত্রাপথে ভ্রমণ করেন আমেদাবাদ, ওয়াধওন ও লিম্বদি। সেখান থেকে জুনাগড়, গিরনার, কচ্ছ, পোরবন্দর, দ্বারকা, পালিতানা ও বরোদা। এরপর যান মহাবালেশ্বর ও পুণায়। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর উদ্দেশে মুম্বাই ত্যাগ করেন স্বামীজি। শিকাগো যাওয়ার পথে জাপান ভ্রমণ করেন। ওসাকা, কিয়োটো এবং টোকিও ভ্রমণ করে ইয়োকোহামা যান। চীন, কানাডা হয়ে অবশেষে শিকাগো পৌঁছেন। শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধর্মসভা শেষ হবার পর বিবেকানন্দ পুরো দুই বছর পূর্ব ও কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে শিকাগো, ডেট্রয়েট, বোস্টন এবং নিউইয়র্কে বক্তৃতা দেন। ১৮৯৫ সালের বসন্তে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। দুই মাসব্যাপী তিনি থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড পার্কে তার এক ডজন শিষ্যকে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়ার জন্য ভাষণ দেন। এ সময়ের পরেই তিনি ‘নিউইয়র্ক বেদান্ত সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করেন দুইবার, ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে। এখানে তিনি সাক্ষাৎ পান এক আইরিশ মহিলা মিস মার্গারেট নোবলের যিনি পরে ‘সিস্টার নিবেদিতা’ নামে পরিচিত হন।
পশ্চিমে থেকেই তিনি ভারতীয় তরুণদের ধর্মীয় দর্শনে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় তিনি ভারতে অবস্থানরত তার অনুসারী ও সন্ন্যাসীদের উপদেশ দিয়ে বিরামহীনভাবে চিঠি লেখেন। পাশ্চাত্য থেকে পাঠানো তার চিঠিসমূহ সে দিনগুলিতে সামাজিক কাজের জন্য তার প্রচারাভিযানের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
১৮৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। পথিমধ্যে ফ্রান্স ও ইতালি ভ্রমণ করেন। বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি কলম্বো পৌঁছান। সেখান থেকে কলকাতায় তার ভ্রমণ ছিল এক বিজয়ঘটিত অগ্রগতি। জনগণ এবং রাজারা তাকে অত্যুৎসাহী অভ্যর্থনা জানান। পাম্বানে মিছিলে রামনাদের রাজা নিজে স্বামীজির ঘোড়ার গাড়ি টানেন। মাদ্রাজে যাওয়ার পথে কতিপয় জাগয়ায় যেখানে ট্রেন থামতো না সেখানে জনগণ রেললাইনে বসে ট্রেন থামাতো এবং স্বামীজির বক্তৃতা শোনার পরই ট্রেন যেতে দিত। এ বক্তৃতাসমূহকে জাতীয়তাবাদী ঐকান্তিকতা ও আধ্যাত্মিক ভাবাদশের্র বলে বিবেচনা করা হয়। এই মানবতাবাদী দার্শনিক ৪ জুলাই ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।