মানবিক বাংলাদেশ

ইকবাল কাগজী
গত ১৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখের ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’-য়ের একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘এরা ৩ শিক্ষাসংগ্রামী ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেল’। সংবাদবিবরণীর শুরুতেই লেখা হয়েছে, ‘হাওরপাড়ের দরিদ্র মানুষদের স্বপ্ন দেখায় তারা। এরা শিক্ষাসংগ্রামী। দারিদ্র্যতার কষাঘাত দমাতে পারেনি তাঁদের। এসএসসি-এইচএসসি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এরা।’ একটু পরে, এর নিচে একজায়গায়, লেখা হয়েছে, ‘কিন্তু সুযোগ পেয়েও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে ভর্তি হবে, ঢাকায় কোথায় থাকবে, লেখাপড়া-থাকা-খাওয়ার খরচ আসবে কোথা থেকেÑ এই চিন্তায় পেয়ে বসেছে তাদের।’  
এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে। সংবাদের শুরুতে উদগত স্বপ্ন অর্থহীনতায় পর্যবশিত হতে চলেছে, বুঝাই যাচ্ছে,  দরিদ্র কৃষকের অভাবক্লিষ্ট সংসারে নিত্যদিন লেগে থাকা অর্থকষ্টের প্রবল চাপে। এই সংবাদটি বলে দিচ্ছে : ‘হাওরপাড়ের দরিদ্র মানুষদের স্বপ্ন দেখা’-র সাধ, মেধাবী ছেলে কিংবা মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার মনস্কামনা, পুঁজিকর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনীতির শোষণনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট। কোনও একটি সমাজের জন্য, এই তথ্যপ্রযুক্তির বিপুল উৎকর্ষের সন্ধিক্ষণে, যে-কোনও মানুষের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকার মতো আর্থনীতিক প্রেক্ষিত তৈরি হওয়াকে যে-কোন  বিবেচনায় মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হওয়াই সঙ্গত। এই অমানবিকতাকে প্রতিরোধ করা অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু এখানে রাজনীতিবিদ নীতিনির্ধারকরা রাষ্ট্রের ভেতরে এমন আর্থসামাজিক বিন্যাস গড়ে তোলেছেন যে, সে-সমাজকাঠামোর ভেতরে মানুষের মৌলিক পাঁচটি চাহিদাকে রাষ্ট্র যথাযথভাবে পূর্ণ করতে পারছে না, বরং মানুষে মানুষে অর্থবৈষম্য দিনে দিনে বাড়ছে বই কমছে না। কৃষকের মেধাবী সন্তান শিক্ষাব্যয় বহনে ব্যর্থ হয়ে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কথায় বলে, আশায় বসতি। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। এবার যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী কেবল টাকার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তাদের ভর্তিসহ শিক্ষখাতের বিভিন্ন ব্যয় বহনে সহৃদয় সহায়তা দিচ্ছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের কতিপয় মানুষ। বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার    
প্রেক্ষিত এমন যে, দৃষ্টান্ত উপস্থাপন না করেই বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় মানবিকতা বা সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের মানবিক পরিস্থিতি প্রসংশনীয় অবস্থানে নেই। এই যখন অবস্থা তখন ‘টাকার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না’ যারা ‘তাদের ভর্তিসহ শিক্ষখাতের বিভিন্ন ব্যয় বহনে সহৃদয় সহায়তা’ যারা দিচ্ছেন নগদ অর্থে, তাঁরা প্রকৃতপ্রস্তাবে এক ‘মানবিক বাংলাদেশ’-য়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন বলেই প্রতিভাত হয়। এই ‘মানবিক বাংলাদেশ’-য়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে আছেন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ জনও। আছেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার, থানার ওসি, কর কমিশনার, চিকিৎসক, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি প্রমুখ। তাঁদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম কিংবা প্রণতি ।
যাঁদের নাম পত্রিকায় পড়েছি এবং মনে আছে, তাঁরা হলেন : মো. সাবিরুল ইসলাম (জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ), জ্যোতির্ময় সরকার (সিলেট মহানগর পুলিশের মোগলাবাজার থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার), আনোয়ার হোসেন (সিলেট মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা), মো. আক্তার হোসেন (সিলেট শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা), সৈয়দ মোহাম্মদ আক্তার হোসেন (পে-ইট-ফরোয়ার্ড’র সিলেট কর অঞ্চলের কমিশনার), শাহেদুল ইসলাম কয়সর (ডিরেক্টর, ঢাকার উৎস ইনস্টিটিউট অব সনোগ্রাফি), ডা. নূরুল ইসলাম (সাধারণ সম্পাদক, সুনামগঞ্জ বিএমএ), ডা. সৈকত দাস (আহ্বায়ক, সুনামগঞ্জ মেডিকেল স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন), খন্দকার আশরাফুজ্জামান (মৌলভিবাজারের শ্রীমঙ্গল সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুরিশ সুপার), মাহফুজ্জামান সরকার ফিরোজ (হাইওয়ে পুলিশ ঢাকা হেড কোয়াটার্সের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার), সমকাল সুহৃদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখা, ইয়ং থিংকিং, শশাঙ্ক শেখর তালুকদার বিন্দু (প্রাক্তন ইউপি সদস্য) প্রমুখ।